সরকারের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী এবং বিভ্রান্তিকর

Send
জ.ই. মামুন
প্রকাশিত : ১৮:২৭, মে ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৩, মে ২৮, ২০২০

জ. ই. মামুনআগেও বলেছি আবার বলি, করোনাভাইরাসের রোগী দেশে ১০ হাজারের মাইলফলক স্পর্শ করেছিল এ মাসের ৪ তারিখ, ৮ মার্চ দেশে ভাইরাস ধরা পড়ার প্রায় দুই মাস পর। সেই ১০ হাজারের দিনে একটি সরকারি ঘোষণা এসেছিল যে ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন শপিং মল বা দোকান খোলা রাখা যাবে। তারপর থেকে আমরা দোকানে যেতে শুরু করলাম।
যদিও পরীক্ষার সুযোগ কম ছিল তবু আগের ৫৮ দিনে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার হয়, সেখানে ১৫ মে দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ২০ হাজারে। মানে ১১ দিনে আরও ১০ হাজার।
এরপর ৩০ হাজার, তারিখ ২২ মে। সময় মাত্র ৭ দিন। সাত দিনে ১০ হাজার। ঈদের তিন দিন আগে, সেদিন সরকার আরেকটি ঘোষণা দিলো, গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও ব্যক্তিগত গাড়িতে ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়া যাবে। আর তখনই আমরা হুড়মুড় করে কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ, মোটরসাইকেল, রিকশা, নসিমন, করিমন, ভটভটি, অ্যাম্বুলেন্স, রেন্ট-এ-কারের সব গাড়িকে ব্যক্তিগত গাড়ি বানিয়ে যে যেভাবে পেরেছি গ্রামে ছুটেছি। ঢাকায় ঈদের শপিং করে গ্রামে আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে ঈদ পালন করে এখনও আমার ‘জাবর কাটছি’ এবং ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

এরই মধ্যে রোগী ৩০ হাজার পূর্ণ হওয়ার ৬ দিন পর দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার পার হলো। আর সেই দিনে এলো সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। ৩০ মে তারিখের পরে আর বাড়ছে না সাধারণ ছুটি নামের লকডাউন। ৩১ তারিখ থেকে অফিস আদালত এবং সীমিত আকারে বাস, ট্রেন, লঞ্চ, বিমানসহ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চালু হবে। 

১১ মে থেকে করোনা শনাক্ত হচ্ছিলো দিনে এক হাজারের উপরে। আজ সেই সংখ্যা দুই হাজার পার হলো। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৪/৫ দিনেই আমরা অর্ধলক্ষ পার হবো এবং এই বিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে জুনের মধ্যে লাখ পার করে ইউরোপ আমেরিকার মতো অবস্থায় পৌঁছে যাবো। যেটা আমাদের জন্য চরম ভয়ের, আতঙ্কের এবং হতাশার। তাই এখনই একে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের সহজ উপায় ঘরে থাকা এবং মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু মাসের পর মাস লাগাতার দেশকে লকডাউন করে রেখে মানুষকে তো না খাইয়েও মারা যাবে না। তাই একটা মধ্যবর্তী সমাধান হচ্ছে জীবনের চাহিদা, কাজ, উৎপাদন এবং ব্যয় সবকিছু কমিয়ে নিয়ে আসা। যুদ্ধের মধ্যে যেমন বিলাসিতা করা যায় না সে রকম এখনও যুদ্ধ পরিস্থিতি ভেবে সবকিছু সীমিত করা।

সেক্ষেত্রে নাগরিকদের দায়িত্ব পালনের চেয়ে বড় বিষয় সরকার বা প্রশাসনের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং তা বাস্তবায়নে নাগরিকদের বাধ্য করা, প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করা। আমাদের সরকার যে তা করছে না তাও নয়, কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ এই সাধারণ ছুটি বা লকডাউনকালে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারের ভেতরে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আরেক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সমন্বয়হীনতা তো আছেই, একই মন্ত্রণালয়ের মধ্যেও সেই সমস্যা রয়েছে। সবশেষ উদাহরণ আজ ২৮ মে জারি করা প্রথম প্রজ্ঞাপনের ২নং বিষয়ে বলা হয়, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় জনসাধারণের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। প্রতিটি জেলার প্রবেশ ও বহির্গমন পথে চেকপোস্টের ব্যবস্থা থাকবে। জেলা প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় এ নিয়ন্ত্রণ সতর্কভাবে বাস্তবায়ন করবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধকল্পে চলাচল নিষেধাজ্ঞাকালে জনগণকে অবশ্যই ঘরে অবস্থান করতে হবে। এতে এ কথাও বলা হয় যে নির্দেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে, ওই একই প্রজ্ঞাপনের ১৩নং ধারায় বলা হয়, উক্ত সময়ে শর্তসাপেক্ষে সীমিত পরিসরে নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে গণপরিবহন, যাত্রীবাহী নৌযান ও রেল চলাচল করতে পারবে। তবে এ সময় সবাইকে মাস্ক পরতে হবে।

এখন একই প্রজ্ঞাপনে যখন এমন দুটো পরস্পরবিরোধী ধারা থাকে তখন জনগণের বিভ্রান্ত হওয়া ছাড়া কী করার থাকে?

এই লেখা যখন লিখছি তখনই এলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রজ্ঞাপন। তাতে বলা হলো, করোনা পরিস্থিতির উন্নয়নের লক্ষে সরকার ৩১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে দেশের সার্বিক কার্যাবলি এবং জনসাধারণের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ/ সীমিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ সময় সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজ ব্যবস্থাপনায় সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে।

আমার ধারণা সরকারের এই তিনটি বক্তব্য পরস্পরবিরোধী এবং বিভ্রান্তিকর। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগরিক হিসেবে আমরা সরকারের কাছ থেকে সুচিন্তিত এবং সুসমন্বিত নীতি এবং নির্দেশনা আশা করি, এমন এলোমেলো সিদ্ধান্ত নয়।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ