কল চালাতে ব্যর্থ কিন্তু পাটের বাজারটা ছাড়বেন না যেন!

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১৫:১২, জুলাই ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৪, জুলাই ০৩, ২০২০

মাসুদা ভাট্টিকৃষক পরিবারে জন্ম বলেই কৃষির সঙ্গে জড়িত যেকোনও ঘটনার ওপরই চোখ পড়ে এবং সে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি। বিস্তারিত জানতে গিয়ে বুঝি যে, কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহটা কতটা প্রবল এখনও। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। পাট বিষয়ে বলার মতো কথা অনেক। কারণ, প্রথমত যে অঞ্চলে আমার জন্ম সেখানে প্রচুর পরিমাণে পাট উৎপাদিত হয়, সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পাট উৎপাদন সমৃদ্ধ এলাকাই সেটি। এই পাট উৎপাদনের সঙ্গে ওখানকার মানুষের জীবনের অনেক পর্বই জড়িত। যেমন, পাট ফুটখানেক বড় হওয়ার পরে প্রথমবার পাটের ভেতর থেকে ছোট পাট বেছে তুলে ফেলতে হয়, যাকে বলা হয় ‘বাছপাট’, এই বাছপাট পচিয়ে আঁশ করে বাজারে বিক্রি করে কৃষক তার সন্তানের মুখে জৈষ্ঠ-আষাঢ়ের ‘ফলফলাদি’ তুলে দেয়, এটা একসময় প্রতিটি কৃষক পরিবারের ক্ষেত্রে সত্য ছিল, এখন হয়তো অবস্থা বদলেছে। কারণ, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থাটা বদলেছে। পরে শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে উপযুক্ত সময়ে পাট কেটে, পচিয়ে, আঁশ ছাড়িয়ে, ধুয়ে, রোদে শুকিয়ে একেবারে ‘সোনা রঙ’ ধরিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়, তখন বিশাল বিশাল নৌকা নিয়ে পাটের ‘বেপারিরা’ এসে পাট কিনে নিয়ে যেতো একসময়, আজকাল দেখি নসিমন কিংবা লরিতে করে পাট চলে যাচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে দেখে, পাট বিক্রির অর্থে সংসার চালানোর অভিজ্ঞতা হওয়ায়, পাট সম্পর্কিত যেকোনও ঘটনাকেই একটু গভীরে গিয়ে দেখার ইচ্ছে হয়।

এছাড়া আরও মজার ব্যাপার হলো, পাট উৎপাদনকারী পরিবারে জন্ম হওয়ার পরে এমন এক পরিবারে গিয়ে বড় হয়েছি, যে পরিবারটি পুরোপুরি পাটনির্ভর কারখানার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ দেশের জুটমিলগুলোর ভেতরকার গল্পও খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আদমজী জুটমিল যখন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এই বৃহৎ পাটকলের বিশাল এলাকা জমি হিসেবে ভাগাভাগি হয়ে যায় তৎকালে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সমর্থকদের মাঝে, তখনও এ বিষয় নিয়ে লিখেছিলাম, বলাই বাহুল্য কোনও কাজ হয়নি। পরে একটি ছোটগল্প লিখেছিলাম, যেখানে এক পাগলের সামনে দিয়ে আদমজী পাটকলের এক শ্রমিকের মেয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের একটি কুখ্যাত এলাকায় যায়, পাগল হয়েও বিষয়টি তার ভালো লাগে না, তাই সে পৃথিবীকেই সে জন্য দায়ী করে অক্ষমের শেষ অস্ত্র গালাগাল দেয়।

অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছিলো বা বোঝা যাচ্ছিলো যে, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর কপালে ‘খারাবি’ আছে। লোকসানে চলতে চলতে সরকার সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার অজুহাত পেয়ে যাচ্ছিলো, অথচ পাকিস্তান আমলেও এই পাটকলগুলোই ছিল পাকিস্তানিদের কাছে ‘সোনার হরিণ’, পূর্ব পাকিস্তানের পাটের টাকাতেই গড়ে উঠেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাশহর পিন্ডি, রাজধানী ইসলামাবাদ। পূর্ব পাকিস্তান এই বঞ্চনাটা ধরতে পেরেছিল বলেই স্বাধীনতার দাবি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিল, অর্থাৎ দেশের স্বাধীনতা অর্জনেও ‘পাটের’ একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পাকিস্তানি বড় ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর প্রত্যেকেই পূর্ব পাকিস্তানে পাটের ব্যবসায় নেমে পড়েছিল, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু এই পাটকলগুলোকে জাতীয়করণ করে পাকিস্তানি ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর আয়কে বাংলাদেশ সরকারের ঝুলিতে ভরতে চেয়েছিলেন। আশা করা গিয়েছিল যে, কমবেশি ৮৭টি সরকারি পাটকল থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ উন্মুক্ত হবে। চলছিল ভালোই, ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশের মোট রফতানি আয় ছিল ৩৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার, তার মধ্যে ৩১ কোটি ৩১ লাখ ডলার আয় হয়েছিল কেবল পাট ও পাটজাতদ্রব্য রফতানি থেকে। এই আয়ের আশাবাদ থেকেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং দেশের পাটশিল্পকে নতুন মাত্রা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ঠিক এই সময়ই দেশের প্রায় ৬০ লাখ পরিবার নির্ভরশীল ছিল পাট উৎপাদন ও পাটজাত দ্রব্য তৈরির কারখানাগুলোর ওপর।

কেন তবে পাটকলগুলো লোকসানে পড়লো? কবে থেকে পড়লো? আবারও ফিরতে হয় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কাছে। এই দিনের পর থেকে বাংলাদেশের যেসব দিক সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে তার মধ্যে পাটশিল্পও অন্যতম। অভিযোগ আছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পাটকলগুলোকে একচেটিয়া ব্যবসা সফল করার সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশের পাটকলগুলোকে বসিয়ে দেওয়ার রাজনীতিও তখনই শুরু হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের বদলে সস্তা কেমিকেল-নির্ভর তন্তু বাজার দখল করার ফলেও পাটের বাজার সংকুচিত হয়েছিল। তবে এও প্রচলিত ছিল যে, সামরিক সরকারগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের পাটকলগুলোর শ্রমিক সংগঠনগুলোর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকায় পাটকলগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভে ব্যর্থ হয়, আর দেশের অন্য আর দশটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতোই দুর্নীতিতে পুরোপুরি ডুবে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত বেগম জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার এসে আদমজী, শম্ভুগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জের বড় পাটকলগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এই বন্ধ হওয়া পাটকলগুলোর কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির কতটা ক্ষতি হয়েছে কিংবা সামাজিকভাবে বাংলাদেশ কী কী অসুবিধা পোহাচ্ছে তা নিয়ে গবেষণা হয়নি বলে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার কোনও সুযোগ নেই।

২০০৮ সালে শেখ হাসিনার সরকার নতুন করে বাংলাদেশের পাটকল ও পাট উৎপাদনে গতি আনার চেষ্টা শুরু করে। পাটের জিন-রহস্য উন্মোচন করে নতুন সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে বলে বাংলাদেশে নতুন এক আশাবাদও তৈরি হয়। উৎপাদনও বাড়ে। সর্বশেষ প্রাপ্ত এক্সপোর্ট প্রমোশন্স ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২০ সালের প্রথমার্ধে দেশের পাট ও পাটজাত দ্রব্য থেকে রফতানি আয় ৫১১.৭৩ মিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯ সালে ছিল ৪২১.০২ মিলিয়ন ডলার। এই আয় দেশের ২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও ২০০টি বেসরকারি পাটকলের একত্রিত আয়। মজার ব্যাপার হলো, ২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশে বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা আরও বাড়লেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে লোকসানে থাকা সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ করে দেবে এবং দিয়েছে। এখানে কর্মরত প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিককে ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ দিয়ে অবসরে পাঠানো হবে। ২৫ হাজার শ্রমিকের পরিবারে যদি গড়ে ৩ জন করেও (পরিবারের সদস্য সংখ্যা আরও বেশিই আছে) মানুষ থাকে তাহলে সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে ৭৫ হাজারে, অর্থাৎ এ দেশের ৭৫ হাজার মানুষ বেকার হলো পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতা বঙ্গবন্ধুর মতোই দেশজ শিল্পের প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহী এবং বিশেষ করে পাটকলগুলোকে প্রণোদনা দিয়ে নতুন চেহারা দেওয়ার জন্যই ২০০৯ সালে নতুন করে বন্ধ থাকা পাটকলগুলোকে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে যে গণবিরোধিতা শুরু হয়েছে তাতে বাংলাদেশের মতো পাটোৎপাদনে প্রথম এবং পাটজাত দ্রব্য উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা রাষ্ট্রের জন্য তো বিষয়টি সোনার সঙ্গে সোহাগা যুক্ত হওয়ার মতো কাঙ্ক্ষিত ঘটনা হওয়ার কথা ছিল। তৈরি পোশাক শিল্প  নিয়ে যখন বাংলাদেশে থাকবে কিনা ক্রমশ বাংলাদেশ থেকে দূরে সরে যাবে– ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ঠিক তখনই পাট ও পাটজাত দ্রব্য নতুন আশাবাদ জাগাচ্ছে বাংলাদেশের জন্য। ২০২১ সাল নাগাদ সারা বিশ্বে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের বাজার ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হওয়ার কথা জানাচ্ছে গ্লোবাল ট্রেড নামের বৈশ্বিক বাণিজ্যের ‘ফিজিবেলিটি’ নির্ধারণকারী সংস্থা। এখান থেকেই জানা যায় যে, বিগত কয়েক বছর ধরে কমতে থাকলেও ২০১৯ সালে এসে বাংলাদেশ আবার পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানিতে শীর্ষ অবস্থানটি ফিরে পেয়েছে। তার মানে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা গৃহীত পদক্ষেপগুলো কাজ করতে শুরু করেছিল বলতে হবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের মতো দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ধরলে বাংলাদেশের হাতে এখনও এমন কোনও বিকল্প পণ্য নেই যা কিনা পাটের জায়গা দখল করতে পারে।

বাংলাদেশের প্রতি ১ হাজার জন মানুষ প্রায় ৮,১৫৪ কেজি পাটজাত দ্রব্য ব্যবহার করে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। সে বিচারে বাংলাদেশে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারকেও অনেকটাই ঠেকিয়ে রেখেছে কেবল পাট। আর কেবল ২০১৮ সালেই সারা বিশ্বের পাট ও পাটজাত দ্রব্যের চাহিদার ৭৯% পূরণ করেছে বাংলাদেশ– এর চেয়ে গর্বের কোনও কারণ বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ছিল কিনা ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই সকলকে।

পাটকল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা সরকারি মালিকানাধীন। সরকার সেগুলো লোকসানে চালাচ্ছিল, যা জনগণের জন্য ক্ষতির কারণ কিন্তু ব্যর্থতা হিসেবে সরকারেরই প্রথম ও প্রধান ব্যর্থতা এই বন্ধ করে দেওয়া। এখন এসব কারখানা বেসরকারি খাতে বা পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপে চালানোর কথা হচ্ছে, হয়তো আমাদের খুশি হওয়া উচিত এটা ভেবে যে, একেবারে বন্ধ তো আর হচ্ছে না! কিন্তু খচ খচ করছে কোথায় যেন, মনে হচ্ছে নাকের বদলে নরুন তো ধরিয়ে দিচ্ছে না সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত এই পাটকলগুলোকে বন্ধ করে জনগণের হাতে? আমরা আশা করতে চাই যে সরকার পাটকলগুলো বেসরকারি খাতে নিয়ে গিয়ে এর চেহারা ও বর্তমান লোকসানি অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে একে লাভজনক করবে। তার মানে সরকার স্বীকারও করছে যে তারা এগুলো লাভজনক করতে ব্যর্থ। কিন্তু এই ব্যর্থতাকে আমলে নিয়ে ২০২১ সালে যে বিশ্বে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা ৩ বিলিয়নের বেশি হবে তার অন্তত ৮০% কি বাংলাদেশের হাতে আনার কাজটি সরকার নিশ্চিত করতে পারবে? বন্ধ করায় যত আগ্রহ ও দ্রুতগতি, এই ৮০% পাট-ব্যবসা বাংলাদেশের হাতে আনায় সরকারের গতি ততটাই তীব্র হবে বলে বিশ্বাস করতে চাই। প্রতিবেশী ভারত তো আছেই পাটোৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে, সঙ্গে মালয়েশিয়া দৌড়াচ্ছে, আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে ইউরোপের বেলজিয়ামও পাটোৎপাদনের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চায়। সুতরাং মাননীয় সরকার, অতি দ্রুত ৩ বিলিয়নের বাজার ধরতে কোমর বেঁধে নেমে পড়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

পাটকল যেহেতু নেই, সেহেতু পাট মন্ত্রণালয়ও কি থাকার দরকার আছে? কিংবা পাটমন্ত্রী? গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের পরিধিও তবে বাড়ছে, তাই তো?

লেখক: সাংবাদিক

 

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ