কত প্রশ্ন রেখে যাবে করোনা?

Send
ইবতেসাম আফরিন
প্রকাশিত : ১৬:৩৪, মে ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৭, মে ১৭, ২০২০

ইব্‌তেসাম আফরিনমহামারির সময়কালে আমরা সবাই বিপন্ন এবং বিপদগ্রস্ত। কিন্তু সবার মাঝেই কি এই বিপন্নতা সমান প্রভাব রাখছে? একজন দিনমজুর, একজন গার্মেন্টকর্মী, একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ আর সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও অবস্থাসম্পন্ন মানুষের বিপর্যয়ের হুমকি কোনও অংশেই কি সমান? এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে মৃত্যুবরণ করেছেন ২৯৮ জন মানুষ, বিশ্বজুড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ৩ লাখ ৫ হাজার ৭৯০ জন। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। ভাইরাসটির কাছে সবাই যেন ক্ষুদ্র। তবে, এর মাঝেও নগণ্য হয়ে আছে শ্রমজীবী, দিনমজুর, সুযোগ-সুবিধাহীন মানুষগুলো। বর্ণবাদ, পারিবারিক নির্যাতন ও হয়রানির মতো বিষয়গুলোর মাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন অবস্থার জন্য আমরা কি এই সামাজিক অবস্থাগুলোকে প্রশ্ন করছি? নাকি, বিপদগ্রস্ততার মাত্রাকে শোকের আবহ দিয়ে ঢেকে, মানবতার ঢাল উঁচু করছি? মনের ভেতর ভয়, অনিশ্চয়তা, ক্ষোভ, আর হাহাকার নিয়ে সমাজের সকল স্তরের মানুষ একযোগে বিপন্ন বোধ করি। প্রশ্ন হলো আমাদের এই বিপন্নতা কিংবা দুঃখবোধ, কেবলই কি একটি সামাজিক পন্থা মাত্র?

পৃথিবী নিত্যদিন মৃত্যুর হারের বৃদ্ধি দেখছে, শোক প্রকাশ করছে, অনিশ্চয়তায় ভুগছে- এই মহামারি সময়কালে তাই বিপন্নতাবোধ, শোক প্রকাশ ও এর স্বাভাবিকীকরণের রাজনীতি প্রসঙ্গে লিখছি। যার নাম আমরা জানি না, যার ভাষা আমরা বলতে পারি না, এমনকি যার থেকে অবিচ্ছেদ্য দূরত্বে আছি, এমন ব্যক্তির মৃত্যুকে ক্ষতি চিহ্নিত করে, তার জন্য আমরা শোক প্রকাশ করছি, তাত্ত্বিক জুডিথ বাটলারের বক্তব্য অনুসারে এটি হলো গণমৃত্যুতে শোক। কিন্তু, এই শোক, মহামারিকালে এর বিশালতা ও বৈসাদৃশ্যের কাঠামোকে আরও কিছু কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্ন করে। রোগ, রোগী, চিকিৎসা ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে সূত্রে টিকে রয়েছে, যা সাধারণ জনগণ সহজাত সত্য বলে ধরে নেয়। তবে, সেই স্বাভাবিকতাকে প্রশ্ন করার জন্য নিজেদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তাই, প্রচলিত ব্যবস্থার বিশালতাকে বারবার, উত্তরের আশায়, প্রশ্ন করাকে আমি সমর্থন করি।

মহামারিতে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, আমরা হতবাক হচ্ছি মৃত্যুর তালিকা হতে দেখে। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা ঝুঁকির মাঝে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সব মৃত ব্যক্তির জীবনের মূল্য আমরা বোঝার চেষ্টা করি, কেননা তাঁর (তাঁদের) মৃত্যুতে কোনও পরিবারের ক্ষতি, কোনও দেশের ক্ষতি, মানবিকতার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি মেনে নিয়ে, এসব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে, সামাজিক মানুষ হিসেবে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর মিছিল দেখে আমরা শোকাহত হই। সাঁঝবাতি প্রজ্বলন করি এবং মঙ্গল বার্তা ধারণ করি। গণশোক প্রশমিত হতে থাকে। মৃত্যুর হার বাড়বে এটাই তখন স্বাভাবিক মনে হয়। তখন আমরা নিজেদের সমস্যা নির্ণয়ে ব্যস্ত হই। কাজের অভাব, গৃহবন্দিত্ব, খাদ্য সংকট, সুরক্ষা কিটের অভাব, অক্সিজেনের ঘাটতি, তথ্য বিভ্রাট, অবিশ্বাস, গুজব, পক্ষপাতিত্ব এসব নানান ঘটনাবলি সামগ্রিক অর্থে আমাদের মানবিক ভিতকে সরবে ঝাঁকুনি দেওয়া শুরু করে। আমরা নিজেদের চরম দুর্দশাপূর্ণ বলে চিহ্নিত করি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এগুলোতেও অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। সামাজিক অসমতায়, সম্পদের অসম বিন্যাস ও বণ্টনে আমরা আবারও অভ্যস্ত হই। কোনও কিছুর পরোয়া না করে, সমস্যাগুলোর দিকে দিকপাত না করে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের বোঝানোর চেষ্টা করছি, “সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে” কিংবা “এইতো আর কিছুদিন”। কিন্তু, বাস্তবচিত্রে আমরা কেন এগুলোকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছি?

দুঃখের প্রসার, প্রকাশ এবং শোকের সঙ্গে সমঝোতার বহুমাত্রিক দিক আছে, যা আমরা বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছোট থেকে বড় হওয়ার পর্যায়ে অভিযোজন করি। আমাদের কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত, বোঝাপড়া সবকিছুই যেন মানুষ হিসেবে আমাদের দৈনন্দিন রাজনীতির প্রতিমূর্তি। আমরা দেখছি ইকুয়েডরে বাথরুমে লাশের স্তূপ। দেখছি ইতালি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে একদিনে সর্বোচ্চ মৃতের সংখ্যা। মৃত ব্যক্তি ক্রমেই কারও আত্মীয়-পরিজনের চেয়ে নিছক একটি সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। আমরা দেখেছি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির শেষ বিদায় দিতে না পারায় আত্মীয় পরিজনের গ্লানি অনিশ্চয়তার বেদনা। এছাড়াও দেখেছি করোনা সন্দেহে বৃদ্ধা মা-কে জঙ্গলে ফেলে রেখে যাওয়ার মতো ঘটনা থেকে শুরু করে করোনা আক্রান্ত হয়েছে বিধায় পালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও। সামাজিক জীবনের অসঙ্গতি রূপ নিয়েছে শারীরিক- মানসিক দুর্বলতা, ভয়, এবং অনিশ্চয়তায়। ফলে, পূর্ববর্তী সব অসঙ্গতি ছাপিয়ে আমরা নিয়তিকে মেনে নিচ্ছি। কিন্তু, কীভাবে এবং কেন?

সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে আমরা আদান প্রদান, লেনদেন এবং বণ্টনের প্রক্রিয়াটির সঙ্গে পরিচিত। সেটি আর্থিক ক্ষেত্রে হোক কিংবা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। যেমন, বাজার করা, বিয়ে, চিকিৎসা সেবা ইত্যাদি। অর্থাৎ, দুই বা ততধিক ব্যক্তির উপস্থিতিতে বস্তুগত কিংবা অবস্তুগত লেনদেনের কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। তেমনিভাবে, মহামারি এই রোগটিও আদান-প্রদানের বৃত্তকে পূরণ করছে। কারও সংস্পর্শে এলে আরেকজন তা গ্রহণ করলে রোগাক্রান্ত হবে। কিন্তু, প্রাকৃতিক লেনদেন যখন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লেনদেনের অনুরূপ হয়ে পরে, তাতেই ঘটে বিপত্তি। আমরা আমাদের চিরায়ত সামাজিক আদান-প্রদানের ধারণাটিকে গৃহবন্দি করছি। মহামারি প্রতিরোধে যখন আমরা প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেকে অবরুদ্ধ রাখছি, তখন তা আমাদের দুর্দশায় ফেলছে। বিপত্তির সীমা শুধু আক্রান্ত রোগীতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং সমাজের সব স্তরে, সবার মাঝেই ছড়িয়ে পড়ছে। বিস্তৃতির এই পর্যায়ে শ্রেণিভেদে, লিঙ্গভেদে, অবস্থানভেদে বিপর্যয়ের মাত্রায় বৈসাদৃশ্য প্রকট আকারে ধরা পড়ে। তবে এই বৈসাদৃশ্য আমরা ধামাচাপা দিচ্ছি “গণশোক” প্রকাশের মাধ্যমে।

এদিকে, করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে নেওয়া ব্যক্তির পরিবারও শোক প্রকাশের জন্য ঘরেই আশ্রয় নিচ্ছেন। তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় দিতে পারছে না, কিংবা মৃতব্যক্তির অধিকার আদায়ের সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় আচার পালনেও অংশ নিতে পারছেন না। শোক প্রকাশের জন্য গৃহই ঠিকানা হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি, তাঁর পরিবার কিংবা মৃত ব্যক্তিটির পরিবারকে আমরা আলাদাভাবে চিহ্নিত করছি। খুবই স্বাভাবিকভাবে তৈরি হচ্ছে অসম অবস্থা। এখানে রোগাক্রান্ত পরিবার এবং গৃহবন্দি জনগণ, মাত্রা ভিন্ন হলেও, দুই-ই বিপর্যস্ত। তবু, এমন অবস্থায় নতুন পন্থায় আমরা শোক ও বিপর্যস্ততা প্রকাশ করছি। যেমন, আমরা বহির্বিশ্বের অন্তর্জালে আবদ্ধ হচ্ছি। বিভিন্ন দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি দিয়ে আমরা তথ্যগত দিক দিয়ে উন্মুক্ত এবং স্বাধীনভাবে বিরাজ করছি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চীনে যখন মৃত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে তিন মিনিটের নীরবতা পালন করে শোক প্রকাশ করে, বাংলাদেশ ও আনুষ্ঠানিকভাবে সেই শোকে শামিল হয়। কিংবা, পরিবারের কোনও ব্যক্তি হারানোর শোক অন্তর্জালে সবার সঙ্গে বণ্টন করছি। আমরা এটিতে অভ্যস্ত হয়ে, একেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিচ্ছি। কিন্তু, ব্যক্তিকভাবে, সামাজিকভাবে এই শোক প্রকাশ কি কোনও অংশে আমাদের ভীতি, দুর্বলতা বা বিপন্নতা এবং অসঙ্গতিকে দূর করতে সমর্থ হচ্ছে?

আমার মতে, এটি তখনই সম্ভব, যখন মানুষ হিসেবে, প্রচলিত ব্যবস্থাসমূহের (সামাজিক ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, এবং সামগ্রিকভাবে বিশ্বব্যবস্থা) ত্রুটিগুলো নির্ধারণ শুরু করা সম্ভব। কেন, একটি ঘরে দশ জন মানুষ বসবাস করছে? কেন সামাজিক দূরত্বের গুরুত্ব লোকে না মেনে বাইরে চলে আসছে? কেন অক্সিজেন স্বল্পতার অভাবে রোগী মারা গেল? কেন একজন বৃদ্ধের মৃত্যু এই ভাইরাসের কারণে হওয়া স্বাভাবিক? কেন শ্রমিকের মৃত্যু অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তির অসুস্থতার কাছে ম্লান হওয়ার সম্ভাবনা রাখে? কেন দেশ হিসেবে আমরা এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিলাম না? কেন টিকা বা ওষুধ আবিষ্কারে ১৮ মাস সময় লাগবে? কেন চিকিৎসা পণ্য অপ্রতুল? কীভাবে এসব কিছু দেখেও আমরা চুপ করে থাকি? এই প্রশ্নগুলো যখন আমরা প্রচলিত ব্যবস্থার কাছে দৃঢ়ভাবে জিজ্ঞেস করবো, তখনই কেবল স্বাভাবিকীকরণে রাজনীতির প্রকৃতি নির্ধারণ সম্ভব।

মানুষ হিসেবে আমাদের সংকটাপন্ন অবস্থা এবং শোকগ্রস্ততার একটি অন্তর্নিহিত সম্পর্ক আছে। আমরা নিজেদের সংকটাপন্ন বলে চিহ্নিত করি। কারণ, আমরা আরেকজনের বিপর্যস্ততা এবং শোক কিছু অংশে অনুধাবন করি। কিন্তু, আমরা উপেক্ষা করি সামাজিক অসমতা। সমাজব্যবস্থায় বৈষম্য প্রতিদিন দেখছি, অসহায় বোধ করছি। খানিক পরেই, মৃত্যুর মিছিলে “বেঁচে আছি”, এই ভেবেই সব দুর্ভোগ এবং অসামঞ্জস্যকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে চলছি। মূলত, এর কারণ হলো আমরা অসমতাকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছি। আমার মতে, শোকের প্রকাশ আমাদের ব্যক্তিক প্রেক্ষাপটের আলোকে হয়। এই প্রক্রিয়াটির শুরু হয় নিজেদের বিপন্নতা চিহ্নিত করার মাধ্যমে। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা দুটি বিষয়কেই অত্যন্ত স্বাভাবিকতার সঙ্গে নিজেদের জীবনে স্থাপন করি যেন সব ত্রুটি আমরা বিচক্ষণতার সঙ্গে এড়িয়ে যেতে পারি। এমতাবস্থায়, সম্ভবত, বৈসাদৃশ্যের তীক্ষ্ণতা লাঘব করে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য, সামাজিক পন্থার সাধারণীকরণকে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করতে হবে। উত্তরগুলো বিপর্যস্ততা ও স্বাভাবিকতার বলয়কে হয়তো ভাঙতে সাহায্য করবে, এবং সচেতন নাগরিক তৈরি করবে। কেননা, মনে হচ্ছে সামাজিক পন্থা, অসমতা এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতনতাই পারবে অভ্যস্ততা প্রতিহত করে সব অসঙ্গতির প্রকৃতি নির্ধারণ করতে।

লেখক: প্রভাষক, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ