প্রণোদনা নিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই লজ্জাকর

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৫:৫২, জুন ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১৫, জুন ০৯, ২০২০

আনিস আলমগীরবাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের বয়স এখন প্রায় চার দশক হয়েছে। আমরা মনে করি চার দশকের মধ্যে গার্মেন্টস সেক্টর একটা শক্তিশালী ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। মালিকরাও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বর্তমানে মন্ত্রিসভায় অনেক মন্ত্রী আছেন, এমপি আছেন গার্মেন্টস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। স্বয়ং বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র নেতা, ২০০৫-২০০৬ মেয়াদে বিজিএমইএ’র সভাপতি ছিলেন এবং গার্মেন্টস মালিকদের গ্রুপ ফোরাম ও সম্মিলিত পরিষদের যৌথ কমিটির প্রেসিডেনশিয়াল সভাপতি। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এই শিল্পের সঙ্গে আছেন। বুঝাই যাচ্ছে সংসদ এবং সরকারের মধ্যে বিজিএমইএ’র সদস্যদের কতটা প্রভাব রয়েছে।
সরকারের মধ্যে তাদের প্রভাব আছে সে কারণেই মনে হচ্ছে বিজেএমইএ এখন সরকারের মধ্যে নিজেদের সুপার পাওয়ার কল্পনা করছে। দীর্ঘদিন গার্মেন্টস শিল্পে কোনও অশুভ কার্যকলাপ নেই, শ্রমিক আন্দোলন নেই, অন্তত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের গত ১১ বছর শান্তিপূর্ণভাবে তারা ব্যবসা করছেন। এখন তারা দেশের কোনও দুর্যোগ সহ্য করতে নারাজ। সাময়িক উত্থান-পতন সব শিল্প সেক্টরে আছে। সেটা ভুলে গিয়ে তারা শ্রমিক ছাঁটাইকে সবচেয়ে সহজ কাজ ধরে নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণের সহজ সমাধান ভাবছেন।

পাকিস্তানের সময়ের ইতিহাস বলে জুট সেক্টর আহামরি লাভজনক ছিল না। তবুও সরকার রফতানির বরাবরে বোনাস ভাউচার ব্যবস্থা চালু করে জুট সেক্টরকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কারণ তখনকার সময়ে জুট ফ্যাক্টরি ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান উপলক্ষ। লাখ লাখ শ্রমিক জুটমিলগুলোতে চাকরি করতো। জুট ব্যাগের বিকল্প সিনথেটিক ফাইবার ব্যাগ বের হওয়ায় পাটের বাজার মন্দা হয়েছে। তবুও আদমজীর মতো জুট কল চালু ছিল বাংলাদেশ আমলেও। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত সরকার মাত্র তিন দিনের নোটিশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে ২০০২ সালের ৩০ জুন আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দিয়েছিল। খালেদা জিয়ার সরকার বিশ্ব ব্যাংকের পরামর্শ এবং আর্থিক ঋণ সহায়তায় এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ পাটকল হিসেবে স্বীকৃত আদমজী পাটকল শ্রমিকদের কিছু বেনিফিট দিয়ে বিদায় করে দেয়।

তখনই উপলব্ধি করেছিলাম জাতির জন্য সঠিক নেতৃত্বের কি প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান মিল বন্ধ করার আগে শ্রমিক নেতাদের কিনে নেন। নেতৃত্বের অভাবে আদমজী শ্রমিকরা একটা প্রতিবাদ মিছিল পর্যন্ত করতে পারেনি। আদমজী পাকটলকে সরকারের ভর্তুকি দিতে হতো। ভর্তুকি দিয়ে পাটকল চালু রাখার পক্ষে ছিলেন না সাইফুর রহমান। তাই তিনি মিল বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং ছলে বলে কৌশলে সফল হয়েছিলেন। রাষ্ট্র মানুষের কল্যাণের জন্য, ব্যবসা করে লাভ করার জন্য নয়—এই দর্শনের বিএনপি সরকার এবং তার অর্থমন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমান বিশ্বাস করতেন না। তাই এত বড় গণবিরোধী নির্মম সিদ্ধান্ত নিতে তারা দ্বিধা করেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় সময় একটা কথা বলে থাকেন বাংলার মানুষ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে কিছু পায়। প্রধানমন্ত্রীর দাবিটি অহেতুক নয়। পাকিস্তানের ২৩ বছরে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে ১৩ মাস আর পূর্ব পাকিস্তানে দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষটা ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের চেয়ে কম ভয়াবহ ছিল না। গভর্নর আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম আতাউর রহমান খানকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ পাঠ করিয়েছিলেন ভুখা মিছিল থেকে ধরে এনে। আতাউর রহমানের মন্ত্রিসভায় দেখলো যে মানুষের হাতে টাকা-পয়সা নেই। সুতরাং বাজারে চাউল থাকলেও তারা কিনতে পারবে না।

তাই তারা মানুষের হাতে টাকা পৌঁছানোর জন্য সারা পূর্ব পাকিস্তানে টেস্ট রিলিফের কাজ আরম্ভ করেছিলেন। কেন্দ্র থেকে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ২০০ কোটি টাকা পূর্ব পাকিস্তানকে দিয়েছিলেন। ২০০ কোটি টাকা কিন্তু কম টাকা নয়। তখন সোনার ভরি ১২০ টাকা টাকা আর পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা সাড়ে চার কোটি। টেস্ট রিলিফের কর্মসূচিতে সারা পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামীণ রোড ঘাটের একটা নেটওয়ার্ক প্রথমবারের মতো গড়ে উঠেছিল। ঢাকা-আরিচা রোড হয়েছিল, নগরবাড়ী থেকে রাজশাহীর আর রাজবাড়ী থেকে খুলনা রোডের কাজ আরম্ভ হয়েছিল। দাউদকান্দি থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত রোড নির্মাণ করে চট্টগ্রাম থেকে আসা ট্রাঙ্ক রোডের সঙ্গে সংযোগ প্রদান করা হয়েছিল। কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে সিলেট রোডের কাজও তখন আরম্ভ হয়েছিল।

মূলকথা দেশের উন্নয়নের জন্য সড়ক-মহাসড়কের যে উন্নয়নের দরকার তা আওয়ামী লীগ আমলে শুরু হয়েছিল। আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ না এলে এবং আওয়ামী লীগ আর দুই-তিন বছর ক্ষমতায় থাকতে পারলে অনেক কাজ সম্পন্ন হতো। ওয়াপদা, বিআইডব্লিউটিএ-এর পত্তন হয় আওয়ামী লীগের হাতে। ১৯৫৬ সালের দুর্ভিক্ষ খুব সফলতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার মোকাবিলা করেছিল। আবার গ্রামীণসহ দেশের প্রধান সড়কগুলোর কাজও আরম্ভ করেছিল আওয়ামী লীগের আমলে। অতীত আওয়ামী লীগের এসব উন্নয়নের কথা বর্তমান আওয়ামী লীগ কেন বলে না বুঝে আসে না। তারা কি বাংলাদেশ আমলে বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল আর শেখ হাসিনার শাসনকাল ছাড়া পাকিস্তান আমলের আওয়ামী লীগের শাসনকালকে হিসাবের মধ্যে গণ্য করতে চায় না?

যাই হোক লিখছিলাম গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিক ছাঁটাই প্রসঙ্গে। চলতি জুন মাস থেকেই তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক। পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা নিয়ে এই ঘোষণা দেওয়া তো লজ্জাকর। শ্রমিকদের বেতন দিতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ কি তাহলে যথেষ্ট ছিল না? রুবানা হক বা অন্য কেউ সেই বিষয়েও কিন্তু কিছুই বলেননি। তিনি বলেছেন এখন নাকি ৫৫ শতাংশ প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজ হচ্ছে। তাতে ১০০ শতাংশ শ্রমিকের প্রয়োজন কী? করোনায় চীনে রফতানি আদেশ কমেছে ৫২ শতাংশ, বাংলাদেশের কমেছে ২ শতাংশ আর ভিয়েতনামের বেড়েছে ৭ শতাংশ। দুই শতাংশ রফতানি আদেশ ৪৫ শতাংশ প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি আনইউটিলাইজ থাকবে কেন? গার্মেন্টস মালিকদের হিসাব অনুসারে তো ৪৫ শতাংশ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কবলে পড়বে।

একবার তাদের আনলেন আবার বিদায় করলেন। আবার আনলেন, এখন বলছেন ছাঁটাই করে দেবেন। এই ব্যবহার তো আমেরিকার শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে যে ব্যবহার করছে তার চেয়েও নির্মম। পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে অগ্রসর করতে যে ভূমিকা এতো বছর রেখেছে, সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়ে তাদের প্রতি একটু হলেও দৃষ্টি আছে বুঝিয়েছে। আর এত বছর ধরে শ্রমিকদের শ্রম সস্তায় কিনে নিয়ে মালিকেরা যে ধনী থেকে ধনকুবের হয়েছেন, কানাডা-মালয়েশিয়া বা অন্যান্য স্থানে সেকেন্ড হোম খুলেছেন, তারা এই দুর্দিনে তাদের শ্রমিকদের কথা মনে রাখবেন না?

এই করোনাকালেও আমরা গার্মেন্টস শিল্প বিশ্বের বুকে আগের মতো টিকে থাকুক এই আশায় বিজেএমইএ নেতৃত্বের গার্মেন্টস খোলা-বন্ধ, বন্ধ-খোলার যে সিদ্ধান্তহীন কর্মকাণ্ড চললো, সারা দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিলো, রাস্তায় শ্রমিকদের দুর্দশার মধ্যে ফেললো, তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়েছে—সব দেখেও চুপ করে ছিলাম। কিন্তু শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়েও তো চুপ থাকা যায় না। এটাতো না-ইনসাফি হবে। গার্মেন্টস মালিকরা কি নিজেদের আইন, আদালত, নীতি, নৈতিকতা সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভাবছেন। বছরের পর পর রাষ্ট্র তাদের প্রটেকশন দিয়েছে তাহলে কার স্বার্থে?

আমরা গার্মেন্টস মালিক ও সরকারকে অনুরোধ করব—উভয় পক্ষ আলোচনা করে ছাঁটাই প্রক্রিয়া থেকে শ্রমিকদের বাঁচানোর একটা পথ বের করেন। এমন ভয়াবহ সময়ে দেশে এখন অস্থিরতা সৃষ্টি করা মোটেও উচিত হবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ