ঢাকার দুই মেয়রের কাছে দুটি প্রত্যাশা

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৩:৪৪, মে ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৭, মে ১৯, ২০২০

আনিস আলমগীরনির্বাচিত হওয়ার প্রায় সাড়ে তিন মাস পর ঢাকা উত্তর এবং ঢাকা দক্ষিণের মেয়র যথাক্রমে মো. আতিকুল ইসলাম এবং ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। নবনির্বাচিত মেয়রদ্বয়কে নতুন দায়িত্ব নিয়ে যাত্রা শুরুর এই শুভ মুহূর্তে অভিনন্দন জানাই। নির্বাচন নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও ধরে নিতে হবে তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনগণের প্রতিনিধি। তৃতীয় বিশ্বের নির্বাচন বিতর্ক ছাড়া হয় না। স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতারও অভাব রয়েছে- বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে। আবার স্বচ্ছ নির্বাচনের ফলাফলও সহজভাবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি এখানে গড়ে ওঠেনি। কখনও গড়ে উঠবে কিনা তাও সন্দেহ আছে। ১৯৯৪ সালে সিটি নির্বাচনে হেরে প্রতিপক্ষের সাত জনকে একসঙ্গে মার্ডারের মতো ঘটনাও এই শহরে আমরা দেখেছি।
ফজলে নূর তাপস চলতি সংসদের সদস্য ছিলেন। তিনি সংসদ সদস্যপদ ত্যাগ করে দলীয় সভানেত্রীর ইচ্ছায় দক্ষিণের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাপসের সঙ্গে সূত্রাপুর, লালবাগের কোনও সম্পর্ক ছিল না। তিনি তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ধানমন্ডি-কলাবাগান আসন থেকে। কিন্তু নির্বাচনের সময় দেখেছি বিএনপির প্রার্থী এবং প্রয়াত বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনের চেয়ে তাপসের প্রতি সর্বত্র জনসমর্থনের ঝোঁক বেশি ছিল।

ইশরাক সম্পর্কে লোকে বলাবলি করতো তার শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে কিন্তু বয়স আর অভিজ্ঞতার অভাবে দক্ষিণ সিটি মেয়র পদের দায়িত্ব নেওয়ার সময় এখনও হয়নি। অবশ্য তার প্রতি মানুষ সহানুভূতিশীল ছিল যথেষ্ট। মরহুম মোহাম্মদ হানিফের মতো ইশরাকের বাবা সাদেক হোসেন খোকাও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। তারা উভয়েই পুরনো ঢাকার মানুষ। সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন গোপীবাগের লোক। তিনি আগে গোপীবাগ থেকে ওয়ার্ড কমিশনারও ছিলেন। আর মোহাম্মদ হানিফের জন্ম কলকাতায় হলেও পৈতৃক নিবাস ছিল বংশাল। ১৯৭৩ সালে হানিফ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি সংসদের হুইপও ছিলেন। সাদেক হোসেন খোকাও সংসদ সদস্য ছিলেন, মন্ত্রী ছিলেন। তারা দু’জনই তাদের দলের ঢাকা মহানগর সভাপতিও ছিলেন।

সিটি করপোরেশন হওয়ার আগে ঢাকা পৌরসভার চেয়ারম্যান পুরনো ঢাকার লোকেরাই হতেন। ঢাকা পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন আনন্দ চন্দ্র রায়, ১৮৬৪ সালে। নবাবদের সময় প্রতিষ্ঠিত সরদার প্রথায় শহর প্রশাসনে সরদারদের একটা ভূমিকা ছিল। পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশন হওয়ার পর কমিশনারদের ভোটে প্রথম মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত, ১৯৭৭ সালে। তিনিও পুরনো ঢাকার লালবাগের লোক।

সিলেকশন প্রথা বাদ দিয়ে গত শতাব্দীর নয় দশকে প্রথম প্রত্যক্ষ ভোটে ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোহাম্মদ হানিফ। বিএনপির প্রার্থী এবং সিটিং মেয়র মির্জা আব্বাসকে পরাজিত করে তখন তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখন ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ঢাকা উত্তর-ঢাকা দক্ষিণ করা হয়েছে। দক্ষিণ অংশে সাবেক পুরনো ঢাকার অনেকটাই রয়েছে আর উত্তর অংশে নতুন ঢাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এবারে নির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং মেয়র ফজলে নূর তাপস- কেউই ঢাকার আদি বাসিন্দা নন। শহর যখন ব্যাপক আকার ধারণ করে কসমোপলিটন রূপ পরিগ্রহ করে তখন আর এলাকাপ্রীতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। আজ থেকে ৮৫ বছর আগে ১৯৩৫ সালে কলকাতা শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। তিনি ছিলেন বরিশালের লোক।

যাক, ঢাকার উভয় মেয়র শপথ নিলেন, দায়িত্ব বুঝে নিলেন। আতিক সাহেব তো আগেই ছিলেন, তাপস সাহেব নতুন মেয়র হলেন। মেয়রের দায়িত্ব নিয়েই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শীর্ষস্থানীয় দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন তাপস। তারা হলেন ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান ও উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার। কী কারণে এই দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে মিডিয়ায় আসেনি। তবে দায়িত্বগ্রহণের পরদিন ১৭ মে সকালে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে নগর ভবনে এসে তাপস বলেছিলেন, ডিএসসিসিকে একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি। এরপরই দুজনকে বরখাস্তের আদেশ আসে মেয়রের স্বাক্ষরে। কারও সন্দেহ নেই যে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান ডিএসসিসির এই কর্মকর্তাদ্বয়কে কেন টার্মিনেট করা হয়েছে।

গত বছর ডেঙ্গু নিধন নিয়ে এই করপোরেশনের দায়িত্বহীনতা, দুর্নীতি সমগ্র মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এবারও দেখছি ডেঙ্গু নিয়ে আশঙ্কার খবর এবং দক্ষিণ সিটির মশা মারার প্রস্তুতি নিয়ে নেতিবাচক খবর। ওষুধ কিনতে বিলম্ব। খবরে দেখলাম উত্তর থেকে সহযোগিতা নিয়ে আপাতত চলার পরিকল্পনা হয়েছে। দুই মেয়রের প্রতি তাদের দলের শীর্ষ নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নগরবাসীর আস্থা রয়েছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় কাজের প্রতি তাদের নিজেদেরও আন্তরিকতার অভাব নেই। আশা করছি করোনা মহামারির এই সময়ে তারা নগরবাসীর মন থেকে ডেঙ্গু আতঙ্ক কাটাতে সফল হবেন।

নির্বাচিত হওয়ার আগে ভোটারদের কাছে তারা  ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসনের ঢাকা, উন্নত ঢাকা- এমন অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বাস্তবায়ন করবেন বলে। নিশ্চয়ই তারা পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করবেন। কতটুকু পারবেন জানি না। কারণ, আমাদের মেয়রদের কাজ অন্যান্য দেশের মেয়রদের মতো নয়। এই মহামারিকালে দেখবেন অন্য দেশের মেয়ররা করোনা নির্মূলে সরাসরি একটা বড় ধরনের ভূমিকা পালন করছেন। আমাদের শাসন ব্যবস্থায় সে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব মেয়রদের ঘাড়ে পড়ে না। কিন্তু শেষমেশ দেখা যায় নগরকর্তা হিসেবে শহরের দুরবস্থার দোষটা মেয়রের ওপরই আসে।

যাক, নিজেদের আয়ত্তের মধ্যে থাকা দুটি কাজ আমি দুই মেয়রকে শুরুতেই সেরে ফেলতো অনুরোধ করবো। ঢাকা মহানগরীটা দূষণের কারণে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। বায়ুদূষণের মাত্রা বিশ্বরেকর্ড করেছে। উভয় মেয়রের কাছে আমরা যারা এই শহরে বসবাস করি তাদের পক্ষ থেকে অনুরোধ, আপনারা সর্বপ্রথম বায়ুদূষণের প্রতি মনোযোগী হোন। তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, যেন দূষণ থেকে ঢাকা শহর রক্ষা পায়। আপনারা উভয়ে স্ব-স্ব এলাকায় ৫ লাখ করে মোট দশ লাখ নতুন গাছ লাগান। প্রয়োজনে আরও বেশি লাগান, কিন্তু সেটা যেন লোক দেখানো না হয়। কড়া সযত্ন পরিচর্যা, তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণ যাতে গাছের পেছনে থাকে। বৃক্ষ বায়ুকে নির্মল রাখে।

আমাদের দ্বিতীয় অনুরোধটা হচ্ছে- দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি একটা কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সংঘবদ্ধ হয়ে সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কাজগুলোতে মাতব্বরি করে আসছে। তারা করপোরেশনের কিছুই না তবে তাদের সঙ্গে বড় আমলাদের একটা যোগসাজশ রয়েছে। তাদের যন্ত্রণায় ঠিকাদাররা অস্থির। তাদের সালামি জোগাতে গিয়ে করপোরেশনের কাজের মান দিন দিন খুবই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। পিডিবি, সিটি করপোরেশন, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে- সর্বত্র এই কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সব আমলে সংঘবদ্ধ হয়ে টাকা হাতানোর ধান্দায় ব্যস্ত।

ক’দিন আগে পত্রিকায় দেখেছি একটি ব্রিজ নির্মাণের দুই বছরের মাথায় ভেঙে পড়েছে। তারও আগে একবার দেখেছিলাম উদ্বোধনের আগের দিনই একটি ব্রিজের একাংশ ধসে পড়েছে। অথচ একটা ব্রিজ কম করে হলেও ৩৫/৪০ বছর টিকে থাকার কথা। কাজের মান এত খারাপ হয়ে যাচ্ছে কেন তার খোঁজ যদি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ না রাখেন তবে বহু মন্দ দিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করেছে- এটা কি কল্পনা করা যায়! এই চক্রকে আপনাদের নিষ্ক্রিয় করতে হবে। তাদের নিষ্ক্রিয় করা গেলে কাজের মান বাড়বে, উন্নয়নও টেকসই হবে।

পরিশেষে, আপনাদের উভয়ের সফলতা কামনা করি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ