অসৎ হওয়ার জন্য প্ররোচিত হই আমরা

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৯:৪৪, জুন ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৬, জুন ২৬, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমান‘এমপির বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ ফেক নিউজ’- গত ফেব্রুয়ারিতে যখন কুয়েত-এর একটি পত্রিকার বরাতে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো কুয়েতে মানবপাচারের সঙ্গে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলের সম্পৃক্ততা নিয়ে খবর প্রকাশ করে, তখন এ ব্যাপারে মন্তব্য চাওয়া হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুরুর উক্তিটি করেছিলেন। এমন প্রতিক্রিয়াই প্রত্যাশিত ছিল।
এরপর জল অনেক দূর গড়ালো, পাপুল কুয়েতে গ্রেফতার হলেন, তাকে গ্রেফতার করে মানবপাচারের হোতা গ্রেফতার হয়েছে বলে কুয়েতি মন্ত্রী টুইটারে জানিয়েছেন, এখন আর এটা অস্বীকার করা যাচ্ছে না। এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ‘স্বাভাবিকভাবে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা, খুবই হতাশাজনক। এটি নিয়ে কুয়েতে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হওয়া উচিত যে পরীক্ষিত লোক ছাড়া জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করা ঠিক না’।
একজন মানুষ যখন সরকারি দলের হয়ে মনোনয়ন পায়, তার স্ত্রীও হন সেই দলের সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়নপ্রাপ্ত এমপি, তখন তাদের ব্যাপারে সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল না এটা মনে করার কোনও কারণ নেই। তাহলে আমরা এটা যৌক্তিকভাবেই অনুমান করতে পারি তাদের ব্যবসার ধরন এবং কর্মকাণ্ড  সম্পর্কে সরকারের কাছে তথ্য ছিল। যদি সেটা নাও থেকে থাকে তাদের বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ ওঠার পরও তো কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ ওঠার পরে সেটাকে উড়িয়ে না দিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসেই যদি তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হতো তাহলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে আজ এই ভয়ঙ্কর লজ্জায় পড়তো না।
সব অবৈধ ব্যবসার ফলে মানুষের জীবন খারাপভাবে প্রভাবিত হয়, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই সব ব্যবসার কারণে মানুষের জীবন সমানভাবে দুর্বিষহ হয় না। পাপুলের মানবপাচারের ঘটনা এই দেশের হাজার হাজার নিরীহ শ্রমিকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। সেটা কেমন তার একটু বর্ণনা দেশের একটি জাতীয় দৈনিক থেকে উদ্ধৃত করছি-
‘নির্মম নির্যাতন, দিনের পর দিন খাবার না দেয়া, অকথ্য প্রহার ছিল এমপি পাপুলের টর্চার সেলের নিত্যচিত্র। বিদেশ বিভুঁইয়ে এমন নির্যাতন সইতে না পেরে কত লোক যে সংজ্ঞা হারাতো তার ইয়ত্তা নেই। এমপি পাপুলের কাজ করতে না চাইলেই রুমে আটকে রেখে মারতো। অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতো। খাবার দিতো না। পরে ক্ষুধার যন্ত্রণায় আবার কাজ করতে চাইলে মাসে ৩শ’ দিনার দিতে হতো পাপুলের লোকজনকে। আমাদের মাসে ১৪০ দিনার বেতন দেয়ার কথা থাকলেও কুয়েতে এসে দেখি মাসে নব্বই দিনারও আয় হয় না। উল্টো প্রতিদিন পাপুলের লোকজনকে দশ দিনার করে দিতে হতো’। ( ১৭ জুন, মানবজমিন)
জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়টা ব্যয় করে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবন ত্যাগ করে, শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে যে মানুষগুলো বিদেশে গিয়ে আমাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে সেরকম হাজার হাজার মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে তদন্ত না করেই রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী শুরুতেই ‘ফেক নিউজ’ বলার চেষ্টা করলেন। অথচ কুয়েত কিন্তু আলোচিত এমপির সঙ্গে জড়িত তাদের দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবছর সমাজের নানা ক্ষেত্র থেকে শোরগোল করা হয়, কিন্তু কালো টাকা সাদা করা বন্ধ থাকে না। এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় কী বলা হয়েছে দেখে নেওয়া যাক -
‘প্রথমত দেশের আইনে যাই থাকুক না কেন, আগামী পয়লা জুলাই ২০২০ থেকে ৩০ জুন ২০২১-এর মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাগণ আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং (দালানকোঠা), ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা অন্য কোনও সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর প্রদান করলে আয়কর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না।’
বিগত বছরগুলোর সঙ্গে এই বছরের কালো টাকা সাদা করার সুযোগের একটা বড় পার্থক্য আছে। আগে ফ্ল্যাট কেনা বা এরকম দু-একটা ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য ছিল। এবং কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কর দেওয়া এবং তার সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা যুক্ত করা ছিল। কিন্তু এবার মাত্র ১০% কর দিয়েই টাকা সাদা করা যাবে এবং সেই টাকা নগদ রাখা যাবে, সঞ্চয়পত্র কেনা যাবে। আমরা মনে রাখবো এই দেশে যারা সৎভাবে কর দেয় উপার্জনের পরিমাণ অনুযায়ী তাদের ৩০% পর্যন্ত কর দিতে হয়। এখানেও রাষ্ট্র দাঁড়িয়েছে অসৎ মানুষের পাশে।

খেলাপি না হয়ে নিয়মিত ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেন, এমন গ্রাহকদের বছর শেষে মোট পরিশোধিত সুদের ১০ শতাংশ রিবেট প্রদানের বিধান ছিল এতদিন। এবার কিছু দিন আগে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভালো গ্রাহকদের একমাত্র সুবিধাটিও তুলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণের সুদ হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। অথচ আমরা সব সময় দেখি বিশেষ পুনঃতফসিল, বিশেষ পুনঃগঠন, সুদ মওকুফ, ডাউনপেমেন্টের শর্ত শিথিলসহ দেশের বড় বড় ঋণখেলাপিদের প্রতিনিয়ত ছাড় দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব সুবিধা নিয়ে আবার তারা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়, যার পরিণতি কী হবে সেটাও আমরা জানি।
পৃথিবীর সর্বোচ্চ ধনী হয়েছিলেন এমন দু’জন ধনকুবের আমেরিকার বিল গেটস ও মেক্সিকোর কার্লোস স্লিম। বিল গেটস ধনী হয়েছেন যুগান্তকারী অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজের মালিক হিসেবে, আর কার্লোস স্লিম মূলত একজন টেলিকম ব্যবসায়ী।
শুধু নিজের প্রতিভা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, আর পরিশ্রম দিয়ে একেবারে সাধারণ অবস্থা থেকে পৃথিবীর শীর্ষ ধনীতে পরিণত হয়েছেন বিল গেটস। কার্লোস স্লিমের গল্পটা কিন্তু এমন নয়।
এ ভদ্রলোক পৃথিবীর শীর্ষ ধনী হয়েছেন মেক্সিকোর ক্ষমতাসীন সরকারের ছত্রছায়ায়, তার অনুকূলে করা নানা রকম অন্যায় আইন এবং অন্যায় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে।
মোটামুটি সুস্থ, সৎ, প্রতিযোগিতামূলক কোনও বাজার ব্যবস্থা থাকলে কার্লোস স্লিম পৃথিবীর সর্বোচ্চ ধনী হয়ে ওঠার প্রশ্নই আসতো না। শুধু তাই-ই নয়, এই ভদ্রলোককে অন্যায় সুবিধা দিতে গিয়ে মেক্সিকোর জাতীয় আয় ২০০৫ থেকে ২০০৯- এই চার বছরে কম হয়েছে ১১ লাখ কোটি টাকারও বেশি।
বিল গেটস এবং কার্লোস স্লিমকে এভাবে তুলনা করা হয়েছে ‘হোয়াই নেশনস ফেইল: দ্য অরিজিনস অব পাওয়ার, প্রসপারিটি অ্যান্ড পভার্টি’ নামের বইটিতে। নানা কারণে বইটি এক অতি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ আমাদের মতো দেশের মানুষের জন্য।
বইটির লেখকদ্বয়, ড্যারন এসেমাগ্লু এবং জেমস এ রবিনসন অসাধারণ সব যুক্তি তথ্য-উপাত্ত উদাহরণ দিয়ে আমাদের বুঝিয়েছেন কেন একটা দেশ সমৃদ্ধশালী হয়, আবার কেনই বা একটা দেশ গরিব থাকে, ব্যর্থ হয়।
উল্লিখিত দুই ধনকুবেরকে আলোচনায় এনে তারা খুব চমৎকারভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন কেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী থাকা একটা দেশ পৃথিবীতে নানা দিকে নেতৃত্ব দেয়, আর আরেকটা দেশ পড়ে থাকে অনেক অনেক পেছনে। যাদের জনগোষ্ঠীর বিরাট একটা অংশের জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে সীমান্ত পেরিয়ে আমেরিকায় ঢুকে যাওয়া।
এর ব্যাখ্যা লেখকরা দিয়েছেন। তারা বলেন, একটি শিশু আমেরিকায় জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠার সময় একটা বিষয় খুব স্পষ্টভাবে দেখে, সেই দেশে সে তার মেধা, যোগ্যতা ও পরিশ্রম অনুযায়ী ফল পাবে। ওই দেশ মানুষের উদ্যম, সৃজনশীলতাকে মূল্যায়ন করে।
এমনকি এসব যোগ্যতা থাকলে সে বিল গেটসের মতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীতেও পরিণত হতে পারে। তাই একটা আমেরিকান শিশু সর্বোচ্চ মনোযোগ দেয় তার মেধা, যোগ্যতা এবং পরিশ্রমের দিকে। এভাবে সে তার রাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও অনেক বেশি অবদান রাখতে পারে।
ওদিকে মেক্সিকোতে জন্মে, বেড়ে ওঠা একটা শিশু দেখে সেই সমাজে তাকে যদি সফল কিংবা ধনী হতে হয়, তাকে সরকারের সঙ্গে এক ধরনের যোগসাজশ তৈরি করতে হবে। তার মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি কিংবা পরিশ্রমের তেমন কোনও মূল্যায়ন ওই দেশে হবে না।
তাই বেড়ে ওঠার সময় একজন মেক্সিকান তার মেধা, যোগ্যতা, পরিশ্রমের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার বদলে তার জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় কীভাবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার ওই চক্রের মধ্যে ঢোকা যায়।
একটা রাষ্ট্রের বিপুল জনগোষ্ঠী যখন তার শ্রম এবং উদ্ভাবনী কাজ বাদ দিয়ে দেয়, সেই জাতির অর্থনীতি এবং অন্যান্য সবকিছু ধাপে ধাপে ভেঙে পড়তে বাধ্য। মেক্সিকোর ক্ষেত্রে ঠিক তাই হয়েছে।
উপরের তিনটা ঘটনা খুব সাম্প্রতিক বলে বেছে নিয়েছি, যদিও এর চেয়ে অনেক বড় এবং উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে, যেগুলো এখানে উল্লেখ করতে পারতাম।
এই দেশে জন্মে যে শিশু বেড়ে ওঠে সে দেখে এই রাষ্ট্রে সৎ হওয়া কম সুবিধাজনক তো বটেই, বহু ক্ষেত্রে বিপজ্জনক। ওদিকে অসৎ হওয়া এই রাষ্ট্রে শাস্তিযোগ্য বিষয় তো নয়ই; রাষ্ট্র পাশে দাঁড়িয়ে নানারকম সুবিধা দেয়। এটা কি তাহলে অসৎ হওয়ার রাষ্ট্রীয় প্ররোচনা না? আলোচিত বইটির আলোকে তাহলে কি আমরা বুঝতে পারছি, এই দেশের অধঃপতনের কারণ কী, আর এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অধঃপতনের কোন অতলে আমরা হারাবো?

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ