কে গরিব, শ্রমিক না মালিক?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৬:৪৯, জুন ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫০, জুন ০৬, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহযে এলাকায় আমার বসবাস, সেই এলাকা বিবেচনায় বেশ স্বস্তি ফিরে এলাম। আতঙ্কে ছিলাম কখন কোভিড-১৯ এর খপ্পরে পড়ে যাই। চারদিক থেকে করোনা সংক্রমণ ধেয়ে আসছে দেখছি। শুরুতে এমন ছিল যে দূরের মানুষজনের কথা শুনতাম। শুনে কত যুক্তি খুঁজে নিয়েছি নিজে নিজে। মানুষটি বিদেশ থেকে ফিরেছেন, তাই আক্রান্ত হতেই পারেন। হয়তো কোনও আত্মীয় ফিরেছেন বিদেশ থেকে, সংক্রমিত হয়েছেন তার সংস্পর্শে গিয়ে। আমিতো বিদেশ যাইনি, বিদেশ ফেরত কোনও স্বজনের কাছাকাছি যাইনি আমি। কেউ গণপরিবহনে ওঠে, নামাজে গিয়ে, বাজারে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন, আমিতো এ ধরনের কাণ্ড থেকে কত দূরে বসে আছি। সুতরাং আমার করোনা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। এই বিশ্বাসে অটল থাকা গেলো না বেশিদিন। কারণ দেখা গেলো দূরবর্তী মানুষদের কাছ থেকে করোনা ধীরে ধীরে বন্ধু, পরিজন ও প্রতিবেশীর সীমানায় ঢুকে পড়েছে। কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে পরিবারের মাঝেও। উদ্বেগ বেড়ে গেলো। সারাক্ষণ উৎকণ্ঠা কে কখন আক্রান্ত হয়ে পড়ি। প্রতিদিনই একদম কাছের প্রিয়জনদের আক্রান্ত এবং মৃত্যুর খবর আসছে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে হারানোর খবর, ঘুমও ভাঙে কোন স্বজন, বন্ধু চলে যাবার সংবাদে। তার ওপর রুজির জন্য বেরও হতে হয় পরিবারের মানুষগুলোকে। নিজেও বের হচ্ছি প্রতিদিন। এমন উদ্বেগের মধ্যেই আশা জাগানিয়া সংবাদ—‘পোশাক শ্রমিকরা গরিব হলেও নাকি তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার শক্তি বেশি’। পোশাক শ্রমিকদের ঘাম ও রক্ত নিলামে দিয়ে যারা আজ টাকার ডাইনোসর, সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্ধারক বলে আবির্ভূত, তারা এই বয়ান দিয়েছেন।

বয়ানের পক্ষে যুক্তি আছে। একদম ফেলনা নয়। পোশাক শ্রমিকদের কারখানায় যে পরিমাণ শারীরিক শ্রম দিতে হয়, তার বিনিময়ে প্রাপ্ত মজুরি দিয়ে যতটুকু আমিষ-পুষ্টি পাতে জুটে, তা দিয়ে দিনের পর দিন যারা ঘাম ঝরাতে পারেন, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তো বিস্মিত করবেই শোষক শ্রেণিকে। এই বিস্ময় থেকেই তারা শোষণের নতুন নতুন নকশা তৈরি করে। এই শোষিত মানুষেরা যে কেবল শারীরিকভাবেই নিপীড়িত তা নয়। চাকরি হারানো, কাঙ্ক্ষিত মজুরি না পাওয়া, বেতন বঞ্চিত হওয়ার মানসিক পীড়নও তাদের সইয়ে যেতে হয়। মানসিক ও শারীরিক পীড়নের লড়াইয়ে এই জয়তু শ্রমজীবী মানুষেরা তো শক্তিশালী হবেনই। কিন্তু আপত্তির বিষয় হলো তাদের গরিব কেন বলা হচ্ছে শোষক শ্রেণি থেকে?

শ্রমিকেরা আগুনে পুড়ে, ভবনে চাপা পড়ে, ছাঁটাইয়ের যাঁতাকলের মাঝেও যেভাবে এই সেলাই শিল্পে রক্ত সঞ্চালন অব্যাহত রাখছে, তাতে এই যোদ্ধাদের মতো উদারতা বা চওরা ছাতিমার পরিচয় তো আমাদের সেলাই কারখানার মালিকরা দিতে পারেননি। যেকোনও প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক দুর্যোগ এবং বৈশ্বিক রকমারি মেরুকরণের ছুঁতোতে প্রথমেই কাঁচি নামিয়ে আনে শ্রমিক বরাবর। চোখ রাঙায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের। হুমকি দেয় কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার। শ্রমিকদের চাপের মুখে রেখেই বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে এবং সরকারের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের চেষ্টায় থাকে মালিকরা। শ্রমিকরা ব্যবহৃত হন দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে। করোনাকালেও সেলাই মালিকরা একই কাজ করছেন। তারা বাজার ধরে রাখতে ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে মনোযোগী না হয়ে, ওঁৎ পেতে আছেন সরকারি প্রণোদনা পকেটে নেওয়ার। করোনাকালের মধ্যে কীভাবে সুরক্ষিতভাবে উৎপাদনে থাকা যায়, করোনা পরবর্তী সময়ে যখন চাহিদা বাড়বে, তখন নিজেদের কাছে ক্রয়াদেশ কত বেশি আনা যায়, সেদিকটায় তাদের উদাসীনতা এখন স্পষ্ট। চীন ও ভিয়েতনাম এই সময়টায় রফতানি বাড়িয়েছে। আর আমাদের সেলাই কারখানার মালিকরা কপাল চাপড়াচ্ছেন। এটি অবশ্য প্রদর্শিত বিষয়। এই বিপন্নতা দেখিয়ে হাজার পাঁচেক টাকাতো সরকারের কাছ থেকে আদায় করা যাচ্ছে। নিজেদের পকেটে টাকার ভাটা পড়বে না। বরং উছলে পড়বে তারল্যের জোয়ার।

এই মানসিকতার ‘সেলাই মালিক’দের আমরা বিত্তশালী বলবো নাকি গরিব? তাদের দিক থেকেতো মানসিক দৈন্যতা বা গরিবানারই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

যাই হোক, গরিব বলে আখ্যায়িত শ্রমিক মানুষগুলোর মাঝেই আমার বসবাস। সকালে তারা যখন কাজের জন্য ছুটেন, তখন আমিও অফিসমুখী। বাড়ি ফিরি মোটামুটি একই সময়ে। মহল্লাতে একই সঙ্গে বসবাসের বয়সটাও কম নয়। সেই মাঠে খেলার সময় থেকেই। সামাজিক দূরত্ব নয়, ঘনিষ্ঠতা থেকেই তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তির যে পরিচয় জানি, তার একটুখানি যদি আমাকে স্পর্শ করতো! হয়তো করেনি। তাই ভরসা রাখছি তাদের ওপরই। করোনা নিশ্চয়ই ওই প্রকৃত শক্তিশালীদের কাছে পরাজিত হবে, হয়েছেও হয়তো। এমনটাই তো বিশ্বাস রাখতে হবে। কারণ তারা চাকরির মতো করোনা পরীক্ষা সেবা থেকেও যে বঞ্চিত।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ