বিপন্ন গণমাধ্যম: সূচকের লজ্জা

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:৪৩, এপ্রিল ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৫, এপ্রিল ২৫, ২০২০

আমীন আল রশীদকরোনার বিপদের মধ্যে অন্যান্য খাতের মতো দেশের গণমাধ্যমও যখন ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, অনেক পত্রিকার ছাপা সংস্করণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে, হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান যখন তাদের কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতে পারছে না—সেই সময়ে জানা গেলো, বিশ্বে মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে আরও একধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ)-এর এই সূচকে প্রতিবেশী সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। এমনকি যে মিয়ানমারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলে কিছু নেই, সেই মিয়ানমারেরও পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ। মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশে কেন এতটা পিছিয়ে, তার অনেক ব্যাখ্যা আছে। আবার সব যুক্তির সঙ্গে সরকার হয়তো একমতও হবে না। তবে আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় মুক্ত গণমাধ্যম নয়, বরং করোনার কালে দেশের গণমাধ্যম কেমন আছে, সেটি দেখা।  ‍
২৩ এপ্রিল পেশাদার সাংবাদিকদের একটি ফেসবুক গ্রুপে জানানো হয়, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের অন্তত ২০ জন সংবাদকর্মীকে একসঙ্গে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একজন সাংবাদিক নেতাও চাকরিচ্যুতি বিষয়ক একটি চিঠি ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন। বলা হচ্ছে, এটি করোনার প্রভাব। এর আগে গত ৪ এপ্রিল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণ। এর প্রতিবাদে সম্পাদকের বাসার নিচে ভিড় করেন সাংবাদিক নেতাসহ প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা।

এর কয়েকদিন আগে দৈনিক মানবজমিনের ছাপা সংস্করণও বন্ধের ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ। তাদের তরফে জানা যায়, করোনার কারণে যেহেতু দেশের সব জায়গায় পত্রিকা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না, তাছাড়া কর্মীদের কাজের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে, তাই প্রিন্ট ভার্সন সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী পাঠকদের উদ্দেশে লিখেছেন, কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই ছাপা সংস্করণ বন্ধ করা হয়েছে।

একইভাবে ডেইলি ইনডিপেনডেন্ট, শেয়ারবিজ, জনতা, বাংলাদেশের খবরসহ আরও বেশকিছু সংবাদপত্রের ছাপা সংস্করণ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই পত্রিকাগুলোর মুদ্রিত সংস্করণ হয়তো আবার বাজারে আসবে। কিন্তু সেটি কতদিন পরে এবং আগের মতো পত্রিকাগুলোর প্রচার থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, করোনার কারণে যেসব খাত সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে, সংবাদমাধ্যম তার অন্যতম। অথচ করোনার কালে চিকিৎসক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মতোই সংবাদকর্মীরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। এরইমধ্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বাকিরাও ঝুঁকির মধ্যে আছেন। কিন্তু তাদের অনেকের পর্যাপ্ত ‍সুরক্ষা এবং ঝুঁকিভাতা দূরে থাক, হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কর্মীদের বেতনটাও ঠিকমতো দেয় না। এপ্রিল মাস প্রায় শেষ। কিন্তু শীর্ষ কিছু সংবাদপত্র ও টেলিভিশন বাদ দিলে কয়টি প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের মার্চ মাসের বেতন দিয়েছে—তা অনুসন্ধান করলে খুব আশাপ্রদ কোনও চিত্র পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন খাতের জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রায় এক লাখ কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, সেই প্যাকেজের ভেতরে গণমাধ্যম নেই। করোনায় স্বাস্থ্যকর্মীদের কেউ আক্রান্ত হলে তার জন্য ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্য বিমা ঘোষণা করা হয়েছে। করোনায় মৃত্যু হলে এটি হবে পাঁচগুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও ঘোষণা করা হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা। ব্যাংক কর্মকর্তারা ১০ দিন স্বল্প পরিসরে অফিসে গেলেই পাচ্ছেন পুরো মাসের সমান বিশেষ ভাতা। এছাড়া অন্যান্য সরকারের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণ ছুটির আওতায় থাকলেও বেতনসহ সবকিছুই নিয়মিত পাচ্ছেন।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা রয়েছে। এর মধ্যে হরিয়ানা রাজ্য সরকার করোনাভাইরাস সংক্রান্ত রিপোর্টিংয়ে যুক্ত সাংবাদিকদের জন্য ১০ লাখ রুপির বিমাও ঘোষণা করেছে। এমনকি পাকিস্তানেও করোনার সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারে যুক্ত কোনও সাংবাদিকের মৃত্যু হলে তার পরিবার ১০ লাখ রুপি পাবে। এছাড়া তার স্ত্রী আজীবন মাসে ১০ হাজার রুপি পেনশন পাবেন।

ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মীরা—যারা সব সময় কোথায় কার অধিকার লঙ্ঘিত হলো, সেই খবরের সন্ধানে থাকেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা দেশ-বিদেশের সবশেষ খবর পৌঁছে দিচ্ছেন মানুষের কাছে, তাদের নিজেদের জন্য কোথাও কোনও সুসংবাদ নেই। বরং এতদিন ধরে পুরো গণমাধ্যম খাত যে ধরনের অনিশ্চয়তা আর সংকটের ভেতরে দিয়ে যাচ্ছিল, করোনা সেই সংকট আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নানা ছুঁতোয়-ছাতায় যেসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা তাদের কর্মীদের বেতন দিতেন না বা দিলেও তা অনিয়মিত এবং পর্যাপ্ত নয়—তারাও এখন করোনাকে একটি বড় উসিলা হিসেবে পেয়েছেন। উপরন্তু বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ লুটপাট ও অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ করে হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেকে। গণমাধ্যমের তথাকথিত গুজব ঠেকাতে সরকারের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে নিয়ে একটি সেল গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সব মিলিয়ে গণমাধ্যম যে সবার প্রতিপক্ষ, সেই সত্যটি আরও একবার নির্মমভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

মনে রাখা দরকার, ডাক্তার, নার্সসহ চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা সুরক্ষিত না থাকলে যেমন কেউই করোনার চিকিৎসা পাবেন না, তেমনি সাংবাদিকরা কাজ করতে না পারলে মানুষ সঠিক তথ্যটিও পাবে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় সব সত্য জানা যায় না। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু তথ্য জানার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া এখনও মূলধারার গণমাধ্যমের বিকল্প নয়। কারণ কোনও সম্পাদক ও সম্পাদকীয় নীতিমালা না থাকায় সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর অপতথ্য ও বিভ্রান্তিও ছড়ায়। সুতরাং সরকারের নিজের স্বার্থেই গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া উচিত। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি একটি বিবৃতিতে বলেছে, করোনাভাইরাস থেকে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় সাফল্যের অন্যতম পূর্বশর্ত অবাধ তথ্যপ্রবাহ। তাই এ দুর্যোগে তথ্য প্রকাশ ও প্রচারে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং পেশাগত সুরক্ষা ও নিয়মিত বেতনভাতার পাশাপাশি আপৎকালীন প্রণোদনা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষ ও সরকারের কাছে আহ্বান জানায় সংস্থাটি।

বলা হচ্ছে, করোনাউত্তর পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়াবহ হবে অর্থনৈতিক সংকট। বিশেষ করে বেসরকারি খাত। সেই ধারাবাহিকতায় দেশের সংকটাপন্ন গণমাধ্যম খাতটি যে আরও বেশি বিপন্ন হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। হয়তো মালিকরা তাদের অন্য ব্যবসা ঠিক রাখতে পত্রিকা ও টেলিভিশনগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করবেন না, কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই ঠিকমতো বেতন পাবেন না। অনেক প্রতিষ্ঠানে যে ছাঁটাই চলছে, তা আরও বাড়বে। বিকল্প না থাকায় অনেকে বেতন ছাড়াই হয়তো চাকরি করবেন। কারণ চাকরিটা না থাকলে তারা পরিচয় সংকটে পড়বেন, যা তাদের আরও বেশি অনিরাপদ করে তুলবে। অর্থাৎ যে গণমাধ্যম খাত এতদিনেও পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারলো না, সেই খাতটি যে আরও বেশি সংকটে পড়বে, তা মোটামুটি চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়।

কিন্তু দেশ ও মানুষের প্রয়োজনে গণমাধ্যমকে তো বাঁচাতে হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই, যেকোনও বিপর্যয়ের কালে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনেক বেড়ে যায়। কারণ মানুষ দুর্যোগের সবশেষ তথ্য জানার জন্য মূলধারার গণমাধ্যমেই ভরসা করে। কেননা এই সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানারকম গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ায়। গণমাধ্যমকে তখন সঠিক তথ্যটি জানাতে হয়। কিন্তু সেই গণমাধ্যম নিজেই যদি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তাহলে গুজব ও বিভ্রান্তির ডালপালা মেলবে, যা সংকট মোকাবিলায় সরকারের বিবিধ উদ্যোগ ভেস্তে দিতে পারে।

গণমাধ্যমের আয়ের উৎস মূলত বিজ্ঞাপন। কিন্তু করোনার কারণে বিজ্ঞাপন এখন বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। সুতরাং এই সংকটকালে যখন নানা খাতের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ঘোষণা করা হলো, সেই আলোকে গণমাধ্যমকে জরুরি সেবাখাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবাদকর্মীদের নিয়মিত বেতনভাতা ও প্রণোদনা নিশ্চিতের জন্য সরকারি উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) এবং টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো), সম্পাদক পরিষদ ও এডিটরস গিল্ড এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

করোনাকালীন সংকট মোকাবিলায় ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন, যেমন সরকারের কাছে বিজ্ঞাপন বাবদ সংবাদপত্রগুলোর যে পাওনা রয়েছে সেই টাকাটা এই মুহূর্তে পরিশোধ করা। সব টাকা সরকার পরিশোধ করে দিলে তা সংবাদপত্র প্রকাশনা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে অনেক বড় সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন। তাছাড়া সরকার যেহেতু বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা দিচ্ছে, সেই ধারাবাহিকতায় সংবাদকর্মীদেরও সরাসরি আর্থিক প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসারও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে বিভিন্ন খাতের মতো এই খাতেও ঋণ দেওয়ার পরামর্শ তার। সেই সঙ্গে অগ্রিম আয়কর দেওয়ার একটি বিরাট চাপ রয়েছে গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। সেটি আপাতত ছয় মাসের জন্য স্থগিত রাখারও প্রস্তাব দিয়েছেন এই সিনিয়র সাংবাদিক। আমরা প্রত্যাশা করি, সংবাদমাধ্যমে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে স্বীকৃতির বিষয়টি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে, দেশ ও মানুষের স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের টিকে থাকার প্রশ্নে সরকার আন্তরিক হবে। সেই সঙ্গে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোয় পেশাদারিত্ব গড়ে উঠবে, সংবাদকর্মীরা নিয়মিত বেতনভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাবেন, কর্মী ছাঁটাই বন্ধ হবে এবং দেশে গণমাধ্যমের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি হবে, যাতে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে মিয়ানমারের মতো দেশের পেছনে থাকার মতো ঘটনা আমাদের লজ্জিত না করে।

লেখক: সাংবাদিক।

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ