গণমাধ্যমের মহামারির যুগে পেশাদারিত্বের অর্ধযুগ

Send
এরশাদুল আলম প্রিন্স
প্রকাশিত : ১৮:০৭, মে ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৮, মে ১৫, ২০২০

এরশাদুল আলম প্রিন্সগত ৩ মে ছিল বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। এদিন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তাদের নিজ নিজ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করে। সঙ্গে সার্বিকভাবে বিশ্ব গণমাধ্যমের অবস্থাও পর্যালোচনা করে। এটি একটি রুটিন কাজ। মুক্ত সাংবাদিকতা বা মুক্ত গণমাধ্যম আজ বৈশ্বিকভাবেই চ্যালেঞ্জের মুখে। গণমাধ্যমকে বলা হয় দেশের ফোর্থ স্টেট বা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কিন্তু দেশে দেশে মুক্ত গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জটির নামও ‘রাষ্ট্র বনাম গণমাধ্যম’। রাষ্ট্র গণমাধ্যমকে শত্রু জ্ঞান করে, কিন্তু গণমাধ্যম চেয়েছে রাষ্ট্রের বন্ধু হতে। যেন, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার, শত্রু বলে গণ্য হলাম। বিশ্ব গণমাধ্যমের ‘তাতেই আমি ধন্য হলাম’ অবস্থা!


সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতার বিষয়টি যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে চর্চা হয় তার ওপরই নির্ভর করে স্বাধীনতার রূপরেখা। তবে বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর সব দেশেই আজ মুক্ত সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জের মুখে। ভবিষ্যতে এ চ্যালেঞ্জ বাড়বে বৈ কমারও কোনও আশু সম্ভাবনা নেই। কারণ, রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাচ্ছে বিশ্বব্যাপীই।

গণমাধ্যমের রসদ হচ্ছে সংবাদ বা খবর। একসময় শুধু সংবাদপত্রের মারফতেই সংবাদ মানুষের কাছে বা ভোক্তার কাছে পৌঁছাতো। কিন্তু আদতে সংবাদপত্র কোনোকালেই পুরোপুরি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি। সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম জন্মেই দেখে ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি। জন্মই তার আজন্ম পাপ। পৃথিবীর সব দেশে, সব কালেই সংবাদপত্রের ওপর কমবেশি চাপ ছিল। এই দেশে বা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ আমলেও সংবাদপত্রের ওপর চাপ কম হয়নি। তবে তার মধ্য দিয়েও সংবাদপত্র যত পরাধীনই থাকুক না কেন, সাংবাদিকরা ছিল অনেকটাই স্বাধীন। ফলে আমরা দেখি, একটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পেছনে অন্তত দুটি বিষয় জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার পাশাপাশি ব্যক্তি সাংবাদিকের মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতাও এখানে জরুরি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা থাকুক বা না থাকুক, পেশায় টিকে থাকার জন্য ব্যক্তি সাংবাদিক নিজেই আজ নিজের ওপর প্রয়োগ করছে সেল্ফ সেন্সরশিপ নামক আত্মরক্ষার কৌশল। সাংবাদিকতার এ মার্শাল আর্টই আজকের গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকদের টিকে থাকার অন্যতম কৌশল। এসবই টিকে থাকার লড়াইের গল্প-গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীর। সেখানে সাংবাদিকের তথা গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার আলোচনাটি অনেকটাই সিলেবাসবহির্ভূত বিষয়। গণমাধ্যমের ওপর চাপের যে কত রকমফের রয়েছে তার বয়ান এক লেখায় কুলোবে না।

আগেই বলেছি, গণমাধ্যমের রসদ হচ্ছে সংবাদ বা খবর। গণমাধ্যম দেশে দেশে যতই বন্দি হোক, সংবাদ কিন্তু ঠিকই স্বাধীন। খবর সব সময়ই মুক্ত। বাহক সেখানে পরাধীন হতে পারে। ফলে সংবাদ সময়ের প্রয়োজনেই তার বাহক বদল করতে পারে। আর যুগের চাকাতো থেমে থাকে না। ছাপার অক্ষরের সংবাদমাধ্যম আজ বেছে নিয়েছে নিজেকে প্রকাশ করার ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যম। টিকে থাকার লড়াইয়ে আজ খবর বা সংবাদ বেছে নিয়েছে অনলাইন, ডিজিটাল মাধ্যম, মাল্টিমিডিয়া মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আরও কত কী। সংবাদ তার পুরনো খোল নলচে বদলে ফেলেছে। খবরের পোস্ট মাস্টার সাংবাদিকদের সে ছুড়ে দিয়েছে চ্যালেঞ্জ। কারণ আগেই বলেছি, খবর মুক্ত। ওদিকে গণমাধ্যমকর্মীরাও পেশার প্রয়োজনেই খবরের পেছনে ছুটছে। সে চ্যালেঞ্জ তারা গ্রহণ করেছেন। তারাও আজ অনলাইনে, ডিজিটাল মাধ্যমে, মাল্টিমিডিয়ায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। সংবাদ এখন আগের চেয়েও অনেক মুক্ত, গণমাধ্যমে মুক্ত হোক বা না হোক। খবর বা সংবাদ আজ অনেকটাই গণমাধ্যম নিরপেক্ষ ও অনির্ভরশীল একটি বিষয়। প্রথাগত সংবাদমাধ্যম তা না হলেও চলে। আগে ছাপার কাগজ ছাড়া সংবাদের চলৎশক্তি ছিল না, যদিও সে ছিল মুক্ত। কিন্তু সেই মুক্তি ছিল সীমিত মুক্তি। আজ সে পুরোপুরিই মুক্ত। খবর নিজেকে প্রকাশ করার জন্য অনেক বিকল্প নিজেই বেছে নিয়েছে। কিন্তু এখানেও রক্তচক্ষু যে একেবারে নেই তা নয়। কারণ, মনে রাখতে হবে যুগ যেমন রোগও তেমন। আগে ছিল কুষ্ঠ, গুটিবসন্ত, কালা জ্বর। এখন সার্স, মার্চ, এবোলা, করোনা। এখন ডিজিটাল যুগ। তাই আইনও ডিজিটাল। সাংবাদিকতা এখন গুপ্তচরবৃত্তির চেয়েও কঠিন। গুপ্তচরকে শুধু শত্রু রাজ্যেই গুপ্তচরবৃত্তি করতে হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুবুহ্যে ঢুকে গোপন খবর বের করে জান বাঁচিয়ে ফিরে এসে সেনাপতির কাছে সে খবর পৌঁছে দিতে পারলেই গুপ্তচরের চাকরি আছে। হালের সাংবাদিকদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র আরও বিস্তৃত। পুরো জীবনই তাকে যুদ্ধ করে যেতে হয়। গুপ্তচরেরও বন্ধু থাকে। হালের সাংবাদিকদের কোনও বন্ধু আছে কি?

এমনই একটি পরিস্থিতিতে প্রাতিষ্ঠানিক গণমাধ্যমের জন্ম, বেড়ে ওঠা ও বিকাশ সহজ কিছু নয়। ডিজিটাল যুগে অনেক কিছুরই হয়তো জন্ম দেওয়া সহজ। প্রতি সেকেন্ডে বিশ্বের কথা না হয় বাদই দিলাম, এই বঙ্গভূমিতে কয়টি ওয়েবসাইট ‘পয়দা’ হয় তার হিসেবও আমাদের জানা নেই। এরমধ্যে ‘এই আছি এই নেই’ মার্কা নিউজপোর্টালও কম নয়। হাজার বারোশ’ টাকায় ওয়েব সাইট কিনে সেখানে কাট-কপি-পেস্টের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অতিদ্রুতই পাঠক সমাজে ঝড় তোলা যায়। এ রকম ঝড় তোলা অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ঘূর্ণিঝড়ে গণমাধ্যম আজ বিপর্যস্ত। এ ঝড়ে টিকে থাকার লড়াইটা বহুমাত্রিক। এখানে শুধু খবর নয়, প্রয়োজন ঝড় তোলা খবর। সেই সঙ্গে আমরা পাঠকরা চাই সেনসেশন। সেই সেনসেশনের সাপ্লাই দিতে গিয়ে গণমাধ্যম নিজেই নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সাংবাদিকদের গলদঘর্ম। এখানে পেশাদারিত্ব, সততা, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা- এরকম আরও সব আদর্শিক শব্দমালা বড়ই বেমানান।

পেশাদারি সাংবাদিকতা অনেক ক্ষেত্রেই আজ অনুপস্থিত। গণমাধ্যমের রয়েছে আজ নানা প্ল্যাটফর্ম। একেকটি প্ল্যাটফর্ম নিজেরাই নিজেদের যুগশ্রেষ্ঠ মনে করছে। সংবাদপত্র মনে করছে তারাই যুগ নির্মাতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা তাদের রূপ বদল করেছে। অনলাইনে আজ তারাও জায়গা করে নিয়েছে নিজের মতো করে। রয়েছে তাদের অনলাইন ও ই-পেপার ভার্সন। সে সঙ্গে নতুন নতুন বাহারি নাম নিয়ে প্রতিনিয়তই বাজারে আসছে নতুন নতুন অনলাইন পোর্টাল। অনলাইন এ পোর্টালগুলো ডিজিটাল নানা সংযোগে সমৃদ্ধ করছে নিজেদের। নানা বাহারি রং, ভিডিও কন্টেন্ট, ডিসপ্লে আরও কত কী। অনলাইন নিজউপোর্টালের এ ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। কাজেই গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জও বহুমাত্রিক। রয়েছে এর অন্তর্গত অস্তিত্বের লড়াই। সেই সঙ্গে নিজস্ব প্ল্যাটফর্মের অপরাপর প্রতিযোগীর সঙ্গে লড়াই তো রয়েছেই। রয়েছে অন্য প্ল্যাটফর্মের গণমাধ্যমের সঙ্গেও লড়াই। কারণ, সবার ভোক্তাই ওই একই পাঠক। এবং সব ভোক্তার কাছেই রয়েছে সব প্ল্যাটফর্মের গণমাধ্যমের এক্সেস। কাজেই এ অন্ত ও আন্ত-লড়াইের মধ্য দিয়েই গণমাধ্যমকে আজ টিকে থাকতে হচ্ছে।

এত গেল গণমাধ্যমের বর্তমান লড়াইয়ের একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে গণমাধ্যমের প্রথাগত, চিরচেনা ও ঐতিহাসিক শত্রু কিন্তু এখনও রয়েছে। দেশে দেশে তারা আগের চেয়ে আরও বেশি গরম। সব মিলিয়ে গণমাধ্যম আজ এক মহামারিতে আক্রান্ত। এ মহামারি জন্মের যেমন, টিকে থাকারও তেমন। এ মহামারির বিরুদ্ধে সহি-শুদ্ধভাবে নিজ স্বাস্থ্য বা কন্টেন্ট বা কনফিগারেশন নিয়ে বেঁচে থাকা সহজ কিছু নয়। বেশিরভাগই ভাইরাস বা মহামারির বিরুদ্ধে নিজের কন্টেন্টের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে বেঁচে থাকে। ঠিক যেমন ভাইরাসের সঙ্গে মানুষ সহাবস্থান করে। ভাইরাস মাঝে মাঝে অ্যাটাক দেয়, মানুষ একটু অসুস্থ হয় আবার কিছু দিন পর সুস্থও হয়ে যায়। বেশিরভাগ অনলাইন মাধ্যমই আজ এভাবে মহামারির সঙ্গে সহাবস্থান করছে- কন্টেন্ট, ফিচার, প্রডাক্ট কম্প্রোমাইজ করে। এর বিরুদ্ধে কোনও প্রতিরোধ ব্যবস্থা তো নেয়ই না, প্রতিষেধকও ব্যবহার করে না। কাজেই বেড়ে যাচ্ছে মহামারি। এরই মধ্যে কম্প্রোমাইজ করেই টিকে থাকে কেউ কেউ।

ডিজিটাল যুগের এই মহামারির সঙ্গে কোনও কম্প্রোমাইজ না করে, বাহারি রঙের ধাঁধায় না পড়ে, রগ রগে উত্তেজনায় কাবু না হয়ে, কোনও সেনসেশনে গা না ভাসিয়ে দিয়ে, তথাকথিত ব্রেকিংয়ের পাল্লায় না পড়ে, চটজলদি তত্ত্বে বিশ্বাস না করে, অনলাইন অস্থিরতায় শামিল না হয়ে, বস্তুনিষ্ঠতাকে প্রাধান্য দিয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার নামই সংবাদযুদ্ধ। যারা এ যুদ্ধে কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে লড়াই করছেন তারা সংবাদযোদ্ধা। পেশাদারিত্বই তাদের তরবারি। শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও এ লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই অনেক বড় সাফল্য। অনলাইনের এ সমৃদ্ধ জনপদে না বলতে পারার শক্তিই নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। আর এই ধাঁধার যুগেও কোনও প্রতিষ্ঠান যদি অর্ধযুগ এ লড়াই চালিয়ে যেতে পারে, তবে বুঝতে হবে তার শক্তি অনেক গভীরে প্রোথিত, পেশাদারিত্বের রসাস্বাদনে সে সমৃদ্ধ, নৈতিকতার বলে সে বলীয়ান। বাধা থাকবে, সীমাবদ্ধতাও থাকবে। এরমধ্যেও একান্ত নিজস্বতা নিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়াই আজকের গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সাফল্য। গা ভাসিয়ে বা গা উজাড় করে দিয়ে নয়, বরং গা ঝাড়া দিয়ে গাত্রোত্থান করে আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার শক্তির উৎস পেশাদারিত্বে। পেশাদারিত্বের মধ্যেই অনলাইন গণমাধ্যমকে প্রতিনিয়ত নতুন করে আবিষ্কার করতে হয় নতুন রূপে ও আঙ্গিকে। সে কাজটিই করে যাচ্ছে বাংলা ট্রিবিউন গত ছয় বছর ধরে। প্রতিনিয়ত নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ করে যাচ্ছে এ নিউজপোর্টাল। আর প্রতিনিয়ত আমরা পাচ্ছি এক নতুন বাংলা ট্রিবিউন। ষষ্ঠ বার্ষিকীর শুভ কামনা প্রকাশক, সম্পাদক ও তথা ট্রিবিউন যোদ্ধাদের।

লেখক: আইনজীবী

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ