চুকনগর গণহত্যা: পাকবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড

Send
মোহাম্মদ এ. আরাফাত
প্রকাশিত : ১১:১৮, মে ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৫, মে ২০, ২০২০

মোহাম্মদ এ. আরাফাতপাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর গণহত্যার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যতিক্রমী নাম ‘চুকনগর’। এই গণহত্যা ব্যতিক্রম ভয়াবহতায় এবং নৃশংসতায়। যে নৃশংসতা আজও প্রতিমুহূর্তে তাড়া করে বেড়ায় চুকনগরবাসীকে। গণহত্যাটি ১৯৭১ সালের ২০ মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে ঘটে, যা বিশ্বের কোনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ একক গণহত্যা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মানসপটে আজও ভেসে ওঠে সেই ভয়াবহ ধ্বংসলীলা, আজও ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন তারা। পাকিস্তানিদের সেই ভয়ংকর পৈশাচিক উচ্চারণ ‘উড়া দো, জ্বালা দো, তাবা করদো’ এখনও কানে ভাসে সেই অঞ্চলের মানুষের। বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, ফুলতলা, তেরখাদা, দিঘলিয়া, দৌলতপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছে আজও দগদগে স্মৃতি বহন করে চলা এক স্থান চুকনগর। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের বৃহত্তম গণহত্যাটি সংঘটিত হয়েছিল সেদিন চুকনগরের পবিত্র মাটিতে। মতান্তরে নির্দিষ্ট স্থানে সংঘটিত সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর একক সর্ববৃহৎ সামরিক গণহত্যা এটি!

মুক্তিযুদ্ধের একদম শুরুর দিক থেকেই ভয়াবহ গণহত্যার পথ বেছে নেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে শুরু হওয়া ইতিহাসের বর্বর গণহত্যা স্তব্ধ করে দেয় বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে। রাজাকার, শান্তিবাহিনী সংগঠিত হওয়ার পর গণহত্যা কার্যক্রম আরও পরিকল্পিতভাবে চলতে থাকে। হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করা বাংলাদেশের মানুষ তীর্থের কাকের মতো ছুটতে থাকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। ফলশ্রুতিতে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে লাখ লাখ মানুষের আগমন ঘটে। ভারতীয় সীমান্তের নিকটে অবস্থিত খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত এমনি এক স্থান চুকনগর। ভৌগোলিক কারণে ১৯৭১ সালে এই চুকনগর বাজার অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেননা, তিনদিকে নদী ঘেরা চুকনগর থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারলেই ছিল নিরাপদ জোন মানে ভারত! আর চুকনগর যেহেতু ছিল যশোর, খুলনা এবং সাতক্ষীরার সংযোগস্থল, তাই অতি সহজেই এই স্থানটি সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ২০ মে’র আগ পর্যন্ত এই সীমান্ত দিয়ে অনেক মানুষ ভারতে অবস্থান নিয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সাংগঠনিকভাবে গ্রুপ তৈরি করে পাহারা দিয়ে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে সাধারণ মানুষকে। এভাবেই চুকনগর বাজার দিয়ে সীমান্তে পারাপার চলমান ছিল। কিন্তু স্থানীয় রাজাকার আলবদর ও জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগের নেতারা চুকনগর বাজার সম্পর্কে জেনে যায় এবং দ্রুততার সাথেই তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে অবগত করে। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাগেরহাটসহ চুকনগরের সংযোগ স্থানগুলোতে তীব্র আক্রমণ চালাতে থাকে। এমতাবস্থায় উক্ত অঞ্চলের মানুষের ঘরে থাকা ছিল প্রায় অসম্ভব। তাই মে মাসের শুরু থেকে বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, ফুলতলা, তেরখাদা, দিঘলিয়া, দৌলতপুর-সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ এসে জড়ো হতে থাকে চুকনগর বাজার ও আশপাশের গ্রামগুলোতে। মে মাসের ১৫ তারিখের পর চুকনগর হাইস্কুল, ডাকবাংলো বাজারের চাঁদনী, বটতলা মন্দির, গরুহাট, ফুটবল মাঠে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। মানুষ আর মানুষ। সবাই সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার জন্য জড়ো হয়েছে। কিন্তু তারা জানতোও না কয়েকদিন পর কী ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের!

২০ মে বৃহস্পতিবার। সকাল থেকেই চুকনগর ছিল কর্মব্যস্ততায় ভরপুর। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা জনতা অপেক্ষা করছে ভারতে পাড়ি দেওয়ার জন্য। কেউবা জীবন জীবিকার তাগিদে, কেউবা নিজের জীবন বাঁচাতে আবার একটা বড় অংশ যাচ্ছে স্বদেশ ভূমিকে দখলদার পাকিস্তানিদের হাত থেকে রক্ষা করার ট্রেনিং নিতে। বেলা দশটার দিকে যশোর এবং সাতক্ষীরা সাব-ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর দুই-তিনটি গাড়ি এসে থামে পোতোখোলা বিলের পাশে। স্থানীয় রাজাকার, আলবদর ও বিহারিদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী শুরু করে এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ। নিরস্ত্র মানুষকে তাক করে দ্বিমুখী আক্রমণে কর্মব্যস্ত চুকনগরকে মুহূর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে পাক হানাদার বাহিনী। বেলা ৩টা পর্যন্ত চলতে থাকে গোলাগুলি, লোকে লোকারণ্য হয়ে যাওয়া চুকনগর লাশের স্তূপে রূপ নেয়। অনেক শিশু মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছিলো, সেই অবস্থায় চলে ঘাতকের কামান। ঘাতকের বুলেট বুকে বিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন মা, কিন্তু অবুঝ শিশু তখনও অবলীলায় মায়ের স্তন মুখে নিয়ে ক্ষুধা মেটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। চুকনগরের আকাশে লক্ষ মানুষের আর্তনাদ আর লাশের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল সেই অঞ্চলের বাতাস। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক উল্লাস ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বুঝি থমকে দিয়েছিলো চুকনগরে জমায়েত ভাগ্যবিড়ম্বিত লক্ষাধিক মানুষের জীবন। মানুষ দিগ্বিদিক ছুটেও নিজেকে শেষ রক্ষা করতে পারেনি। জড়ো হওয়া লাখো মানুষ চিনতো না রাস্তাঘাট, তাই অনেকটা অসহায় অবস্থায় পড়তে হয় তাদের এবং মৃত্যুক্ষণ গণনা ছাড়া ভিন্ন কোনও পথ তাদের হাতে ছিল না।

চুকনগরে গণহত্যায় ঠিক কত বাঙালি শহীদ হয়েছিল এর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা না গেলেও চুকনগরে ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। গণহত্যার পর নদীতে লাশ আর রক্তের স্রোত দেখে আঁতকে উঠেছিল জীবিত থাকা অবশিষ্টরা! আটলিয়া ইউনিয়নের পাতাখোলার বিল থেকে ভদ্রা নদী এবং সাতক্ষীরা রোড থেকে ঘ্যাংরাইল নদী পর্যন্ত যতদূর দেখা যায় শুধু লাশ আর লাশ ছিল। ২০ তারিখের পর ২৪ তারিখ পর্যন্ত টানা চারদিন লাশ সরানোর কাজে ব্যস্ত ছিল ৪২ জনের একটি দল। সেই প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, ২৪ তারিখ দুপুর পর্যন্ত চার হাজার লাশ গুনে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেয় তারা। এই গণনার মধ্যে নদী, পুকুর, ডোবা, জলায় ভাসমান হাজার হাজার লাশ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অথচ ভিয়েতনাম যুদ্ধে একসাথে কয়েকশ’ মানুষ হত্যার বিষয়টি অনেক বড় গণহত্যা হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত, যা চুকনগরের হত্যাকাণ্ডের তুলনায় নগণ্য! যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চুকনগর গণহত্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক ফজলুল বারী জনকণ্ঠের এক নিবন্ধে লিখেছিলেন-

‘লাশের উপর লাশ, মায়ের কোলে শিশুর লাশ, স্বামীকে বাঁচাতে স্ত্রী জড়িয়ে ধরেছিল। বাবা মেয়েকে বাঁচাতে জড়িয়ে ধরেছিল। মুহূর্তে সবাই লাশ হয়ে যায়। ভদ্রা নদীর পানিতে বয় রক্তের বহর, ভদ্রা নদী হয়ে যায় লাশের নদী। কয়েক ঘণ্টা পর যখন পাকিস্তানিদের গুলির মজুত ফুরিয়ে যায় তখন বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল মানুষগুলোকে।’

এই লেখাটি পড়ার পর আরেকটু খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করি চুকনগর সম্পর্কে, কথা হয় খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই গাইনের সাথে, যার বাবা অভিনাশ গাইন শহীদ হয়েছিলেন চুকনগর গণহত্যায়। শুধু নিতাই গাইনের বাবা নয়, তার কাকা-কাকিমা, কাকাতো ভাই, ফুফু-ফুফাদেরকেও নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। কীভাবে একজন অপরিচিত মসজিদের বারান্দায় পাটি দিয়ে ঢেকে তার জীবন রক্ষা করেছিলেন সে লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনাও শুনেছি তার কাছ থেকে।

চুকনগর জেনোসাইড পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর একটি পরিকল্পিত গণহত্যা ছিল। আমি মনে করি, জেনোসাইডের প্রকৃত সংজ্ঞায় চুকনগর একটি বড় উদাহরণ হতে পারে। যখন ঘোষণা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে চাওয়া হয় তখন সেটি জেনোসাইড বলে বিবেচিত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক সেরকমটাই ঘটেছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু হত্যা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তান জাতীয়তাবাদ প্রতিস্থাপন করতে গিয়েই এতসব রক্তপাত। চুকনগর গণহত্যাও এর ব্যতিক্রম নয়। যেহেতু চুকনগরের আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করতো, তাই শুরুর দিকেই এই এলাকা রাজাকার আলবদরদের টার্গেটে পরিণত হয়। বাংলাদেশের আর কোথাও যেহেতু এক এলাকায় এত হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস নেই তাই মুসলিম লীগ নেতাদের একক দৃষ্টি পড়ে এই চুকনগর অঞ্চলে। আর তাই সময় সুযোগ বুঝে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা ১৯৭১ সালের ২০ মে জেনোসাইডের ষোলকলা পূর্ণ করে চুকনগরের মাধ্যমে।

চুকনগরেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গণহত্যাটি ঘটিয়েছিল পাক বাহিনী। একটি এলাকায় এত কম সময়ে এত মানুষ আর হত্যা করা হয়নি। অথচ কী আজব দেখুন, এত ভয়াবহ একটি ঘটনা নব্বই দশকের পূর্ব পর্যন্ত কিনা দেশবাসীর কাছে ছিল অজানা! অবশ্য ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এমন অনেক বধ্যভূমি ও গণহত্যার ইতিহাস রয়েছে, যা জনসম্মুখেই আসেনি। এমনও অনেক স্মৃতিচিহ্ন আছে যেগুলো এখন বিলুপ্ত! দশ হাজারেরও বেশি মানুষ যে চুকনগরে পাকবাহিনীর হাতে হত্যার শিকার হয়েছে সেই ঐতিহাসিক স্থানটিও হয়তো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি, সেই অপ্রকাশিত ইতিহাসকে স্মরণ রাখতে ১৯৯৩ সালে গঠিত হয় ‘চুকনগর গণহত্যা ৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ’। সেই সময় থেকে চুকনগর গণহত্যা দিবস ধীরে ধীরে মানুষ জানতে শুরু করে। ২০০৪ সালে গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য সরকার এই গ্রামের বিলের ৭৮ শতক জমি অধিগ্রহণ করে। এরপর গণপূর্ত বিভাগ ২০০৬ সালে ওই জমির একাংশে সাত লাখ টাকা ব্যয়ে ‘চুকনগর গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করে। চুকনগর স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম আজ জানতে পারছে বীরদের বীরত্বগাথা। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য যে ১৫ খণ্ডের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রে ও গণহত্যা বিষয়ক পুস্তকে চুকনগরে সংঘটিত গণহত্যার বিষয়টি এখনও স্থান পায়নি। এখনও মুক্তিযুদ্ধের আলোচনায় ও খাতাপত্রে চুকনগর অবহেলিত। তাই আমাদের দাবি থাকবে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যেন সঠিক মর্যাদায় স্থান পায় চুকনগর। হাজার বছর পরেও যেন বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারে চুকনগরের কথা, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বর্বর গণহত্যার কথা।

তথ্যসূত্র: চুকনগর গণহত্যা, মুনতাসির মামুন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ।

 

লেখক: অধ্যাপক। চেয়ারম্যান, সুচিন্তা ফাউন্ডেশন

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ