সামাজিক অবক্ষয়ই আমাদের অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা

Send
মামুন রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:২৪, মে ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৭, মে ২৪, ২০২০

মামুন রশীদআমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, বেশিরভাগ লোকজন বেশি-বেশি জিনিস কিনতে পারে, যতই করোনা, বন্যা আর দুর্যোগের কথা বলুন, কারো কারো হয়তো পুরো পুষ্টির অভাব মেটে না, তবে দেশের কোথাও কেউ না খেয়ে মরে না। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স আর গ্রামে-গঞ্জে কার্যরত অসংখ্য এনজিও আর ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার সৌজন্যে গ্রামের মানুষ বিশেষ করে কর্মঠ লোকের কোনও অর্থনৈতিক সমস্যা নেই বললেই চলে।  কৃষিজাত পণ্য ছাড়াও অকৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনে গ্রাম-বাংলার মানুষ অনেক এগিয়ে। ইদানীংকালে আমার বিভিন্ন কারণে গ্রামে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। শহুরে দারিদ্র নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকলেও গ্রামে যে দারিদ্র লক্ষণীয়ভাবে কমেছে সে ব্যাপারে আমি অনেকটা নিশ্চিত। তাই বিদেশ-ফেরত লোকদের অধিকাংশের টাকাকড়ি বা জমি-জমা কিছুই নেই, এ ব্যাপারে টেলিফোনে নেওয়া জরিপে  আমার খটকা আছে। শহুরে নিম্নবিত্ত, যারা হাত পাততে পারেন না, তাদের বেশ সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু যারা হাত পাততে পারেন, তাদের সমস্যা কমে আসছে। এক্ষেত্রেও টেলিফোন জরিপের ফল কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ বলেই আমার ধারণা। ব্যক্তিগত সাহায্যের বাইরেও বিভিন্ন এনজিও এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছেন। কিছুটা দুর্নীতি হলেও বিশেষ করে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সরকারের ত্রাণ বিতরণও বেশ কাজ করছে।
তবে সমস্যা কোথায়?  সমস্যা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়। আমাদের সমাজটা ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রীক,  অমানবিক, শঠ আর ঠগবাজে ভরে যাচ্ছে।
১) মিথ্যা বলার প্রয়োজন নেই, তাও মানুষ অকারণে মিথ্যা বলেন, মুসলিম প্রধান দেশে যেখানে ‘ইনশআল্লাহ’, ‘মাশাল্লাহ’ আর ‘দোয়া করবেন’ হচ্ছে সর্বাধিক উচ্চারিত শব্দ, সেখানেও মানুষ অকারণে শুধু মিথ্যা বলে। এমনকি মসজিদের সামনে দাঁড়িয়েও। এটাকে পাশ্চাত্যে অনেকে বলেন ‘ইম্পালসিভ লায়িং’। এটাকি বাহাদুরি দেখানোর জন্য না নিজেকে জাহির করার জন্য আমি জানি না। আশেপাশে,  পরিবারে সবাই বুঝে না বুঝে প্রচুর মিথ্যা বলছি।
২) সর্বত্র প্রদর্শনের বাহার: আমার ড্রেস, আমার গাড়ি,  আমার বাড়ি, গহনা আর পারফিউম না দেখাতে পারলে তো আমি মরেই যাবো- এমন একটা ভাব অনেকের মাঝেই দৃশ্যমান। শুধু আমাতেই থেমে নেই, আমার মেয়ে কী বাড়ি কিনলো, আমার মেয়ে-জামাই কী গাড়ি চালায়, তা কিন্তু ছুতা-নাতা করে না বলতে পারলে পেটের ভাত হজম হয় না। বন্ধুদের অনেকেই তামাশা করে বলছেন- করোনার মাস্ক পড়া যুগে যে উনাদের কী হবে?
৩) প্রচারেই প্রসার: অভিযোগ আছে- সাংবাদিক ভাই-বোনদের অনেকেই নিয়মিত বেতন পান না, অনেক পত্রিকা আর টিভির অবস্থাই খারাপ বলে শুনছি কিন্তু বেশিরভাগ সাংবাদিক ভাইদেরই চলছে ব্যবসায়ী, কিছু ‘জনপ্রিয়’ অর্থনীতিবিদ আর রাজনীতিবিদদের সাথে খানা-পিনা। শত হলেও ‘পিআর’ বা জন- সম্পর্কটা বজায় রাখতে হবে। জানাশোনার দরকার নেই, ঘন ঘন পত্রিকা-টিভিতে ছবি দেখেই জনগণ বুঝবে কে ‘বিশিষ্ট’। আজকাল শুনছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা বিচারালয়ও নাকি ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ ট্র্যাপে পড়ে যাচ্ছেন কিংবা কিছুটা হলেও প্রভাবিত হচ্ছেন।
৪) পড়ার কোনও শেষ নেই, পড়ার চেষ্টা বৃথা তাই: আমার এক বিদেশি বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল- ছুটিতে আমরা কী করি? আমার সোজা উত্তর- শপিং। নো ছবি দেখা, নো সুইমিং অর সমুদ্রবিহার কিংবা বই পড়া। শুধুই শপিং আর শপিং। টাকা আছে?  বিদেশ যাও আর শপিং করো।
৫) নেওয়ার আনন্দে আছে দেওয়াতে নেই: আমার এক বড়লোক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দান-খয়রাত কী করছে?  তার নির্দয় উত্তর- ওটাতো আগের দিনের অত্যাচারী জমিদারদের কাজ ছিল, যেটাকে আমরা নাকি সুন্দর করে নাম দিয়েছি- সিএসআর।  আমি অবশ্য সাহস করে বলতে পারিনি, আগের দিনে প্রায় জেলাশহরে নামকরা  স্কুলটিই অত্যাচারী জমিদারদের করা। কেউ কেউ আবার বলেছে তারা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে নিয়মিত চাঁদা দেন।  
৬) ‘কাইজ্জ্যা’র বেলায় আছে মানুষ,  মিলের বেলায় নাই: বন্ধুতে বন্ধুতে ঝগড়া,  অগ্রজ- অনুজে ভুল বুঝাবুঝি, স্বামী-স্ত্রীতে মনোমালিন্য?  আগে হলে এগিয়ে আসতেন পাড়ার মুরুব্বি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই বা বোন কিংবা মামা-চাচা,  এখন আর কেউ নেই। সামান্য কারণে ঘটে যেতে পারে চরম পরিণতি।

৭) আমার শুধু টাকা চাই, টাকার উৎস জানতে চাই না: ছেলে মাত্র চাকরি শুরু করেছে, এত টাকা কোথায় পায় আমার কি জানার দরকার। আমার স্বামী,  আমার বস- হোক না নামকরা ঋণখেলাপী, তাতে আমার কী আসে যায়। আপনারা যে বলেন, ‘ট্রিক্যল ডাউন থিয়োরি’ তার টাকার ছিটেফোঁটাতো আমরাও পাই। অমুকের মেয়ে জামাইয়ের গাড়ি আছে আর চাকরির তিন বছরেই বাড়ি আছে বলে কত বাবা-মা যে মেয়ের বহুদিনের প্রেমের বিয়ে ভেঙে দিচ্ছেন আপনি আমি জানিও না। সরকারি কর্মকর্তাদের স্টাফ কোয়ার্টারেও একই কারণে ঝগড়া।  দেখেননি দুর্নীতি করতে রাজি হয়নি বলে গাজীপুরের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের কী দশা হয়েছে।
৮) নগরায়ন আমাদের দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ: আগে পাড়ায় মহল্লায় প্রতিটি পূজা-পার্বন বা উপলক্ষ বা দুর্দিনে এগিয়ে আসতো মানুষ। যে যার কাজটি করে ফেলতো আর মুরুব্বিরা সামাজিক অনুশাসনের দেখভাল করতেন। এখন কেউ কারো ধার ধারে না। ‘আমিইতো সব বুঝি’ বা ‘না বুঝার কি আছে?’
৯) রাজনৈতিক ভেদাভেদ সামাজিক বন্ধনকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে: এ+ আর বি+ এর কারণে অনেক সময় বন্ধু বন্ধুতেও মারামারি লেগে যাচ্ছে। বি+ সন্দেহে জাতির ক্রান্তিকালেও একজন বিজ্ঞানী বা ডাক্তারকে কাজে লাগানো হবে না। কারণ সবাই জানেন এ+ নেতৃবৃন্দ এতে খুব রেগে যাবেন। ডাস্টবিনে পড়ে থাকুক জাতীয় সমঝোতা। আরও সমস্যা হচ্ছে- এ+ ক্ষমতায় থাকলে তাদের কাছের দুর্বিনীত,  ফাঁকিবাজ, অসৎ, দুর্নীতিপরায়ন কিংবা মানুষ হত্যাকারী কোনও ব্যক্তির বিচার হবে না বা গুরুপাপে লঘু শাস্তি হবে। বি+ হলেও একই অবস্থা।
১০) নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন খুব হচ্ছে না: এটি শুধু যে নির্যাতন বা অবিচার তা-ই নয়। কাকে প্রমোশন দেওয়া হবে, বিদেশে ট্রেইনিংয়ে পাঠানো হবে কিংবা নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় যাওয়ার জন্য তৈরি করা হবে- সব সিদ্ধান্ত নমস্য পুরুষদের হাতে। তা-না হলে কিন্তু শুনতে হবে বেয়াদপ কিংবা একরোখার বদনাম।
১১) সামাজিক সম্মানের সবটুকুই প্রতিপত্তি নির্ভর: প্রিয় শিক্ষক, ক্লাসে ভালো পড়ানো শিক্ষক, নীতিবান সরকারি কর্মকর্তা,  মসজিদের ইমাম সাহেব, ন্যায়নিষ্ঠ বিচারপতি আর পাড়ার সুখে-দুঃখে আপনজন মুরুব্বি- এ শব্দগুলো মানুষ ভুলে যাচ্ছে, যাবে। জোর যার মুল্লুক শুধু তারই হবে বা হচ্ছে।
১২) মনের গ্লানিকে কবে ছুড়ে ফেলে দিয়েছি: উঠতে না পারলে কেউ তোমাকে মনে রাখবে না। তা-ই যে কোনও মূল্যে তোমাকে উঠতে হবে। যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে লাভ নাই। দ্বিধা-দ্বন্দে ভুগিয়েও কোনও উপকার হবে না। সব- জায়গায়ই একটু-আধটু এদিক-সেদিক করতে হয়। 
অসুবিধা কী?  উন্নতি তো হচ্ছে। উন্নতির তো কিছু ‘সাইড ইফেক্ট’ থাকবেই। অনেকে বলেন, ‘অয়েল ইউর অউন মেশিন’। আবার বলেন, ‘চুপ করেনতো ভাই। আপনি আমি একা কী করবো?’
তাইতো!  আমি আপনি একা কী করবো?  আর আমাদের কি-ইবা করার আছে?  ভালোইতো আছি। ঈদ মোবারক।   

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক         

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ