বাড়ি বদলে যায়

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৫:০৮, জুন ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১১, জুন ২৮, ২০২০

আহসান কবির‘ঈশ্বর আছেন। অন্তত যাদের বাড়িঘর হয়, টাকা-পয়সা হয়, নানাদিকে সাফল্য, তাদের নিশ্চয়ই ঈশ্বর আছেন। না, যাদের কিছুই নেই তাদেরও সেই ঈশ্বরই ভরসা।’ (বাড়ি বদলে যায়, রমাপদ চৌধুরী)
‘বাড়ি বদলে যায়’ নামে লেখক রমাপদ চৌধুরীর একটা উপন্যাস আছে। ভাড়াটিয়া আর বাড়িওয়ালার চিরন্তন সম্পর্কের এই বাস্তবধর্মী উপন্যাসে বাড়িওয়ালার মনস্তত্ত্ব যেমন আছে তেমনি আছে ভাড়াটিয়াদের শ্রেণিবদলের কথাও। ভাড়াটেরা বাড়িওয়ালা হলেও হয়তো তাদের মনস্তত্ত্ব বদলে যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বলেছিলেন ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে রমাপদ রায়ও ঠিক তাদের বাইরে নন। যাদের কিছু নেই তারা ঈশ্বরের ওপর ভরসা করতেই ভালোবাসে। ভাড়াটিয়ারা সম্ভবত ‘যাদের কিছু নেই’ (বা সামান্য আছে) সেই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত!
রাস্তায় দেখা একটা বিজ্ঞাপন এবং বাসা দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লেখাটা শুরু করা যায়।

বিজ্ঞাপন: ছোট্ট ফ্যামিলির জন্য বাসা ভাড়া দেওয়া হয়। পশ্চিমমুখী বাসা। আলো বাতাস পর্যাপ্ত। স্কুল কলেজ হাসপাতাল আশেপাশে! সার্বক্ষণিক পানি, বিদ্যুৎ ও দারোয়ান সুবিধা। ভাড়া আলোচনা সাপেক্ষে!

বাস্তবে দেখার পর: দেড় রুমের বাসা। ছোট রুমটা মুরগির খোপ। ওটাই ড্রয়িং ডাইনিং। জানালা শেয়ারিং পাশের বাসার সঙ্গে। বড় রুমটাতে একটা বিছানা ফেলার পর আলমারি রাখলে আলনা রাখার জায়গা থাকে না। জানালা নাই। রান্না ও টয়লেটের ব্যবস্থা বাইরে! দিনে দুপুরে ও রাতে আধাঘণ্টা করে পানি ছাড়া হয়! বিদ্যুৎ বাড়িওয়ালার ইচ্ছেমতো। যা বিল আসে সব ভাড়াটিয়াদের কাঁধে এসে পড়ে। জুতো বাসার বাইরে রাখতে হবে যেন জুতো গুনে ভেতরে কয়জন থাকে সেটা বাড়িওয়ালা বুঝতে পারে। আর বাড়িওয়ালার অবর্তমানে তার বখাটে ছেলে ও মেয়ের উৎপাত ফ্রি।

উপন্যাস বা সিনেমাতে যেমনই থাকুক ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার সম্পর্ক বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেতিবাচক। সিনেমার নায়ক ও ভিলেনের মতো কিংবা মালিক ও শ্রমিকের মতো। কখনও সখনও মনে হয় বাড়িওয়ালা ভাড়াটের সম্পর্ক জেলখানার পাহারাদার ও বন্দি কয়েদিদের সম্পর্কের মতো। ভাড়াটে ও বাড়িওয়ালার সম্পর্ক শত বছর ধরে যেসব নিয়মের বেড়াজালে বন্দি আছে—

এক. পরিমিত পানি ব্যবহার করতে হবে। কল খুলে রাখলে শাস্তি।

দুই. রাত দশটার আগে বাসায় ফিরতে হবে। না আসলে বাইরে থাকতে হবে।

তিন. বেশি অতিথি আসা চলবে না। পানি ও বিদ্যুৎ বেশি খরচ হলে অতিরিক্ত বিলের টাকা দিতে হবে।

চার. দেয়ালে পিন গাঁথা যাবে না! দেয়াল ময়লা করা যাবে না। নির্দিষ্ট জায়গায় ময়লা ফেলতে হবে!

পাঁচ. ব্যাচেলর নিষিদ্ধ। ভাড়া পাঁচ তারিখের মধ্যে দিতে হবে।

এবার উল্টো দিক দিয়ে ভাবুন—

কোটি কোটি ভাড়াটের কথা চিন্তা করে সরকারের উচিত হবে বাসায় থাকার ট্রেনিং করানো। বাসা ভাড়া নেবার আগেই এই সার্টিফিকেট জমা দিয়ে ভাড়াটে হতে হবে। তারপর—

এক. কেমন করে দরজা জানালা নিঃশব্দে লাগাতে হয় শিখতে হবে। শিখতে হবে বাসার যত্ন কীভাবে নিতে হয়। মনে রাখতে হবে দেয়াল ময়লা করা ছোটলোকি।

দুই. ভাড়াটের ব্যবহারে বোঝা যাবে তার বংশের পরিচয়! পানি, বিদ্যুৎ আর গ্যাসের ব্যবহারে পরিমিতি আনতে হবে। মনে রাখতে হবে এটা জমিদার বা রাজার বাড়ি নয়। যেখানে সেখানে থুথু ফেলা চলবে না। বাবা মা না শেখালেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা প্রয়োজনে শিখে নিতে হবে।

তিন. ডিসিপ্লিন্ড মানতে হবে। রাত দশটার আগে বাসায় ফিরতে হবে! সন্ধ্যা ছয়টার পরে গেস্ট আসা নিষেধ এটা মানতে হবে। ভাড়াটের বাইরে যারা রাতে থাকবে তাদের নাম পরিচয় বাড়িওয়ালাকে জানাতে হবে।

চার. মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখতে হবে। চুরি ডাকাতি হলে বাড়িওয়ালা দায়ী থাকবে না।

পাঁচ. বাসায় প্রেম ও ডেটিং করা নিষেধ। অসামাজিক কার্যকলাপের প্রমাণ পেলে পুলিশে সোপর্দ করা হবে! ভাড়া বাসাকে নিজের বাসা মনে করে বাস করতে হবে।

এই হলো ভাড়াটে ও বাড়িওয়ালার পরস্পর বিরোধী মনঃস্তত্ত্ব!

আর আছে প্রচলিত আইন ও গল্প-উপন্যাস বা নাটক সিনেমা। নাটক সিনেমায় ভাড়াটের ছেলে আর বাড়িওয়ালার মেয়ে কিংবা বাড়িওয়ালার ছেলে আর ভাড়াটের মেয়ের মধ্যে প্রেম হয়, বিয়েও হয়। বাস্তবে যে এমন দুই একটা ঘটনা ঘটে না তেমনও না। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত কৌতুকটা এমন—

বাড়িওয়ালা: তোমার সাহস তো মন্দ না। ব্যাচেলর হয়ে বাসা ভাড়া নিতে এসেছ?

ভাড়া নিতে ইচ্ছুক: তাহলে আঙ্কেল আপনার বিবাহযোগ্য মেয়েকে একজন বিবাহিতর সাথে বিয়ে দিয়ে দিয়েন!

তবে বাড়িভাড়া সংক্রান্ত প্রচলিত আইনটা কেমন ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালাদের জন্য? যতই বলা হোক ‘ভাড়াটে বান্ধব আইন’, আসলে আইন এক্ষেত্রে বাড়িওয়ালাদের স্বার্থই রক্ষা করে। ‘ভদ্রপল্লীতে ঈশ্বর’ থাকার মতো আইনও ভদ্র-বড়লোকদের জন্য। আইন বড়লোকদের জন্য রক্ষাকবচ আর গরিবদের জন্য জালের মতো। একবার জড়িয়ে গেলে সহসা মুক্তি নেই। ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তান বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। পরের বছর এই আইনের অবসান ঘটলেও ১৯৬৩ সালে আবারও জারি করা হয় যা স্বাধীনতার পরও বলবৎ থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৬ সালে আবারও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে আবারও আইন জারি করা হয়, যা এখনও অব্যাহত আছে। এই আইনে বাড়িভাড়ার জন্য সেলামি নেওয়া অবৈধ। এক মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না। বেশি ভাড়া নেওয়া, আলো-বাতাস ঠিকমতো ভাড়াটে যদি না পায় তাহলে বাড়িওয়ালার শাস্তি হবে। বাড়ি ভাড়ার রশিদ দেওয়া বাধ্যতামূলক!

বাস্তবে কোনও ভাড়াটে যদি ভাড়া দিতে দেরি করেন তাহলে আদালত সাধারণত পনের দিনের নোটিশে ভাড়া দিতে বলেন ভাড়াটিয়াকে। না দিতে পারলে অবধারিতভাবে উচ্ছেদ আদেশ পেয়ে যান বাড়িওয়ালা। উচ্ছেদ হয়ে যান ভাড়াটে নিজেই। বাড়িওয়ালা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ান, বছরে এক-দুইবার তো অবশ্যই। সেলামি বা অগ্রিম নেন ইচ্ছেমতো। সেখানে আইন নীরবই থাকে! প্রতি জেলায় একজন সহকারী জজ থাকেন বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। সরকার বড় ধরনের আয়কর পান বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে। সম্ভবত বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন তাই মালিকদের স্বার্থই রক্ষা করে। ভাড়াটেদের এই আইন কতটা সুরক্ষা দেয় সেটা নির্ণিত নয়। তাই করোনাকালে ভাড়া দিতে না পারার ‘অপরাধে’ অনেককেই বাসা থেকে উচ্ছেদ করা গেছে। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে যে একজন মানুষ যিনি ৫০ বছর ঢাকা শহরে ছিলেন তিনি তিনমাস বাসাভাড়া দিতে না পারায় তাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। গ্রামের বাড়িতে রওনা হবার আগে টেলিভিশনের সাংবাদিককে তিনি বলেছেন,‘আমি ৫০ বছর ঢাকা শহরে ছিলাম। তবু এই শহর আমার হয়নি।’

নিজের ‘আশ্রয়’ না থাকলে শহর বা গ্রামকে নিজের মনে হয় না! রমাপদ চৌধুরী তার উপন্যাসে হয়তো সেকারণেই লিখেছিলেন—‘নিরাশ্রয়! একটা বাড়িই কী মানুষের আশ্রয়? শুধু ক’খানা ঘর? হয়তো তাই! এই সমাজ, এই সমাজ ব্যবস্থায়। তা নাহলে আজকের মানুষ সমস্ত জীবনেই অতৃপ্ত, অসুখী কেন? শুধু একটা আশ্রয়ের খোঁজে?’

এই আশ্রয়ের সন্ধানেই হয়তো থাকে মানুষ। বুঝুক আর না বুঝুক, কেউ কেউ হয়তো পায়, অধিকাংশ মানুষই পায় না!

করোনাকালে ঘরভাড়া মওকুফ করার ঘটনা যেমন আছে, যেমন আছে ভাড়াটিয়াদের সাহায্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার ঘটনা, তেমনি একাধিক বাসা থেকে ভাড়াটে উচ্ছেদের ঘটনাও আছে! ১৯৯২ সালের একটা ঘটনা বলে লেখাটা শেষ করি। ১৯৯১ সালে নৌবাহিনীর চাকরি হারাবার পর এই শহর নিজের মনে করে উদ্বাস্তু (!) হিসেবেই থেকে যাই এক বছর। ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছোটভাই কাম বন্ধু মাহবুব রাসেলের সহায়তায় প্রথম বাসা ভাড়া নেই মোহাম্মদপুরের ১৯৬ শাহজাহান রোডে তিনতলা ভবনের নিচতলায়। বাড়ির মালিক হিসেবে জানতাম তিতাসের কর্মকর্তা আমানউল্লাহ খান সাহেবকে। তিনমাস বাসা ভাড়া দিতে পারিনি বলে একদিন তিনি এসে বললেন—‘তোমার তিনমাসের ভাড়া দিতে যেয়ে আমি গরিব হয়ে যাচ্ছি কবির।’ ‘পরদিন কিছু একটা করবোই’ বলার পর উনি চলে গেলেন। আমি ভেবে পেলাম না উনি কীভাবে আমার ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন? রুমে তখন কিছু বই, পত্রিকা, ঘুমানোর জাজিম, বালিশ আর জগ গ্লাস ছাড়া কিছুই ছিল না। পরদিন ভোরে জাজিম তোষকের ভেতরে সবকিছু বেঁধে তিনতলার ছাদে ওঠার সিঁড়িতে রেখে আমি চলে এলাম বাসা ছেড়ে। পনের দিন পরে আমানউল্লাহ খান সাহেব আমাকে খুঁজে বের করলেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলের ১০৮ নম্বর রুম থেকে। বাসায় নিয়ে গেলেন। খাওয়ালেন। বললেন—‘আমি এই বাড়ির মালিক নই। ধরে নাও দেখভাল করি। নতুন করে জীবন শুরু করো। আশা করি টিউশনি করে হলেও বাসা ভাড়া দিতে পারবে!’

কী যে হয়ে গেলো আমার ভেতর! জীবন বদলে ফেললাম। একটু একটু করে ভাড়া শোধ করে দেবার চেষ্টা করছিলাম। ১৯৯৩ সালের ১৫ আগস্ট আমানউল্লাহ খান সাহেবের কাছে একটা ইতিহাস শুনলাম। আমার মনটা ‘আউলা’ হয়ে গেলো। ১৯৬ শাহজাহান রোডের তিনতলা ভবনের নিচ তলায় থাকতাম আমি, দ্বিতীয় তলায় ভাড়া থাকতেন মনোয়ারউদ্দীন সাহেব। তাকে সবসময়ে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে দেখতাম। আমানউল্লাহ খান সাহেব জানালেন—’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কামানের একটা গোলা দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল মোহাম্মদপুর পোস্ট অফিসের উল্টোদিকে গ্রীন হেরাল্ড স্কুলের দেয়ালে। একটা গোলা এসে পড়েছিল ১৯৬ শাহজাহান রোডের বাসায়। মনোয়ার সাহেবের দুই ছেলে খোকন ও আনিস মারা যায় সেদিন! কামানের আরেকটা গোলা এসে পড়েছিল শাহজাহান রোড থেকে কয়েক শত গজ পেছনে টিনশেড নামের জায়গায়। সেখানেও মারা গিয়েছিল কয়েকজন। তার মধ্যে একজন মনোয়ার সাহেবের কাজের মেয়ে!

ফেরেশতার মতো মানুষ আমানউল্লাহ খান সাহেব ১৯৯৯ সালে মারা যান। অল্প কয়েকদিন পর তার পরিবার ১৯৬ শাহজাহান রোডের বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বাধ্য হই আমরা, ভাড়াটিয়ারাও! মনোয়ার সাহেবও বাসা ছেড়ে চলে যান।

জানি না কেন এখনও ১৯৬ শাহজাহান রোডের বাসাটাকে ভুলতে পারিনি! ছেলেদের স্মৃতি বুকে নিয়ে মনোয়ার সাহেবও এখন আর বেঁচে নেই!

লেখক: রম্যলেখক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ