জরুরি ভিত্তিতে কঠোর ‘লকডাউন’ চাই

Send
ড. জহির আহমেদ
প্রকাশিত : ১৮:৪৬, জুন ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৮, জুন ০২, ২০২০

ড. জহির আহমেদদেশব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ ৩১ মে সরকারিভাবে ঈদের ছুটির পর প্রথম অফিস আদালত খোলা হয়েছে। সরকারি ভাষায়, ‘সীমিত পরিসরে’ গণপরিবহন চলাচল শুরু হয়েছে। গ্রামের বাড়ি থেকে ঈদ ফেরত মানুষ শহরে আসতে শুরু করলো। উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করি সর্বত্র। সরকারি নির্দেশনায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে সবাইকে নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ আজকেই ভিডিওতে ভাইরাল হয়েছে চট্টগ্রামের  আগ্রাবাদের একটি বাসে যাত্রী বনাম বাসের ড্রাইভার এবং হেল্পারদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা। সরকারি নির্দেশনার বাইরে অধিক যাত্রী নেওয়ার কারণে এ ঘটনার সূত্রপাত। দেখা যায় যে, বাস চালক ও হেল্পারের না ছিল গ্লাভস, না ছিল মাস্ক। সারা দেশে নিশ্চয়ই এরকম অপ্রীতিকর ঘটনা বেড়েই চলবে।
হঠাৎ ঘোষণা দিয়ে এই স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন করা যায় না। এটা যতটুকু না আইনের প্রয়োগ, তার চেয়েও বেশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বোধ। সীমিত বাস দিয়ে, সীমিত যাত্রী পরিবহন করার চেষ্টা দিয়ে জনবহুল নগরীতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যায় না। যেহেতু আমাদের রিসোর্সের অভাব, যেহেতু আমাদের অধিক মানুষ, সেহেতু সবাই একই সময়ে গন্তব্যে যেতে চাইবেই। পাবলিক হেলথ-এর মতোই এ দেশে দীর্ঘকাল যাবৎ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট উপেক্ষিত আছে। করোনাভাইরাসের মহামারি সামলাতে আমাদের পাবলিক হেলথ সেবা যে কতটুকু অপ্রস্তুত তার জন্যে গবেষণা করতে হবে না। দেশব্যাপী সর্বসাধারণ হাড়ে হাড়ে সেটি উপলব্ধি করছে; স্বজনরা ট্রমা, ভয়, শঙ্কা, আর মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে অনুভব করছে; আক্রান্তরা নিথর হচ্ছে শব মিছিলে যোগ দিয়ে। যে ফেসবুকের নিউজ ফিডে হাস্যোজ্জ্বল পারিবারিক আর বন্ধুত্বের ছবি শোভা পেতো; সেখানে এখন স্থান করে নিচ্ছে মৃত্যুর মিছিলের নির্বাক ছবি। আরও চোখে পড়ে অসংক্রমিত বন্ধুদের সংক্রমিত হওয়ার ভয়ের বিবর্ণ চাহনি। স্তব্ধ হয়ে যাই যখন স্ক্রলে অসংখ্য ফেসবুক বন্ধুদের চোখে মুখে টল টল কান্নার ছবি একের পর এক দেখতে পাই।  এক কথায়, মর্মস্পর্শী নিকট ভবিষ্যৎ আমাদের হাতছানি দিচ্ছে। কেউ না কেউ ইতোমধ্যে স্বজন হারিয়েছে, হারাচ্ছে।

সরকার চেষ্টা করছে নিঃসন্দেহে; তবু এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতা, এক ধরনের আস্থাহীনতা আমরা লক্ষ করি। সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর গণপরিবহন ১৫  জুন নাগাদ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিলেও এক ঘণ্টা পর গণপরিবহন সীমিত আকারে চালু করার পুনঃঘোষণা দেয়। প্রেসার গ্রুপগুলোর চাপের কাছে সরকারকে অসহায় করে রেখেছে মনে হচ্ছে। যেমনটি আমরা দেখলাম গার্মেন্টস কারখানার ক্ষেত্রে। বিজিএমইএ আর বিকেএমইএ সরকারের চেয়েও অনেক পরাক্রমশালী। একটি মধ্যপন্থা দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করছি আমরা সরকারের মধ্যে। তা হলো- স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির দু’কূল রক্ষা করা; জীবন আর জীবিকা এই দ্বৈরথ একসাথে পরিচালন করা। মনে হচ্ছে, ‘লকডাউন’ বা ‘ছুটি চলবে’; আবার দোকানপাট বিকাল পর্যন্ত চলবে, আর সন্ধ্যার পর মানুষের চলাচলসহ সবই বন্ধ থাকবে।

কতক পূর্ব সতর্কীকরণ আমরা পাচ্ছি সুরক্ষার কৌশল হিসেবে। যেমন, মাস্ক পরা বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। কিন্তু বাংলাদেশে উপসর্গহীন করোনা রোগীর থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর দেখা কিংবা মাস্ক দিয়ে সংক্রমণ আটকানোর (নাকি ধুলোবালি আটকানো) বিষয়টি নির্ভরযোগ্য নয় বলে বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে ব্যাখ্যা করেছেন। আমার  তত্ত্বাবধানে নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এবার ঈদে বাড়ি ফেরাদের নিয়ে একটা জরিপ গবেষণা করে। ঈদের পর ফলোআপ তথ্য দেখাচ্ছে যে, ৪৮ জন উত্তরদাতা যারা ঈদের আগে সুস্থ ছিলেন কিন্তু ঈদের চার দিন পর থেকেই ৮ জন করোনার উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে আছেন এবং ৭ জন ঢাকায় চলে এসেছেন। দেশব্যাপী ঈদে যাওয়া-আসার কারণে সংক্রমণের তীব্রতা যে কত বাড়তে পারে তা ওই গবেষণা থেকে কিছুটা অনুমান করা যায়। দ্রুত দৃষ্টি দেওয়া যাক বিশেষজ্ঞ জ্ঞান কি বার্তা দিতে চায় আমাদের?  

দেশে করোনার ক্রমবর্ধমান ছোবল পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যে যেমন একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি; তেমন ঝাঁকুনি অর্থনীতি আর সরকারের জন্যেও। বিশ্বব্যাপী এই ঝাঁকুনি লেগেছে জীবনমুখীন বিজ্ঞানের শাখাগুলোতেও। ভাইরোলজি, মহামারিবিদ্যা, জৈব চিকিৎসা এবং ফার্মাকোলজি  জ্ঞানকাণ্ডগুলো এই ভাইরাসের ব্যাপকতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। একইভাবে ব্যর্থ হয়েছে  জীবনমুখীন  অপর শাখাগুলো, যেমন- অর্থনীতি, রাজনীতিসহ অপর সামাজিক বিজ্ঞানগুলো। প্রায়ই সব শাখাই এ ধরনের মহামারির সম্ভাব্য দিকের কথা বলেছে। যেটি বলেনি নিশ্চিতভাবে তা হলো, এই ভাইরাসের ধ্বংসযজ্ঞের গতি-প্রকৃতি কি। সারা বিশ্বে তাই এই ভাইরাসের শরীরবৃত্তীয় মহামারিই শুধু দেখা দেয়নি; বরং চিন্তার রাজ্যেও এই মহামারির প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।

এই মুহূর্তে আমাদের কাছে মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হচ্ছে জীবন কীভাবে মূল্যায়িত হবে? ( ক’দিন আগেও এ প্রশ্ন গৌণ ছিল)। আমাদের সবার কাছেই জীবনের মানে হচ্ছে বেঁচে থাকা, আর বেঁচে থাকাটাই একমাত্র মূল্যবান বিষয়। করোনার প্রতিষেধক এখনও আবিষ্কার হয়নি। বিকল্প কী? সারা বিশ্বে ‘লকডাউন’ করোনা সংক্রমণের একমাত্র গতিরোধক ব্যবস্থা। অনেক দেশেই এই  ‘লকডাউন’ তুলে নেওয়া হয়েছে; কারণ এর ফলে প্রান্তিক ও নিম্ন-আয়ের মানুষের জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। আজও আর্জেন্টিনায় ‘লকডাউন’ তুলে নেওয়ার জন্যে বিরাট সমাবেশ হয়েছে।

‘লকডাউন’-এর পক্ষে দুস্তর যুক্তি হলো- এটি করোনা সংক্রমণের বিস্তারকে ঠেকিয়ে রাখে; এটি ভাইরাস ছড়ানোর সময় ক্ষেপণ করে। আমাদের দেশের জন্যে ‘লকডাউন’ আর একটা কারণেও প্রয়োজন। যেখানে সারা দেশে নগণ্য ভেন্টিলেটর, অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, মুষ্টিমেয় প্রাইভেট হাসপাতাল করোনা সেবা দিচ্ছে, তা নিরসনের জন্যেও আমাদের প্রস্তুতি হিসেবে করোনাভাইরাস আটকানো দরকার। ‘লকডাউন’ করা না হলে করোনা আক্রান্ত রোগীতে হাসপাতালগুলো সয়লাব হয়ে যাবে। মানুষের গতিবিধি, চলাচল নিয়ন্ত্রণ এই মুহূর্তে বড় সমাধান। কৌশলগুলো হচ্ছে সংক্রামককে শনাক্ত করা, পরীক্ষা করা। নিয়ন্ত্রণের অপর পদক্ষেপগুলো হচ্ছে, ব্যক্তিগত সুরক্ষা চর্চা করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি। ‘লকডাউন’ হচ্ছে ওই পদক্ষেপগুলোর সমষ্টিগত কৌশল। শারীরিকভাবে ঘরের বাইরে না যাওয়ার কথা বলে এই কৌশল।  

কিন্তু বিতর্ক আছে যে, জীবনকে প্রায়োরিটি দিতে গিয়ে অর্থনীতি যে অচল হয়ে যাবে। সরকার মধ্যপন্থা বেছে নিয়েছে মনে হচ্ছে। জীবিকার স্বার্থে ঈদ পরবর্তী ঢাকামুখী জনস্রোত (যেখানে স্বাস্থ্যবিধি অকার্যকর) জীবনকে বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে না, দিচ্ছে না? দৈনিক পরিসংখ্যান তো তা-ই বলছে। গত এক সপ্তাহে ইনস্টিটিউট অব এপিডেমোলজি ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (আইইডিসিআর)-এর হিসেবে আক্রান্ত এবং মৃত্যুহার যেভাবে ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে তাতে দেশবাসী আতঙ্কিত না হয়ে পারে না। এই মুহূর্তে করোনা সংক্রমণকে আটকাতেই হবে; এর বিকল্প নেই (যেমন করে উহান আটকিয়েছিল)। জানি, ‘লকডাউন’ জীবিকার ক্ষতি করে। ব্যক্তিগত জীবিকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডে এই ক্ষতি বিষাদময়। কিন্তু এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কঠোর ‘লকডাউন’ দীর্ঘমেয়াদে একটা বিনিয়োগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

সরকারকে জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে আমজনতার জীবন রক্ষাকেই আগে বিবেচনায় নিতে হবে। দক্ষিণ  কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, তাইওয়ান ও কানাডার মতো দেশগুলো জনবান্ধব ‘লকডাউন’ আরোপ করে সাফল্য দেখিয়েছে। সরকারের বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা অনেক চেষ্টাকেই বাধাগ্রস্ত করছে। একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকারের করোনা বিষয়ক কমিটির অভিজ্ঞ এক সদস্যের সাজেশন ছিল, সরকার যেন এই মুহূর্তে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে; অফিস আদালত আর দোকানপাট যেন আরও কিছুদিন বন্ধ রাখে; যা আশ্চর্যজনকভাবে উপেক্ষা করা হয়। ওই কমিটির অপর সদস্য একই মত প্রকাশ করেন যে, ‘ঈদের ছুটিতে মানুষের অবাধ চলাচলের কারণে সংক্রমণের হার অনেক বেড়ে যাবে’ এবং সেটি ঘটছেও।

রোগতত্ত্ব আর অর্থনীতির আলাদা দুই জগতের মাঝে যেন আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। রোগতত্ত্ব প্রতিষ্ঠান ‘লকডাউনের’ পক্ষে কিন্তু এর অর্থনৈতিক ফলাফল নিয়ে নীরব। আবার অর্থনীতিবিদরা (বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ-সহ) ‘লকডাউনের’ কারণে জীবিকা ও অর্থনীতির লাভক্ষতির হিসেব নিকেশ কষছে, কিন্তু ভাইরাসের জৈবিক গতিপ্রকৃতি বিষয়ে নীরব। ফলে ‘লকডাউন’ করা আর না করার বিষয়ে একটা তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় করার বড়ই অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যক্তি সচেতন হয়ে আমরা কতটুকু এই ভাইরাসের মরণ ছোবল থেকে মুক্ত হতে পারবো, যখন কিনা বেশিরভাগ মানুষের টেস্ট-ই হয়নি? 

এখন চূড়ান্ত সময় এসেছে। আমাদের জীবন-জীবিকায় ভুক্তভোগী মানুষ, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আর স্বজনহারা মানুষ—এদের অভিজ্ঞতা শুনতে হবে (নিম্ন/মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতাদানসহ, অন্তত কয়েক সপ্তাহের জন্য হলেও)। শুনতে হবে যারা আমাদের অগ্রবর্তী যোদ্ধা (যেমন, চিকিৎসাকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিক, প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধি), তাদের সুপারিশের কথা । বলাবাহুল্য, ইতোমধ্যে আমরা কম-বেশি তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনে চলেছি বিভিন্ন মাধ্যমে। সময়ক্ষেপণ না করে এখনই সে সুপারিশগুলোর সমন্বয় ও বাস্তবায়ন করা দরকার। আর তা করতে হবে একটা (হতে পারে স্বল্পমেয়াদি) কঠোর ‘লকডাউন’ জারির মাধ্যমে। বিভিন্ন দেশের উদাহরণ আছে, ‘লকডাউন’ জীবিকা থমকে দেয়, আবার ‘লকডাউন’ জীবন বাঁচায়ও। এই মুহূর্তে দ্বিতীয়টি আমাদের জন্যে ভীষণভাবে জরুরি। আমাদের শব মিছিল আর দীর্ঘ হবে না, কায়মনোবাক্যে সেটিই চাই।      

লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ