সুবোধ ফিরবে?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:০৫, জুলাই ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৬, জুলাই ০৪, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহকান পেতে বসেছিলাম, যদি তার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। অভিমান করে চলে গেছেন তিনি। এমনটাই জানি। আবার এমনও খবর শুনি, তাকে আটকে রাখা হয়েছে কোনও খাঁচায়। নতুন ভোরের অপেক্ষায় আছেন তিনি। আনকোরা কোনও ভোরের আলোয় তিনি বেরিয়ে আসবেন খাঁচা ভেঙে। সেই অপেক্ষাতেই ছিলাম। অনুজীব কোভিড-১৯ যখন পৃথিবীকে বিপন্ন করে তুললো, মানে গোলকের মানুষকে তার অসহায়ত্বের কথা মনে করিয়ে দিতে চাইলো, ভাবলাম এবার বুঝি সুবোধ সেই ভোরের আলো দেখতে পাবে। না, প্রতিদিন গোধূলি পেরিয়ে রাত নিকটবর্তী হচ্ছে ভোরের। নতুন দিনের সূর্য কোনও শুভ বার্তা নিয়ে আসছে না। দেখছি পুরনো খবরগুলোই কানে কড়া নাড়ছে। মানুষের লোভ কমেনি। বরং আগের চেয়ে আরও লোভাতুর হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের বাসনা সীমানা প্রাচীর ভেঙে মানচিত্র বড় করার। এক গোলার্ধ মোড়লগিরি করতে চায় অপর গোলার্ধে। আছে পণ্যের ঔপিনিবেশিক স্থায়ী করার কূটনীতি। কোভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা পেরিয়েছে পাঁচ লাখের কোঠা। কোথাও কোথাও আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা চূড়াতে পৌঁছার পর নিম্নগামী হলেও, আবার আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। কোনও কোনও রাষ্ট্র স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করলেও, বিশ্বস্বাস্থ্য হুঁশিয়ার করে যাচ্ছে—করোনার ভয়াল রূপের এখনও বাকি। অর্থাৎ কোভিড-১৯ এর যে ছোবল দেখছে বিশ্ব, এরচেয়েও ভয়ংকর ছোবল অপেক্ষা করছে।

ছোবলের সেই হুঁশিয়ারিকে মানুষ মোটেও তোয়াক্কা করছে না। পাশের মানুষটি আচমকা চলে যাওয়ার পরেও, মন থেকে লোভ-হিংসার রিপুগুলোকে ধৌত করার তাগিদ নেই। বরং দেখছি বেড়ে গেছে আর্থিক লুটপাট ও সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতা। কোভিড-১৯ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক পণ্য। আমরা অর্থনৈতিক মন্দার কথা বলছি। নিত্য জানছি কত মানুষ কাজ হারাচ্ছে। ঝাঁপ পড়ছে কত প্রতিষ্ঠানে। শহর ছেড়ে যাওয়া মানুষের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। মানুষের দীর্ঘশ্বাস বন্ধ হওয়ার কান্নাকে ছাপিয়ে উঠছে বণিকদের উল্লাস। অদৃশ্য অনুজীবকে কীভাবে ঘায়েল করা সম্ভব, তা এখনও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। কিন্তু রকমারি সুরক্ষা ও চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধ, খাবার নিয়ে বাণিজ্য চলছে। কর্মহীন মানুষকে, বেকার হবার ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের সামনে রেখে প্রণোদনার টাকা কেড়ে নেবার নকশারও কমতি নেই। করোনা বাণিজ্যের লাভের গুড় খেতে ব্যস্ত গণমাধ্যমও। ঘরে বসে থাকা ভোক্তাদের কেড়ে নিতে চটকদার খবর তৈরি করছে। কোভিড-১৯ নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা রকম বিভ্রান্তিও তৈরি হচ্ছে।

প্রকৃতি কিন্তু দুনিয়াজুড়েই আনন্দে আছে। মানুষ ঘরবন্দি হবার পর, প্রাণিকুল ফের ফিরে পেয়েছিল তাদের হারানো আবাস। সমুদ্র, অরণ্য, পাহাড় এমনকি জনপদেও প্রাণীদের অবাধ যাতায়াত ও উল্লাস দেখা গেছে। ফুল-পাখি সবার কাটছে আনন্দ সময়। বলা হচ্ছে—মানুষ যে পাপ করে আসছিল এখন চলছে এর প্রায়শ্চিত্ত। কোভিড-১৯ জীবনে যে বিরতি এনে দিয়েছে, সেই বিরতিতে মানুষ আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করবে, উদিত হবে তাদের শুভবুদ্ধি। না এই স্বপ্নগুলো ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কিছু নয়। বাস্তবতা ভিন্ন। মানুষ মোটেও যেন পরিশোধিত হতে রাজি নয়। মুখে মুখোশ তুলছে, কোভিডকে আটকে দেওয়ার জন্য নয়, প্রত্যেকে তাদের অবয়বে লোভের মুখোশগুলো যেন না পড়ে যায়, তা ঠেকাতেই যেন ‘মাস্ক’ পরছে।

কোভিড-১৯ কাল কবে শেষ হবে বলা মুশকিল। চরিত্র বদল করে নানা আবহাওয়ায় নিজেকে মানিয়ে নিয়ে চলছে করোনা। তার আচরণ বলছে সহজে ছেড়ে যাওয়ার নয়। করোনা যত দীর্ঘ সময় থাকবে, তত মানুষের জীবন ও জীবিকা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। পৃথিবী গদ্যময় হবে ক্ষুধায়। নিরন্ন ও বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি মানুষ প্রবলভাবে আরও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারে। সম্ভাবনা আছে মৌলবাদের শেকড় বিস্তৃত হবার। কারণ সকল দেশে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রকে ধর্মান্ধতাকে মোকোবিলা করতে হয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের বাণী, সুপারিশ কাজে দেয়নি অনেক ক্ষেত্রে। কভিড-১৯ সংক্রমণের ক্ষেত্রে সাম্যতা এনেছিল। অনুজীবটি  বিত্ত-বিত্তহীন কাউকেই ছাড় দেয়নি। মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল, আগামীর নতুন পৃথিবী থেকে বৈষম্য দূর হবে। মানুষ দাঁড়াবে মানুষের পাশে। সুখ আনন্দ, সম্পদের বৈষম্য কমে যাবে। কিন্তু করোনা যত দীর্ঘ হচ্ছে ততই দেখা যাচ্ছে মানুষ তার পুরনো খোলস ছাড়ছে না। বরং আঁকড়ে ধরে আছে। এবং সুযোগ খুঁজছে নতুন পৃথিবীর পিঠার ভাগে বড় করে কামড় বসাতে। এই আচরণ দেখে মনে হতে পারে  করোনা মানুষ মারার পাশাপাশি স্বপ্নটাকেও মেরে ফেলছে। সকল মানুষ নয়, কিছু মানুষ লোভের পর্বতের আরোহী। কিছু মানুষ পৃথিবীকে বানাতে চায় হিংসের ভাগাড়। পৃথিবীর অবশিষ্ট জনসংখ্যা কিন্তু সুবোধের মুক্তি চায়। এই পৃথিবীতে না হোক, করোনাকালের পরের নতুন পৃথিবী সুবোধের হবে,  এই স্বপ্ন মৃত্যুঞ্জয়ী।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ