মুখ থুবড়ে পড়লো কার?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:১৫, জুন ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৬, জুন ২১, ২০২০

আমীন আল রশীদহাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় কোনও রোগী মারা গেলে সেটি ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য হবে—হাইকোর্ট যেদিন (১৫ জুন) এই নির্দেশনা দিলেন, তার পরদিনই চট্টগ্রামে বিনা চিকিৎসায় শাওন নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত চার বছরের ওই শিশুকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করেন শিশুটির বাবা জাহিদ হোসেন। কিন্তু কেউ ভর্তি নেয়নি। অবশেষে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেতেই তার কোলে সন্তানের মৃত্যু হয়। তবে বিনা চিকিৎসায় শিশুটির মৃত্যু হলেও এই অপরাধে কারও শাস্তি হবে না। কারণ হাইকোর্টের ওই নির্দেশনাটি স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের ভার্চুয়াল চেম্বার আদালত।
প্রসঙ্গত, গত ৬ জুন দুপুরে ভিডিও কনফারেন্সে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে করোনা ইউনিট উদ্বোধনকালে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, করোনা মোকাবিলায় সকল সুযোগ-সুবিধা এবং চিকিৎসকদের সুরক্ষাব্যবস্থা থাকার পরও হাসপাতাল থেকে রোগী ফেরত দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভর্তি হতে না পেরে স্ত্রীর সামনে অসহায়ভাবে স্বামীর মৃত্যু ঘটেছে—যেটি অত্যন্ত মর্মান্তিক, অনাকাঙ্ক্ষিত। তথ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতাল থেকে রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ‘মানবতাবিরোধী কাজ’।

সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জনগণের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। অতএব কোনও নাগরিক বিনা চিকিৎসায় মারা গেলে রাষ্ট্র সে দায় এড়াতে পারে না।

আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে নাগরিকদের ক্ষোভ ও প্রশ্নের শেষ নেই। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী ধরে আমরা স্বাস্থ্য বা চিকিৎসাব্যবস্থার নামে কী গড়ে তুলেছি, সেটি করোনার মতো একটি অনুজীব এসে সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে মরে যাওয়ার একাধিক ঘটনা এরইমধ্যে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। মার্চের শেষদিকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকেও (মো. আলমাছ উদ্দিন) এই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। অথচ ১৯৭১ সালে নিজের জীবন বাজি রেখে তিনি দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর ঠিক আগের বছরে এসে, নিজের সেই স্বাধীন দেশে তাকে মরতে হলো বিনা চিকিৎসায়—এর চেয়ে লজ্জার, এর চেয়ে অপমানের, এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের কী হতে পারে!

অস্বীকার করার উপায় নেই বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মাতৃ ও শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ, টিকাদান কর্মসূচি, কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্যানিটেশনে যথেষ্ট সফলতা আছে। কিন্তু তারপরও করোনার প্রকোপ শুরুর পর পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রতিদিন যেসব ঘটনা ঘটছে, তা অতীতের সব সাফল্য ম্লান করে দিচ্ছে কিনা, সে প্রশ্নও আছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় নজর দেওয়া যাক:

১. বরিশাল নগরীর বান্দ রোডের রাহাত আনোয়ার হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. আনোয়ার হোসেন। ৭ জুন রাতেও তিনি এক রোগীর অস্ত্রোপচার করেন। এরপর নিজের শরীরেই করোনার উপসর্গ দেখা দিলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকায় আনা হয়। রাজধানীর তিনটি বড় হাসপাতালে ঘুরেছেন একটা আইসিইউ বেডের জন্য। কিন্তু পাননি। অবশেষে বাড্ডা এলাকার এএমজি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা পাওয়া গেলেও ততক্ষণে মৃত্যু হয় এই চিকিৎসকের।

২. করোনায় আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি মৃত্যু হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর পেডিয়াট্রিক সার্জারির অধ্যাপক ডা. গাজী জহির হাসানের। তার মৃত্যুসংবাদ শোনার পরে তার অনেক সহকর্মী এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। নিজেদের মেসেঞ্জার গ্রুপে (অফ দ্য রেকর্ডে পাওয়া) কেউ কেউ এমনও লিখেছেন, বিএসএমএমইউ নিজেকে দেশের সর্বোচ্চ হাসপাতাল দাবি করে। তাহলে তারা কেন এই সিনিয়র প্রফেসরের চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হলো?

৩. দেশের একটি বড় সরকারি হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের ভাষ্য: ‘খুব ভালো রেফারেন্স ছাড়া রোগী ভর্তি করা ভয়ানক টাফ। এমনকি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপকদেরও খাওয়া নাই। মিনিমাম প্রফেসর, ডিরেক্টর, জয়েন্ট সেক্রেটারি লেভেলের রিকমেন্ডেশন লাগবে। এক কথায় রীতিমতো ভয়াবহ অবস্থা। এফেক্টেড হলে আল্লাহ ছাড়া উপায় নাই।’ তবে শুধু হাসপাতালে রোগী ভর্তিই নয়, বরং সরকারি ব্যবস্থাপনায় করোনার পরীক্ষা করাতে গিয়েও নাগরিকদের কী ভীষণ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ কল্পনাও করতে পারবেন না।

৪. সম্প্রতি রাজধানীর মুগদা হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা করাতে গিয়ে আল আমিন নামে একজন যুবকের মুখ থুবড়ে পড়ে থাকার একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, আসলে কার মুখ থুবড়ে পড়লো, আল আমিনের নাকি পুরো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার? স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক—যে দেশ বৈশ্বিক নানা সংকটের ভেতরেও নিজের প্রবৃদ্ধি আর রিজার্ভ নিয়ে অহঙ্কার করে; যে দেশ নানা ক্ষেত্রে নিজেকে রোলমডেল হিসেবে দাবি করে—সেই দেশের একজন নাগরিকের হাসপাতালের সামনে এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি কতটা সঙ্গত, কতটা কাঙ্ক্ষিত?

গত অর্ধ শতাব্দীতে যারা সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বড় বড় পদে ছিলেন, তারা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে আসলে কী করেছেন; বেসরকারি খাতে যে বড় বড় হাসপাতালের অনুমোদন দেওয়া হলো, সেগুলো হাসপাতাল না কসাইখানা—কী হিসেবে গড়ে উঠলো, রাষ্ট্র সেটি কোনোদিন খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছে? নাকি ঠিকাদারের তালিকা অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার কেনাকাটা এবং সেই টাকার ভাগ নেওয়া আর সুন্দর সুন্দর ভবন নির্মাণকেই আমরা স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন হিসেবে ধরে নিয়েছি? যদি তাই হয়, তাহলে এখন করোনাকালে চিকিৎসা পেতে মানুষের যে অসহনীয় দুর্ভোগ, দুর্গতি—সেটিই হয়তো আমাদের প্রাপ্য।

বাজেট সমস্যা?

আমরা যখনই কোনও খাতের সমস্যা নিয়ে কথা বলি, তখনই অজুহাত খাড়া করা হয় যে পর্যাপ্ত বাজেট নেই, লোকবল সংকট ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো, গত ৪৮ বছরে স্বাস্থ্য খাতে যে বাজটে বরাদ্দ হয়েছে, তার কত শতাংশ খরচ হয়েছে, কোথায় খরচ হয়েছে এবং তার কত শতাংশ চুরি ও লুটপাট হয়েছে? এই খাতে শুধু পুকুর চুরি নয়, বরং বিশাল দিঘিও যে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে তার অসংখ্য উদাহরণ আছে এবং গণমাধ্যমে অসংখ্য রিপোর্ট হয়েছে। হাসপাতালে পর্দার মতো অতি সাধারণ জিনিসের কেনাকাটায়ও কী ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে, তা দেশবাসীর অজানা নয়। এরপর সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনাকাটার নামে ঠিকাদার-স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কী ধরনের নেক্সাস থাকে, কীভাবে শত কোটি টাকার শ্রাদ্ধ হয়, সে খবরও সচেতন নাগরিকদের জন্য নতুন কোনও খবর নয়। সুতরাং বাজেটে বরাদ্দ কম—এই অজুহাতে হাসপাতালে চিকিৎসা না দেওয়া বা চিকিৎসক সংকটের দোহাই দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ যা বাজেট ছিল, সেটির অর্ধেকেরও যে সঠিক ব্যবহার হয়নি, তা বুঝতে কারও জ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার হাসপাতালে যে পরিমাণ জনবল আছে, ১৭ কোটি লোকের দেশে সেটি পর্যাপ্ত নয় বটে, কিন্তু যারা আছেন, তারাও কি সঠিকভাবে নিজেদের দায়িত্বটা পালন করছেন? সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ ওষুধগুলোর কত শতাংশ রোগীদের দেওয়া হয় আর কত শতাংশ বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়, সে হিসাব কি আমরা জানি? মাঝেমধ্যে দু’চারজন চোর ধরা পড়লে এটা নিয়ে সংবাদ হয়। কিন্তু চুরি তো হয় বছরব্যাপী। কয়টা চুরির খবর গোয়েন্দা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সাংবাদিকরা রাখেন?

করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকেই দাবি উঠছিল স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। হয়েছেও তাই। অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে এবার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। এছাড়া করোনা মোকাবিলায় জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রশ্ন তো ওই একই জায়গায় গিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে যে, এই থোক বরাদ্দ আসলে কোথায় খরচ করা হবে, কে খরচ করবেন, কীভাবে করবেন এবং তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে কিনা? তাছাড়া উন্নয়ন ব্যয় দিয়ে যেসব কেনাকাটা করা হবে, তার কতগুলো আসলেই প্রয়োজনের নিরিখে আর কতগুলো কেনাকাটা হবে ঠিকাদারের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী; এই বরাদ্দের কত শতাংশ লুটপাট হবে; কত পার্সেন্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অসৎ লোকজনের পকেটে আর কত শতাংশ জনপ্রতিনিধিদের পকেটে যাবে—সে প্রশ্নের উত্তরও আমরা জানি না। যদি না জানি তাহলে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর খবরে উল্লসিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। বরং ধরে নিতে হবে, বেশি বরাদ্দ হয়েছে মানে এবার চুরির অংকটাও বাড়বে। এটি ঠেকানোর কোনও কৌশলের কথা আমরা শুনিনি বা স্বাস্থ্য খাতের বাজেট সঠিক পথে খরচ করা এবং চুরি ঠেকানোর কোনও প্রতিশ্রুতি অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়ও ছিল না।

কেন আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি তার কারণ হিসেবে অনেকে বলেন, দেশের ধনী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা দেশের হাসপাতালে (সরকারি হাসপাতালে তো নয়ই) চিকিৎসা করান না, তাই তারা এসব হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও সংকট সম্পর্কে ওয়াহিবহাল নন। কিন্তু করোনার কারণে তো ধনী-গরিব সবাইকে দেশের হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বড় বড় প্রাইভেট হাসপাতাল করোনার প্রকোপ শুরুর পরে বলতে গেলে শাটডাউট হয়ে গিয়েছিল। কোনও চিকিৎসা তারা দেয়নি। এখন কয়েকটি হাসপাতালে করোনার পরীক্ষা ও চিকিৎসা হচ্ছে।  

এরকম বাস্তবতায় একজন সিনিয়র সাংবাদিক সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, এমপিদের চিকিৎসা তার নির্বাচনি এলাকার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, মন্ত্রীদের চিকিৎসা নিজের জেলা সদর হাসপাতালে এবং সচিব ও আমলাদের জন্য সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল বাধ্যতামূলক করা হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত সত্যিই বদলে যাবে। সাধারণ মানুষও চিকিৎসা পাবে। যদি তা করা না যায়, তাহলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ভয়াবহতা কোনোদিন শেষ হবে না।

লেখক: সাংবাদিক।

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ