করোনার সাথে ‘অ্যাডজাস্ট’ করে বসবাস!

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৬:১২, মে ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৭, মে ২০, ২০২০

প্রভাষ আমিনঅনেকেই আমার কাছে জানতে চান, করোনা যাবে কবে? আমি হাসি, এই প্রশ্নের উত্তর আমি কেন, পৃথিবীর কেউই জানে না। আমি যে জানি না, যিনি প্রশ্ন করেছেন, তিনিও সেটা জানেন। তারপরও এই প্রশ্ন আসলে আমাকে নয়, তিনি নিজেকেই করেছেন। এটা এক ধরনের সান্ত্বনা। তবে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে আমার যেটা মনে হয়েছে, করোনাভাইরাস খুব শিগগিরই যাচ্ছে না। হতে পারে, কখনোই যাবে না। হয়তো রূপ বদলাবে, ধরন বদলাবে, হয়তো দুর্বল হয়ে যাবে। কিন্তু করোনা ঘাপটি মেরে থাকবে আমাদের আশপাশেই। সুপার ভাইরাস করোনা দুর্বল হয়ে যেতে পারে, যেমন দুর্বল হয়ে গেছে সুপার সাইক্লোন আম্পান। এই দুই সুপার দুর্যোগের আঘাতে মানবজাতি এখন বিপর্যস্ত।
করোনার বিস্তার ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ মানে স্বাধীনতা দিবস থেকে অবরুদ্ধ বাংলাদেশ। দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে ‘সাধারণ ছুটি’। আপাতত ছুটি চলবে ৩০ মে পর্যন্ত। আমার ধারণা ছুটি আরও বাড়ানো হবে। তবে যতই বাড়ানো হোক, এই সাধারণ ছুটি তো অনন্তকাল চলবে না। কোথাও না কোথাও গিয়ে থামতে হবে। গার্মেন্ট কারখানা, শপিং মল, মসজিদ খুলে দেওয়ার পর ‘সাধারণ ছুটি’ সত্যিই ছুটিতে পরিণত হয়েছে। গণপরিবহন না থাকলেও কোথাও কোথাও ফিরে এসেছে সেই চিরচেনা যানজট। সরকারের নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে ঈদে বাড়ি ফেরার জন্য মরিয়া অনেকেই। যেকোনও জনসমাগমই করোনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তবু মানুষকে জীবনের প্রয়োজনেই বাইরে যেতে হয়। এখন আমাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা যে ঘরের বাইরে যাচ্ছি, তা সত্যিই প্রয়োজনীয় কিনা। সরকারকে ফাঁকি দিতে গিয়ে যেন আমরা নিজেদের ঝুঁকির মুখে ফেলে না দেই। নিজের ভালোটা নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। বেঁচে থাকলে অনেক ঈদ করতে পারবেন, অনেক শপিং করতে পারবেন, অনেক আনন্দ করতে পারবেন। বিশ্বাস করুন বেঁচে থাকার চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই, সুস্থতার চেয়ে বড় কোনও উপলক্ষ নেই।

তবে বাস্তবতা হলো, আগে আর পরে সরকারকে সবকিছু খুলে দিতেই হবে। সরকার না দিলে মানুষ নিজ দায়িত্বে বেরিয়ে পড়বে। তাই আমাদের সবাইকেই করোনার সাথে মিলেমিশে থাকার উপায় বের করতে হবে। গত সপ্তাহে ‘আমরা সবাই করোনা পজিটিভ’ শিরোনামে লেখাটি শেষ করেছিলাম লাইফস্টাইল বদলে ফেলার পরামর্শ দিয়ে। আর তার আগের সপ্তাহে লিখেছিলাম ‘করোনা পজিটিভ?, বি পজিটিভ’। সে লেখায় করোনা মোকাবিলায় দৃঢ় মনোবলের গুরুত্বের কথা বলেছিলাম। কিন্তু শুধু দৃঢ় মনোবল দিয়ে হবে না, সঙ্গে চাই শারীরিক ফিটনেসও। আসলে দৃঢ় মনোবল, শারীরিক ফিটনেস এবং স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইলই এখন আমাদের লাইফলাইন। তবে এই লাইফলাইনগুলো কিন্তু নতুন কিছু নয়। আমাদের সাধারণভাবেই এই নিয়মগুলো মেনে চলা উচিত।

মানসিক দৃঢ়তার কথা আগেই বিস্তারিত লিখেছি। তাই সে প্রসঙ্গে আর গেলাম না। আসুন তাহলে আমরা লাইফস্টাইলের কথা বলি। একটা ব্যাপার ভালো করে বুঝে নেন, আপনি কিন্তু কখনোই আর করোনাপূর্ব বিশ্ব ফিরে পাবেন না। করোনা পরবর্তী বিশ্ব হবে আসলে এক নতুন বিশ্ব। মাস্ক কিন্তু আমাদের নিত্য পোশাকের অংশ হয়ে গেলো। ধরে নিতে হবে বাকি জীবন শার্ট, প্যান্ট, শাড়ি, গয়না, থ্রিপিসের মতো মাস্কও আপনার পোশাক হয়ে যাবে। যারা নিয়মিত চশমা ব্যবহার করেন, চোখে চশমা না থাকলে তাদের অস্বস্তি লাগে। আমারও ইদানীং মুখে মাস্ক না থাকলে অস্বস্তি লাগে। প্রথম প্রথম চশমা ব্যবহার করলে মানুষ হোঁচট খায়, উল্টাপাল্টা দেখে; তারপরও মানুষ চশমায় অভ্যস্ত হয়। মাস্ক ব্যবহারের শুরুতেও অনেকের দম বন্ধ হয়ে আসতো, মুখ চুলকাতো। কিন্তু চশমার মতো মাস্কেও আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাবো, আসলে যেতেই হবে। আর ঢাকার যে বায়ুমান তাতে আরও আগেই আমাদের মাস্কে অভ্যস্ত হওয়া উচিত ছিল। কালো ধোয়া আর ধুলাবালি থেকে রক্ষা করতে পারলে, আমাদের ফুসফুসের অবস্থা আরও ভালো থাকতো। যেটা স্বাভাবিক সময়েই করা উচিত ছিল, করোনা এসে সেটা করতে আমাদের বাধ্য করছে। আসলে ঠেলার নাম বাবাজি, ঠেলায় পড়লে আমরা সবই করি। আমার ধারণা ভবিষ্যতে নারীদের পোশাক, থ্রি পিসের বদলে ফোর পিস বিক্রি হবে। ছেলেদেরও শার্টের সাথে রং মিলিয়ে একটা মাস্কও থাকবে। হিজাব যেমন দ্রুত ধর্ম থেকে ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল, মাস্কও স্বাস্থ্য থেকে ফ্যাশনে বদলে যাবে। ভবিষ্যতে হয়তো মাস্ক দেখে মানুষ চেনা যাবে। পুরনো গেঞ্জি ছিঁড়ে ঘরে বানানো প্রয়োজনীয় মাস্ক যেমন থাকবে, আবার কয়েক হাজার টাকা দামের ফ্যাশনেবল মাস্কও থাকবে।

নতুন লাইফস্টাইল মানে কিন্তু নতুন কিছু নয়। আসলে এগুলো আমাদের আগে থেকেই করা উচিত ছিল, আমরা খামখেয়ালি করে করিনি। ইদানীং যে আমরা হাঁচি-কাশির শিষ্টাচারের কথা বলছি, একবার ভাবুন করোনা পূর্ব সময়ে যে বা যারা মানুষের মুখের ওপর হাঁচি বা কাশি দিতেন তারা কতটা সভ্য ছিলেন। এই বদভ্যাসগুলো আমার ছিল, কিন্তু আসলেই প্রকাশ্যে দাঁত খোটা, নাক বা চোখে হাত দেওয়াটা অভব্যতা হিসেবেই বিবেচিত হতো। বন্ধু মুন্নী সাহা তো মাঝে মাঝে হাত বেঁধে রাখতো যাতে আমি চোখে বা নাকে হাত দিতে না পারি। এখন জানের ভয়ে নিজেই অদৃশ্য বাধনে হাত বেঁধে রাখি। শিষ্টাচারগুলো নতুন নয়, এখন শুধু এগুলো বাধ্যতামূলক হয়ে যাচ্ছে। আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাটা কিন্তু সব ধর্মেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মুসলমানরা দিনে পাঁচবার নামাজ পড়েন এবং নামাজ পড়ার আগে অজু করে পবিত্র হতে হয়। ধর্ম ঠিকমত মানলেই কিন্তু আপনি করোনা থেকে অনেকটা নিরাপদ থাকতে পারবেন।

করোনার পরে আপনার কর্মক্ষেত্রের পরিবেশও কিন্তু পাল্টে যাবে। অফিসে ঢোকা থেকে শুরু করে, সব ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অফিসে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হয়তো বদলে যাবে সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট। তবে একটা জিনিস মানিয়ে নিতে আমাদের সত্যি কষ্ট হবে। সেটা হলো, আড্ডা, জমায়েত, জামাত। আমার ধারণা লোকসমাগমের ঝুঁকিটা আরও অনেকদিন থাকবে। বাসার বাইরে বের হলে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে আপনার অন্তত ছয় ফুটের মধ্যে কোনও লোক আসছে না। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে, কথা বলার সময় দু’জনের মুখেই মাস্ক লাগানো আছে। আগে যেমন আমরা দেখা হলেই হাত মেলাতাম বা বুকে জড়িয়ে ধরতাম। সেই উষ্ণতাটুকু সত্যি আমরা মিস করবো।

তবে শুধু লাইফস্টাইল বদলে বা দৃঢ় মনোবল দিয়েই করোনাকে জয় করা যাবে না। করোনার বিরুদ্ধে সবার আগে দরকার শারীরিক সক্ষমতা, ফিটনেস। লাইফস্টাইলের সাথে বদলে ফেলতে হবে খাওয়ার স্টাইলও। খাদ্যাভ্যাসের সাথে শারীরিক সক্ষমতার ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে। করোনা তো বটেই যে কোনও ক্ষেত্রেই একজন ধূমপায়ীর চেয়ে অধূমপায়ীর ঝুঁকি কম, একজন অ্যালকোহলিকের চেয়ে একজন নন-অ্যালকোহলিকের ঝুঁকি কম। উল্টাপাল্টা খেয়ে আপনার ফুসফুস, লিভার, কিডনির বারোটা বাজিয়ে রাখলে; করোনা কেন, যে কোনও ভাইরাসই আপনাকে সহজে কাবু করে ফেলবে। ধরুন আম্পানের মতো একটা ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে। আপনি কী করবেন? নিশ্চয়ই ঘূর্ণিঝড় থেকে বাঁচার জন্য নিজের ঘরটা মজবুত করে বাধবেন। আসলে ঝড়ের মৌসুম আসার আগেই উপকূলীয় এলাকার সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ঘর মেরামত করেন, খুঁটিগুলো আরও শক্ত করেন। তারপরও ঘূর্ণিঝড়ে কিছু ঘর উড়ে যায়। যাদের ঘর দুর্বল তাদেরগুলোই উড়ে যায়। শরীর হলো আপনার ঘর। আপনি যদি আপনার শরীরটাকে শক্ত করে বেঁধে রাখতে পারেন, তাহলে যত অসুখ-বিসুখই আসুক সহজে আপনাকে কাবু করতে পারবে না। তবে যত শক্তই হোক, সময়ে সব ঘরই একসময় ভাঙে। যতই নীরোগই হন, বয়সকালে মানুষের শরীরও ভেঙে পড়ে। তাই যে কোনও বিপদ-আপদ সামাল দিতে আমাদের শারীরিকভাবে ফিট থাকাটা জরুরি। আর শারীরিক ফিটনেসের জন্য জন্য চাই পুষ্টিকর, সুষম ও নিয়মিত খাবার। পরিমিত খাবার যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি পরিমিত ঘুম এবং ব্যায়াম। মানে একটা রুটিন জীবনে অভ্যস্ত হতে হবে। মানুষের ঘরের খুঁটি উইপোকা খেয়ে ফেলতে পারে, তাতে ঘর ভঙ্গুর হয়ে যাবে, হালকা বাতাসেই উড়িয়ে নিতে পারে। তেমনি ফাস্টফুড, জাঙ্কফুড, রেস্টুরেন্টের খাবার, রাস্তার পাশের খাবার খেয়ে খেয়ে আমরাও আমাদের শরীরকে নাজুক করে ফেলি। তাই অল্প আঘাতেই কাবু হয়ে যাই। সুস্থ থাকার জন্য পুষ্টিকর খাবার খেতে কিন্তু অনেক টাকা লাগবে না। বরং পোলাও কোর্মা, ভাজা-পোড়া, ফাস্টফুড খেতে পয়সা খরচ হবে; আবার আপনার শরীরও খারাপ হবে। কিন্তু পরিমিত ভাত, সাথে প্রচুর শাকসবজি, ছোট মাছ খেতে কিন্তু আপনার তেমন খরচই হবে না। শরীর সুস্থ রাখতে কিন্তু আপনাকে দূরে কোথাও যেতে হবে না। গ্রামে আপনার বাড়ির আশপাশেই পেয়ে যাবেন সবকিছু। মনে আছে করোনা আসার পর হঠাৎ থানকুনি পাতার চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। আপনার বাড়ির পাশে অযত্নে বেড়ে ওঠা থানকুনি পাতা কিন্তু পেটের মহৌষধ। যে কোনও পেটের পীড়া ভালো হয়ে যাবে থানকুনি পাতা খেলে। আপনার বাড়ির পাশে অবহেলায় বেড়ে ওঠা কচুর ঝাড় থেকেই পেতে পারেন, আপনার প্রয়োজনীয় পুষ্টি। কচু শাক, কচুর লতি, কচু, কচুর মুখী। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ভিটামিন সি খাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বাড়ির পাশে লেবু বা বাতাবি লেবু বা মৌসুমী ফলই কিন্তু আপনার প্রয়োজনীয় পুষ্টি আর ভিটামিনের চাহিদা মেটাতে পারবে। জাঙ্ক ফুড খেয়ে বা কিটো ডায়েটের নামে না খেয়ে শরীর নষ্ট করে রাখলে করোনার দোষ দিয়ে পার পাবেন না।

আসলে স্রেফ প্রকৃতির কাছে ফিরে গেলেই আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, শরীর ফিট থাকবে। আপনার সামলে নিতে পারবেন করোনা ঝড়। কিন্তু প্রতিদিন তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার বিলাসিতা যারা করেন, তাদেরই উড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। শারীরিকভাবে ফিট থাকার জন্য খাদ্যাভ্যাসটা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি নিয়মিত ব্যায়ামও। আর ফিট থাকার জন্যও কিন্তু জিমে যেতে হবে এমন কোনও কথা নেই। বাড়ির পাশের মাঠে কয়েকটা চক্কর দেয়া বা পাশের পুকুরে কয়েক চক্কর সাঁতারই আপনাকে ফিট রাখার জন্য যথেষ্ট। ভিটামিন ডি'র ঘাটতি মেটাতে ট্যাবলেট না খেয়ে সকালে গায়ে একটু রোদ লাগান। ভিটামিন ডি চলে আসবে শরীরে। করোনা থাকুক না থাকুক ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, রুটিন লাইফ তো খারাপ কিছু নয়।

টুকটাক ঝড়-ঝাপটা , বন্যা, সাইক্লোন যেমন লেগেই থাকে প্রকৃতিতে। তেমনি, নানান অসুখ বিসুখও ভোগায় আমাদের। কোনও কোনও ঝড় যেমন বেশ ভয়ংকর। কোনও কোনও ভাইরাসও তেমনি প্রাণঘাতী। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাথে লড়াই করে যেমন মানব সভ্যতা টিকে আছে। তেমনি ভাইরাসের সাথে লড়াই করেও টিকে থাকতে হবে। তবে সেজন্য চাই জোরালো প্রস্তুতি। দৃঢ় মানসিক শক্তি, স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল আর ফিট শরীর আপনাকে শুধু করোনা নয়, সব বিপদ আপদ থেকেই দূরে রাখবে।

লেখাটি শেষ করছি সাংবাদিক মোজাম্মেল হক চঞ্চলের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে, ‘করোনা অনেকটা বউয়ের মতোই। মনে করেছিলাম কন্ট্রোল করবো। এখন দেখি অ্যাডজাস্ট করতে হবে।’ আসলেই করোনা যেহেতু খুব সহজে যাচ্ছে না, তাই করোনার সাথে অ্যাডজাস্ট করে বসবাসের কৌশলগুলো জেনে নেওয়াই ভালো।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ