বঙ্গবন্ধু, ৭ জুন ও যৌবনে দাও রাজটিকা

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ০১:৩০, জুন ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৭, জুন ০৭, ২০২০

স্বদেশ রায়জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় নায়ক নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু দুইজন দুই প্রজন্মের নেতা। একজন যখন রাজনীতির শিখরে আরেকজন তখন তরুণ। তারপরেও এ দু’জনের রাজনীতির গতিপথ ও রাজনৈতিক বিশ্বাসে অনেক বেশি মিল। দু’জনেরই ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে দেখা যায় তাঁদের ওপর কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রভাব ছিল অনেক বেশি। নজরুল যৌবনের কবি। তিনি যৌবনে বিশ্বাস করতেন। বলা যেতে পারে নজরুল পরবর্তী (নজরুল বাকশক্তি হারানোর পরে) প্রজন্মের মধ্যেও যৌবনে আস্থা রাখতে সবথেকে বেশি ভূমিকা রেখেছে নজরুলের চেতনা। আর নজরুলের যৌবনকালে অর্থাৎ সুভাষ চন্দ্র বসু যখন ভারতের যুব সমাজের মূল নেতা তখন তিনি ঘোষণাই দিয়েছিলেন, ‘আমরা যখন আমাদের ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধে যাবো তখন নজরুলের গান হবে আমাদের সঙ্গী, নজরুলই আমাদের যৌবন জাগিয়েছেন।’ সুভাষ চন্দ্র বসুও নজরুলের মতো নিজ জীবনে যৌবনকে জাগিয়েছিলেন। বাস্তবে, নিজ জীবনে যৌবনকে জাগানো অনেক বড় বিষয়। খুব কম যুবকই পারে নিজের সমস্ত যৌবনকে কাজের ভেতর দিয়ে জাগিয়ে তুলতে। সুভাষ চন্দ্র বসু নিজের জীবনে যৌবনকে জাগিয়ে তাকে এত দ্রুত শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার যখন মাত্র ৪১ বছর বয়স সে সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে ‘দেশনায়ক’ হিসেবে এক বাণী পাঠিয়ে ভারতবর্ষের নেতা হিসেবে বরণ করে নেন। অন্যদিকে শুধু নজরুল পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে নয়, বাঙালির  চিরকালের ইতিহাসে নিজ যৌবনকে জাগিয়ে ও যৌবনকে সঙ্গে নিয়ে সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মাত্র ৫১ বছর বয়সে তিনি বাঙালি জাতির জনক হয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর একান্ন বছর বয়সের ভেতর প্রায় একক নেতৃত্বে একটি জাতি ও একটি দেশ সৃষ্টি করেছেন। এই মহান সৃষ্টির পেছনে অনেক কিছুই কাজ করেছে ঠিকই তবে এখানে অনেক বড় ভূমিকা থেকে যায় তারুণ্যের ও যৌবনের শক্তিকে কাজে লাগানো। পৃথিবীর ইতিহাসে এই সত্য দেখা যায়, যে ব্যক্তি বা নেতা তারুণ্য ও যৌবনকে কাজে লাগাতে পেরেছেন বেশি তিনিই সব থেকে বেশি সফল হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সফলতার অন্যতম কারণ যৌবন ও তারুণ্যকে যথা ব্যবহার করা। সাধারণ বাঙালির যে স্বভাব অর্থাৎ তারুণ্য ও যৌবনকে হেলায় নষ্ট করা- বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বঙ্গবন্ধুর জীবনকাল যৌবনেই শেষ হয়েছে। মাত্র ৫৫ বছর ৪ মাস বঙ্গবন্ধুর জীবনকাল। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তাঁর যে অর্জন তা কেবলই সম্ভব হয়েছে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তিনি সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন বলেই। তাঁর এই অর্জন ধরে যদি তাঁর  যৌবনকে মূল্য দেওয়ার ইতিহাস বিশ্লেষণ করা হয় সেটা কোনোমতেই একটি বা দুটি প্রবন্ধে লেখা সম্ভব নয়। এটা আমাদের সংগ্রামের ইতিহাসের, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক বড় বিষয়। কয়েক খণ্ড বই লিখেও এর ব্যাপ্তি প্রকাশ করা কঠিন। যাহোক, আমরা যদি প্রথমে বঙ্গবন্ধুকে অতি সংক্ষেপে লক্ষ করি তাহলে দেখতে পাই, বঙ্গবন্ধু তার অমূল্য যৌবন বিন্দুমাত্র নষ্ট করেননি। ১৯৪৬ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতার বিশেষ রাজনৈতিক সহকারী। ওই বয়সে তিনি সর্ব ভারতীয় রাজনীতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সহকারী হিসেবে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে সমর্থ হন। বিশেষ করে ১৯৪৬-এর দাঙ্গার পরে শান্তমাথায় কাজ করা অনেক বড় বিষয় ছিল। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার পরে অনেকের ভেতর সূক্ষ্মভাবে হলেও একটা সাম্প্রদায়িকতা জন্ম নেয়। ওই সময়ে সত্যি অর্থে গোটা ভারতবর্ষে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে অসাম্প্রদায়িক কিছু মানুষ। তাদের নেতা হন তখন মহাত্মা গান্ধী আর এই গান্ধীর সহযাত্রী হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বঙ্গবন্ধু তখন এ দু’জনের অনেক কাজের ছায়াসঙ্গী। সর্ব ভারতীয় রাজনীতিতে এ ধরনের বড়মাপের নেতাদের সঙ্গে এমন কম বয়সে জওয়াহেরলাল নেহরু ও সুভাষ বসু ছাড়া আর কাউকে কাজ করতে দেখা যায়নি। জওয়াহেরলাল নেহরু যে বয়সে কংগ্রেস সেক্রেটারি শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে কাজ করেছেন তার থেকে কম বয়সে বঙ্গবন্ধু প্রবীণ নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে কাজ করেন।

যেমন আজ কারও কোনও দ্বিমত নেই যে পাকিস্তানে প্রথম অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, আর এর প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান। বাস্তবে বঙ্গবন্ধু যখন এই ছাত্র সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করছেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৮ বছর। এই ২৮ বছর বয়সে তিনি পূর্ব বাংলায় শুধু ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করছেন না, ভাষা আন্দোলনও শুরু করে দিয়েছেন। পাশাপাশি মুসলিম লীগের বিপরীতে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ বা জনগণের মুসলিম লীগ গড়ে তোলার উদ্যোগও ওই ২৮ বছর বয়সে নিচ্ছেন আর সফল হচ্ছেন ২৯ বছর বয়সে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবী ও কিছু বামপন্থী বুদ্ধিজীবী মিলে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের সে চেষ্টাকে সেদিন সবথেকে বেশি সাহায্য করেছিলো তৎকালীন জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার। তবে ইতিহাস নির্মম। ইতিহাসকে কোনোদিন কোনও কিছু দিয়ে চেপে রাখা যায় না। পরিপুষ্ট বীজ যেমন তার নিজস্ব শক্তির জোরে মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আসে, ইতিহাসও তার আপন শক্তিতে বের হয়ে আসে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান তাঁর নেতৃত্ব ইতিহাসের আপন গতিতে আজ প্রতিষ্ঠিত। ভাষা আন্দোলনের সময় আরও দেখা যায়, আওয়ামী মুসলিম লীগের সিনিয়র নেতাসহ অন্যান্য দলের সিনিয়র নেতারা এমনকি আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা কমিউনিস্ট পার্টির নেতারাও কিছুটা আপসকামী হয়ে পড়েছিলেন, তখন সামনে থাকা পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের কথা ভেবে। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা মনে করেছিলেন নির্বাচন হলে তারা লাভবান হবেন আর কমিউনিস্ট পার্টি মনে করেছিল নির্বাচন পরবর্তী সরকার হয়তো তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেবে। এই আপসকামিতার সময়ে বঙ্গবন্ধু জেলে বসে যাদের কাছে ১৪৪ ধারা ভাঙার নির্দেশ পাঠান তারা সকলে তরুণ। অর্থাৎ সেদিন যে আন্দোলন হয় তা মূলত যৌবন ও তারুণ্যের মেলবন্ধনের একটি প্রকাশ। আর এটা ঘটেছিল বঙ্গবন্ধুর তারুণ্যের প্রতি, যৌবনের প্রতি আস্থা থাকার কারণে। অন্যদিকে নিজেও একজন তরুণ হয়ে সে দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন। 

এমনিভাবে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সারা জীবন যদি আমরা একটু বিচার বিশ্লেষণ করে দেখি তাহলে দেখতে পাবো তিনি রাজনীতি করেছেন সব সময়ই যৌবন ও তারুণ্যের ওপর ভর করে। বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্যে তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছয় দফা ও তার জন্যে আন্দোলন। কারণ, ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনে বিজয় ও ১৯৫৪-এর নির্বাচনের ভেতর দিয়ে মুসলিম লীগের রাজনীতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে পাকিস্তান নামক দুই ডানার রাষ্ট্রটি ধরে রাখার একমাত্র পথ ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্ব। তিনিই তখন একমাত্র জীবিত নেতা ছিলেন, যিনি পাকিস্তানের দুই খণ্ডে গ্রহণযোগ্য। সে চেষ্টাও তিনি করেছিলেন। কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে যখন পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা ছুড়ে ফেললো এবং ১৯৬২ সালে বৈরুতের হোটেলে রহস্যজনকভাবে মারা গেলেন, তখন সত্যি সত্যি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির দুটো ডানা একসঙ্গে রাখার আর কেউ ছিলেন না। অথচ ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম দুই খণ্ডেরই কোনও সিনিয়র নেতা এই সত্য সেদিন উপলব্ধি করতে পারেননি। তারা যদি সেদিন এই সত্য উপলব্ধি করতে পারতেন তাহলে বঙ্গবন্ধু অনেক কম রক্তপাতের ভেতর দিয়ে পাকিস্তানের সামরিক জান্তাদের কাছ থেকে পাকিস্তানের দুই খণ্ডের মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের পথ করে দিতে পারতেন। এর ফলে শুধু বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশ পেতো না, পাঠানরা তাদের স্বাধীন পাখতুনিস্তান পেতো, বেলুচরা স্বাধীন বেলুচিস্তান পেতো, পাঞ্জাব, করাচির মানুষও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতো তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আর তার ভেতর দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হতো এই উপমহাদেশে শুধু গণতন্ত্র নয়, শান্তিও। হয়তো এর ফলে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভূগোলে আরও কিছু পরিবর্তন আসতো। তবে সেটা হলে আজ যে মৌলবাদ, আজ যে হানাহানি, সর্বোপরি উপমহাদেশে যে শান্তি প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না- এই অবস্থা থেকে মুক্তি আসতো। পাকিস্তানের দুই খণ্ডের সিনিয়র নেতারা সেদিন সে সত্য বুঝতে পারেননি। কারণ, তাদের এক অংশ পাকিস্তানের ভেতরই তাদের ভাগ্য- এই স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। আরেক অংশ পাকিস্তানের সামরিক শাসকের উচ্ছিষ্ট ভোগে ব্যস্ত ছিলেন। তাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরপরই শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পারলেন, সিনিয়র নেতাদের দিয়ে কোনও কাজ হবে না। যা কিছু করতে হবে, সেটা তাঁকেই করতে হবে। আর এ কাজে তিনি সঙ্গী পাবেন কেবল যুব ও তরুণদের। এ লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু  খুবই সুচিন্তিতভাবে আওয়ামী লীগ নিয়ে অনেকটা একলা চলো নীতি নেন। আর তিনি প্রথমেই তার আওয়ামী লীগকে একটি তারুণ্যনির্ভর দল করেন। অন্যদিকে ছাত্রলীগ কর্মীদের ভবিষ্যতের যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলার পথ গ্রহণ করেন।

আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের পর বঙ্গবন্ধু সত্যি অর্থে পূর্ববাংলার মানুষের জন্যে তাঁর মূল কর্মসূচি দেন। কারণ, তিনি ততদিনে নিশ্চিত হয়ে গেছেন, তিনিই বাংলার একক নেতা হতে চলেছেন। এখন বাংলার মানুষকে মুক্ত করার দায়িত্ব তাঁর। তাছাড়া ১৯৫২ থেকে ভাষাভিত্তিক চেতনায় পথ চলে ততদিনে পূর্ববাংলায় একটি আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা দাঁড়িয়ে গেছে। এই জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ জনগোষ্ঠীকে তখন ওই জাতীয়তাবাদ কেন্দ্রিক ভূখণ্ড ও অর্থনৈতিক কাঠামো দিতে হবে। ভবিষ্যৎদ্রষ্টা রাজনীতিক হিসেবে বঙ্গবন্ধু তাই কোনও ভুল পথে এগোননি। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ কেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করার জন্যে নিজস্ব অর্থনীতি এবং ওই অর্থনীতি আপন ভূমিতে পরিপুষ্ট যাতে হতে পারে তার জন্যে নিজস্ব স্বাধীন ভূখণ্ড গড়ার কর্মসূচি হাতে নেন। বঙ্গবন্ধুর এই কর্মসূচিই ছিল ৬ দফা। ৬ দফাকে বিশ্লেষণ করলে বিস্মিত হতে হয়। একটি স্বাধীন দেশের ভেতর বসে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে কীভাবে নিজস্ব অংশের স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়া যায় তার সবথেকে বড় উদাহরণ পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ছয় দফা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রায় ষাট বছর ধরে ভারতের স্বাধিকার আন্দোলনের জন্যে সংগ্রাম করে। এই ষাট বছরের সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে তারা একের পর এক কর্মসূচি দিয়েছে কিন্তু ৬ দফার মতো এমন সুচিন্তিত কর্মসূচি তারা দিতে পারেনি। ছয় দফা কীভাবে এবং কতটা সুচিন্তিত কর্মসূচি ছিল সে ব্যাখ্যা করতে গেলে এই লেখা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। বরং দেখা যাক, বঙ্গবন্ধু তাঁর এই সুচিন্তিত কর্মসূচিকে জনগণের দাবিতে পরিণত করতে কোন পথে এগিয়ে ছিলেন। ১৯৬৬ সালের এই ছয় দফা ১৯৭০-এর নির্বাচনের ভেতর দিয়ে জনগণের সম্পদে পরিণত হয়। তবে এর আগে এই ছয় দফা বাংলার মানুষের প্রাণের দাবি ও রক্তের দাবিতে পরিণত হয়েছিল ১৯৬৬-এর ৭ জুনের হরতালে মনু মিঞাসহ অন্যরা যখন তাদের বুকের রক্ত রাজপথে ঢেলে দেয়- ওই জীবনদানের বিনিময়ে। সেদিন কিন্তু ছয় দফাকে এই প্রাণের দাবিতে পরিণত করার কাজে বঙ্গবন্ধু নির্ভর করেছিলেন তরুণ ও যুবকদের ওপর। সত্যি অর্থে সেদিন ২৭ বছরের তরুণ শেখ ফজলুল হক মনিই এই হরতালের নেতৃত্ব দেন। সেদিন এই তরুণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শুধু যে হরতাল সফলের সব কাজ করেছিলেন তা নয়, বঙ্গবন্ধু জেল থেকে যে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার সবই তিনি বাস্তবায়িত করেছিলেন। এমনকি সেটা যে বাস্তবায়িত হচ্ছে তাও তিনি হরতালের আগের রাতে অর্থাৎ ছয় তারিখ রাতে ৩২ নম্বরের পাঁচিল টপকে ঢুকে বেগম মুজিবকে জানিয়ে এসেছিলেন। কারণ, ইতিহাসের এই আরেকটি চাপা পড়া অধ্যায় সব দেশে সব কালে থেকে যায়। সেটা হলো পেছন থেকে শক্তি, সাহস ও বুদ্ধি জোগানো। যে কাজটি বাংলাদেশ সৃষ্টির সংগ্রামে বেগম মুজিব করেছিলেন। তাই ৭ তারিখ যে সফল হরতাল হতে যাচ্ছে সে বিষয়ে সবকিছু শেখ ফজলুল হক মনি সেদিন বেগম মুজিবকে জানিয়ে এসেছিলেন রাতের অন্ধকারে দেয়াল টপকে ওই বাড়িতে গিয়ে। প্রকাশ্যে সেদিন তাঁর যাওয়ার উপায় ছিল না। প্রকাশ্যে গেলে তিনি গ্রেফতার হয়ে যেতেন। বঙ্গবন্ধু সেদিন যৌবনের ওপর নির্ভর করে ভুল করেননি। ইতিহাসের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে, অনেক ঘটনা বিশ্লেষণ করে আজ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়, সেদিন যে মনু মিঞাদের মতো কর্মী তৈরি হয়েছিলেন তেজগাঁও শ্রমিক এলাকায় আর তারা যে ৭ জুনের হরতালে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন, এর পেছনে তরুণ শেখ ফজলুল হক মনির অবদান অনেক বড়। কারণ, জেল থেকে পাঠানো নির্দেশ অনুযায়ী তেজগাঁও শ্রমিক এলাকায় হরতালের সপক্ষে নিজে কাজ করেছিলেন সেদিন শেখ ফজলুল হক মনি। বঙ্গবন্ধুও সেটা বুঝতে ভুল করেননি। তাই দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার পরে বাম নেতারা যেখানে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নানানভাবে কাজ করছেন সে সময়ে বঙ্গবন্ধুর হয়ে কাজ করছেন যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি। সত্যি অর্থে স্বাধীনতার আগেও ছাত্রদের পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার পেছনে শেখ ফজলুল হক মনির ভূমিকা অনেক বেশি ছিল। আর বঙ্গবন্ধু যে এই যুবনেতার ওপর শ্রমিক এলাকায় তাঁর সংগঠন গড়ে তোলার দায়িত্ব দিয়ে সঠিক কাজ করেছিলেন তার প্রমাণ মেলে ৭৩ ও ৭৪ সালের কয়েকটি ঘটনায়। হয়তো ইতিহাসের পাতায় কোনোদিন এগুলো পাওয়া যাবে না কিন্তু শেখ ফজলুল হক মনির ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা জানেন, ৭৩ ও ৭৪ সালে তেজগাঁওয়ে শেখ ফজলুল হক মনিকে হত্যার জন্যে কয়েকবারই হত্যাকারীরা চেষ্টা করে ( হত্যা চেষ্টাকারীরা সিরাজ সিকদার গ্রুপসহ বিভিন্ন বাম গ্রুপের লোক ছিল)। এমনকি একটি হত্যাচেষ্টার পর পরই শেখ ফজলুল হক মনি টেলিফোন করে তৎকালীন বাম নেতা কাজী জাফর আহমদকে বলেছিলেন, ‘এই জাফর শেষ পর্যন্ত তুই আমাকে হত্যার জন্যে লোক পাঠালি!’ ব্যক্তিজীবনে কাজী জাফরের সঙ্গে যথেষ্ট ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বন্ধুত্ব ছিল শেখ ফজলুল হক মনির। এর থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, বঙ্গবন্ধু সেদিন এই যুবনেতার ওপর শ্রমিক বেল্টের দায়িত্ব দিয়ে সঠিক কাজটিই করেছিলেন। কারণ, সেদিনের বামপন্থীরা তাঁর সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না বলেই তো তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন।

শুধু এই ছয় দফা বা শ্রমিকদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার দায়িত্ব নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু এই যুবক ও তরুণদের ওপর দিয়ে গিয়েছিলেন এক কঠিন দায়িত্ব। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শেষ অবধি অনেকেই হয়তো পাকিস্তানের সঙ্গে আপস করতেন, অনেকেই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়তেন। এমনকি নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধেও শুধু মোশতাক, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর গং ষড়যন্ত্র করেনি,  শাহ মোয়াজ্জেম, মিজান চৌধুরীসহ অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। তাই যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সেখানে অনেক ধরনের  সমস্যা বা জটিলতা দেখা দিতো। শুধু আপসকামিতা নয়, হঠকারী অনেক বামপন্থীরা দেশের ভেতর নানাভাবে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলে মুক্তিযুদ্ধকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা  শুরু করে দিয়েছিল। এমনটি ঘটতে পারে সেটা আগে থেকেই চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু তাঁর বিশ্বস্ত তরুণ ও যুবকদের দিয়েছিলেন অনেক গুরুদায়িত্ব। তারা যাতে এমন একটি বাহিনী গড়ে তোলে যারা শেষদিন অবধি যুদ্ধ করবে বাংলাদেশের মুক্তির জন্যে। আর সে ব্যবস্থা করে যান তিনি ২৬ মার্চে গ্রেফতার হওয়ার আগেই। শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে যাতে ছাত্র ও যুবনেতারা বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি শতভাগ আস্থাবান ও বিশ্বস্ত তরুণদের নিয়ে বিশেষ মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গড়ে তোলে তার সবকিছু বন্দোবস্ত তিনি করে যান বেশ আগে থেকেই। ১৯৭০-এর জনপ্রতিনিধি চিত্তরঞ্জন সুতারের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই বঙ্গবন্ধু এ ব্যবস্থা করেছিলেন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদ বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে যাবতীয় দিকনির্দেশনা নিয়েই ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, সেই ইতিহাস সবাই জানেন। বঙ্গবন্ধুর ওই নির্দেশ সেদিনের যুব ও তরুণ নেতারা সঠিকভাবে পালন করেছিলেন। তারা সারা দেশ থেকে ছাত্রলীগের ত্যাগী কর্মীদের নিয়ে যান ভারতে বা তাদের কর্মীরা ভারতের যে প্রান্তে জড়ো হয় সেখান থেকেই তাদের নিয়ে যান। আর ভারত সরকারের বিশেষ সহযোগিতায় তাঁদের দেরাদুনে বিশেষ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয় সেদিন। তাদের এই সামরিক ট্রেনিংয়ের বাইরে সবথেকে বড় কাজটি করতেন ওই সময়ের ছাত্র ও যুবনেতারা- যা ছিল রাজনৈতিক মোটিভেশনাল ট্রেনিং। আর এভাবেই তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন সেদিন মুজিব বাহিনী। মুজিব বাহিনী নিয়ে পরে অনেক ভুল ব্যাখ্যা বামপন্থী ও ডানপন্থী বুদ্ধিজীবীরা একযোগে করেছেন। কিন্তু ইতিহাসের সত্য হলো, বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনায় শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে এই বাহিনী গড়ে উঠেছিল মূলত দীর্ঘস্থায়ী মুক্তিযুদ্ধের পথে যদি বাংলাদেশ যায় সে সময় যেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যাতে সমান তালে এগুতে পারে সেই লক্ষ্যে। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীও এ সত্য উপলব্ধি করে এই বাহিনী যাতে সঠিকভাবে গড়ে ওঠে তার ব্যবস্থা করেছিলেন। তবে সবথেকে বড় দিক হলো সেদিন বঙ্গবন্ধুর এই যুব ও তরুণ নেতারা যেভাবে সমর বিজ্ঞানে পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন তা ছিল বিস্ময়কর। এই বাহিনীর ট্রেনিংয়ের তত্ত্বাবধায়ক জেনারেল উবান এক সাক্ষাৎকারে একথাও বলেন, শেখ ফজলুল হক মনির সমরনীতি সম্পর্কে জ্ঞান দেখে তিনি মাঝে মাঝে সন্দেহ করতেন, এই ব্যক্তি কোনোক্রমে কখনও পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিনা?

মুক্তিযুদ্ধের পরে অর্থাৎ স্বাধীনতার পরপরই যাতে যুবশক্তি বিপথগামী না হয় বরং দেশের যৌবন সংগঠিতভাবে জেগে ওঠার পথ পায় সেজন্যে  বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালেই শেখ ফজলুল হক মনিকে নির্দেশ দেন যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করতে। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের ভেতরই কতটা শক্তিশালী হয়েছিল তার প্রমাণ ১৫ আগস্টের পরে ধীরে ধীরে যে আওয়ামী লীগ গড়ে উঠেছে তার অধিকাংশ নেতা এসেছেন যুবলীগ থেকে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যৎ নেতা তৈরির পথটি তৈরি করতে ভুল করেননি। যৌবনে বসেই ভবিষ্যৎ নেতা তৈরির কাজটি শুরু তিনি যুব ও তরুণদের দিয়ে করিয়ে ছিলেন। আর এর থেকেই স্পষ্ট হয় কাজী নজরুলের মানসে আপসের পরিবর্তে যৌবনের প্রতীক যে নেতার ছবি আমরা পাই, সে নেতাই বঙ্গবন্ধু। আর নজরুলের মানস থেকেই বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনে এ সত্যকে ধারণ করেছিলেন, যৌবনে দাও রাজটিকা। 

 

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X