শিক্ষাঙ্গন হোক মুক্তবুদ্ধি চর্চাক্ষেত্র

Send
ড. জেবউননেছা
প্রকাশিত : ১৯:৩৩, মে ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৬, মে ১০, ২০২০

ড. জেবউননেছালেখার শুরুতে ছোট একটি গল্প দিয়ে শুরু করবো। কয়েকদিন আগে দেশের একটি প্রখ্যাত এবং প্রাচীন কলেজের অধ্যক্ষ দুঃখের সঙ্গে বললেন, তাঁর কলেজের বেশিরভাগ শিক্ষক ক্লাসের চেয়ে বেশি কোচিংয়ে ব্যস্ত। তিনি যতই বলেন শ্রেণিকক্ষে মন দিতে, শিক্ষকরা ততটা আন্তরিক নয়। একদল শিক্ষক তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রও করছেন সঙ্গে কিছু অভিভাবক নিয়ে। সেই অধ্যক্ষ বলা চলে একাই যুদ্ধ করছেন শিক্ষার্থী এবং প্রতিষ্ঠানটির জন্য। এরকম মানসিকতার মধ্যেও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ঈর্ষণীয় সফলতা এসেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের প্রাথমিক স্তরে মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১,৩৪,১৪৭টি। মাধ্যমিক স্তরে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্কুল ২০,৪৬৫টি। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় কলেজের সংখ্যা ৪,৪৯৫টি। উচ্চ শিক্ষায় মোট বিশ্ববিদ্যালয় ১৫৪টি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৪৯টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১০৫টি। কারিগরি শিক্ষায় মোট কারিগরি প্রতিষ্ঠান ৮,৬৭৫টি, মোট শিক্ষার্থী ১২ লক্ষের বেশি। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ভর্তির হার প্রায় ১৬%। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে শিক্ষার হার ২০% এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৩০% করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় মোট মাদ্রাসা ৯,২৯৪টি। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ৪৩১২টি। কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ১৪,০০০ এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লক্ষ।

বাংলাদেশ সংবিধানে রয়েছে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ বিষয়টি।  ২০১০ সালে বাংলাদেশ পেয়েছে একটি শিক্ষানীতি। যদিও এর বাস্তবায়ন ধীর। শিক্ষার বিষয়টি সংযুক্ত হয়েছে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এমডিজি) ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এবং ভিশন-২০২১-এ। ২০৩০ সালের মধ্যে নারী ও পুরুষের জন্য সুলভে উচ্চশিক্ষা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, উচ্চশিক্ষার বিষয়টিও অনেকটা পিছিয়ে আছে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় উচ্চশিক্ষার ওপর জোর দিলেও বাস্তবায়ন তেমন দেখা যায়নি। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবলের জন্য ঘাটতি পূরণে ৪.৫ লক্ষ নাগরিককে নিযুক্ত করে প্রতিবছর দেশ থেকে ব্যয় হচ্ছে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অন্তত ৪৬% শিক্ষার্থীকে চাকরির জন্য তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়। দক্ষ ব্যক্তির অভাবে দেশের পোশাক খাতের ১৩% কারখানায় বিদেশিরা কাজ করছেন। বাংলাদেশে মাত্র ৭টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। অথচ এই শিক্ষাটি বিশেষভাবে প্রয়োজন। কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত কৃষি শিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান করা সময়ের দাবি।

তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এখন এগিয়ে যেতে হবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলায়। ২০১৬ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রধান ক্লাউস শোয়াইব এই বিপ্লবের কথা বলেন। কারিগরি শিক্ষা প্রশিক্ষণে অটোমেশন, রোবোটিকস ও ডেমোগ্রাফিক ডিফেন্ডেড এবং উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চ কারিগরি শিক্ষা এবং তথ্য প্রযুক্তি খাতে সমন্বিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এই শিল্পের বিকাশে কাজে হাত দেওয়া প্রয়োজন। নইলে প্রচলিত নিয়মে গ্রাজুয়েট তৈরি হলে সমাজে আর এদের চাহিদা থাকবে না। যদিও সরকার চতুর্থ বিপ্লবের বিষয়ে কাজ শুরু করেছে।

এতদসত্ত্বেও শিক্ষার মানসম্পন্ন উন্নয়নে প্রধান সমস্যা ‘শিখন সংকট’। যেটি বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়শীল দেশের সমস্যা। কারণ, এই সমস্যাটির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়টি জড়িত। শহরের অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তানের চেয়ে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা শিখে কম। তবে ঢালাওভাবে বলা যাবে না। কারণ, অতীতে যারা দেশের হাল ধরেছেন বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গ গ্রাম থেকে এসেছিলেন। অপরদিকে, পরীক্ষার প্রশ্ন মাথা রেখে বিদ্যালয়ে লেখাপড়া এগিয়ে যায়। তাছাড়া, ব্যাঙের ছাতার মতো কোচিং সেন্টার তো আছেই। শিক্ষকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষকের প্রশিক্ষণ মাত্র ৫০%। প্রশিক্ষণের মান সন্তোষজনক নয়। শিক্ষকের মান, যোগ্যতা এবং দক্ষতা ও দায়িত্ব নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ইউনেস্কোর আর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাধ্যমিকে ৬৬% শিক্ষকই অপ্রশিক্ষিত। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে ৪৩% মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সৃজনশীল প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারছেন না। অপরদিকে, উন্নত দেশে বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোনও পরীক্ষার চাপ নেই। এ সময়টায় তারা জীবনমুখী শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। শিক্ষকরাও যথেষ্ট দক্ষ থাকেন। উন্নত বিশ্বের শিক্ষকতা একটি লোভনীয় পেশা।

কুদরত-ই-খুদা জাতীয় শিক্ষা কমিশনের একটি  রিপোর্টে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ আছে, সেখানে শুরুতেই বলা হয়েছিল, আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান পদ্ধতি নানাদিক দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ। এটি শুধু বিভিন্ন বিষয়ের সংখ্যা সমতার দিকে দিয়ে নয় বরং মান ও গুণগত উৎকর্ষের দিক থেকে বর্তমান উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা জাতির জন্য এক ভীষণ উদ্বেগের কারণ (অনুচ্ছেদ ১৩.১১,পৃষ্ঠা-৮৪)। বর্তমান সরকার উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে চেষ্টা করে যাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ফর হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ ২০১৭-২০২১ প্রতিবেদনে একটি সুপারিশ প্রদান করেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি ‘আমব্রেলা লেজিসলেশন প্রণয়ন ও প্রবর্তন করা’ (অনুচ্ছেদ, সি-১,পৃ.-৬২)। বিশ্বের এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিয়ে স্থান দখলের জন্য দূরদৃষ্টি এবং কর্মপরিকল্পনা, প্রশাসন, শিক্ষা ও গবেষণা, গুণগত মান, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ এই ছয়টি সূচকে মন দিতে হবে।

ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক ফর দ্য এভেইলিবিলিটি অব সায়েন্টিফিক পাবলিকেশনসের ২০১৫ সালের ১৫ এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দুর্নীতি থেকে লাভবান হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা এবং খুব শিগগির এ অপরাধ কমবে না’। এ ধরনের প্রতিবেদন নিশ্চয়ই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সম্মানজনক সংবাদ নয়। ‘ভালো শিক্ষক তৈরি করবো কীভাবে?’ এই শিরোনামে একজন লেখক বলেছেন, ‘শিক্ষকের পদটি নিলামে তুলে, দলীয় আনুগত্য আর স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে সর্বত্র অভিযোগ (২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫, দৈনিক প্রথম আলো)’।

অথচ উদাহরণ হিসেবে যদি বেলজিয়ামে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতির দিকে তাকাই, সেখানে শিক্ষক পদ প্রত্যাশীরা আবেদন করার পর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা দিয়ে নম্বরের ভিত্তিতে র‌্যাংকিং করে প্রাথমিক বাছাই করা হয়। এরমধ্যে কেউ কেউ বাদ পড়ে যায়। এরপর তাদের মৌখিক পরীক্ষায় আহ্বান করা হয়। সেখান থেকে পুনরায় বাছাই করা হয়। এরপর বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং নিয়োগ বোর্ডের সামনে পাঠদান করতে হয়। সেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক পদে আবেদনকারীকে নম্বর দেবেন। এরপর নিয়োগ বোর্ড, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে আর একটি তালিকা করা হয়। পুনরায় তাদের মৌখিক পরীক্ষার জন্য আহ্বান করা হয়। নম্বরের ভিত্তিতে যারা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করেন, তারাই নির্বাচিত হন শিক্ষক হিসেবে। এই হলো সেই দেশের শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি। অথচ আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতির আগে আবেদনকারীরা (সবাই নয়) শিক্ষক পদ লাভের জন্য ইদুর দৌড়ে অবতীর্ণ হয়। যে যত বেশি দৌড়াতে পারবে, সে-ই সফল হয়। উপরন্তু সে নিয়োগে সঠিক প্রার্থী মূল্যায়িত হয় কিনা সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এবং ক্ষুরধার দেশপ্রেমিক নিয়োগ বোর্ডে আপস করেন না। তারা যোগ্যতার পক্ষে থেকে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। সেক্ষেত্রে কোনও কোনও সময় যোগ্য ব্যক্তিবর্গ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তবে এমনও আছে, অপরাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও কোনও বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ  বছরের পর বছর আটকে থাকে।

এহেন পরিস্থিতিতে সংখ্যার বিচারে সব স্তরে  শিক্ষার সাফল্য, দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে শিক্ষার মান নিয়ে গবেষণা করার মোক্ষম সময় এটি। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, নিয়োগ এবং মূল্যায়ন নিয়ে এখন থেকে শক্তভাবে না ভাবলে সামনে খারাপ সময় অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

১৯৬৯ সালে প্রকাশিত বইয়ে জাপানের একজন কূটনীতিক লিখেছিলেন, ‘১০০ মিলিয়ন মানুষের দেশ জাপানে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫০০-এর বেশি কিন্তু গ্রাজুয়েটদের মান এমন যে তাদের অনেকে পোস্টম্যানের চাকরি করেন, এমনকি কেউ কেউ রাস্তায় জুতা পলিসের কাজ করেন’ (ইচিরো কাওয়াসাকি, জাপান আনমাস্কড, চার্লস ই টাটল কোম্পানি, রুটল্যান্ড, ভরমন্ট ও টোকিও, ১৯৬৯, পৃ: ৯৯)। সেই জাপান এখন শিক্ষাদীক্ষা এবং সর্বত্রই উন্নত অবস্থানে রয়েছে। সদিচ্ছা থাকলে ঘুরে দাঁড়ানো সময়ের ব্যাপার মাত্র।

২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেড় কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রায়োগিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হবে। এই পরিকল্পনায় শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের কারিগরি, বৃত্তিমূলক, প্রযুক্তিগত শিক্ষা প্রদানের প্রতি জোর দেওয়া প্রয়োজন। তবে বর্তমান সরকার বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় বাধ্যতামূলকভাবে বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারই ধারাবাহিকতায়, ২০২১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে, ২০২২ সালে ৭ম শ্রেণিতে এবং ২০২৩ সালে ৮ম শ্রেণিতে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা হিসেবে একটি কারিগরি বিষয় বাধ্যতামূলক চালু করা হচ্ছে।

সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষার জন্য প্রয়োজন মাধ্যমিক থেকে উন্নত কারিকুলাম। দক্ষ ব্যক্তির জন্য সিঙ্গাপুরের নানিয়াং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের আদলে ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে নিয়োগের ক্ষেত্রেও দক্ষতার স্তর যাচাই করে নিয়োগ দেওয়া দরকার। সরকারকে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ডিজিটাল এবং সফট স্কিলসকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। দেশে দুই-তৃতীয়াংশ তরুণকে কারিগরি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজে লাগানোর সময় এখনই। কর্মক্ষেত্র বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষতা এবং জ্ঞানচর্চার সুযোগ বৃদ্ধি করা। আটটি বিভাগে আটটি টেকনিক্যাল স্কিল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা যেতে পারে। দেশে প্রতিবছর ২০ লক্ষ মানুষ চাকরির বাজারে আসছে। কিন্তু কারিগরি খাতে কতটা লোকবল প্রয়োজন তা নির্ণয় করা যায়নি।

একদল মুখোশধারী মানুষ নব্য কায়দায় ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নানাভাবে শিক্ষাঙ্গনে তাদের রাজনৈতিক পাল্লার ওজন বাড়িয়ে চলেছে। শিক্ষাঙ্গনে যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে তাহলে অনাগত ভবিষ্যতে এ দেশ কতটুকু নিরেট বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিকের সন্ধান পাবে তা খুবই প্রশ্নাতীত। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দেশের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যখন কথা বলার সুযোগ হয়, লক্ষ করেছি তারা হতাশ। তারা ভাবতে পারেন না শিক্ষাঙ্গনের মতো পবিত্র স্থানে নিয়োগ থেকে শুরু করে নানা রকমের দুর্নীতি হতে পারে। এখনই সময় আত্মশুদ্ধির এবং আত্মসমালোচনার। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দায়িত্বশীলতা না বাড়ালে শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। জাতি পতিত হবে ঘোর অমানিশায়। পঞ্চাশের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। এ সময়ে শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য অথবা দুর্নীতি নিয়ে আলোচনার বিষয়টি কাম্য ছিল না। অথচ দুর্ভাগ্য, এটি নিয়েই আমাদের বারবার আলোচনা করতে হচ্ছে। সর্বস্তরে নিজের বিবেকবোধ জাগ্রত না করলে এবং প্রতিষ্ঠানকে ভালো না বেসে ব্যক্তিস্বার্থ যতদিন মুখ্য থাকবে ততদিন এসব অনিয়মের মূলোৎপাটন করা অসম্ভব। অথচ সরকার তার সাধ্যমতো শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য দিনান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

স্বপ্ন দেখি করোনা পরবর্তী বিশ্বে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে শুদ্ধচর্চা এবং মুক্তবুদ্ধির অনুশীলন হবে। শিক্ষার সব স্তরে নিয়োগে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ এবং মানসম্পন্ন শিক্ষক প্রশিক্ষণ হবে। দুর্নীতি ও অন্যায়ের লাগাম টেনে  শিক্ষাঙ্গন সব অন্যায় এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবে। মুখ থুবড়ে পড়বে আধিপত্যবাদীদের বৃথা আস্ফালন। বন্ধ হবে দল ভারী করার সংকীর্ণ রাজনীতি।

লেখার শুরুর সেই অধ্যক্ষের মতো অন্য কোনও অধ্যক্ষ আর দুঃখ করবেন না। শিক্ষক শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দেবে। শিক্ষকরা হবেন জ্ঞানের বাঁশিওয়ালা, যার আদর্শের পিছনে ছুটবে  সবাই। শিক্ষার্থী শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, পাশাপাশি মানুষ হওয়ার দীক্ষা পাবে। সর্বোপরি মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সর্বস্তরে নিয়োগ, দেশকে ভালোবাসা, যেখানেই দুর্নীতি সেখানেই প্রতিবাদ, এই নীতি নিয়ে সবাই একতাবদ্ধ হবে। সেই স্বপ্নকে সারথী করে সব দুর্নীতিবাজ ও ষড়যন্ত্রকারীকে প্রতিহত করে তরুণ সমাজ ওড়াবে সুখের পায়রা। শেষ করবো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে, তিনি ৯ অক্টোবর, ১৯৭২ ঢাকার পিজি হাসপাতালে বলেছিলেন , ‘শৃঙ্খলা ফিরে না আসলে কোন জাতি বড় হতে পারে না। সততা ফিরে না আসলে কোন জাতি বড় হতে পারে না।’

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ