মানুষের বিভাজন ভাইরাসের সংযোজন

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১৬:২৭, এপ্রিল ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৯, এপ্রিল ২৮, ২০২০

মাসুদা ভাট্টিবিংশ শতক মানুষকে এক ধরনের অহংকার দিয়েছিল যে, মানুষ চাইলেই সবকিছুকে জয় করতে পারে। বিশেষ করে কলেরা, বসন্ত, হাম, যক্ষ্মা কিংবা যেকোনও সংক্রমণের মহৌষধ হিসেবে ‘পেনিসিলিন’ আবিষ্কার মানুষকে এতটাই ক্ষমতাবান করে তুলেছিল যে, শেষাবধি রাসায়নিক মারণাস্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে ‘জীবাণু-যুদ্ধে’ জড়ানোর জন্য মানুষ উঠেপড়ে লেগেছিল। যেকোনও মুহূর্তে পৃথিবীতে একটি ‘জীবাণু-যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে, সেরকম আশঙ্কাও তৈরি হয়েই ছিল। বিংশ শতকের শেষ দিকে এসে মানুষের হাতে আসে আরেক অস্ত্র, যার নাম ‘তথ্য’, অবাধ তথ্যপ্রবাহের নামে এই তথ্যকে ব্যবহার করে দুর্বলের ওপর সবলের চাপ বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত সফল রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য পৃথিবীর দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে ক্রমাগতভাবে শুষে যাচ্ছিল। কিন্তু একুশ শতকের শুরুতে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোও এই তথ্যে নিজস্ব পারঙ্গমতা অর্জন করার ফলে এই শোষণের মাত্রা ও তীব্রতা কমতে শুরু করেছিল। পৃথিবীর অক্ষ বদলাতে শুরু করেছি মাত্র। কিন্তু তারই মাঝে এলো এই করোনা-ঝড়, যাতে আবার মানুষের নিজের গড়া পৃথিবী যা নিয়ে এতদিন গর্ব করেছে মানুষ, সেটাই এখন পুরোপুরি বদলে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে মানুষের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। অ-কোষী ভাইরাসের কাছে নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করা মানুষের এই আপাত পরাজয় মানুষকে যুগপৎভাবে দিশেহারা করে তুলেছে এবং ভবিষ্যৎ-শঙ্কায় দেশে দেশে যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে, তা আসছে পৃথিবীকে কোন জটিলতায় নিয়ে ফেলবে, এটা নিয়ে আলোচনা চলছে সর্বত্র।

বিংশ শতকে পৃথিবীর ক্ষমতাগর্বী মানুষ দুই-দুইটি বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়েছে এবং এই মানব-সৃষ্ট যুদ্ধে মানুষের মৃতের সংখ্যা যেকোনও মহামারির তুলনায় কম নয়। ইউরোপের ব্ল্যাকডেথ কিংবা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ যে পরিমাণ মানুষের প্রাণহরণ করেছিল দুই-দুইটি বিশ্বযুদ্ধ এবং তার কারণে দেশে দেশে ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষের কারণে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা হিসাব করলে খুব বড় কোনও পার্থক্য পাওয়া যাবে না। বিশ্ব যখন ক্ষমতা ও বাণিজ্যদম্ভ নিয়ে যুদ্ধে রত, তখন ভারতবর্ষের বাংলায় চলছে চরম দুর্ভিক্ষ, মাত্র এক বছরে ২৫ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল এই মানব-সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে। অপরদিকে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে মাত্র নয় মাসে ৩০ লাখ বাঙালি প্রাণ হারায়। বিংশ শতক যেমন বিভিন্ন আবিষ্কারে ও সৌকর্যে মানব সম্প্রদায়ের জন্য গর্বের সময় তেমনি বিশ শতক মানুষের কারণে মানুষের মৃত্যুর এক ভয়ংকর সময়কালও। অথচ মধ্যযুগের ক্ষমতা দখলকারী রাজাদের রাজ্যবিস্তারের লক্ষ্যে মানুষ হত্যাকে অস্বীকার করেই বিংশ শতক ‘সভ্যতার’ পথে যাত্রা শুরু করেছিল বলে দাবি করা হয়। কলেরা, বসন্ত, যক্ষ্মা কিংবা পোলিও’র মতো রোগ থেকে মুক্তি পেতে মানুষ যুগান্তকারী আবিষ্কার দিয়ে মানব জাতিকে রক্ষা করার জন্য একদিকে যেমন প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য, তেমনি অপরদিকে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য ঘটানো যুদ্ধে জড়িয়ে মানুষ নিজেই নিজেকে হত্যার জন্য নিন্দার্হ।

মজার ব্যাপার হলো সভ্যতাগর্বী মানুষ যে পৃথিবীকে নিয়ে গর্ব করে, সেই পৃথিবীকে ধ্বংসের জন্য বানিয়েছে ১৫ হাজার পারমাণবিক বোমা বা ‘ওয়ারহেড’। এর বেশিরভাগই পৃথিবীর দুই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছে মজুত রয়েছে, যা দিয়ে পৃথিবীকে কয়েকবার ধ্বংস করা সম্ভব বলে মনে করে পারমাণবিক শক্তি নিবারণী প্রচারমূলক সংস্থা নিউকম্যাপ। তারা একটি উদাহরণ দিয়ে বলতে চায়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা বি-৮৩ নামের একটি বোমা বিস্ফোরণের প্রথম চব্বিশ ঘণ্টায় ১৪ লাখ মানুষ মারা যাবে এবং ৩৭ লাখ মানুষ গুরুতর আহত/অসুস্থ হবে এবং ১৩ কি.মি. শহর এলাকা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। অপরদিকে রাশিয়ার কাছে থাকা ‘জার বোম্বা’ নামের বোমার আঘাতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৭৬ লাখ মানুষ মারা যাবে এবং গুরুতর আহত/অসুস্থ হবে ৪২ লাখ মানুষ, নিউ ইয়র্কের মতো একটি শহর ধ্বংস করতে এই বোমার লাগবে মাত্র এক ঘণ্টা। আরও মজার কথা হলো, কেবল যুক্তরাষ্ট্র কিংবা রাশিয়ার দুই যুযুধান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিংবা পুতিনই নয়, গোটা বিশ্বেই যাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তারা প্রত্যেকেই এই অস্ত্র আরও বাড়ানোর ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। পাকিস্তানের এক সময়কার প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন, পাকিস্তানকে যদি একশ’ বছর না খেয়েও থাকতে হয় তবুও পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে এবং বলাই বাহুল্য, পাকিস্তান তার প্রধান শত্রু তালিকায় স্থান দিয়ে রেখেছে আরেক পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র ভারতকে। দুই দেশেই প্রবল দারিদ্র্য প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণ সংহার করে (ভারতে প্রতি বছর ২০ লাখ শিশু মারা যায় অতি-দারিদ্র্যের কারণে এবং পাকিস্তানে ২৬ লাখ শিশু মারা যায় প্রতি বছর) অথচ দু’দেশই তাদের সামরিক বাজেট (গোপন ও প্রকাশ্য) প্রতি বছরই বাড়ানোর জন্য পৃথিবীতে ‘কুখ্যাতি’ অর্জন করেছে। মোট জিডিপি’র ৩.৬ (পাকিস্তান) এবং ২.৮ (ভারত) ভাগ সামরিক খাতে ব্যয় করে দেশ দু’টি নিজের দেশের প্রায় ৩০ ভাগ জনগণকে না খাইয়ে মারার পথ উন্মুক্ত রাখছে। আর গোটা বিশ্বের কথা যদি বলি তাহলে প্রায় ২.২ শতাংশ সামরিক ব্যয় নিয়ে বিশ্ব তার ৩৬ শতাংশের বেশি জনসংখ্যাকে প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যে রেখে মানব সভ্যতার দম্ভ প্রকাশ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। শুনলে হয়তো হাসি পেতে পারে তবে অতীব দুঃখের সঙ্গে এই সত্য আমাদের জানতে হয় যে, পৃথিবীতে ১.৮৫ বিলিয়ন মানুষ চরম দরিদ্র অবস্থায় জীবন-যাপন করে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় অর্ধেক মানুষকে প্রতিদিন মাত্র ১.২৫ ডলার দিয়ে জীবন-যাপন করতে হয়, যা দিয়ে এক কেজির সামান্য বেশি চাল কেনা সম্ভব মাত্র।

এমন এক বৈষম্যময় পৃথিবীতে যখন করোনাভাইরাসের মতো মহামারি আসে, তখন সভ্যতাগর্বী পৃথিবীর নগ্ন চেহারাটা আরও নগ্ন হয়ে ওঠে আমাদের সামনে। কেবলমাত্র বাংলাদেশের মতো সদ্য উন্নয়নশীল দেশের তালিকা থেকে বেরুনো রাষ্ট্রই নয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা ফ্রান্স বা ইতালির মতো রাষ্ট্রগুলোও যে তাদের নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবার খাতটি চরম অবহেলার মধ্যে রেখে এতদিন নিজেদের উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রচার করতে যে ঢোলটি জোরেশোরে বাজিয়েছে তাও আসলে ফুটো। আমাদের অবাক করে দেয় দেশে দেশে বড় বড় কোম্পানি করোনা আক্রান্ত হওয়ার কারণে ঘোষিত ‘স্টে হোম’ নির্দেশের সুযোগ নিয়ে রাতারাতি বন্ধ ঘোষণা দিয়ে বসে অথবা সরকারের কাছে হাত পাতে ‘প্রণোদনার’ জন্য। একরকম ব্ল্যাকমেইল করেই বলে, হয় আমাদের প্রণোদনা দাও নাহলে হাজার হাজার শ্রমিককে আমরা ছাঁটাই করবো, তাতে ফল বেশি ভালো হবে না। প্রশ্ন হলো, এতদিন যে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা কোম্পানিগুলো করেছে, সে অর্থ তারা কোথায় ব্যয় করেছে যে মাত্র মাস দু’য়েকের ‘বন্ধ’ ঘোষণার ফলে তাদের দেউলিয়া হতে হচ্ছে? এসব কোম্পানির সিইওগুলো কতটা অদক্ষ ও অবিবেচক হলে এই অল্প সময় টিকে থাকার কৌশল তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় না রেখেই বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বেতন বোনাসের নামে! এসব প্রশ্ন তোলার মতো ‘গলা’ খুব কম মানুষেরই আছে কিংবা সেগুলো শোনার মতো ‘কান’ই বা ক’টা আছে, বলুন?

এরকম এক অসম ও গণমানুষকে তুচ্ছ করা ব্যবস্থার পৃথিবীতে করোনা এসে হামলে পড়েছে গণমানুষেরই জীবন সংহারে। প্রায় দুই লাখ মানুষ ইতোমধ্যে মারা গেছে করোনা-আক্রান্ত হয়ে। আরও কতদিন এই অচলবস্থায় মানুষ আটকে থাকবে, তার কোনও ঠিক নেই। এক দেশ থেকে আরেক দেশে করোনাভাইরাস পৌঁছে যাচ্ছে দ্রুত এবং বদলাচ্ছে নিজের চরিত্র। কিন্তু একটি জায়গায় এই করোনাভাইরাস ও তার প্রভাব একই রকম থাকছে, তা হলো এর অভিঘাতে মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম ও ভয়াল দুর্দশা, মানুষের ভবিষ্যৎ হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। প্রণোদনা দিয়ে হয়তো রাষ্ট্রগুলো আরও কিছু মাস এই বিপদ থেকে সাময়িক উদ্ধারের চেষ্টা চালাবে এবং তাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এতে উপকৃত হবে ‘চাকরিদাতা’ কোম্পানিগুলো, ‘চাকরি করা’-দের ক্ষেত্রে অবস্থাটার খুব বেশি হেরফের হবে না, বা হচ্ছে না এখনও। করোনাভাইরাস যদিও উভয়পক্ষকেই সমানভাবে আক্রমণ করবে, কাউকে ছাড়বে না। আশার আলো হিসেবে শিগগিরই হয়তো ঘোষণা আসবে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের, এবং সেখানেও মোটামুটি ৬ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করবে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা দেশ বা সংস্থাগুলো। এমতাবস্থায় মানুষের প্রয়োজনে মানুষ অর্থাৎ ‘মানবতাই’ কেবল পারে একটি অচল পৃথিবীকে আশাবাদী ও সচল করে তুলতে। পৃথিবীর বর্তমান ‘অর্ডার’ (ওয়ার্ল্ড অর্ডার) করোনার মতো ভয়ংকর ভাইরাস আক্রান্ত, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। যার ফলে আমরা প্রতিনিয়ত বহুবিধ অনিয়মের শিকারই কেবল নই, হাজারে হাজারে মানুষের মৃত্যুও এই ‘স্ট্যাটাস ক্যুও’-ভাইরাস ঠেকাতে পারে না, খবর না হলে এসব থেকে যায় মানুষের অগোচরেই। আর খবর হলেও পরদিন নতুন খবরের নিচে সেগুলো চাপা পড়ে। আর সে কারণেই করোনাভাইরাস মোকাবিলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে নামতে হবে পৃথিবীর চলমান বাস্তবতা পরিবর্তনে কাজ করতে। এটা কেবল কোনও একক দেশের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন হবে সমগ্র বিশ্বের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের। এটা মানুষেরই জানা আছে যে, মানুষের ভেতরকার বিভাজন ভাইরাসের ক্ষেত্রে উৎসবমুখর সংযোজন, সেটা করোনাভাইরাস হোক আর মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখে দেশে দেশে সামরিক বাজেট বাড়ানোর ভাইরাসময় তৎপরতাই হোক। মানুষই রুখবে, মানুষের ঐক্যই রুখে দেবে এই সকল প্রকার ভাইরাসের আক্রমণকে।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ