করোনা পরীক্ষা নিয়ে নিরীক্ষা করবেন না

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৬:২৪, জুলাই ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪০, জুলাই ০১, ২০২০

প্রভাষ আমিনকরোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ দুর্নীতি, অদক্ষতা, খামখেয়ালি, সমন্বয়হীনতা, পরিকল্পনাহীনতা, অমানবিকতার নানামাত্রিক তেলেসমাতি সৃষ্টি করেছে। তবে টেস্টের ক্ষেত্রে যেটা করেছে, সেটা রীতিমতো অপরাধ। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলে আসছে, টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট। যেহেতু করোনাভাইরাসের কোনও টিকা নেই, কোনও ওষুধ নেই। তাই টেস্ট করে করোনাভাইরাস বহনকারীদের আলাদা করেই এর বিস্তার রোধ করা বা অন্তত কমিয়ে রাখা সম্ভব।
কয়েকদিন আগে চীনের একটি বিশেষষজ্ঞ দল বাংলাদেশ সফর করে গেছে। তারা উহানে করোনা নিয়ন্ত্রণের চারটি সূত্র বলে গেছে; দ্রুত টেস্ট, দ্রুত শনাক্ত, দ্রুত আইসোলেশন এবং দ্রুত চিকিৎসা। তার মানে দ্রুত টেস্ট করতে পারলেই আসলে করোনা যুদ্ধের অর্ধেক জেতা হয়ে যায়। সেই চেষ্টাটাই আমরা করিনি। আমি জানি না, বাংলাদেশ বোধহয় শুরুর দিকে ‘নো টেস্ট, নো করোনা’ নীতি নিয়েছিল। অন্য সব বিষয়ের মতো করোনাকেও অস্বীকার করে বা চাপা দিয়ে পার পেতে চেয়েছিল। আমার এই মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়, ১১ জানুয়ারি আসে প্রথম মৃত্যুর খবর। আর বাংলাদেশে প্রথম শনাক্তের খবর আসে ৮ মার্চ, প্রথম মৃত্যু ১৮ মার্চ। উহানে জানুয়ারি মাসে করোনার বিস্তার ঘটলেও বাংলাদেশে আলোচনা শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাসে। তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, কোনও ভয় নেই। করোনা মোকাবিলায় আমাদের পূর্ণ প্রস্তুতি আছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও দিনের পর দিন ভিডিও কনফারেন্সে পূর্ণ প্রস্তুতির গল্প শুনিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের এক চিকিৎসক প্রথম ভিডিও কনফারেন্সে করোনা প্রস্তুতির ঘাটতি তুলে ধরেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই পূর্ণ প্রস্তুতির গল্পের জবাব দিয়েছেন বিএমএ মহাসচিব ও সরকার সমর্থক চিকিৎসক নেতা ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী। তিনি বলেছেন, শূন্য প্রস্তুতি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতির গল্প শুনিয়েছে। প্রস্তুতিটা যে সত্যি ‘শূন্য’ ছিল, তা আপনিও বিশ্বাস করবেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে করোনা টেস্ট শুরু হয় ২ হাজার কিট নিয়ে। ১৭ কোটি লোকের দেশে ২ হাজার টেস্টিং কিট! এই হলো পূর্ণ প্রস্তুতির নমুনা। আর এই ২ হাজার কিট দিয়ে আইইডিসিআর জাতিকে কুমিরের ছানা দেখিয়ে গেছে মাসখানেক। জনমতের প্রবল চাপে বাধ্য হয়ে আইইডিসিআর করোনা টেস্টের সুবিধার সম্প্রসারণ করে। পরে বেসরকারি পর্যায়েও করোনা টেস্টের সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। এখন দেশে মোট ৬৬টি ল্যাবে করোনা টেস্ট করা হয়; এরমধ্যে ৪৮টি সরকারি, ১৮টি বেসরকারি। তারপরও চাহিদার তুলনায় তা সামান্যই। এখনও দেশের ৪৩টি জেলাতেই করোনা টেস্টের সুবিধা নেই। বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন অন্তত ৩০ হাজার টেস্ট করার পরামর্শ দিলেও বাংলাদেশ করতে পারছে কমবেশি ১৭ হাজার।

করোনা যুদ্ধে টেস্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ করোনার বিস্তার ঠেকাতে টেস্টের কোনও বিকল্প নেই। ঝুড়িতে যদি একটা পচা আম থাকে, তাহলে দ্রুত সেটা ভালো আমগুলোকেও পচিয়ে ফেলবে। নিয়মটা হলো পচা আমটা চিহ্নিত করে সরিয়ে ফেলতে হবে। করোনাতেও তেমনি, সংক্রমিত মানুষটিকে চিহ্নিত করে আলাদা করে ফেলতে হবে, যাতে তিনি আর ভাইরাসটি ছড়াতে না পারেন। টেস্টের সুযোগবঞ্চিত একজন করোনা সংক্রমিত ব্যক্তি যদি নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ান, তাহলে দ্রুতই তিনি আরও অনেক মানুষকে সংক্রমিত করে ফেলবেন। তাই সন্দেহভাজন সবাইকে টেস্ট করে যত বেশি সংখ্যক সংক্রমিত মানুষকে চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করা যাবে, তত এর বিস্তার ঠেকানো যাবে। তার মানে আপনি টেস্টে বিনিয়োগ বাড়ালে চিকিৎসায় খরচ কমবে। অথচ একদম শুরু থেকে বাংলাদেশ করোনা টেস্টের ব্যাপারে চরম রক্ষণশীল। যখন বাংলাদেশে ২ হাজার কিট ছিল, তখন আইইডিসিআর’এ করোনা টেস্টের সুযোগ পাওয়া আর আমেরিকার ভিসা পাওয়া সমান দুরূহ ছিল। বিশাল ইন্টারভিউ দিতে হতো। সন্তুষ্ট হলেই সিরিয়াল মিলতো, তাও ৪/৫ দিন পরে। এমনও হয়েছে আইইডিসিআর’এর ইন্টারভিউতে ফেল করা মানুষ অন্য হাসপাতালে টেস্ট করে পজিটিভ হয়েছেন। একদম শুরুর দিকে তো শুধু বিদেশ থেকে আসা বা তাদের সংস্পর্শে আসা মানুষই কেবল ইন্টারভিউ দেওয়ার সুযোগ পেতেন।

করোনা টেস্টের সিরিয়াল পেতে লাগতো ৪/৫ দিন, রিপোর্ট পেতে লাগতো ১০/১৫ দিন। এমনও হয়েছে সিরিয়াল পাওয়া বা রিপোর্ট পাওয়ার আগেই আক্রান্ত ব্যক্তি মারা গেছেন। বেচারা মারা যাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণটাও জেনে যেতে পারেননি। করোনা টেস্ট নিয়ে একসময় যে অরাজকতা ছিল; তা অমানবিক, অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য, অগ্রহণযোগ্য। টেস্টের যোগ্য কিনা সে ইন্টারভিউ দিতেও ৭/৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। টেস্টের জায়গাগুলো এমন ভিড়াক্রান্ত থাকতো যে সেখানে গিয়ে নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকতো। পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে বটে, তবে এখনও টেস্ট করা এবং রিপোর্ট পাওয়া বিশাল ঝক্কির ব্যাপার। তদবির ছাড়া সহজে টেস্ট করা যায় না।

করোনা টেস্ট করার বিষয়টি যখন ভোগান্তির অপর নাম, তখন ‘আমরা সবাই করোনা পজিটিভ!’ শিরোনামে আমি লিখেছিলাম, আমরা সবাই যেন নিজেদের করোনা পজিটিভি ধরে নিয়ে সে অনুযায়ী আচরণ করি। কিন্তু বিষয়টি অত সহজ নয়। করোনা পজিটিভ ধরে নিয়ে ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। করোনা সার্টিফিকেট এখন অতি জরুরি কাগজ। প্রথম কথা হলো, হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে হলে এখন করোনা সার্টিফিকেট মাস্ট। করোনা পজিটিভ না হলে কোনও কোনও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যায় না। আবার নেগেটিভ না হলে অনেক হাসপাতালে নেয় না। এমনও হয়েছে, টেস্ট রেজাল্ট না পাওয়া চিকিৎসা বঞ্চিত হয়েছেন অনেকে, মারাও গেছেন। তাই কিডনি রোগীর জীবন বাঁচাতে হলেও করোনা রিপোর্ট লাগবে। রিপোর্ট না থাকলে কেউ ডায়ালিসিস করতে পারবে না। করোনা সংক্রমিত হলে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পাবেন। আর করোনায় মারা গেলে পাবেন ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা। তাই সরকারি কর্মকর্তারা জ্বর হলেই করোনা টেস্ট করতে ব্যাকুল হয়ে ছোটেন।
বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুহার ১ দশমিক ২ ভাগ মাত্র। কোনোরকমে জ্বর হয়ে বেঁচে গেলেই তো লটারি। বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেককেই ছুটি শেষে চাকরিতে যোগ দিতে হলে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট জমা দিতে হয়। দেরি হলে চাকরি হারানোর ভয়। তাই তারাও ব্যাকুল হয়ে ছোটেন করোনা টেস্ট করতে। সরকারি-বেসরকারি চাকুরেদের ব্যাকুল লাইন, চিকিৎসা পেতে অসুস্থ মানুষদের ব্যাকুল লাইন—সব মিলে করোনা টেস্টের জন্য উপচেপড়া ভিড়। প্রতিটি ল্যাবেই  স্যাম্পলের স্তূপ, রিপোর্ট পেতে পেতে ১০/১২ দিন অপেক্ষা। অনেকে হয়তো টেস্টের সিরিয়াল পেতে পেতে বা রিপোর্ট পেতে পেতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পজিটিভ থেকে নেগেটিভ হয়ে গেছেন। অনেকের হয়তো প্রথমবারের রিপোর্ট পাওয়ার আগেই দ্বিতীয়বার টেস্ট করার সময় চলে আসে।

শারীরিক সুস্থতা-অসুস্থতা ছাড়াও করোনা টেস্টের বিপুল চাহিদা প্রতারকচক্রকে অনুপ্রাণিত করে থাকবে। এই সুযোগে তারা মাঠে নেমে পড়ে। করোনা সংক্রমণে সরকারি চাকুরেদের প্রণোদনার ঘোষণার পর এক লেখায় আমি শঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম, যে দেশে সচিবরাও মুক্তিযোদ্ধার জাল সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরিতে সুবিধা নেয়; সে দেশে টাকার লোভে করোনার জাল সার্টিফিকেট দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেবে। হয়েছেও তাই। প্রণোদনা পেতে করোনা পজিটিভের জাল সার্টিফিকেট জমা দিয়ে ধরা খেয়েছেন রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালের কর্মচারী কুতুবে রাব্বানী। অতি লোভে বেচারাকে এখন জেল খাটতে হচ্ছে। এছাড়া মুগদা এলাকা থেকে করোনা টেস্টের জাল রিপোর্ট তৈরির সঙ্গে জড়িত এক চক্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা পাঁচ হাজার টাকা দিলেই আপনার চাহিদামতো ‘নেগেটিভ’ বা ‘পজিটিভ’ রিপোর্ট সরবরাহ করে। জেকেজি নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারের অনুমতি নিয়ে স্যাম্পল সংগ্রহ করতো। কিন্তু সংগ্রহ করা স্যাম্পল তারা ফেলে দিতো এবং মনগড়া রিপোর্ট বানাতো। করোনা টেস্ট নিয়ে এই তেলেসমাতিই বলে দেয়, সাধারণ মানুষের জন্য এটা কত দরকারি।

করোনা টেস্ট শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, দরকারি সরকারের জন্যও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ সবাই বারবার বলছেন, করোনা মোকাবিলার প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র এর বিস্তার রোধ। কারণ করোনার যেহেতু ওষুধ নেই, তাই একবার ছড়িয়ে গেলে বিপুল সংখ্যক মানুষের চিকিৎসা দেওয়া কঠিন। আর বিস্তার রোধের জন্য দরকার অনেক বেশি টেস্ট। কিন্তু বাংলাদেশ শুরু থেকেই টেস্টের ব্যাপারে রক্ষণশীল। তারা বোধহয় ভাবছেন, বেশি টেস্ট করলে বেশি আক্রান্ত পাওয়া যাবে, তাতে সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। কিন্তু করোনার জন্য তো সরকার দায়ী নয়। করোনার বিস্তার ঠেকাতে না পারা এবং যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারা সরকারের জন্য ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হবে। সরকারের সাফল্য হবে যত বেশি সংখ্যক টেস্ট করে করোনা আক্রান্তদের শনাক্ত করা এবং তাদের বিচ্ছিন্ন করা, যাতে তারা করোনা ছড়াতে না পারে। টেস্টের সুযোগ না পাওয়া করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবাধে ঘুরতে দেওয়া মানে একটা বোমাকে ছেড়ে দেওয়া।

টেস্টের হিসাবে বাংলাদেশ বরাবরই পিছিয়ে। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা তো বটেই, বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে টেস্টে আমরা পিছিয়ে। লাখের বেশি আক্রান্ত এমন ১৮টি দেশের মধ্যে মেক্সিকোর পর সবচেয়ে কম পরীক্ষা হয় বাংলাদেশে। জনসংখ্যার অনুপাতে টেস্টে ২১৫টি দেশের মধ্যে বালাদেশ ১৪৭তম। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ লাখে টেস্ট হয় ৮৯ হাজার ৩৫১ জন, ইতালিতে ৮৩ হাজার ৫৮৫ জনে। আর বাংলাদেশে কত জানেন? একটু ধারণা করুন। বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখে টেস্ট হয় মাত্র ৪ হাজার ২৯ জনের। এই অবস্থায় করোনা টেস্টের সুবিধা যখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার এবং দাবি; তখন সরকার এর রাশ টেনে ধরার চেষ্টা করছে। এতদিন সরকারিভাবে বিনামূল্যে করোনা টেস্ট করা হলেও এখন আর সেই সুযোগ থাকছে না। হাসপাতালে গিয়ে টেস্ট করলে ২০০ টাকা, বাসায় বসে করালে ৫০০ টাকা দিতে হবে। সরকার যে ব্যবসা করার জন্য এই ফি নিচ্ছে বা করোনা টেস্ট করতে গিয়ে সরকার ফতুর হয়ে যাচ্ছে; ব্যাপারটি তেমনও নয়। একটি আরটি পিসিআর টেস্ট করতে সরকারের খরচ হয় সাড়ে ৩ হাজার টাকা। সেখানে ২০০ টাকা সত্যি টোকেন ফি। সরকারের দাবি হলো, বিনামূল্যে হওয়ায় করোনা টেস্টিং কিটের বিপুল অপচয় হয়। এখন যত টেস্ট হয়েছে, তাতে শনাক্তের হার মাত্র ২০ ভাগ। তার মানে ৮০ ভাগই নেগেটিভ আসে। এটাকেই সরকার অপচয় মনে করছে। কিন্তু এতে তো সরকারের খুশি হওয়ার কথা যে বাংলাদেশে সংক্রমণের হার কম। তবে এই ২০ ভাগ, ৮০ ভাগের হিসাবের একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। করোনা আক্রান্তরা ১৪ দিন বা ২১ দিন পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় টেস্ট করায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নেগেটিভ আসে। শুধু প্রথমবার করানো টেস্টের ফলাফল বিবেচনায় নিলে সংক্রমণের হার আরও অনেক বেশি হবে।

বিনামূল্যে করার সুযোগ ছিল বলেই সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে, সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালে টেস্ট করাতে গেছেন বলে আমার মনে হয় না। আর উপসর্গ না থাকলে তো সাধারণ মানুষ টেস্ট করার সুযোগই পায়নি। বরং এমন অনেককে আমি চিনি যারা সকল লক্ষণ নিয়ে ভয়ে হাসপাতালে যাননি বা আশেপাশের লোকজন জেনে গেলে হয়রানি হতে পারেন, এই ভয়ে বাসা থেকে স্যাম্পল দেননি। তারপরও অপচয় হয়েছে। প্রভাবশালীদের অনেকে কোনও উপসর্গ না থাকা সত্ত্বেও সাবধানতা হিসেবে পরিবারের সবার, এমনকি ড্রাইভার, মালি, গৃহকর্মী সবার টেস্ট করিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে হয়তো শতভাগ নেগেটিভ এসেছে। আবার কোনও পরিবারে একজনের জ্বর দেখে সবার টেস্ট করিয়েছেন। আবার এক ল্যাবে হয়তো পজিটিভ এসেছে, ভয়ে তিনি আরও একাধিক ল্যাবে টেস্ট করিয়েছেন। কারণ দ্রুত নেগেটিভ রিপোর্ট ম্যানেজ করতে না পারলে তিনি চাকরিতে যোগ দিতে পারছেন না। আবার কোনও সরকারি চাকুরে হয়তো হালকা জ্বর নিয়ে টেস্ট করিয়ে নেগেটিভ পেয়েছেন, তিনি পজিটিভ রিপোর্টের আশায় আরও একাধিক টেস্ট করিয়েছেন। করোনার কিট অপচয় করতে অল্প-স্বল্প ক্ষমতা লাগে। দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য করোনা টেস্ট বরাবরই সোনার হরিণ। যারা এতদিন টেস্ট সুবিধার অপব্যবহার করেছে, তাদের কাছে ২০০ টাকা কোনও বিষয়ই না। আমার ধারণা ফি নির্ধারণে অপব্যবহার কমবে না; বরং নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত আর দরিদ্র মানুষ; যাদের কাছে ২০০ টাকাও অনেক; তারা জ্বর নিয়ে ঘুরে বেড়াবে, কিন্তু টেস্ট করতে আর যাবে না। আর যত কমই হোক, করোনা টেস্টের ফি নির্ধারণ মানেই হলো, সরকার বলছে, তোমরা টেস্ট করতে এসো না। কিন্তু সরকারের অবস্থান হওয়া উচিত উল্টো। যত দ্রুত সম্ভব, সারা দেশে টেস্ট সুবিধা ছড়িয়ে দেওয়া এবং সবাইকে বলা, করোনার লক্ষণ দেখা দিলেই টেস্ট করতে আসুন। এমনকি সুযোগ থাকলে লক্ষণবিহীন মানুষকেও টেস্টের আওতায় আনা উচিত। কারণ উপসর্গবিহীন অনেকেও করোনা বহন করছেন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকায় তিনি হয়তো টেরই পাননি, কিন্তু নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানো এই লক্ষণবিহীন ব্যক্তিটিই প্রবীণ কাউকে সংক্রমিত করে জীবনসঙ্কটে ফেলে দিতে পারেন। তাই টেস্ট সুবিধা বাড়িয়ে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের আলাদা করে ফেলাটা অতি জরুরি। আমি জানি এখানে টাকা কোনও সমস্যা নয়। বাজেটে করোনা মোকাবিলায় জরুরি ফান্ড হিসেবে ১০ হাজার কোটি টাকা তো আছেই। তাছাড়া টেস্ট করে, বিচ্ছিন্ন করে করোনার বিস্তার ঠেকাতে পারলে হাসপাতালের ডাক্তারদের থাকা-খাওয়ার পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে না। করোনা পরীক্ষা নিয়ে নিরীক্ষা না করে টেস্টে বিনিয়োগ বাড়ান, তাতে চিকিৎসায় খরচ কমবে।

 

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ