একটি নক্ষত্রের স্বর্গে প্রত্যাবর্তন

Send
আবদুল মান্নান
প্রকাশিত : ১৫:৩০, মে ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩১, মে ০৪, ২০২০

আবদুল মান্নানদেশে অথবা বিদেশে গত কিছু দিন যাবৎ মৃত্যু সংবাদগুলো এত গা সওয়া হয়ে গেছে যে এখন কারও মৃত্যু সংবাদ শুনলে তেমন অবাক হই না। মনে হয় তা বোধ হয় প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু গত মঙ্গলবার সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হঠাৎ জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের মৃত্যু সংবাদটা শুনে শরীরটা কেমন যেন হিম হয়ে যায়। একেবারেই অপ্রত্যাশিত। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী আমার সরাসরি শিক্ষক না হয়েও আমার মতো অনেকেরই শিক্ষক। একই কাতারে প্রফেসর আনিসুজ্জামান, প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম, প্রফেসর রফিকুল ইসলাম। জামিল স্যার শুধু একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকৌশলীই নন, আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক, নির্লোভ, অমায়িক, আর তার কর্ম দ্বারা হয়ে উঠেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে তার মতো প্রতিষ্ঠান সহসা গড়ে উঠবে তা মনে হয় না। তার দেশপ্রেম ছিল প্রশ্নাতীত, যা তিনি পদ্মা সেতুর কথিত দুর্নীতির দায়ে যখন বাংলাদেশ, প্রধানমন্ত্রর ও তার পরিবারের সদস্যদের এক শ্রেণির মিডিয়া, টিআইবি, সিপিডি আর তথাকথিত সুশীল সমাজের একাংশ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল, তখন প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী একাই সাহসের সঙ্গে বলে গেছেন পদ্মা সেতুর কথিত দুর্নীতি একটি সাজানো ষড়যন্ত্র, তিনি বলেন ‘এই প্রকল্পের সঙ্গে আমি গোড়া হতেই জড়িত’। সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করতে চাই।

কীর্তিমান বাঙালি কেন জানি আজকাল তাদের অতীত দিনের কথা অথবা না জানা অতীত প্রসঙ্গ নিয়ে লিখতে বা কথা বলতে চান না। এর একটি কারণ হতে পারে সত্য কথা কেউ শুনতে চান না। এই দিক দিয়ে একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি ও ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মওলানা আবুল কালাম আজাদ। তিনি মৃত্যুর পূর্বে প্রকাশ করেছিলেন তার রাজনৈতিক আত্মজীবনী ‘ইন্ডিয়া উইনস্ ফ্রিডম’। তবে বলে গিয়েছিলেন তার গ্রন্থের শেষ ত্রিশ পৃষ্ঠা যেন তার মৃত্যুর ত্রিশ বছর পর প্রকাশিত হয়। তাই হয়েছিল। সেই ত্রিশ পৃষ্ঠায় তিনি লিখে রেখেছিলেন ভারত ভাগের জন্য জিন্নাহ্’র চেয়ে নেহেরু অনেক বেশি দায়ী, তিনি একটু নমনীয় হলে ভারত বিভাগ এড়ানো যেতো। জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার এই দেশের একজন অসাধারণ কীর্তিমান মানুষ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জামিল স্যারের সঙ্গে আমার কখন পরিচয় তা ভুলে গেছি। কিন্তু মনে আছে আমি যখন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়া সম্পর্কে কিছুই জানতাম না, একদিন হঠাৎ করে তার টেলিফোন পাই। বললেন ‘অভিনন্দন’। জানতে চাই কেন স্যার? বলেন আপনি ইউজিসি’র পরবর্তী চেয়ারম্যান হচ্ছেন। আমি তো অবাক। পরদিন আমার একজন সুহৃদ সাংবাদিক ফোনে জানালেন স্যার আপনার নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়ে গেছে। স্যারকে আবার ফোন করি আগাম সংবাদ দেওয়ায় ধন্যবাদ জানানোর জন্য।

জামিল স্যার যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক অনুষ্ঠানে আমাকে অংশগ্রহণ করার জন্য তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কখনও না করতে পারিনি। সেখানে গেলে তিনি যে সম্মান আমাকে দেখাতেন তাতে আমি অভিভূত হয়ে যেতাম। একদিন হঠাৎ তিনি আমাকে বলেন, ‘নিশ্চয় আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে।’ বলি, ‘হ্যাঁ আছে।’ তিনি বলেন আমাকে তিনি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবেন। একটু অবাক হয়েছিলাম। তিনি আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে প্রফেসর আনিসুজ্জামান, প্রফেসর রফিকুল ইসলাম ও প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরীকে জাতীয় অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হলো। এর চেয়ে ভালো আর কোনও নিয়োগ হতে পারে না। দেশে আর যে ক’টি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা আছে তা এখন অনেকটা তামাশায় পরিণত হয়েছে। সেই জন্যই গতবার একুশে পদক ঘোষণা করা হলে আমার কাছে একজন ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন পদক কিনতে কাকে কত টাকা দিতে হয়। আমি অবাক না হয়ে পারিনি। তালিকা দেখে কেন এমন প্রশ্ন তা বুঝতে কষ্ট হয় না। জাতীয় অধ্যাপকের সঙ্গে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের একটি সম্পর্ক আছে, কারণ এই পদক যারা পান তাদের বেতনভাতা মঞ্জুরী কমিশনের তহবিল হতে দেওয়া হয়। মঞ্জুরী কমিশন হতে সিদ্ধান্ত নিলাম এই তিনজন জাতীয় অধ্যাপককে কমিশন হতে সংবর্ধনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বাকি দু’জনের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তারা রাজি হলেন। জামিল স্যারের অফিস হতে জানা গেলো তিনি দেশের বাইরে আছেন। কিছু সংকোচ নিয়ে তাকে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে খবর পাঠালাম। কিছু পরেই তিনি জানান তিনি লন্ডনে আছেন। তবে আমাদের সংবর্ধনার দিন ৯ জুলাই তিনি দেশে ফিরবেন এবং আমাদের অনুষ্ঠানে আসবেন। বলাবাহুল্য মঞ্জুরী কমিশনে এই ধরনের অনুষ্ঠান এই প্রথম। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলি ‘আমরা খুব বেশি কিছু হয়তো করবো না, কিন্তু যাই করি তা যেন ভালোভাবে করি।’ সকলের প্রচেষ্টায় সেদিন একটি ভালো অনুষ্ঠান হয়েছিল।

অনুষ্ঠানের সময় হলে আমি স্বয়ং নিচে গিয়ে অতিথিদের স্বাগত জানাই। জামিল স্যারের গাড়ির দরজা যখন খুলে তাকে রিসিভ করি, তখন তিনি বলেন, ‘আরে আপনি কেন কষ্ট করে এসেছেন?’ বলি ‘স্যার আপনাদের কাছ হতে শিখেছি।’ সেদিন চমৎকার অনুষ্ঠান হয়েছিল। চা পানের সময় স্যার জানতে চান আমার টার্ম আর কত দিন আছে? পদটা কি নবায়নযোগ্য? স্যারকে বলি, ‘বঙ্গবন্ধুর করা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন আইন-১৯৭৩ অনুযায়ী একমাত্র কমিশনের চেয়ারম্যান দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নিযুক্ত হতে পারেন কোনও সদস্য নন।’ জামিল স্যার বলেন, তিনি আশা করেন তাই যেন হয়। তাকে বলি এই সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারকদের, এখানে চেয়ারম্যানের কিছু করার নেই। যেদিন আমার মেয়াদ শেষ হলো সেদিন জামিল স্যারকে ফোন করে খবরটা দিলে তিনি বলেন, ‘কেন দ্বিতীয় মেয়াদ হয়নি?’ বলি, ‘এখনও না, আর হবে তেমন আশা করি না, কারণ অনেকেই আমি গেলেই বাঁচেন। কারণ তারা তাদের অপকর্মগুলো নিয়ে খুব অসুবিধায় ছিলেন।’ স্যার সহ আরও কয়েকজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিকে তাদের সহযোগিতা আর আমার জন্য প্রত্যাশার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই।

২০০৯-২০১০ সালে দেশে পদ্মা সেতুর কথিত দুর্নীতি নিয়ে এই যে তুলকালাম শুরু করে দিলো দেশের দুটি পত্রিকা, সুশীল সমাজের একটা অংশ, টিআইবি আর সিপিডি। তখন শেখ হাসিনার পক্ষে সত্যটা বলার জন্য একমাত্র মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক অধ্যাপক কোনও সূচনা ছাড়াই আমাকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা দেশের এত বড় সর্বনাশ না করলেই পারতেন।’ আকাশ থেকে পড়লাম। ‘শেখ হাসিনা এমন কি সর্বনাশ করলো যা আমি জানতে পারলাম না।’ ‘কেন দেখেননি, পদ্মা সেতুর সব টাকা নিয়ে তা হজম করে ফেলেছে?’ তাকে বুঝানোর বৃথা চেষ্টা। কথা বাড়াই না। বেসরকারি টিভির রাতের টকশোতে সব বাদ দিয়ে পদ্মা সেতুর কথিত দুর্নীতি একমাত্র বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। একজন বরিষ্ঠ সাংবাদিক (বর্তমানে প্রয়াত) যিনি নানাভাবে বঙ্গবন্ধুর কৃপাধন্য হাসপাতালে চিকিৎসারত, হাতে ক্যানোলা নিয়ে প্রতি রাতে টকশোতে এসে শেখ হাসিনার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করেন। তার কথার তোড়ে অন্যরা কথা বলতে পারেন না। সব টিভি চ্যানেলেই একই অবস্থা। শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়িয়ে এই প্রকল্পের সঙ্গে প্রথম হতেই জড়িত প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন সব মিথ্যা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বললেন, যেখানে কোনও অর্থই বিশ্ব ব্যাংক ছাড় করেনি, সেখানে দুর্নীতির প্রসঙ্গ অবান্তর এবং তিনি নানা ধরনের প্রমাণসহ যুক্তি দিলেন। কিন্তু যারা কালই শেখ হাসিনাকে পদচ্যুত করতে চান, তারা কেন শুনবেন তার কথা? শেখ হাসিনাকে যারা এক দণ্ডও ক্ষমতায় দেখতে চান না, আড়ালে বলেন প্রফেসর সাহেব দালালি না করলেও পারতেন। সব শেষে কানাডার আদালত যখন পরিষ্কার ভাষায় জানালো পদ্মা সেতুতে কোনও অর্থই ছাড় করা হয়নি, কোনও ধরনের দুর্নীতিও হয়নি, তখন সকলে চুপ।

গত নির্বাচনের আগে ঠিক করলাম পদ্মা সেতু নিয়ে হাতের কাছে যা আছে দলিলপত্র, পত্রিকার কাটিং, তথ্য, বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বক্তব্য নিয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশ করবো। এগিয়ে এলো অনুজপ্রতিম সুভাষ সিংহ রায়। আমার অর্থায়ন আর সুভাষের সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো ‘পদ্মা সেতুর সাত কাহন’। বইটির একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। আমন্ত্রণ জানানো হলো প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান (তিনি একজন অভিযুক্ত ছিলেন), প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান (যিনি প্রধানমন্ত্রীকে অভয় দিয়েছিলেন বিশ্বব্যাংক নাই বা দিলো অর্থ, বাংলাদেশ নিজের অর্থে এই সেতু বানাতে সক্ষম), সাহাবুদ্দিন চুপ্পু (দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা, যিনি এই কথিত দুর্নীতির তদন্ত করেছিলেন), সাংবাদিক স্বদেশ রায় (যিনি নানা যুক্তি দিয়ে বলার চেষ্টা করেছিলেন এখানে কোনও দুর্নীতি হয়নি)। ড. মশিউর রহমান সকালে ফোন করে জানিয়েছিলেন তিনি ওই দিন আসতে পারছেন না, কারণ সেদিন ছিল সরকারের ওই মেয়াদের শেষ কর্মদিবস, প্রধানমন্ত্রী সকলের সঙ্গে কথা বলবেন।

সেদিনের সভায় সবাই মন খুলে বলেছিলেন এই ষড়যন্ত্রের নানা অজানা কথা। ড. আতিউর বলেছিলেন ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের এক আনুষ্ঠানিক সভা শেষে ব্যাংকের সভাপতির সঙ্গে তাদের পূর্ব নির্ধারিত সভা কীভাবে বাতিল করা হয়েছিল। বলেছিলেন এর পূর্বে কোন তিন বাঙালি সভাপতির কক্ষ হতে দীর্ঘ সময় বৈঠক শেষে বের হয়েছিলেন। জামিল স্যার বলেছিলেন ষড়যন্ত্রটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত, যাতে শেখ হাসিনা সরকারকে বেকায়দায় ফেলা যায়। স্বদেশ রায় টোকিওতে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা সাংবাদিক হিসেবে কাভার করতে যাচ্ছিলেন। বিমানে তার সামনের সিটে ষড়যন্ত্রকারীদের দু’জন বসেছিলেন, যারা তাকে চেনে না। তাদের মধ্যে যে কথা হচ্ছিল স্বদেশ রায়ের মতে এসে দেখা যাবে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়েছে। টোকিওর সভায় বাংলাদেশের পদ্মা সেতুও এজেন্ডা ভুক্ত ছিল। জামিল স্যার আমাকে অনেক দিন বলেছেন তিনি আমাকে পদ্মা সেতু সাইটে নিয়ে যাবেন। যাওয়া হয়নি। আর হবে বলে মনে হয় না। স্যার আপনার অভাব কখনও পূরণ হবে না। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান ষড়যন্ত্রেও মুখোশ খুলে দিতে সাহস নিয়ে দাঁড়ানোর আর একজন মানুষ কমে গেলো। দেশটা তো বামনে ভরে যাচ্ছে। আপনি যেখানেই থাকুন স্যার, ভালো থাকুন।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ