এন-৯৫, পিপিই এবং আমাদের ভবিষ্যৎ

Send
রাশেক রহমান
প্রকাশিত : ১৭:৪৯, মে ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০১, মে ১৪, ২০২০

রাশেক রহমানআজ যখন কলাম লিখতে বসলাম তখনই একটা দুঃসংবাদ পেলাম। আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান। এই লেখাটিও তাঁর প্রতি উৎসর্গ করলাম।
এ সপ্তাহে আরও একজন চিকিৎসক করোনায় মারা গেছেন। এ নিয়ে তিন জন চিকিৎসক মারা গেলেন। বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন বা বিডিএফ-এর সব শেষ হিসাব অনুযায়ী ৫৬৫ জন ডাক্তার আক্রান্ত হয়েছেন। আর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যসোসিয়েশন-বিএমএ’র হিসাবে ডাক্তারসহ আক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা এক হাজারের বেশি। দেশের একেবারে প্রথম শ্রেণির গণমাধ্যমগুলো বলছে বাংলাদেশে মোট আক্রান্তের ১১ ভাগেই স্বাস্থ্যকর্মী। অথচ এই হার করোনায় সবচেয়ে বিপজ্জনক যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র দুই শতাংশ এবং প্রথম আক্রান্ত চীনে সাড়ে তিন শতাংশ। আরেকটি তথ্য না দিলেই নয়। সেটি হচ্ছে আমাদের পুলিশ বাহিনীতে এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৯২৬ জন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৯০৭ জন সদস্য রয়েছেন। এ পর্যন্ত পুলিশ মারা গেছেন ৭ জন।  ময়মনসিংহ মেডিক্যালেই শুধু আক্রান্ত ডাক্তারের সংখ্যা শতাধিক। সেখানে একটি করোনা পরীক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। করোনার চিকিৎসাকেন্দ্র তো আছেই। এরইমধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডাক্তার সংকটের কারণে সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা গণমাধ্যমের কাছেও বলতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিদিন ঢাকায় স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ হচ্ছে। আমরা খবরে জানতে পারছি দূর গ্রামের হাসপাতালে চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ায় নমুনা সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার গল্প। এই দুর্যোগে যেখানে জাতির মনোবল চাঙা রাখার চেষ্টা করছে সরকার, সেখানে এমন সব ঘটনা সত্যিই অনাকাঙ্ক্ষিত।

পাঠক চলুন দেখে আসি এমন হলো? এটা কী নিয়তি, না মানবসৃষ্ট দুর্যোগ? শুরুতে জানার চেষ্টা করি চিকিৎসক বন্ধুদের সংগঠনগুলো কী বলছে? বিএমএ মহাসচিব তিনটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। এরমধ্যে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসম্মত পিপিই না দেওয়াটা অন্যতম হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশে কর্মরত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারাও চিকিৎসাকর্মীদের পিপিইর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপেও বলছে যারা পিপিই ব্যবহার করছেন তারা বাধ্য হয়ে করছেন। তারা কেউই এর মান নিয়ে খুশি নন। পুলিশ বন্ধুদের অবস্থা আরও করুণ। চিকিৎসকরা তবু বলতে পারছেন পিপিইর মানের কথা। তারা চাকরির ধরনের কারণে সেটাও বলতে পারছেন না।

পাঠক বিরক্ত হবেন না। এত তথ্য সূত্রের উল্লেখ করছি, কারণ আমি বলতে চাচ্ছি একটি দেশের পুরো কাঠামোর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে কীভাবে গুটিকয় দুর্নীতিবাজ তাদের চুরি অব্যাহত রেখেছে? আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কত শক্তিশালী? মানুষের সম্মিলিত শক্তির চেয়ে কি বেশি? তাহলে কেউ তাদের আটকাতে পারছে না কেন? এমনকি সবকিছু প্রকাশ পাবার পরেও গ্রেফতার হচ্ছে না কেন ? আমার জানামতে আজ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়নি। কেন হলো না? সারা দেশের পিপিই’র অনিয়ম প্রকাশ হতে শুরু করে বিতরণ হয়ে যাওয়ার পর। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫ হাজার চিকিৎসা কর্মীর বিপরীতে প্রায় ১৩ লাখ পিপিই সরবরাহ করেছে কেন্দ্রীয় ওষুধ প্রশাসন। এতে গড়ে প্রত্যেক কর্মীর ১৫টি করে পিপিই পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখনও  মাঠপর্যায়ে বহু স্বাস্থ্যকর্মীকে পিপিই ছাড়া কাজ করতে দেখা গেছে। গণমাধ্যমের কাছে তারা বারবার জানিয়েছেন কাজ করতে হচ্ছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। সে সময় একটি পত্রিকা ঢাকাসহ সব বিভাগীয় দফতরে বিতরণের কাগজপত্র মিলিয়ে দেখে চার লাখ পিপিই’র কোনও হদিস নেই। ওই সময়ই চিকিৎসা কর্মীরা জানিয়েছিলেন সরবরাহ করা কোনও পিপিই পূর্ণাঙ্গ নয়। গাউনের সঙ্গে গগলস নেই। নেই এন-৯৫ মাস্ক। গ্লাভস, সু-কাভার এবং হেডক্যাপ নেই। অথচ এসব কিছুই একটি সেটের সঙ্গে থাকার কথা। কোনও কোনও জায়গার আলাদা করে এন-৯৫ মাস্ক, গ্লাভস, সু-কাভার, হেডক্যাপ সরবরাহ করা হয়েছিল। একজন তরুণ চিকিৎসক বলেই দিলেন, পিপিই’র নামে যেটা পাঠানো হয়েছে সেটাকে বড়জোর রেইনকোট বলা যেতে পারে। মাঠের চিকিৎসকরা এ সময় সোচ্চার হচ্ছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ শক্তভাবে প্রত্যেক চিকিৎসকের পাশে না দাঁড়িয়ে একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দায় সারলেন। কিন্তু দরকার ছিল করোনাযুদ্ধে অংশ নেওয়া সামনের কাতারের যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা।  এরপর পিপিই নিয়ে আরও নানা কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়েছে। এর মান নিয়ে প্রশ্ন তোলায় ঢাকার একটি হাসপাতালের প্রধান ওএসডি হয়েছেন। ঢাকার বাইরের একজন হাসপাতালের প্রধানকে মানসিক হাসপাতালে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। এসব পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে।

এসব কাজে বিরক্ত হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একদিন প্রেস ব্রিফিংয়ের মধ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার পরেও পিপিই দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হওয়ার কোনও খবর পত্রিকায় দেখলাম না। দুর্নীতিবাজরা এত শক্তিশালী, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে এ কথা ভাবতে পারি না। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসাবে তো আরও পারি না। আমাদের ইতিহাসে পাই খোদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রমিক কর্মচারীদের আন্দোলনে পেশাজীবীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তারাও আজীবন বঙ্গবন্ধু পাশে ছিলেন। এসব পেশাজীবীর সমর্থনে আজকের বাংলাদেশ। এই দেশ আজ আরেক ক্রান্তিতে। এখন পেশাজীবীদের বিশেষ করে ক্রান্তি কাটানোর যুদ্ধ যারা করছেন তাদের বাঁচানো প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। কিন্তু আমরা সেই কর্তব্য তো করতে পারছিই না, উল্টো সামনের সারির যোদ্ধাদের বিপদে ফেলছি। এ দায় দেশের প্রতিটি সচেতন মানুষের। আমি নিজেও এর বাইরে নই। তবে আমি এর জন্যে সবচেয়ে বেশি দায় দেই পেশাজীবী সংগঠনগুলোর। চিকিৎসকদের কথাই যদি বলি, তাদের মূল সংগঠন বিএমএ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বাচিপ এবং বিএনপি সমর্থিত ড্যাব। পেশাজীবী অধিকার রক্ষায় চিকিৎসকদের আরও সংগঠন আছে। এছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকার রক্ষায়ও একাধিক সংগঠন রয়েছে। পুলিশদের ইউনিয়ন করার সুযোগ না থাকলেও রয়েছে নানা ক্লাব। যেখান থেকেও চাইলে অধিকার রক্ষার কথা তো বলাই যায়।

খুব খোলা চোখে যদি দেখা যায়, পিপিইতে যে গাউন দেয়া হয়েছে, সেটার সেলাই ঠিক আছে কিনা সেটা দেখা উচিত শুরুতেই। দেখতে হবে হিট সিল বা ছিদ্রবিহীন সেলাই আছে কিনা। পিপিই মান নিয়ন্ত্রণের এটাই প্রথম শর্ত। যে কেউ চাইলেই দেখতে পারেন। একই রকমভাবে সরবরাহ করা অন্য পণ্যগুলোর মান ধরতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কেউ কিছু বলছে না এখনও। অথচ বাবার রাজনৈতিক সহকর্মী হওয়ার কারণে মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনকে চিনি ছোটবেলা থেকে। বিএমএ মহাসচিব ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলালসহ আমাদের দলে চিকিৎসক পেশাজীবী রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত আমি তাদের চিনি।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন চাচাকে আমি খুব ভালোভাবে চিনি। তাদের কাছ থেকে অনেক স্নেহ পেয়েছি। তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠ নিজের চোখেই দেখেছি। কারণ তিনি আমার বাবার রাজনৈতিক সহকর্মী এবং প্রতিবাদী সত্তা ধারণকারী মানুষ। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক, যিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত আস্থাভাজন বিশ্বস্ত। তিনি চিকিৎসকদের নেতা। বিএমএ সভাপতি হিসেবে ও বিএমএ মহাসচিব মহাসচিব ডা.এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল ভাই এবং একই সঙ্গে আমি উল্লেখ করতে চাই স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি ইকবাল আর্সালান ভাই ও স্বাচিপের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ ভাই, উনারা ছাত্রজীবন থেকেই বাংলাদেশের ক্রান্তিলগ্নে ও যেকোনও সংকটকালে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির জোরালো কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিবাদ করেছেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। চিকিৎসকদের প্রাণনাশের আশঙ্কা আছে জেনেও যখন কেউ সুপরিকল্পিতভাবে ঠান্ডামস্তিষ্কে বাংলাদেশে যখন নকল পিপিই ও নকল এন৯৫ মাস্ক বা ভেজালযুক্ত কোনও পণ্য সরবরাহ করে তখন তার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট, নির্দিষ্ট, ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে মামলা এবং আইনি সহায়তা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তাই আমি মনে করি আর কেউ কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করুক বা না করুক, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য যে সংগঠন পরিচিত, তাদের উচিত অতিসত্বর বাংলাদেশের যেকোনও থানায় ফৌজদারি মামলা রুজু করা। যাতে করে সুষ্ঠু তদন্তের মধ্য দিয়ে যারা নকল পিপিই ও নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করেছেন তারা আইনের আওতায় আসেন এবং এটা যেন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।

এমনকি বর্তমান ড্যাব নেতাদের সম্পর্কেও একটা ধারণা রাখি। এরা কেউই নেতিবাচক চরিত্র নন। প্রত্যেকেই নিজের কর্মীদের প্রতি যথেষ্ট সহমর্মী। প্রত্যেকেই মাঠের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু কেন এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় যাচ্ছেন না আমার মাথায় আসছে না। এরই মধ্যে ঔষধ প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি করেছে। কিন্তু এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে, মানহীন এসব পিপিই ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছে। এরা কেউই ঔষধ প্রশাসনের তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী নন। তাহলে বিভাগীয় তদন্ত হবে কার বিরুদ্ধে? তাই এখানে এই চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধ আইনের আশ্রয় নেওয়ার বিকল্প নেই। আর পেশাজীবী প্রতিনিধিরা যদি এই বিচার চায়, তাহলেই সবচেয়ে ন্যায্য হয়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দরকার এই অপরাধীদের। কারণ, এটি ন্যূনতম সাধারণ অপরাধ নয়। এর সঙ্গে মানুষের মৃত্যু জড়িত। জড়িত করোনা মোকাবিলার ভবিষ্যৎ।

এই অপরাধীরাও সাধারণ অপরাধী নয়। তারা সংখ্যায় অল্পও নয়। যারা প্রধানমন্ত্রীর চোখরাঙানি উপেক্ষা করতে পারে তাদের চক্রকে ছোট করে দেখার কিছু নেই। আবার একথাও ঠিক, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মহাশক্তিধর যুদ্ধাপরাধী চক্রের বিচার কার্যকর হয়েছে। সেটা সম্ভব হয়েছে মানুষের চাওয়ার শক্তিতে। এই পিপিই চোরদের বিচারও আমাদের চাইতে হবে খুব শক্ত করে। মনে রাখা দরকার, লকডাউন শিথিল হচ্ছে। এখন সামনের সারির যোদ্ধাদের জন্যে যথাযথ পিপিই নিশ্চিত করা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক: রাজনৈতিক কর্মী

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ