করনোর আমদানি-রফতানি

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:৪০, মে ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:১৯, মে ২৪, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহসুপার সাইক্লোন আম্পান নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার আম, লিচু ঝরিয়ে দিয়ে গেছে। বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে এবার। কিন্তু কৃষকরা ধান মাঠ থেকে পুরোপুরি উঠিয়ে আনতে পারেনি। মাঠের ধান ভেসে গেছে আম্পানের ঝড়-বৃষ্টিতে। করোনাকাল শুরু হওয়ার পর তরিতরকারি, ফলমূলের উৎপাদন স্বাভাবিক হলেও, সেই ফসল বিপণনে সংকট তৈরি হয়। সাধারণ ছুটি বা লকডাউনের জন্যে বাজারে চাহিদা কমে যায় এবং গণপরিবহন বন্ধ থাকায় পণ্যের বিতরণ কাঠামোও ভেঙে পড়ে। মাছ ও পোল্ট্রি শিল্পেরও একই অবস্থা। যখন কৃষিজ পণ্যের সরবরাহ ও বিতরণ কাঠামো সচল কবে হবে, কী উপায়ে করা সম্ভব এ নিয়ে সকলে উদ্বিগ্ন, তখন আমাদের মনোযোগ চলে গেলো করোনা বিতরণের দিকে। কোভিড-১৯ এর বিতরণ কত নির্বিঘ্ন ও সুষম করা যায় এনিয়ে যেন আদা জল খেয়ে নেমে পড়লাম। করোনা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় আটকে থাকুক, আমরা যেন সেটা মেনে নিতে পারছিলাম না। তাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেও জেলাগুলোকে অবরুদ্ধ বা বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। নারায়ণগঞ্জ কোভিড-১৯ এর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও প্রবেশ নিষেধে সিলগালা দিতে পারিনি। নারায়ণগঞ্জ থেকে করোনার চালান গেছে সারা দেশেই। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় গার্মেন্ট শ্রমিকদের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে ডেকে এনে তাদের জেলায় জেলায় করোনার পার্সেল পাঠানো হলো। স্থানীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে খোলা হলো বিপণি বিতান। মসজিদ আর না খুলে উপায় কী? করোনার এলাকাভিত্তিক বিপণন দ্রুত প্রসারিত হলো। করোনা পরীক্ষার বুথ ও সংখ্যা বাড়ায় সেই ফলাফল বা গাণিতিক হিসেবটাও আমরা জানতে পারছি। যখন আক্রান্তের সংখ্যা ৩,৩,৬,৬, করে বাড়ছিল তখন আমাদের মাঝে আতঙ্কে মাত্রা যেখানে ছিল, আজ ১৬০০ আক্রান্ত ও ২৪ জন মৃত্যুর পর সেখান থেকে আতঙ্কের পারদ অনেক নিচে নেমে এসেছে।

ঢাকাসহ সারা দেশের সড়কে গাড়ির চাপ প্রায় স্বাভাবিক। ঈদের বাজার ঢাকাতে মহল্লাভিত্তিক যেমন জমে উঠেছে, তার চেয়েও কয়েক গুণিতক হারে বেড়েছে গ্রামেগঞ্জে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধিকে তোয়াক্কা না করেই চলছে কেনাকাটা। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা না মেনে চলছে ইবাদত। সড়কে ও হাটে বাজারে ভিড় করছে কারা? বিপন্ন বা নিম্নবিত্তদের ভিড় নেই। তারা আছেন ত্রাণ আর কাজের খোঁজে। ধারণা করা হচ্ছিল করোনাকাল কত দীর্ঘ হবে তা এখনও অনিশ্চিত জেনে মানুষ তাদের সঞ্চয় ধরে রাখবে। ঈদ বাজারে ভিড় করবে না। ধারণাকে উল্টে দিয়েছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত, এমনকি নিম্ন-মধ্যবিত্তের একটি অংশ। তারা ঈদকে ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব দিচ্ছে বেঁচে থাকা বা মৃত্যু ভয়কে পেছনে রেখে। বাবা-মা, পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে যাওয়ার যে গোয়ার্তুমি, সেখানে একরত্তি ভাবনা প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে না যে, তার এই কাছে যাওয়া বা ছুটে যাওয়া বাবা, মা, সন্তান এবং স্ত্রীর জীবন বিপন্ন করতে পারে। এই কাছে যাওয়া প্রিয়জনকে হারানোর উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে।

মানুষ কেন বেপরোয়া হয়ে উঠলো? সরকারি বা স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনা কেন মানতে চাইছে না। এর প্রধানতম কারণ হলো জোয়ার ভাটা সিদ্ধান্ত। কোভিড-১৯কে ঘিরে নেওয়া নির্দেশনাগুলোর কঠোরতা মুহূর্তের মধ্যেই চুপসে গেছে। ‘সীমিত’ শব্দটি গোলমাল করেছে বেশি। ‘সীমিত’ আকারে বাজার হাট, মসজিদ খুলে দেওয়া হলো, কিন্তু সেখানে পরিমিতিবোধ রক্ষা করা গেলো না। রেস্টুরেন্ট খোলা হলো প্রথমে, তারপর অন্যান্য বিপণি বিতান। দুপুর দুইটা থেকে সরতে সরতে রাত আটটায় গিয়ে ঠেকলো। আটটার মধ্যে সব বন্ধ। আটটা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত বাইরে থাকা যাবে না। যেন এ সময়টুকু কোভিড-১৯-এরও বিশ্রামের সময়। কাউকে এ সময়ে সংক্রমিত করবে না। সীমিত আকারে উন্মুক্ত করার ঘোষণা সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে বা হয়েছে বলেই হয়তো ‘ছাড়’ দেওয়া হয়েছে। তাই এখন পথে নেমে পড়া যায়। তাই নেমেছেন তারা। সর্বশেষ যখন ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঈদে বাড়ি যাওয়ার দাওয়াত দেওয়া হলো, তখন তো সোনায় সোহাগা। এবারের বার্তা তো আরও ‘ফকফকা’। স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে ঈদে যে যেখানে আছেন থাকুন, আবার অন্যদিকে দাওয়াত কার্ড এলো নিজ গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাওয়ার। তাহলে করোনা আসলে সীমিত কিছু মানুষকেই ছোবল দেবে। সকলের দিকে তার নিশানা নেই। অতএব ‘চল বাড়ি যাই’। ঈদের উপহার হিসেবে আরেক দফা কোভিড-১৯ বিতরণ শুরু হয়ে গেলো। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সরকারের স্বাস্থ্য দফতরও সতর্ক করে বলছে- এই যাত্রা মরণযাত্রার শামিল। কিন্তু তাদের কথা কানে তোলার সময় কই। ঘাটে ঘাটে, সড়কে সড়কে এখন ঘরমুখো কোভিড-১৯-এর ভিড়। এই যাত্রা নিরাপদ হোক সেই প্রত্যাশা করতেও তো বুকে বল পাই না। তারপরও স্বভাবসুলভ বলতে হয়- ‘যাত্রা সংক্রমণমুক্ত হোক’।

লেখক: বার্তাপ্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ