করোনা সংক্রমণের দুষ্টচক্রকে রুখতে হবে

Send
রাশেক রহমান
প্রকাশিত : ১৯:৪৩, মে ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪২, মে ০২, ২০২০

রাশেক রহমানসেদিন আমার এক গণমাধ্যমের বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলাম। সে কী করছে তা জিজ্ঞেস করলাম। সে আমাকে বললো নাটক দেখছে। হুমায়ূন আহমেদের আজ রবিবার নাটক দেখছেন। আমি বললাম হুমায়ুন আহমেদ এমন এক চরিত্র ছিলেন, যিনি খুব সহজ ভাষায় মানুষের কাছে কঠিন বার্তাও সরলভাবে পৌঁছে দিতে পারতেন। অনেকেই তখন ভাবতো তিনি কি আসলে পারবেন টিকে থাকতে? কিন্তু বাস্তবতা হলো তার সেই সরল ভাষায় পৌঁছে দেওয়া বিষয়গুলোই কিন্তু এখনও মানুষের মুখে মুখে।
সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে যে শব্দগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, লকডাউন ইত্যদি। আজ হুমায়ূনকে খুব মিস করছি। কারণ, এই শব্দগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের ধাতস্থ করে তোলার যে প্রক্রিয়া, মানুষকে বোঝানোর যে প্রক্রিয়া তা মনে হয় আজও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বুঝে উঠতে পারেননি। একদিকে যেমন তারা পারেননি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করতে, অন্যদিকে তারা পারেননি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও মানুষের মধ্যে স্বস্তির জায়গা সৃষ্টি করতে। হয়তোবা এ বিষয়ে আমাদের জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যারা জড়িত তারা নিজেরাও কিছুটা বিভ্রান্ত। আর এ কারণে আমরা দেখেছি কেউ কেউ বলেছে বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাস আসবে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক।
করোনার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ সে যুদ্ধে আমরা সবাই জয়ী হতে চাই। সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা অনেক হতে পারে। তবে আমাদের আরও কী কী করা যেতে পারে তা নিয়েও কথা বলা যেতে পারে। পেছনের দিক তাকিয়ে কেউ যদি মনে করে কী কী ভুল হয়েছে আর তা নিয়েই পড়ে থাকতে হবে তবে তার সঙ্গে আমি একমত নই। বরং পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও কী কী করা যেতে পারে সেটা তুলে ধরা প্রয়োজন।
কোভিড-১৯ সংক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে সচেতনতা এবং সেটা মোকাবিলা করার জন্য আমাদের চিকিৎকসরা হচ্ছেন অগ্রসৈনিক। আমাদের একদিকে যেমন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সুরক্ষার কথা চিন্তা করতে হবে, তার পাশাপাশি যারা তাকে চিকিৎসাসেবা দেবে সেই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার কথাও চিন্তা করতে হবে। সেই জায়গা থেকে আমার আহ্বান হচ্ছে, একেবারেই জনস্বাস্থ্যের ওপরে যারা পারঙ্গম বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি তাদের দিয়ে একটা সমন্বিত টিম গঠন করা দরকার, যারা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ফ্রন্টলাইনার যোদ্ধা তাদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করবে।

আমরা দেখেছি একজন চিকিৎসক মারা গেছেন করোনা আক্রান্ত হয়ে। এখন পর্যন্ত দেশে প্রায় ৫ শতাধিক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। যদি আমরা কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলার এই ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে আমরা কিন্তু দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবো না। শুধু মানুষ হিসেবেই নয় বরং একজন চিকিৎসক হিসেবেও তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন দেশের স্বার্থেই। এটা আমাদের প্রায়োরিটি ভিত্তিতে করতে হবে।
যেকোনও বৈশ্বিক মহামারি, যা স্থানীয় পর্যায়েও মহামারিতে রূপান্তরিত হয় সেই জায়গায় জনগণ, যারা জনগণকে সেবা দেবেন তাদের সবার সুরক্ষার বিষয় কিন্তু সামনে চলে আসে। সুতরাং নীতিপ্রণয়নের জায়গায় যদি জনস্বাস্থ্যের সম্পৃক্ততা না থাকে তাহলে দীর্ঘমেয়াদে কিন্তু আমরা জয়ী হতে পারবো না। দ্বিতীয়ত, যদি দেখা যায় তবে বাংলাদেশের সক্ষমতার জায়গা থেকে অনেক ঘাটতি থাকতেই পারে কিন্তু আমি কোনও বিতর্কে না গিয়ে বলতে চাই, পৃথিবীর কোনও দেশ কিন্তু এই মহামারির বিরুদ্ধে গিয়ে সফল হতে পারেনি। ঠিক একইভাবে আমার দেশে মহামারির ছোবল কিন্তু অন্যান্য দেশের তুলনায় পরে এসেছে।
সেক্ষেত্রে অন্য দেশগুলো মহামারি মোকাবিলার ক্ষেত্রে কী কী উপায়ে সফল হয়েছে সেটাকে অনুকরণ করার কিছুটা জায়গা আমাদের রয়ে গেছে। এই সুযোগ আমাদের নিতে হবে। নেওয়া হচ্ছে না সেটা বলবো না, কিন্তু সেই সুযোগটা আমাদের নিতে হবে। যেমন, রাশিয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন এক লক্ষ টেস্ট করা হচ্ছে করোনাভাইরাসের জন্য। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সেটা কোনোভাবে সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু কোনটা করা সম্ভব তাহলে? রাশিয়ায় যে লোকগুলোর টেস্ট করার পরে যে মাত্রায় সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে তা কোন পর্যায়ে থাকছে সেটা লক্ষ রাখা যেতে পারে। অর্থাৎ সেই সংক্রমণের মাত্রা কী মৃদু নাকি মাঝারি নাকি সংকটাপন্ন? এটাকে বিশ্লেষণ করে তারা চিকিৎসা করার জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে। আমার দেশে সর্বোচ্চ যতটুকু পরীক্ষা করা সম্ভব সেটা করে আমাদেরও সেই তিন প্রকৃতির চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যদি জয়লাভ করতে হয় তবে জনসচেতনতার কোনও বিকল্প পদ্ধতি নেই। এক্ষেত্রে লকডাউন নতুন শব্দ হতে পারে, কোয়ারেন্টিন নতুন শব্দ হতে পারে, কিন্তু আপনি আমি বেঁচে থাকতে চাই, আপনার আমার জীবনের যে স্পৃহা সেটা কোনও নতুন ব্যাপার নয়।

সুতরাং বাংলা চলিত ভাষা ব্যবহার করে বাংলাদেশের যে গণমাধ্যম আছে সব মিলে যদি মানুষের কাছে এটা বোঝানো যা যায় যে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের ঘরে থাকতে হবেই। নতুবা অনেক বড় বিপর্যয় আসতে পারে। আমি মনে করি এর বিকল্প নেই। কারা বলবেন এসব কথা। যাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে জনগণের মধ্যে সহজবোধ্য ভাষায় তাদের যদি আমরা এই কথাগুলো তুলে ধরার সুযোগ করে দেই তবে নিশ্চয় পারা যাবে। আরেকটি বিষয় বলতে হয় যে এন্থনি ফাউচির নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তারা কিন্তু ২০০৫ সালে একটা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে এমন মহামারি হতে পারে। এমনকি বারাক ওবামাও কিন্তু বলেছিলেন একটা ফ্লু-ভিত্তিক মহামারি আসতে পারে। সেই জায়গায়ও আমরা প্রস্তুতি নেইনি। পৃথিবীতে ৯০০ কোটি মানুষ, আর যাই হোক আমি বিশ্বাস করি না যে এই করোনাভাইরাসের কারণে আমরা সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো। মানুষ আছে, মানুষ থাকবে, আমরা আরও সুন্দর সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাবো, কিন্তু এখনও খুব বেশি দেরি হয়ে গেছে বলে আমি বিশ্বাস করতে চাই না।
এই দেশের মানুষ অনেক সময়েই যদি বলা হয় ঘরে যান, ঘরে থাকুন, তারা শুনতে চায় না। সেক্ষেত্রে কী করবেন? সেক্ষেত্রে মাইকেল ফ্রে নামে আপনাদের একজনের কথা মনে আছে কিনা জানি না। যিনি ১৯৯৬ সালে সিঙ্গাপুরে কিছু গাড়িতে দাগ দিয়েছিল, গাড়ির ক্ষতি করেছিল। সে মার্কিন নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর সরকার তাকে ছয়বার বেত্রাঘাত করার রায় দিয়েছিল তাদের আদালতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন যে রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিল ক্লিনটন, তিনি অনুরোধ করার পরে সেই শাস্তি কমে চার বেত্রাঘাতে নেমে আসে। এই কথাটা এ কারণে বলছি যে আমাদের দেশে জরিমানা, জেল, ফাঁসি সবই আছে কিন্তু সবসময়ে আসলে এগুলো দিয়ে হয় না। অনেক সময় মানুষকে ঘরে রাখার জন্য যদি নতুন কোনও আইন, নতুন কোনও সাজার ব্যবস্থাও করা লাগে তবে তাকে বিকল্প হিসেবে ভাবা যেতে পারে। কারণ, ১০০ বছর পুরনো বিচার ব্যবস্থা দিয়ে ২০২০ সালের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ, হয়তো সর্বনিম্ন ২০০ টাকা জরিমানা করার সুযোগ আছে কিন্তু দেখা গেলো যাকে এই জরিমানা করা হচ্ছে তার আড্ডার মূল্য হয়তোবা তার চাইতে বেশি। তিনি আজকেও ২০০ টাকা দিলেন, হয়তোবা পরের দিনও আবার সেই টাকাই জরিমানা দেবেন। তাদের জন্য জেল বা জরিমানা হয়তো কোনও বিষয়ই না। আরেকটি বিষয় বলতে চাই যে এই মহামারিকে সামনে রেখে কতগুলো প্রটোকল নিশ্চিত করার। শুধু একজন রোগী কীভাবে হাসপাতালে আসবে, তার চিকিৎসা কীভাবে হবে এর পাশাপাশি ভাবতে হবে সেই বিষয়গুলো নিয়েও। কারণ, এ দেশে জেল ব্যবস্থাপনা আছে। এই করোনাভাইরাস চলাকালীন যদি সেখানে কোনোভাবে সংক্রমণ হয় তবে কয়েদিদের ব্যবস্থাপনা কী হবে সেই বিষয়ে প্রটোকল ভেবে রাখা দরকার। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এই প্রটোকল ব্যবস্থাগুলো ভেবে রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ টেস্ট হয়েছে তাকে আসলে যথেষ্ট বলা যায় না। আর তাই খুব দ্রুত টেস্ট করার সংখ্যা বাড়াতে হবে, যে বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে লকডাউনও খুব কার্যকারিতার সঙ্গে মানতে হবে। এই লকডাউনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সাসপেক্টেড কেইস বা সংক্রমিত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করা ও তাকে দ্রুত চিহ্নিত করে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে কন্টাক্ট ট্রেসিং করে তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিশ্চিত করাও। এক্ষেত্রে টেস্টের সংখ্যা বাড়াতে হবেই। বাংলাদেশ এখন প্রথম কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার পরে ৫৩তম দিন পার করছে। আমরা যদি লক্ষ করি এই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের নমুনা পরীক্ষা ও সংক্রমণের সংখ্যা, তবে দেখা যাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যানে অনেকভাবেই পিছিয়ে আছে সবদিকে। একই সঙ্গে মৃত্যুর হারও কিন্তু বেশি অনেক উন্নত দেশের তুলনায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে কী পরিমাণ নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা দরকার তা অতিসত্বর নিরূপণ করা দরকার দ্রুত। এই পরিসংখ্যান বিবেচনায় রেখেও নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে হবে। নতুবা এই লকডাউন সফল করা সম্ভব হবে না।
তাই লকডাউন কার্যকর করার কোনও বিকল্প নেই। আর এক্ষেত্রে এটাকে কার্যকর করার জন্য আমার কিছু প্রস্তাবনা আছে। প্রথমত, যদি মানুষের পেটে খাওয়া না থাকে তবে কখনোই সফল লকডাউন করা সম্ভব না। বাংলাদেশের উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের যারা হতদরিদ্র মানুষ তাদের একটা তালিকা আছে প্রশাসনের কাছে। কিন্তু আজকে ত্রাণ পৌঁছানোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঢাকা শহরে যিনি রিকশা চালাতেন অথবা ঢাকা শহরে যিনি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন বা একজন রাজমিস্ত্রি যিনি কাজ করতেন, ভিক্ষার জন্য হাত না পেতে তিনি যখন তার গ্রামে ফিরে গেছেন এবং তার নিত্যদিনের আয় যখন বন্ধ হয়ে গেছে তখন তাকে কীভাবে সেই ত্রাণের তালিকায় আনা যায় এটা একটা চ্যালেঞ্জ।
সুতরাং টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত লকডাউন সফল করতে হলে জনপ্রশাসনসহ বাংলাদেশের সচেতন রাজনৈতিক শক্তি, যারা নেতৃত্বের জায়গায় আছে, তারা সবাই মিলে নতুন করে যারা এই খাদ্য সংকটে পড়েছেন তাদের নাম সেই তালিকায় যুক্ত করতে হবে। সেক্ষেত্রে এটা মানুষকে ঘরে রাখতে সহযোগিতা করবে। যদি তাদের নাম আমরা সেই তালিকায় সন্নিবেশিত না করি তাহলে লকডাউন হুমকির সম্মুখীন হয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, এখনও আমরা দেখছি অনেক স্থানেই গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন এখনও বাকি। তারা বেতনের জন্য বিক্ষোভ জানাচ্ছেন, মিছিল করছেন, দাবি জানাচ্ছেন ও তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া আসা করছেন। সেক্ষেত্রেও কিন্তু এই নগরকেন্দ্রিক লকডাউনও হুমকির মুখে পড়ে যায়। গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে প্রতিদিনই বিভিন্ন রকমের প্রতিবেদন তুলে ধরা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারো যদি বেতন বাকি থাকে তারাও যদি সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন তারাও কিন্তু লকডাউনের জন্য একটি হুমকি। সুতরাং সেই জায়গা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।
বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল দেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রযুক্তির যে স্ফুরণ ঘটিয়েছেন সেটার সহযোগিতা নিয়ে প্রত্যেকের ঘরে ঘরে অতিসত্বর বেতন পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি লকডাউনকে সফল করার ক্ষেত্রে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন আমাদের দেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে আমাদের দেশের গণমাধ্যমকর্মীরাও। জনস্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটে যদি বিবেচনা করি তবে তাদের পরিবারও কিন্তু ঝুঁকির মুখেই আছে। সুতরাং তাদের প্রতিনিয়ত মোটিভেশন দেওয়া, তাদের উজ্জীবিত করার জন্যেও কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। যদিও এটা প্রত্যক্ষভাবে স্বাস্থ্যের সঙ্গে সংযুক্ত নয় কিন্তু পরোক্ষভাবে অবশ্যই এটা সংযুক্ত।
আমাদের দেশে সংক্রমণের দুষ্টচক্রকে যদি ভাঙতে হয় তবে আমাদের দৃষ্টিতে আসলে লকডাউনের কোনও বিকল্প  নেই। যেহেতু এর কোনও বিকল্প নেই তাই সবা কাছে অনুরোধ, যাতে আমরা এমন কিছু করি, এমন কিছু বলি, যাতে এই লকডাউন আগামী দিনে আরও বেশি সফল হয়। কারণ, শুধু উপসর্গ দেখে পরীক্ষা করে বা সেই উপসর্গ দেখে উপশম করার মধ্য দিয়েই যদি আমরা ভাবি করোনামুক্ত হয়ে যাবো, তবে সেটা কিছুটা হলে বাস্তবতা বিবর্জিত বলে মনে করি আমি। ভাইরাসকে না জেনে না বুঝে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যায় না। সুতরাং একে বোঝার ও জানার জন্য যা প্রয়োজন তা-ই করা দরকার। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন টাইপ বা স্ট্রেইনের কোভিড-১৯ সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশে কোন ধরনের সংক্রমণ আছে সেটা নির্ণয় করা খুব জরুরি। এটা নিয়ে একটা গবেষণা প্রয়োজন, যাতে এটা কতটা ভয়াবহ তা সবাইকে বোঝানো যায়। এক্ষেত্রে এই ফিল্ডের বিশেষজ্ঞদের সামনে আনা দরকার। একই সঙ্গে এই মহামারির বিরুদ্ধে সফল হবো না এটাও মনে করার কোনও সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের বাঙালিদের সফল হওয়া ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প নেই। সুতরাং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সামনে আনা প্রয়োজন। সবশেষে যা বলতে চাই তা হলো, বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তার সাহসিকতার স্থান থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কিন্তু এখনও নিজেই নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলও কিন্তু পুরা যুদ্ধক্ষেত্রে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। তাতে তার সৈন্যরা সাহস পায়, উজ্জীবিত হয়। আমার দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন, সবার সম্মুখীন হয়ে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন ও সমাধান দিচ্ছেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর ঘরের ভেতর থেকে ভিডিও কনফারেন্স করা মানায় না। সেটা না করে তার উচিত ঘরের বাইরে এসে ঝুঁকি নিয়ে নেতৃত্ব দেওয়া, যাতে তাকে দেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সবাই অনুপ্রাণিত হতে পারেন। দেশের মানুষের সমালোচনার জবাব দেওয়ার জন্য, মানুষকে উৎসাহ দেওয়ার জন্যে হলেও তার বের হয়ে আসা প্রয়োজন। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত। কারণ, রাজনীতি করলে ঝুঁকি নেবো না, ঘরের বাইরে আসবো না, এটা ঠিক নয় বলেই আমি মনে করি।
এক্ষেত্রে একটা বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, যা আমি লেখার শুরুর দিকেই বলেছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রযুক্তির যে স্ফুরণ ঘটিয়েছেন সেটার সহযোগিতা আমরা বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও নিতে পারি। প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে যদি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মনিটরিং করা হয় প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে, তবে আমার বিশ্বাস সেটাকে সবাই স্বাগত জানাবেন। ইতোমধ্যে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকেও অনেকেই চাচ্ছেন এমন প্রযুক্তির সহায়তা। এক্ষেত্রে অবশ্যই একটা বিশাল বিষয় হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ব্যস্ততা, যেখানে তিনি সারা দিনই দেশের জন্য কাজ করে যান। সেক্ষেত্রে
হাসপাতালে লাইন রোবটের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে একটি সেল খোলা যেতে পারে শুধু হাসপাতাল-ল্যাব কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করার জন্য। এক্ষেত্রে সেই সেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাজই হবে হাসপাতাল বা ল্যাবে কী কী অভিযোগ আসছে তা প্রতিদিন মনিটর করা। একই সঙ্গে সেই হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সমস্যাগুলো লিপিবদ্ধ করা এবং তা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা। এক্ষেত্রে আমি বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধুকন্যা নিজেই দিনের মধ্যে কিছুটা সময় বের করে নিয়ে হলেও সারা দেশের আসল চিত্র দেখতে চাইবেন। এক্ষেত্রে কোভিড-১৯ চিকিৎসা ব্যবস্থার গতি বৃদ্ধি পাবে অবধারিতভাবে।
আমি গর্বের সঙ্গে বলতে চাই যে বাংলাদেশের জিডিপি পৃথিবীর ৩৮তম। এটা সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার কারণে। আবার দেখা যায় জনসংখ্যার দিকেও আমরা পৃথিবীর অষ্টম স্থানে আছি। অর্থাৎ আমাদের দেশ হলো একট জনবহুল দেশ। এসব পরিসংখ্যান মাথায় নিয়ে যদি আমাদের টেস্টের সংখ্যা যদি পৃথিবীর সবচেয়ে কম হয় তবে সেক্ষেত্রে যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না। সুতরাং আমাদের জিডিপি ৩৮তম, জনসংখ্যার দিকে অন্যতম একটি বৃহৎ দেশ, সে বিবেচনায় হলেও টেস্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যে দূরত্ব সেটা বড় দূরত্ব নয়, সময়ের দূরত্বই সবচেয়ে বড় দূরত্ব। যদি আমরা লকডাউনকে সফল না করি তাহলে কিছুটা আড্ডা হয়তো বা দেওয়া যাবে, মনে প্রশান্তিও হয়তো বা দেওয়া যাবে, কিন্তু প্রিয়জন, আপনজনকে হারানোর যে ব্যথা এবং সময়ের যে দূরত্ব তাতে কিন্তু আমরা পরাস্ত হয়ে যাবো।
তাই সকলকে করজোরে অনুরোধ করি, যার কোনও জরুরি প্রয়োজন নেই তিনি যেন বাড়ির বাইরে না যান। ঘরে থেকে সরকারের যে পরামর্শ সেগুলো মানুন। চিকিৎসকদের সাহায্য করুন, বিশেষজ্ঞদের সাহায্য করুন। সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনীর সদস্যসহ প্রশাসনের যারা রাস্তায় নেমে কাজ করছেন তাদের সহায়তা করুন। এভাবে যদি আমরা চলতে পারি তবে আমাদের জয় হবে। আমরা নিশ্চয় খুব দ্রুতই নতুন ছন্দ স্পন্দন নিয়ে বাঙালি হিসেবে উদ্ভাসিত হবো এই পৃথিবীর বুকে।
সকলের জন্য একটা কথা বলি। আমরা আমাদের নিজেদের ভালোবাসি। আমি যখন নিজেকে ভালোবাসি আমার এই ভালোবাসার জায়গাটা আমার বাবা ও মাকে বাদ দিয়ে কখনোই না। তারা কিন্তু আমিই। আমার কন্যাসন্তানকে বাদ দিয়ে না। সেও কিন্তু আমিই। আমার ভাই, আমার বোন, তারাও কিন্তু আমিই। আমার আমিত্বের জায়গাটা অনেক বড়। অর্থাৎ আমাকে যখন কেউ বলে তুমি কেমন আছো? আমি তখনই বলতে পারি আমি ভালো আছি যখন আমার বাবা ভালো থাকবে, মা ভালো থাকবে, বোন ভালো থাকবে, কন্যা ভালো থাকবে, আমার স্বজনরা ভালো থাকবে। তাদের কেউ একজন যদি ভালো না থাকে তবে আমি সচরাচর বলতে পারি না যে আমি ভালো আছি। আমি সেই জায়গা থেকে সবাইকে একটা আহ্বান জানাই। আপনাদের ভালো থাকাটা বড্ড জরুরি। আপনি যাতে সারা জীবন বলতে পারেন ভালো আছেন, ভালো ছিলেন, ভালো থাকবেন তার জন্য আজকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
আর সঠিক সিদ্ধান্তটা হচ্ছে, সরকারের অনেক দোষ থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। এই বিচার করার সময় রয়ে গেছে। একজন চিকিৎসক সক্ষম হতে পারেন, নাও হতে পারেন, তাও বিচার করার অনেক সময় রয়ে গেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আপনি যাতে বলতে পারেন যে ভালো ছিলেন, ভালো আছেন, ভালো থাকবেন তার জন্য বাংলাদেশের বীর সেনাবাহিনীর সদস্য, সামরিক বাহিনীর সদস্য, বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যসহ হাজারো চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সকলেই আজ মাঠে। জনপ্রশাসনের অগণিত দক্ষ, শিক্ষিত, আত্মমর্যাদায় বলীয়ান কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আপনার সুরক্ষার জন্যেই মাঠে।
তাই আপনি ঘরে থাকুন। ঘরে থাকলে আমি নিশ্চিতভাবে দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, করোনাভাইরাস আপনাকে আক্রান্ত করবে না। এতে আপনি বলতে পারবেন ভালো আছেন, ভালো থাকবেন। এই ভালো থাকায় আপনার স্বজনরা সবাই আছেন। সবচাইতে বড় কথা কতটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রকাশ করাতে পারবো আমি জানি না। শুধু এতটুকু বলতে পারি যে এই করোনাভাইরাস শিকার খোঁজে। এই করোনাভাইরাস ছড়ানো জন্য একজন মানুষ দরকার। সুতরাং যখন ঘরে না থেকে আপনি বাইরে ঘোরাঘুরি করেন তখন অন্য কোনও মাধ্যম থেকে শিকার হিসেবে ভাইরাসটি আপনার শরীরে যেতে চায়। এভাবে সে আপনার মাধ্যমে অন্য নতুন শিকারের কাছেও যেতে পারে।
এটা বলা যেতে পারে দুষ্ট সংক্রমণের চক্র। এই সংক্রমণ চক্রটি আমরা চাইলেই ভেঙে দিতে পারি যদি কয়েকটা দিন কষ্ট করে ধৈর্য ধরে ঘরে থাকি। একইসঙ্গে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যদি না যাই তবে আমরা করোনাভাইরাসকে পরাজিত করবো। এভাবে আপনি ভালো থাকবেন, আমি ভালো থাকবো, আমরা সকলে ভালো থাকবো। আর এভাবে ভালো থাকবে আমাদের বাংলাদেশ।

লেখক: রাজনীতিবিদ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ