‘ধোলাই’ টাকার অর্থনীতি

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৬:০৬, জুন ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৮, জুন ১৩, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহশুরু হলো টাকা ধোলাই। বুড়িগঙ্গার কালো জল দিয়ে নোংরা কাপড় ধোলাই চলে। এখন নোংরা মানুষের জেব বা পকেট ভর্তি, কম বলা হলো, দালান ভর্তি টাকা ধবল করা হবে। মজুরি খুব বেশি না। একশতে দশ টাকা মাত্র। লুকিয়ে রাখার চেয়ে প্রকাশ্যে আনতে এই খরচা টাকার মালিকদের জন্য সামান্যই। বাংলাদেশ দরিদ্র থেকে যত ঊর্ধ্বমুখে ছুটছে ততই কালো রঙের টাকা বাড়ছে। আমরা নিজেদের ভারতকে টপকে সিঙ্গাপুর, কানাডার মতো ভাববো আর আমাদের পকেটে টাকার মেদ জমবে না, তাতো হতে পারে না। এই মেদ জমা টাকার রঙ কালো। কীভাবে টাকার মেদ জমে, কাদের জেব স্থূল হয় কালো টাকায়? প্রথমত ব্যবসায়ীরা এই রোগে আক্রান্ত হন। স্বেচ্ছায় আক্রান্ত বলা যেতে পারে। তারা পণ্য আমদানি-রফতানি, ঠিকাদারি কাজের যন্ত্রপাতি আনা নেওয়া, ক্রয়-বিক্রয়ে দরের কাগজে নয় ছয় করে টাকার একটি অঙ্ক আড়াল করে ফেলে। রাষ্ট্রকে আয়-ব্যয় হিসেবে দেখানোর সময় ওই টাকা অন্ধকারে রেখে দেয়। ফলে বৈধভাবে সেই কালো টাকা খরচের যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলে। ক্রমশ টাকা জমতে জমতে একেক জন ব্যবসায়ী টাকার কালো পাহাড় তৈরি করে ফেলে। শুধু ব্যবসায়ী নন, অন্যান্য পেশাজীবীও এই কাজটি করেন। আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ অন্যান্য পেশাজীবীর অনেকে তাদের নির্ধারিত বেতন, ফি’র সবটুকু আয়কর রিটার্নে দেখান না। না দেখানো অংশটি অব্যবহৃত থেকে যায় রাষ্ট্রের ভেতরে। এই টাকা যখন পর্বত পরিমাণ হয়, তখন রাষ্ট্র ভাবে অর্থনীতির স্বাভাবিক চক্রতে টাকাগুলোকে নিয়ে আসলে, বাজার চাঙ্গা হবে। বিনিয়োগ বাড়বে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এবার নিয়ে ষোল দফা এই ভাবনায় কালো টাকা ধোলাইর সুযোগ দেওয়া হলো।

অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে মাত্র ষোল হাজার কোটি টাকা ধবল হয়েছে। এরমধ্যে ২০০৭-০৮ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সাদা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব বিভাগ বরাবরই স্বপ্ন দেখে—কালো টাকার মালিকেরা পুঁজিবাজার, আবাসন বাজারে ঝাঁপ দিয়ে পড়বে। বাস্তবে রাজস্ব বিভাগের অভিজ্ঞতা স্বপ্নভঙ্গের। অন্ধকার চিন্তার মানুষেরা টাকা উড়িয়ে নিয়ে যায় তাদের দ্বিতীয় ভূমিতে। এই ভূমিতে জন্ম না নেওয়াতে সে ভূমিকা রাখতে পারেনি। টাকার ডাইনোসর হয়ে তার সেই সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। যতই আমরা বিজ্ঞাপন করি না কেন, দেশ পশ্চিম আর পূবের সেরা দেশ হয়ে গেছে বা যাচ্ছে, তাতে ভরসা রাখতে পারছেন না তারা। তাই উড়িয়ে দিচ্ছে টাকা। দ্বিতীয় দেশে টাকা থাকলে এমন মহামারির দিনে অন্তত বিশেষ উড়োজাহাজ বা উড়াল অ্যাম্বুলেন্সে করে তো সেই টাকার সঙ্গ সুখ পাওয়ার সুযোগ থাকে! তাই মাইকিং, প্রোপাগান্ডা করেও পুঁজিবাজারের প্রতি কালো টাকার ডাইনোসরদের দরদ আদায় করা যায়নি। কারণ পুঁজিবাজারের পতনে পিষ্ট হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা। সেখানে যারা খেলোয়াড় ছিলেন তারাইতো কালো টাকার ও টাকা পাচারের শীর্ষ মালিক। ভেতরের গোমর সব তাদের জানা। পুঁজিবাজারের প্রতি তাদের মায়া দেখানো, পুরোই লোকসান।

টাকা ধোলাই করার ধামাকা অফারের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পত্রিকায় আবাসন খাতের বিজ্ঞাপন বেড়ে গেছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে এখানে খুব বড় ধরনের বিনিয়োগ আসেনি উচ্চ, উচ্চমধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী কালো টাকার মালিকদের কাছ থেকে। কিছুটা এসেছে মাঝারি ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের কাছ থেকে। তারা তাদের দুর্নীতির টাকা ফ্ল্যাট কেনার মাধ্যমে হালাল করার চেষ্টা করেছে। যেহেতু দশ ভাগ সুদ দিলেই টাকার উৎস নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেরও প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে না। সেহেতু সরকারি, বেসরকারি পেশাজীবীরা আবাসন খাতে কিছুটা বিনিয়োগ করেছে। এবারও তেমন বিনিয়োগ হবে কিছুটা। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এই শ্রেণিটিও দেশীয় আবাসনে বিনিয়োগে রুচি অনেকটাই হারিয়ে বসে আছে। তাই খুব বড় ধরনের চাঞ্চল্য এই খাতে দেখা যাবে না। মুশকিল হলো, মাঝখান থেকে বিপদে পড়বে সাধারণ মানুষ। যারা তাদের কষ্টার্জিত টাকা, ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে মাথার ওপর একটা ছাদের স্বপ্ন দেখেন, তাদের নাগাল থেকে সরে যেতে পারে ফ্ল্যাটের স্বপ্ন। কালোকে ধবল করার খবর শুনে প্রায় রুগ্‌ণ হতে যাওয়া আবাসন খাত শরীর ঝাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ফ্ল্যাটের পড়তি দাম আবার বাড়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।

করোনাকালে স্বাস্থ্যখাতসহ বিভিন্ন খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি জনগণকে যেমন পীড়ন দিচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—জীবন ও জীবিকার টেকসইয়ের লড়াইতে দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করা হবে। সমাজ, রাষ্ট্র সমতা ও সাম্যের গান গাইবে। সেই প্রত্যাশায় কালো জল ঢেলে দেওয়া হলো দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকাকে স্বীকৃতি দিয়ে। অশ্রদ্ধা জানানো হলো, যারা তাদের সৎভাবে উপার্জিত টাকায় নিয়মিত প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কর দিয়ে যাচ্ছেন। সৎ করদাতা ও দেশপ্রেমিক জনগণকে অশ্রদ্ধা জানানো বাজেট সাফল্যের মাইলফলকে কি পৌঁছাতে পারে? অতীত ভরসা দেয় না।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ