মহামারির চেয়ে অনাহারে মানুষ মরবে বেশি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:০৮, মে ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১০, মে ২১, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীজাতিসংঘ মহাসচিবের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষ সহকারী তার এক সাম্প্রতিক লেখায় বলেছেন, বিশ্বে ক্ষুধা এবং ক্ষুধাজনিত রোগের কারণে ৯০ লাখ লোক মারা যায়, যা অস্ট্রিয়ার জনসংখ্যার সমান। আবার এটি এইডস, ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মায় মারা যাওয়া রোগীদের সম্মিলিত সংখ্যারও বেশি। করোনার কারণে এবার খাদ্য শৃঙ্খলা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়েছে এবং এর কারণে ক্ষুধা এবং ক্ষুধাজনিত রোগে এবার দ্বিগুণের বেশি মানুষ মারা যাবে। তিনি এই মৃত্যুগুলোকে করোনা মহামারির ‘হিডেন কস্ট’ হিসেবে বিবেচনা করতে পরামর্শ দিয়েছেন। এই মৃত্যুর শিকার হবে অতি দরিদ্র মানুষগুলো এবং সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় থাকা মানব সন্তানেরা। আমরা করোনার কারণে দুর্ভিক্ষের জন্য অপেক্ষা করছি কিন্তু তিনি তার লেখায় দেখিয়েছেন এরইমধ্যে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি গবেষণা করে দেখিয়েছে কোভিড-১৯ সংকটে যে খাদ্য সংকট বাড়ছে তা ২৬টি দেশকে মহাসংকটের মধ্যে ফেলে দেবে। এমন দেশের মধ্যে ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিকসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশের অবস্থা খুব শিগগিরই খারাপ হয়ে পড়বে। তিনি বলেছেন, এই তিনটি দেশে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এরইমধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন। তিনি হিসাব-নিকাশ করে বলেছেন, সারা বিশ্বে দেড়শ কোটি শিশু কোভিড-১৯ সংক্রমণের ভয়ে ঘরে বসে আছে। তারা তাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এই দেড়শ কোটি শিশুর মধ্যে ৩৫ কোটি শিশু স্কুল থেকে প্রদত্ত বিনামূল্যের খাবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। গত চার মাস ধরে ‘মিড ডে মিল’ না পাওয়ায় এই ৩৫ কোটি শিশুকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। কোভিড-১৯ আরও কিছু দিন অব্যাহত থাকলে তারা অনাহারে মরে সাফ হয়ে যাবে নিশ্চিত। হয়তো এই শিশুগুলো মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তার হিসাবও বিশ্ববাসী জানবে না।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন আমেরিকার সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে এসেছিলেন এবং তিনি পশ্চিমবাংলা, আসাম, ত্রিপুরার শরণার্থী ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করেছিলেন। খুব কষ্ট স্বীকার করে এই মানবতাবাদী বহু তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন এবং আমেরিকায় গিয়ে কংগ্রেসের বক্তৃতায় সীমান্তে শরণার্থী ক্যাম্প থেকে সংগৃহীত তথ্যের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে অনাহারে অপুষ্টিতে বিনা চিকিৎসায় ১০ লক্ষাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এই ১০ লক্ষাধিক শিশুর মৃত্যু কি মুক্তিযুদ্ধের হিডেন কস্ট নয়? এই ১০ লক্ষাধিক শিশুর মৃত্যু কি মুক্তিযুদ্ধের হিসাবে আসবে না? ইতিহাস কি তাদের মৃত্যুকে বিবেচনায় নেবে না? ইতিহাসের হিসাব-নিকাশ খুবই কষ্টসাধ্য। ঐতিহাসিকেরা তা খুঁটে খুঁটে বের করে লিপিবদ্ধ করেন। জ্ঞানপাপীরা তা বুঝে না। কোনও ঘটনার ইতিহাস বিলম্বে লেখা হলে তাতে সত্যের সমাবেশ থাকে বেশি।

যাহোক, লিখছিলাম করোনা প্রসঙ্গে। সমগ্র বিশ্বে ছড়ানো-ছিটানো এই মহামারি থেকে রক্ষার উপায় কী? কোভিড-১৯ দ্রুত প্রসারমান একটি ভাইরাস নয় শুধু, এটা যে শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে তাও নয়, এই ভাইরাস বিশ্বের জীবনপ্রবাহে বিরাট আঘাত হেনেছে। কোভিড-১৯ একটি মহাযুদ্ধের চেয়ে কম ধ্বংসাত্মক নয়। বিশ্বব্যাপী করোনার এই মহারণ থেকে মানুষের আত্মরক্ষার উপায় কী?

জাতিসংঘ মহাসচিব করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার সময় বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। মহাসচিব হিসেবে তার আহ্বান ছিল যথাযথ, কিন্তু সমন্বয়ের উদ্যোগটা নেবে কে! ১৯৪৫ সালের পর এসব উদ্যোগ নিতো আমেরিকা। এখন এক বর্ণবাদী লোক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তিনি বিশ্ব ব্যবস্থাটাই বুঝেন না এবং তার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারেন না। সে কারণে তিনি বিশ্ব ব্যবস্থার ক্ষতি করেছেন প্রচুর। ওয়াশিংটন পোস্টের এক কলাম লেখক লিখেছেন, ট্রাম্প করোনার চেয়েও ভয়াবহ। আমেরিকার যা ভাবমূর্তি ছিল বিশ্বব্যাপী তাও বিনষ্ট করে ফেলেছেন ট্রাম্প। অনেকে এখন বলছেন অচিরেই চীন এক নম্বর সুপার পাওয়ার হবে।

সারা বিশ্বে ৭০টি দেশে আমেরিকার ঘাঁটি রয়েছে। তার বাজেটের ধারে কাছে নেই অন্য কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী। বিশ্বের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে মার্কিন সৈন্য রয়েছে ১৩ হাজার। জাতিসংঘের খরচের ২৪ শতাংশ বহন করে আমেরিকা। ২০১৯ সালে আমেরিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দিয়েছে আর চীন দিয়েছে ৪৪ মিলিয়ন ডলার। ইউনিসেফকে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ৭০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে আর চীন দিয়েছে ১৬ মিলিয়ন ডলার। সুতরাং চীন আমেরিকার স্তরে পৌঁছাতে বহু সময় নেবে। বললেই সুপার পাওয়ার হওয়া যায় না। এই জন্যই আমেরিকার শত দোষ ত্রুটি থাকার পরও তাদের কোনও উদ্যোগ কখনও বিশ্বের অসহযোগিতার কারণে হতাশ হয়নি।

এখনও আমেরিকা উদ্যোগ নিলে করোনা প্রতিরোধে একটি সমন্বিত সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া যেত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনাগ্রহের কারণে তা হচ্ছে না। অথচ এই গ্রহের মানুষকে করোনার হাত থেকে রক্ষার জন্য একটি সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশ চাল রফতানি নিষিদ্ধ করেছে। তাদের এই সিদ্ধান্ত আফ্রিকাকে সরাসরি দুর্যোগের মুখে ফেলবে। কারণ, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া থেকে আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলো বছরে সাড়ে চার শত কোটি ডলারের চাল ক্রয় করে।

কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের কাছে উদ্বৃত্ত খাদ্য রয়েছে। রক্ষণশীল মনোভাব নিয়ে এসব রাষ্ট্র বসে থাকলে বিশ্বের খাদ্য ঘাটতি এলাকার মানুষ অনাহারে মারা যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারির চেয়ে অনাহারে লোক মরবে বেশি। করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার বলুন আর মহামারির মোকাবিলায় বলুন- তা যদি জাতিসংঘের ছোট-বড় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার আওতায় না আসে, তবে মনে হয় এই গ্রহের ৭৮০ কোটি মানুষ গভীর সংকটে পড়বে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ