বাজেট বাড়ালেই হবে না, স্বাস্থ্য এবং কৃষিখাতে নজর দিতে হবে

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:২২, জুন ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৩, জুন ১৮, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীগত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাংলাদেশের ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেট সংসদে পেশ করেছেন। স্বাভাবিক সময়ে একটা সুবিন্যস্ত বাজেট তৈরি করা যেখানে সুকঠিন, সেখানে করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী বিরাজমান অচলাবস্থায় বাজেট তৈরি কঠিনতর ব্যাপার। অনেকে বলছেন, বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়। করোনা যদি আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে চলে যায়, তবে বাজেট বাস্তবায়নে তেমন অসুবিধা হবে না। আর করোনা যদি ভয়াবহ রূপ নেয়, তবে কোনও কিছুই তো ঠিক থাকার কথা নয়।
বিএনপি বলেছে দেউলিয়া বাজেট। দেউলিয়া বলে রসিকতা করার কিছু নেই। গোটা বিশ্বটাই তো দেউলিয়ার পথে হাঁটছে এখন। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলনের কথা উল্লেখ করে এই বাজেটে প্রবৃদ্ধির ৮ দশমিক ২ ভাগ প্রাক্কলন নিয়ে অনেকে উপহাস করার চেষ্টা করেছেন। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ নেমে দুই কিংবা তিন শতাংশ হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এই হিসাব কি সঠিক?

ব্যবসা-বাণিজ্য কোনও কিছুই স্বাভাবিক নেই। সর্বত্র স্থবিরতা। আসলে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক ভাইরাসের কবলে পড়ে গোটা মানবসভ্যতা এখন হুমকির মুখে পড়েছে। ভাইরাসটি সম্পর্কে সঠিক ধারণাও এখনও বিশ্বের মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও একদিন এক কথা বলে। কেউ বলেছে বহুরূপী করোনা বহুবার রূপ পরিবর্তন করে এখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। আবার অনেকে বলছেন ভাইরাসটির ধ্বংসের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে আসছে। একবার বলছে উপসর্গহীন ভাইরাস বহনকারীরা সবচেয়ে বেশি রোগ ছড়াচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলছেন এই সমস্ত লোকের দ্বারা সংক্রমণের কোনও সম্ভাবনা নেই।

শত শত বৈজ্ঞানিক আর প্রতিষ্ঠান এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু কেউই এখনও ব্যাপকভাবে সফলকাম হয়নি। খোদা না করুক, এই ভাইরাস যদি প্লেগ আর স্পেনিশ ফ্লুর মতো দীর্ঘ সময়ব্যাপী থাকে তবে সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থা লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখন বলছেন তার দেশের সামরিক বাজেট করোনার পেছনে ব্যয় করার জন্য।

আমাদের এই অর্থবছরের প্রস্তাবিত মোট বাজেটের ৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্থাৎ ২৯ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ স্বাস্থ্যখাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় তিন হাজার কোটি টাকার মতো বেশি। বাজেটে করোনার জন্য থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এখন বাংলাদেশে করোনা ক্রমবর্ধমান। অবস্থা যদি ইতালি-স্পেন আর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মতো হয় তবে স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ ব্যয় করেও হয়তো কিনারা পাওয়া যাবে না। যে ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে সমন্বিত স্বাস্থ্যবিজ্ঞান গবেষণায় ১০০ কোটি টাকা। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী যারা কোভিড-১৯ মোকাবিলায় কাজ করছেন তাদের জন্য ৮৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।

যাহোক, সার্বিকভাবে অস্বাভাবিক অবস্থা। সুতরাং সে কথা বিবেচনায় রেখে কথা বলতে হবে। কলকারখানা দোকানপাট সব বন্ধ। লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে গেছে। যারা দিনমজুরি করতো তারা এখন কাজের অভাবে ভিক্ষা করছে। শত মানুষ হতদরিদ্রের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। আমরা কোথায় যাচ্ছি আর এর শেষ পরিণতি কী হবে, এসব কিছু চিন্তা করলে কোনও লোক স্থির থাকতে পারে না। যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের অস্থিরতা তো আরও বেশি।

জাতীয় বাজেট গতানুগতিক। পূর্বের চেয়ে ব্যতিক্রম তেমন কিছু নেই। অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিচালনার খরচ ইত্যাদির একটা হিসাব কষে  ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন, যা চলতি অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। টাকার অঙ্কে এই পার্থক্য ৬৬ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। বাজেটে তিন লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব প্রত্যাশা করা হয়েছে। রাজস্ব বিভাগ কিন্তু অনুরূপ অঙ্কের রাজস্ব করোনা পরিস্থিতিতে আদায় না হওয়ার কথাই বলেছেন। অবশিষ্ট টাকা বিদেশ থেকে এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার হিসাব করা হয়েছে।

বাজেট কোনও অর্থমন্ত্রী কাঁচা হাতে প্রণয়ন করেন না। সব দোষ ত্রুটির পরেও বাজেট সুন্দরই হয়। বাজেট বাস্তবায়নে সফলতা-বিফলতা নির্ভর করে এবার সবাই আশা করেছিল স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকবে। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দিয়ে খুবই জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্যখাতের কাজ আরম্ভ করতে হবে। এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলা দরকার, প্রত্যেক উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। কোনও কিছুই শূন্য থেকে আরম্ভ করতে হচ্ছে না। উপজেলা কমপ্লেক্স-এর ছোট ছোট হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়াতে হবে। আর প্রয়োজনীয় ডাক্তার নার্স নিয়োগ দিতে। প্রয়োজনীয় ইকুপমেন্ট সরবরাহ করে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে। তাহলে আপাতত উপজেলায় উপজেলায় ছোট ছোট হাসপাতাল ছোট ছোট স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিটে দাঁড়িয়ে যাবে। কিছু হলেই শহরে ছোটা বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে করতে মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এই কাজগুলো সমাধা করতে পারলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

একটি কথা বলা প্রয়োজন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষ বলুন, মিডিয়া বলুন, বুদ্ধিজীবী সমাজ বলুন কারও ধারণা ভালো নেই। গণস্বাস্থ্যের করোনা কিট হয়তো বাস্তবেই কাজের না। কিন্তু মানুষ সেটা বিশ্বাস করছে না কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর থেকে মানুষের আস্থা একদম উঠে গেছে। এই মন্ত্রণালয় ঘিরে যেভাবে একটি চক্র বছরের পর বছর অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, যেখানে এই মন্ত্রণালয়ে বছরের পর বছর চাকরি করে একটি গোষ্ঠী দুর্নীতিতে সহায়তা করছে, সরকারি হাসপাতালগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তাতে করে এই মন্ত্রণালয়টিকে সবাই ‘চোরের আখড়া’ হিসেবে দেখে।

গত কয়েক বছর স্বাস্থ্যখাতে বেশ কিছু দুর্নীতির কেলেঙ্কারির বিষয় সামনে এসেছে। গত বছরের শুরুতে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল স্বাস্থ্যখাতে ১১টি উৎস থেকে দুর্নীতি হয়, যার মধ্যে রয়েছে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পণ্য কেনাকাটা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোনও পদক্ষেপ নিয়েছেন কি? সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে অনুরোধ করবো শক্ত একজন মন্ত্রী নিয়োগ করে যেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়টিকে পুনর্বিন্যাস করা হয়। করোনার এই দুর্যোগ মুহূর্তে সার্জারি মাস্ক কিনতে কী জালিয়াতি করেছে সেটা তো সবাই খবরে দেখেছে।

বাংলাদেশের কৃষি গতানুগতিকভাবে চলছে। কিন্তু কৃষির প্রতি এবার বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। কারণ আমরা সবাই দেখছি চাল রফতানিকারক দেশগুলো চাল রফতানির ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করছে। আফ্রিকার দেশগুলো ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া থেকে চাল আমদানি করতো। কিন্তু ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া চাল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। সুতরাং আমাদের দেশ খাদ্য নিয়ে কোনও সমস্যায় পড়লে আমরা হয়তো এমন কোনও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে পারি। গত তিন মাসের অচলাবস্থায় অবাধ খাদ্য সরবরাহে কোনও অচলাবস্থা কেউ লক্ষ করেনি। সর্বোপরি বোরোর ভালো ফলন হয়েছে। আউশ এবং আমনের ভালো ফলন নিশ্চিত হলে খাদ্য নিরাপত্তা মজবুত হবে।

কৃষি মৎস্য প্রাণিসম্পদ ও খাদ্য নিরাপত্তা মিলিয়ে এবারের বাজেটে কৃষিখাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয় ২২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় এক হাজার পাঁচ কোটি টাকা বেশি। প্রধানমন্ত্রী এপ্রিল মাসে কৃষিতে যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলেছিলেন তা কিন্তু পাঁচ শতাংশ সুদে এবং তা জমির মালিকদের জন্য। এবারের বাজেটে বিষয়টি কীভাবে পেশ করা হয়েছে আমি নিশ্চিত হতে পারিনি এখনও। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে কৃষকদের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ হচ্ছে বর্গা কৃষক। প্রণোদনা যদি জমির মালিকানা দেখে দেওয়া হয়, তাহলে কৃষিতে সম্পৃক্ত অর্ধেক কৃষকের জন্য কোনও প্রণোদনা থাকে না। সুতরাং প্রণোদনায় বর্গা কৃষকদের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

এবার বাজেটে আরেকটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংক নির্ভরতা বেশি। মাফিয়া চক্রের মতো একটা চক্র সরকারের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো থেকে নানা কৌশলে টাকা নিয়ে ব্যাংকগুলোর ভিত্তিকে দুর্বল করে রেখেছে। তাই ব্যাংকগুলো এখন আর্থিক ও সুশাসন সংকটে রয়েছে। এই সংকট থেকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, নয়তো ব্যাংকগুলো অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ