অর্থনীতি সচল রাখা এবং সুরক্ষার প্রতি যত্নবান হতে হবে

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৬:৪১, মে ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৪, মে ১৪, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীকৃষি, রেমিট্যান্স আর পোশাক রফতানি- এই তিন খুঁটির জোরে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু গত চার মাসে সারা বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি আকারে দেখা দেওয়ার পর বৈশ্বিক জীবনপ্রবাহ স্তব্ধ হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ৮০ লক্ষ থেকে আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। যারা আগে দরিদ্র ছিল তারা হতদরিদ্র হয়ে যাবে। সুতরাং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি যে বলছে দুর্ভিক্ষ হবে- তা অহেতুক নয়। তারা ভবিষ্যৎ বাণী দিচ্ছে যে অনাহারে তিন কোটি মানুষ মারা যেতে পারে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্বের প্রতিটি দেশ নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণ করে চলছে। এখন কেউ কারও দিকে চেয়ে থাকার সময় নেই।
গত চার মাস বিশ্বব্যাপী লকডাউন ছিল। তাই বিশ্বব্যাপী জীবনপ্রবাহ থেমেছিল। আরও কয়েক মাস এভাবে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলে বিশ্ব পরিপূর্ণভাবে অচল হয়ে যাবে। বিশ্বের জীবনসুধা হলো তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আর বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাকে তালাবদ্ধ করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। সবাইতো লকডাউনে বসা। কয়দিন রাষ্ট্র ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছাবে? হাতে যা কিছু আছে তা তো অফুরন্ত নয়। বসে থাকলে অনাহার সমগ্র সমাজকে গ্রাস করবে। বিশ্বব্যাপী হানাহানির দরজা খুলে যাবে।

করোনার মতো আরও বহু মহামারি বিশ্বে এসেছে কিন্তু বিজ্ঞানের চূড়ান্ত বিকাশের যুগে এভাবে লকডাউন বলে ঘরে বসে থাকা কোনও সঠিক কাজ নয়। প্লেগের সময়, স্পেনিশ ফ্লুর সময় কোটি কোটি মানুষ মরেছে আর তখন জীবনপ্রবাহও সমান্তরালভাবে চলেছে। মানুষ সৃষ্টির সেরা বুদ্ধিমান জীব। মানুষের হাতে সবকিছু পরাজিত হয়েছে অতীতে। ভবিষ্যতেও পরাজিত হবে। পশ্চিমাদের লকডাউন ব্যবস্থা বা চীনের লকডাউন ব্যবস্থা এদেশে হুবহু চালানো যাবে না। তারা ধনী দেশ। তারা যা ইচ্ছে করতে পারবে আমরা তা করতে পারবো না। ঝুঁকি নিয়ে হলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করে জীবন প্রবাহ সচল রাখতে হবে।

লকডাউনে ঘরে বসে থাকলে হাওরের ফসল ঘরে তোলা যেত না। সাহস করে সবকিছু করতে হবে। সৎ সাহসের বিকল্প কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধ যারা দেখেছে তারা জানে আড়াই হাজার বছরের যোদ্ধা জাতি পাকিস্তানিদের সাধারণ হাতিয়ার নিয়ে বাঙালিরা মোকাবিলা করেছে। সফল হয়েছে। অবশ্য ৩০ লক্ষ লোককে আত্মহুতি দিতে হয়েছে। আত্মহুতির মহড়ায় পিছুও হটেনি তারা।

দু’সপ্তাহ আগে ব্রিটেনের বিখ্যাত ইকোনোমিস্ট পত্রিকা বাংলাদেশ সম্পর্কে আশাব্যাঞ্জক কথাবার্তা বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ এই বছর বাংলাদেশে চাল, গম ও ভুট্টার উৎপাদন ১০ লাখ টন বাড়বে বলে আগাম বার্তা দিয়েছে। হাওরের বোরো ফসল উঠে গেছে। এখন সারা দেশে সমতলের বোরো ফসল কাটা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে কৃষকরা আমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অধিক বৃষ্টি, খরা আর বন্যা থেকে রক্ষা পেয়ে আমনের আবাদও যদি আল্লাহ চাহে তো সফল হয় তবে বলা যাবে বাংলাদেশকে আল্লাহ অনাহারের হাত থেকে রক্ষা করলো।

এখানে আরও একটা কথা উল্লেখ করতে হয়, মার্কিন কৃষি বিষয়ক সংস্থার তথ্যমতে চাল উৎপাদনকারী দেশের উৎপাদন এই বছর কমেছে কিন্তু বাংলাদেশের উৎপাদন বেড়েছে তিন শতাংশ। অবশ্য ভারত ও ভিয়েতনামের উৎপাদন বেড়েছে এক শতাংশ করে।

আমরা ঠেকায় পড়লে কিছু করার চেষ্টা করি, নয়তো পড়ে থাকে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনও মজবুত ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠেনি। অথচ যেসব দেশে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সংস্থা সুরক্ষা রয়েছে সেইসব দেশে করোনা বিস্তার করতে পারেনি। কিউবা, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মজবুত করেছে। সুতরাং সেইসব দেশে করোনার বিস্তার হয়নি। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে দক্ষ বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন। আমরা এতদিন দক্ষ স্বাস্থ্যসুরক্ষার দিকে কোনও খেয়াল করিনি। করোনা উত্তর পরিস্থিতিতে আমাদের দক্ষ স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। এখন আমরা বুঝি যে খাদ্য সুরক্ষা যেমন প্রয়োজন স্বাস্থ্য সুরক্ষাও অনুরূপ প্রয়োজনীয় বিষয়। এখন অর্থনীতিতে মনোযোগ দিতে হবে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো প্রদত্ত তথ্য অনুসারে গত এপ্রিল মাসে বিভিন্ন খাতে রফতানি আয় হয়েছে মাত্র ৫২ কোটি ডলার। অবশ্য একই মাসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এসেছে ১০৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। বাংলাদেশে রফতানি আয় রেমিটেন্সের কম- এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। এই মহামারির প্রভাব শুরু হওয়ার আগের যে কোনও মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সব সময়ই রেমিট্যান্সের চেয়ে আড়াই-তিন গুণ বেশি বিদেশি মুদ্রা এসেছে পণ্য রফতানি করে।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১৫৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। ওই মাসে রফতানি আয় ছিল ৩৫৮ কোটি ১৯ লাখ ডলার। পুরো অর্থবছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলেও বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্য রফতানি থেকে বাংলাদেশ মোট ৪ হাজার ৫৩ কোটি ৫০ লাখ (৪০.৫৩ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছিল। আর রেমিটেন্স এসেছিল ১ হাজার ৬৪২ কোটি (১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন) ডলার।

সারাবিশ্ব করোনায় বিধ্বস্ত। সুতরাং রফতানি আয় কমবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের পোশাকের ৮০% যায় ইউরোপ আর অবশিষ্ট অংশ যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। উভয় বাজার করোনায় আক্রান্ত তবে লকডাউন সব দেশই শিথিল করছে। গ্রীষ্মের মৌসুম এসেছে। এখন গ্রীষ্মের কাপড় প্রয়োজন হবে। চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া তাদের রফতানি পোশাকের কারখানা খুলেছে। সুতরাং বাংলাদেশ তার পোশাক কারখানা না খুললে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাজার হারাবে।

সরকার স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করে গার্মেন্ট খুলেছে। প্রথম প্রথম অসুবিধা হতে পারে পরে। এটাই নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। শ্রমিকরা অভ্যস্থ হয়ে যাবে। তবে কারখানায় যেন বাইরের কোনও লোক না আসে। কঠিনভাবে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। করোনা কতদিন চলে বলা মুশকিল তবে আমরা আশা করি ২/১ মাসের মধ্যে প্রতিষেধক বের হয়ে যাবে। অক্সফোর্ড যে প্রতিষেধক মানুষের শরীরে প্রয়োগ শুরু করেছে সেটা আল্লাহ চাহেতো কার্যকর প্রমাণিত হবে। তবে প্রতিষেধক বের হোক বা না হোক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিকরা করোনার মধ্যে উৎপাদন করার একটা স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করুক এবং সফলকাম হোক তাই কামনা করছি।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ