আনিসুজ্জামান, দেবেশ রায়। একে একে নিবিছে দেউটি

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ২০:১৫, মে ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০৬, মে ১৫, ২০২০

দাউদ হায়দারঅভাবনীয়। মেধা ও বোধের জগৎ শূন্য হচ্ছে, দুই বাংলায়। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ক্রমশ বিলীন। আগামী প্রজন্ম- যাঁরা খুঁটি হিসেবে ধরতে চান যাঁদের, আশ্রয় পেতে চান যাঁদের কাছে- পথের শেষ কোথায় জেনেও পথহীনতায় দিশেহারা হবেন, সন্দেহ নেই। কেউ যখন আস্থা হারায়, একাকিত্বের দুর্মম প্রহারে নিজস্বতায় চিড় ধরে। বুদ্ধিজীবীহীন দেশ গভীর ক্ষতে এতিম। সুস্থ সংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা, মানবিকতা, বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা যখন উধাও হয়ে যায়, দেশও নড়বড়ে, ভিত্তির শিকড়ও ঘুণ ধরা।
রামমোহন বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ রেনেসাঁসের যে বীজ বুনেছিলেন, বাংলার সমাজরাষ্ট্র শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এমন কী আন্দোলন, প্রতিবাদ আমাদের মনমানসে নানাভাবে সঞ্চারিত। এই সঞ্চার আনিসুজ্জামান, দেবেশ রায়ের রক্তমজ্জায় ছিল সচল। দু’জনেই অধ্যাপক। দু’জনেই লেখক, দু’জনেই বুদ্ধিজীবী। দু’জনেই প্রতিবাদী। দু’জনেই সমাজবাদ তথা সাম্যবাদে উদ্দীপ্ত, সোচ্চার ছিলেন ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। দু’জনেই সংগ্রামী। দু’জনেই উন্নতশির। দু’জনেই মানুষের সহমর্মী। মানুষের সহকর্মী। সুখ-দুঃখে সঙ্গী। দু’জনেই ভয়ডরহীন। দু’জনেই গদ্য লেখক।

আনিসুজ্জামান কবিতে লিখেছেন যৌবনের শুরুতে, যেমন লেখেন অধিকাংশ বাঙালি স্কুল-কলেজের বয়সে।

কবিতা ছেড়ে পরে গল্প। খুব বেশি নয়, দুই-তিনটি। গল্প লেখা থেকেই গদ্যের হাত তৈরি।

ধারণা করি, তাঁর সমসাময়িক গল্পকারদের গল্পের চেয়ে জোরালো নয়, জনপ্রিয় নয়, অনেকটাই দুর্বল, বেছে নেন গবেষণা, যা, বাংলার সম্পদ। গবেষণাই ছিল তাঁর মূল পাণ্ডিত্য। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি ধনী।

দেবেশ রায়ও গবেষক। তাঁর গবেষণায় মার্ক্সিয় ধ্যানধারণা। মার্ক্সিয় চিন্তাচেতনাবোধে উদ্দীপ্ত। ছিলেন একদা কৃষক-শ্রমিক সংগঠনে যুক্ত।

আনিসুজ্জামান চিন্তক, সমাজকর্মী, বুদ্ধিজীবী, গবেষক হিসেবেই বহুখ্যাত, উপন্যাস লেখেননি। লিখেছেন আত্মজীবনীও। তাঁর ‘বিপুল পৃথিবী’ আত্মজীবনী, পরে আরও বিস্তারিত, বড় আকারে গ্রন্থ, নামকরণ ‘কাল নিরবধি।’

দেবেশ রায় গবেষক হিসেবে সাধারণ পাঠককুলে অপরিচিত, গাল্পিক-ঔপন্যাসিক এবং রাজনৈতিক প্রবন্ধের জন্যে বহুমান্য। আমজনতার লেখক নন, জনপ্রিয়ও নন বাহারি লেখকদের মধ্যে।

দেবেশের লেখা পড়তে হয় বোধবুদ্ধি-মাথা সজাগ রেখে। চটজলদি পাঠ্য নয় বলে বুদ্ধিজীবীর কদরে শ্রদ্ধেয়। বহুমানিত।

দেবেশের মতো আনিসুজ্জামান প্রত্যক্ষ রাজনীতিক নন, কোনও রাজনৈতিক সংগঠন, দলে একীভূত হননি। কিন্তু সব প্রগতিশীল আন্দোলনে সব অসামাজিকতার বিরুদ্ধে কঠোর, অগ্রগণ্য সংগ্রামী, সোচ্চার। বিপদ জেনেও উচ্চকণ্ঠী। মিছিলে পয়লা। পদাতিক। দেবেশও। দু’জনেই সমাজ রাষ্ট্র মানুষের কল্যাণে অগ্রপথিক।

দেবেশের উপন্যাসে, তাও আবার উত্তরবঙ্গের পটভূমি, মানুষ সমাজের প্রাধান্য, উদ্বাস্তু, মানবতার দলিল, লিখেছেন বরিশালের যোগেন মণ্ডলকে নিয়ে রাজনৈতিক উপন্যাস। তিস্তা পারের বৃত্তান্ত নিয়ে দুইবার। উপন্যাস। দেশভাগের রাজনীতি, স্মৃতি নিয়ে আনিসুজ্জামান, দেবেশ রায়ের লেখায় যে ছবি, যাতনা, বঙ্গীয় সমাজের ইতিবৃত্ত, হালের লেখকের লেখায় পাওয়া যাবে না।

দু’জনের আরও মিল। আনিসুজ্জামান পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার বশিরহাটের (জন্ম)। দেবেশ রায় বাংলাদেশের পাবনার (জন্ম)। দেশভাগে দু’জনেই দুই দেশে, উদ্বাস্তু, মাতৃভূমিহীন, মূল শিকড়, ভিটেমাটি-ছাড়া। দু’জনেই আঁকড়ে ছিলেন বাংলার সমাজ-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি।

দূরে যাননি। দু’জনেরই একাত্মতা বাংলাদেশ। দু’জনেরই মাটি-মানুষ বাংলার। দুজনেরই একই দিনে, ঘণ্টা কয়েকের ব্যবধানে প্রস্থান। এই প্রস্থানে, সবার্থেই, একে একে নিবিছে দেউটি, দীপ জ্বালানোর থাকছে না কেউ।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ