বাস ভাড়ার ‘বাঁশ’

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৬:২৫, জুন ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৭, জুন ০৩, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাকোভিড-১৯ মোকাবিলা করার জন্য চিকিৎসাশাস্ত্র ও অর্থনীতির বিশেষজ্ঞের নানা মত। সেসব মতামত নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা যেমন আছে, তেমনি নীতিনির্ধারক মহলেও নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা আছে। ৩১ মে থেকে সরকার অফিস, আদালত সব খুলে দিয়েছে। সংক্রমণের শঙ্কা সঙ্গে রেখেই রুটি ও রুজির তাগিদে মানুষ কাজে নামতে চেয়েছে। তাই সরকারও জীবনের পাশাপাশি মানুষকে জীবিকা দিতে লকডাউন থেকে সবকিছু আনলক করেছে।
সেদিন থেকে ট্রেন এবং বিমান চলাচলও শুরু হয়। বাস চলাচল শুরু করে একদিন পর, পহেলা জুন থেকে। বিমান ও রেল ভাড়া বাড়েনি, তবে বাস ভাড়া বেড়েছে ৬০ শতাংশ। মালিকদের চাপে প্রথমে ৮০ শতাংশ বাড়লেও জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে এটা ভেবে সেতু ও সড়কমন্ত্রী ৬০ শতাংশে তা নামিয়ে আনেন। কিন্তু এটিও সাধারণ মানুষকে আহত করেছে। এই সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের মানুষ। কারণ করোনার এই আড়াই মাসের প্রভাবে তাদের অনেকেই রোজগার হারিয়েছেন, রোজগার কমেছে, অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। তারা ভাবছেন এই সিদ্ধান্ত তাদের সরাসরি আঘাত করছে।

মানুষের এই ভাবনা একেবারেই অমূলক নয়। ব্র্যাক, ডেটা সেন্স এবং উন্নয়ন সমন্বয়-এর এক যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন একটি সংকটময় মুহূর্তে উপনীত হয়েছে। এ মহামারি নিম্ন আয়ের মানুষকে অস্বাভাবিকভাবে প্রভাবিত করেছে। দেশের প্রায় ১০ কোটি ২২ লাখ মানুষ অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত দুর্বলতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিবারের উপার্জন কমে গেছে। ১৪ লাখেরও বেশি প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন বা ফিরে আসছেন।

নিম্ন আয়ের মানুষ বলতে খুব নিম্ন পর্যায়ে যারা বহুকাল ধরে রয়েছেন শুধু তারাই নয়। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও আছেন। ব্যক্তিখাতের কর্মীরা অনেকে বেতন পাননি, অনেকে অর্ধেক বা ২৫ শতাংশ পেয়েছেন। প্রণোদনা দেওয়ার পরেও পোশাক খাতের শ্রমিকদের অনেককে ৬০ শতাংশ বেতন দেওয়া হয়েছে। তাদের বাসা ভাড়া ও অন্যান্য খরচ তো কমেনি।

এই যখন অবস্থা তখন বাস ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠবেই। প্রশ্ন আরেকটা কারণে উঠছে যে, প্রথম দিনেই দেখা গেছে শারীরিক ও সামাজিক দূরত্বের কোনও বালাই নেই। বাসে গাদাগাদি করে মানুষ যাতায়াত করেছে বা করতে বাধ্য হয়েছে। করোনা স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী কোনও আসন বিন্যাস নেই, কিন্তু ভাড়া দিতে হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি। প্লেনে চড়েন তুলনামূলকভাবে ধনিক শ্রেণির মানুষ, তাই তাদেরটা বাড়েনি, ট্রেন চালায় সরকার, সেটা বাড়েনি। বাস মালিকদের তোয়াজ করতে গিয়ে সরকার অতি সাধারণ মানুষকে সামান্য ভাবনায়ও নেয়নি–ঠিক এমনই একটা ধারণা সৃষ্টি হয়েছে এই স্বল্প সময়ে।

বাস মালিকরা বলছেন অল্প যাত্রী নিয়ে বাস চালাতে গেলে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। কিন্তু যে স্বাস্থ্যবিধি মানার দোহাই দিয়ে বাসে আসনসংখ্যার অর্ধেক যাত্রী তোলার কথা বলা হচ্ছে এবং তার জের ধরে বাস ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে সে বিষয়ে একটা কড়া নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। যদি আসন খালিই না থাকলো, তাহলে ৬০ শতাংশ বেশি ভাড়া নেওয়া হবে কেন? ভাড়া এমনভাবে বেড়েছে যে খুব সামান্য পথ গেলেও, মানে বাসে উঠলেই এখন একজনকে দিতে হবে ১৫ টাকা।

আন্তঃজেলা বাসগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি ও শারীরিক দূরত্ব মানা সম্ভব হলেও টাউন সার্ভিসে সেটা মেনে চলা একেবারে অসম্ভব বলছেন একজন বাস মালিক। এই বাস্তবতা জেনেও মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ তথা সরকার কেন বাস ভাড়া বাড়ানোর জন্য মালিকদের চাপে রাজি হলো সেটা বোধগম্য নয়। যে শ্রমিকদের দোহাই দিয়ে এ কাজটি করা হলো, তাদের যে এক পয়সাও বেতন বা মজুরি বাড়বে না, সেটা আমরা জানি। পরাক্রমশালী যেসব শ্রমিক নেতা যুগ যুগ ধরে নিজেদের সম্পদ বাড়িয়েছেন শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডের নামে চাঁদাবাজি করে, তারা এই করোনাকালে শ্রমিকদের কোনও খোঁজ নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। এবার বাস চালুর সময়ও শ্রমিকের নিয়মিত বেতনের কথা উচ্চারিত হয়নি তাদের দিক থেকে।  

আন্তঃজেলা বাসের ভাড়া নিয়েও কথা উঠছে। ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ানোর ফলে কোনও কোনও রুটে বাস ভাড়া বিমান ভাড়ার প্রায় সমান হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে ঢাকা যেতে বাসে লাগছে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা। আর ৬০ শতাংশ হারে বাড়ানোয় একটি এসি বাসে প্রায় এক হাজার ৬০০ টাকা করে ব্যয় হচ্ছে যাত্রীদের। অথচ আকাশপথে বিমানে যাওয়া যাচ্ছে এক হাজার ৯৯৯ টাকায়।

গণপরিবহনে যাত্রীর সংখ্যা, মালিক-শ্রমিকদের মানসিকতা, রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দুর্বলতার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে গণপরিবহন চালানোর সিদ্ধান্ত যে অবাস্তব সেটা প্রথম দিনেই প্রমাণিত হয়েছে। সব সিট পূর্ণ করে এমনকি দাঁড়ানো যাত্রীও বহন করেছে বাসগুলো, অথচ ভাড়া নিয়েছে ৬০ ভাগ বেশি।

যেহেতু সীমিত আকারে কোনও কিছু চলছে না, আসন বিন্যাস হয়নি, স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি কোনও বাসেই, তাই করোনার দুঃসময়ে কর্মহীন মানুষের কাঁধে ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়া চাপানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বর্ধিত ভাড়া কমবে এমন ভাবনার আর যৌক্তিকতা নাই। এমনকি বাসের পরিচালন ব্যয় ঘাটতির অর্থ প্রণোদনা হিসেবে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার যেসব কথা উঠেছিল সেসবেরও প্রয়োজন আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। জনবাদী শাসনব্যবস্থায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের স্বার্থরক্ষা জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক

 

 

/এমএমজে/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ