পথে যেতে যেতে

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:০৪, মে ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৬, মে ২৯, ২০২০

রেজানুর রহমানপথে একটাও চায়ের দোকান খোলা নেই। স্বাভাবিক সময়ে রাত দুপুরেও পথের ধারে চায়ের দোকান খোলা থাকে। এখন বাজে সকাল ১০টা। অথচ চায়ের দোকানগুলো বন্ধ। শুধু কি চায়ের দোকান? রাস্তার ধারে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবই বন্ধ। তবে সাধারণ মানুষের চলাচল আগের মতোই আছে। কিন্তু প্রাণচাঞ্চল্য নেই। মানুষ যেন রোবট হয়ে গেছে। জীবন চালাতে পথে বেরুতে হয় বলে পথে নেমেছে। কিন্তু করোনার ভয়ে আতঙ্ক সবার চোখে-মুখে।
ভোর সাড়ে ৫টায় প্রাইভেটকারে ঢাকা থেকে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছি। প্রায় আড়াই মাস ঘরবন্দি থাকার পর বাইরে বেরিয়েছি। সৈয়দপুরে আমার ছোট্ট একটা বাড়ি আছে। প্রায় ৫ মাস ধরে বাড়ির তালা বন্ধ। আমার মা, ভাইবোনেরা সবাই সৈয়দপুরে থাকে। ঘরবন্দি জীবনের একঘেঁয়েমি কাটাতে সিদ্ধান্ত নেই মাকে দেখার জন্য হলেও সৈয়দপুরে যাবো। ছোট্ট বাড়িটার তালা খুলবো। কয়েকটা দিন সেখানে থাকবো। কিন্তু যাবো কী করে? বাস বন্ধ, ট্রেন বন্ধ, লঞ্চ, স্টিমার বন্ধ। আকাশপথও বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো বাস বন্ধ থাকলেও প্রাইভেটকার ঠিকই চলে। তবে ভাড়া বেশি। যোগাযোগ করা হলো পরিচিত এক ড্রাইভারের সঙ্গে। একসময় সে অন্যের গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করতো। এখন সে নিজেই একাধিক গাড়ির মালিক। ফোন করতেই ব্যস্ততা দেখিয়ে বললো, স্যার গাড়ি পাবেন, তবে ভাড়া একটু বেশি লাগবে। কথা প্রসঙ্গে সে জানালো করোনার কারণে এই লকডাউন সময়টা তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই তার গাড়ি ভাড়ায় যায়। ভাড়া অন্যান্য সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ। কখনও তার চেয়েও বেশি। কথা প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, রাস্তায় ঝামেলা হয় না। পুলিশ ধরে না...।

হেসে কথাটা উড়িয়ে দেয় সে! স্যার এই দেশে টাকা ফেললে বাঘের দুধও পাবেন। তার হাসির অর্থ আমি বুঝতে পারি। একটু যেন অপরাধী মনে হয় নিজেকে। করোনার এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি স্যালুট পাওয়ার যোগ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব স্তরের সদস্যরা। তারা জীবন বাজি রেখে যেভাবে করোনা পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন, তা সত্যি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। অথচ আইনের লোকদের প্রতিই কিনা অভিযোগের তীর ছুড়লো প্রাইভেটকারের ড্রাইভার।

ঢাকা থেকে রওনা দিলাম ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। ভোর সাড়ে ৫টায় আকাশ ফর্সা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি শুরু হওয়ায় গোটা ঢাকা শহর কালো অন্ধকারে ছেয়ে যায়। অনেকদিন প্রিয় শহরটাকে ভালো করে দেখিনি। ভেবেছিলাম পথে যেতে যেতে জীবনের বড় সময় কাটিয়ে দেওয়া প্রিয় ঢাকা শহরকে প্রাণভরে দেখে নেবো। কিন্তু অন্ধকার সে সুযোগ দিলো না। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই আমাদের গাড়ি বেরিয়ে গেলো ঢাকা শহর থেকে।

সাভার, নবীনগর এলাকা অতিক্রম করে আমরা যখন চন্দ্রা মোড় অতিক্রম করছি। তখন ঝড় থেমে গেছে। আকাশ ফর্সা হয়ে উঠেছে। চন্দ্রা মোড়ে এই সময় প্রচণ্ড ভিড় থাকার কথা। বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কারসহ নানান ধরনের যানবাহন ও শত শত মানুষের ভিড়ে এলাকাটা গম গম হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু এলাকা নীরব। কিছু মানুষ আছে। যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছে। হঠাৎ হঠাৎ দুই একটি প্রাইভেটকার এলেই দৌড়ে গিয়ে ঘিরে ধরছে। এসব দেখতে দেখতে চায়ের তেষ্টা অনুভব করলাম। কিন্তু চন্দ্রার মতো এত ব্যস্ত এলাকায়ও কোনও চায়ের দোকান খোলা নেই। শুধু চায়ের দোকান কেন, কোনও দোকানই খোলা নেই। এই এলাকায় রাত দিন ২৪ ঘণ্টা হোটেল রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের টিকিট কাউন্টার খোলা থাকে। কিন্তু এখন বন্ধ। ড্রাইভার গিয়েছিল চায়ের দোকান খুঁজতে। ফিরে এসে বললো, স্যার একটা দোকানও খোলা নেই। চলেন রওনা দেই। সামনে নিশ্চয়ই চায়ের দোকান খোলা পাবো। চন্দ্রা থেকে আমাদের গাড়ি আবার ছুটতে শুরু করলো। রাস্তা ঘাট অনেক প্রশস্ত হয়েছে। অনেক দিন এই পথে আসিনি। তাই বিস্ময় জাগছে। এত সুন্দর রাস্তা! যাওয়া-আসার পৃথক লেন। উন্নত দেশের রাস্তার মতো।

এত বড় রাস্তায় যানজট হয় কেন? প্রায়ই প্রচার মাধ্যমে এই রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের কথা শুনি। কেন হয় যানজট? কিছু দূর এগিয়ে যেতেই সব ভালো লাগা উবে গেলো। যানজটের গুরু রহস্য পরিষ্কার হলো। দুই লেনের প্রশস্ত আধুনিক রাস্তাটি হঠাৎ এক জায়গায় এসে যেন থেমে গেছে। সেখানে ব্রিজ নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি। সহজেই বোঝা গেলো এই এলাকায় রাস্তার গাড়িগুলো এসে থেমে যায়। তখন নিশ্চয়ই একদিকের গাড়ি থামিয়ে রেখে অন্যদিকের গাড়িকে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। বিপত্তিটা দেখা দেয় এখানেই। ব্যস্ত রাস্তায় কয়েক মিনিটের ব্যবধানে যানবাহনের দীর্ঘলাইন পড়ে যায়। তখন মাইলের পর মাইল যানজটের সৃষ্টি হয়।

পথে যেতে যেতে এরকম আরও কয়েক জায়গায় প্রতিবন্ধক দেখা গেলো। চমৎকার রাস্তা চলতে চলতে হঠাৎ এসে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। ব্রিজ অথবা কালভার্ট নির্মাণ শেষ হয়নি। ফলে যান চলাচলে অস্থিরতা থাকে সব সময়। তবে এতকিছুর পরও একটা পজিটিভ স্বপ্ন আমার মাথায় খেলতে শুরু করলো। আজ অথবা কাল না হয় পরশু নিশ্চয়ই এই মহাসড়কটি তার আধুনিক রূপ পাবে। তখন সত্যিকার অর্থে এই এলাকার যাতায়াত ব্যবস্থা অনেক আনন্দের হয়ে উঠবে! কিন্তু সেটা কতদিন পর? মানুষের ধৈর্যের একটা সীমা আছে।

এখনও চায়ের দোকানের সন্ধান মেলেনি। বঙ্গবন্ধু সেতু পেরিয়ে সিরাজগঞ্জ হয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে সামনের  দিকে। ফুড ভিলেজসহ নামকরা কয়েকটি হোটেল রেস্তোরাঁর পরিবেশ দেখে যারপরনাই অবাক হলাম। রাত দিন ২৪ ঘণ্টা খাবারের এই প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থাকে। সে কী কোলাহল আর ব্যস্ততা মিলে মিশে থাকে। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলোর দরজা বন্ধ। ফুড ভিলেজ অতিক্রম করার সময় দেখলাম একটাও মানুষ নেই। দেশের সব মহাসড়কে এ ধরনের অসংখ্য খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। হাজার-হাজার কর্মচারী এসব হোটেল রেস্তোরাঁয় কাজ করে। আহারে! তাদের অবস্থা এখন কেমন? শুধু কী হোটেল রেস্তোরাঁর কর্মচারী, অন্য পেশার সাধারণ মানুষগুলো কেমন আছে? মাথার চুল কাটা হয় না প্রায় আড়াই মাস। স্বাভাবিক সময়ে এক মাস অন্তর মাথার চুল কাটা হয়। এখন দেশের সব সেলুন বন্ধ। করোনা সংক্রমণে হাত ও মুখ খুবই স্পর্শকাতর জায়গা। অথচ সেলুনে হাত ও মুখের স্পর্শই জরুরি। সে কারণে দেশের সব স্যালুন বন্ধ। কিন্তু এই পেশার মানুষজনের কী অবস্থা?

ড্রাইভারের কথায় চমক ভাঙলো। সে চায়ের দোকান খুঁজে পেয়েছে। আশপাশে তাকিয়ে বুঝলাম বগুড়া পার হয়েছি। রাস্তার ধারে ছোট্ট বাজার মতো এলাকা। ছোট্ট চায়ের দোকান। আদা ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে বিশেষ কায়দায় চা বানাচ্ছে দোকানি। এক কাপ চায়ের দাম ৫ টাকা। খদ্দের সংখ্যা অনেক। বোঝা গেলো এই দোকানের চায়ের অনেক সুনাম আছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত চা পাওয়া গেলো। দাঁড়িয়েই চা খাচ্ছি। হঠাৎ পাশেই দাঁড়ানো কয়েকজনের সংলাপ কানের পর্দায় ধাক্কা দিল। ৪ জন মাঝ বয়সী লোক চা খাচ্ছে আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আড্ডা দিচ্ছে। দু’জনের মুখে মাস্ক। অন্য দু’জনের মুখ খোলা। লম্বা মতো লোকটি হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বললো, ঘরে থাকতে তো আর ভালো লাগে না। সরকার কি ছুটি আবার বাড়াবে? বেঁটে মতো লোকটি বললো, ছুটি বাড়ানো ঠিক হবে না। আমাদের মতো এই গরিব দেশটা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। তার কথা কেড়ে নিয়ে মুখভর্তি দাড়িওয়ালা লোকটি বললো, তোমরা যা-ই বলো সাধারণ ছুটি আরও কিছু দিন থাকা দরকার। দেশে যে হারে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে তাতে সামনে কঠিন সময় মোকাবিলা করতে হবে। ৪ জনের মধ্যে মুখে বসন্তের দাগওয়ালা লোকটি বিরক্ত হয়ে বললো, ছুটি দিলেই কি এই দেশের মানুষ ছুটি মানে? বর্তমান সময়ের সাধারণ ছুটির অর্থ কী? অর্থ হলো সবাই মিলে ঘরে থাকা! কিন্তু আমরা কি সবাই ঘরে থাকছি? গার্মেন্টস কারখানা খোলা, বাজার ঘাট খোলা। ঈদের দিন ঢাকায় সংসদ ভবনের সামনে, হাতিরঝিল এলাকা ও ধানমন্ডি লেকসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয়েছিল। এরা কেউই স্বাস্থ্যবিধি মানেনি! মানবেও না। কাজেই সরকারের উচিত ছুটি বাতিল করে সবকিছু খুলে দেওয়া। না হলে দেশটার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে!

দেশের ক্ষতি আর লাভ নিয়ে ওরা চারজন বিতর্ক শুরু করে দিয়েছে। ততক্ষণে গাড়িতে উঠে পড়েছি। পিচঢালা রাস্তার দুই ধারে ধান শুকাতে দিয়েছে আশপাশের বাড়ির লোকজন। মাইলের পর মাইল এমন দৃশ্য দেখা গেলো। স্বস্তি পেলাম দৃশ্যগুলো দেখে। যাক বাবা খাবারের জন্য হয়তো দেশের মানুষ কষ্ট পাবে না। রাস্তায় যেতে যেতে রাস্তার এক পাশে রাস্তা বড় করার উদ্যোগ পরিলক্ষিত হলো। বোঝা যাচ্ছে মহাসড়কটি প্রশস্ত করা হবে। সেজন্য মাটি ভরাটের কাজ চলছে। কিন্তু পরিবেশ দেখে কিছুটা ভয় পেলাম। রাস্তা প্রশস্ত করার কাজটি এখন থেমে আছে। ফলে কোথাও কোথাও রাস্তায় মাটি পাশের গভীর জলাশয়, পুকুর অথবা নিচু জমিতে গিয়ে পড়েছে। তার মানে এটা এক ধরনের অপচয়। করোনা থেমে গেলে আবার হয়তো রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য মাটি ভরাটের কাজ শুরু হবে। আবার বাজেট বরাদ্দ হবে। আবার রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হবে। এই অর্থ আসবে কোত্থেকে? পথে যেতে যেতে এক জায়গায় দেখলাম রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য মাটি ভরাট কার্যক্রম থেমে আছে। কারণ একটি ছোট্ট মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে! রাস্তা প্রশস্ত করতে হলে মসজিদটি সরাতে হবে....।

সৈয়দপুর শহরের কাছাকাছি এসে পড়েছি। হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা বিলবোর্ড নজরে এলো। তাতে লেখা ‘শতভাগ বিদ্যুৎসম্পন্ন উপজেলা।’ তার মানে আমার প্রিয় শহর সৈয়দপুর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে! আনন্দ ও স্বস্তিতে মন ভরে গেলো। বিদ্যুৎ স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া মানে আধুনিক অগ্রযাত্রায় এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু শহরে ঢুকেই অবাক হয়ে গেলাম। শতভাগ বিদ্যুৎসম্পন্ন উপজেলায় কোনও বিদ্যুৎ নেই। ঝড় বৃষ্টি শুরু হলেই এই উপজেলায় বিদ্যুৎ চলে যায়। তারপর আর বিদ্যুতের দেখা মেলে না। এক সাংবাদিক বন্ধুকে ফোন দিতেই বললো, হ্যাঁ এটাই সৈয়দপুরের আসল চিত্র। প্রশ্ন করলাম, ‘তাহলে শতভাগ বিদ্যুৎসম্পন্ন বলা হচ্ছে কেন? সাংবাদিক বন্ধু হাসতে হাসতে বললো, বিদ্যুৎ সংযোগে শতভাগ। বিতরণে নয়....।’

অঙ্কটা বেশ মজার, তাই না?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ