করোনাকালে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হওয়া অধিকারচ্যুত নয় কি?

Send
ড. জহির আহমেদ
প্রকাশিত : ১৩:১৭, জুলাই ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৯, জুলাই ০৫, ২০২০

ড. জহির আহমেদবিগত মার্চ মাস থেকে শুরু করে আজ জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হচ্ছে। করোনাভাইরাসের কারণে জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে; থমকে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি। ব্যাংক বিমা, ফ্যাক্টরি, অফিস আদালত দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। বেশ কিছুদিনের সাধারণ ছুটি/লকডাউন থেকে বের হয়ে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সবকিছু খুলে দিয়েছে আবার জুনের প্রথম দিকে।
ঘরবন্দি সময়ে (এপ্রিল-মে ২০২০) ঢাকা ছিল ফাঁকা। দীর্ঘদিন পর সরকার ‘স্বাভাবিক’ জীবনে ফিরতে চেষ্টা  করছে। ভয়ে ও শঙ্কায় দোকানপাট খুলতে শুরু করে, বাসে-ট্রেনে যাত্রী কিছু কিছু দেখা যায়। ঢাকার বিখ্যাত ‘জ্যাম’ আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেফটি পদক্ষেপ হিসেবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক ব্যবহার চোখে পড়ে। গার্মেন্টস কর্মী সহ কর্মমুখী মানুষ ঢাকা ফিরতে শুরু করে–একেবারে গাদাগাদি করে লঞ্চে, ভ্যানে, ট্রেনে করে যে যেভাবে পেরেছে ফেরত এসেছে।   
কিন্তু এসেই পড়েছে সংকটে; এক ‘অভাবনীয়’ সংকটে। তিন মাসের বাড়ি ভাড়া সহ জীবনযাত্রা  চালান দুষ্কর হয়ে পড়ছে। কেবল খেটে খাওয়া শ্রমিক নয়, চাকরিজীবী মধ্যবিত্তও সংসার চালাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বেতন বকেয়া রয়েছে; অর্ধেক হয়ে গেছে অনেকেরই। নানান খরচপাতি যেমন প্রাত্যহিক বাজার, বাচ্চাদের স্কুলের বেতন, ঘর ভাড়া মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। দিনমজুর কাজ পায় না; ফ্যাক্টরি শ্রমিকদের ছাঁটাই, আর বেতনভোগী কর্মচারীদের চাকরির অনিশ্চয়তা, ব্যাংকের ঋণের সুদ (গাড়ি, ফ্রিজ, ওভেন, ফ্ল্যাটসহ অন্যান্য উদ্দেশ্যে নেওয়া) গুনতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। একেবারে নাভিশ্বাস অবস্থা। এসবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়।   

এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয় উঁচুতলার জনগোষ্ঠীর মতোই। যৌথ পরিবারের প্রতি নৈতিক এবং ধর্মীয় দায়বদ্ধতা এদের চেয়ে আর বেশি কার আছে?  সংসারের  ঘানি টানতে একবার ঢাকা থেকে গাদাগাদি করে ক্ষুদ্র যানে করে, হেঁটে দেশের বাড়ি যায়;  আবার একইভাবে চাকরি বাঁচাতে ঢাকায় চলে আসে অল্প ক’দিনের ব্যবধানে। সরকারের অস্থির সিদ্ধান্ত, ব্যবস্থাপনার অভাব এবং গার্মেন্টস মালিকদের প্রতি অনুরক্ত হয়ে ৫০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া সাধারণ শ্রমিকদের বিপর্যস্ত করে তোলে। এই পলিসিগুলো প্রকারান্তরে  ভাইরাস সংক্রমণে সহায়তা করেছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন।     

গত ক’মাসে জীবিকার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।  প্রাইভেট স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষকরা বেতন না পেয়ে কেউ কেউ সবজি বিক্রি করে বেঁচে থাকার পথ খুঁজছে। সোনা-দানা, গাড়ি,  সঞ্চয়পত্রের জমানো টাকা, ধার কর্জ করে চলছে। বাড়ি ভাড়া ছেড়ে দিয়ে মেসে থাকছে; পরিবার পরিজনকে তো বহু আগেই দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। স্কুলের খরচ চালাতে না পেরে ঢাকা শহরে বেশ কিছু মালিক স্কুল বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছে। এটি মহামন্দা বা দুর্ভিক্ষের পদধ্বনির মতো নয় যে মানুষ পূর্ব প্রস্তুতি নেবে। এ অবস্থা তাৎক্ষণিক। করোনাকালের এই সময়ে প্রাণ রক্ষায় ব্যাপক সংখ্যক মানুষ গ্রামমুখী হচ্ছে। সম্প্রতি ‘ফাইন্ডিংস ফ্রম এ লার্জ অনলাইন সার্ভে’ শীর্ষক গবেষণা পরিচালনা করেন বিআইডিএস। এতে উঠে এসেছে—করোনার আগে কর্মহীন পরিবার ছিল ১৭ শতাংশ। এখন তা ৩০ শতাংশে ঠেকেছে। এর মধ্যে শ্রমশক্তিতেই নেই এমন পরিবার ১১ শতাংশ। ওই গবেষণায় দেখা যায়, মাসিক আয় ৫ হাজার টাকার নিচে ছিল এমন পরিবারের আয় প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। ১৫ হাজার টাকার নিচে উপার্জনকারীর আয় কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ৩০ হাজারের নিচে উপার্জনকারীর আয় কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

ঢাকা শহর থেকে একটু দূরে গ্রামের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। গিয়েছিলাম পারিবারিক একটি কৃষিজমি পরিবেষ্টিত ছোট্ট খামারবাড়িতে। গাছগাছালি ঘেরা দুস্তর প্রান্তর। লাউয়ের শাক, ডাঁটা শাক তুলছি আমি। অযত্নে বেড়ে ওঠা কলমি শাকগুলো পরিষ্কার করছি। আমার চোখ চলে যায় এক দল চড়ুই পাখির কিচির মিচির ডাকের দিকে। আশেপাশে হাউজিং সোসাইটির উঁচু উঁচু দালানগুলো মাথা তুলে ক্রমাগত উপরে উঠছে। কিছু দিন আগেও আমার বাড়ির পাশে নির্মাণ শ্রমিকদের সরব উপস্থিতি ছিল। আজ কাউকেই তেমন দেখছি না। নীল আকশের মাঝে এক টুকরো কালো মেঘ আমাকে ছায়া দিলো। উপরে তাকিয়ে দেখলাম কিছু পাখি উড়ে যাচ্ছে; তারও উপরে একটি ঈগল ভেসে বেড়াচ্ছে। কিছুটা দূরে কিছু নারী বন্য শাক তুলছে; বাচ্চারা আম কুড়োচ্ছে। পাশের রাস্তা কেরানীগঞ্জ এর দিকে গিয়ে মাওয়ায় পৌঁছেছে। রাস্তার দিকে চোখ যায় মিছিলের মতো বেশ ক’জন লোক হেঁটে ওই দিকেই যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করছিলাম, এত লোক কই যায়? তারা জানালেন, গ্রামে যাচ্ছেন; ঢাকায় কাজ নেই-তাই। তাদের মুখে নেই মাস্ক; নেই গ্লাভস। ‘বেঁচে থাকাই কষ্ট-মাস্ক দিয়ে কী হবে?’ জানালেন একজন।

দৃষ্টি ফেরানো যাক অন্য আরেক বাস্তবতার দিকে। এটি ঢাকা শহরের ভিআইপি এলাকা বসুন্ধরা সিটির আশপাশের এলাকা। ঢাকার অভিজাত বাসিন্দারা হাঁফ ছেড়ে উঠলেই তিনশ’ ফুটের কাছে গিয়ে নতুন করে শ্বাস নিতে চান। প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে আসেন তারা। আকাশ ছোঁয়া টাওয়ারগুলো রাস্তার দু’পাশে চোখে পড়ে। একটু এগোলোই দেখি রাতারাতি বসুন্ধরার কনভেনশন সেন্টার করোনা হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ এই হাসপাতাল দেখতে অনেকটা শুভ্র তাঁবুর মতোই মনে হয়। যতই এগোতে থাকি গ্রামীণ একটা আবহের অনুভব আসে।

গত ক’বছরে এই জনপদের ল্যান্ডস্কেপের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। নিচু এই জলাভূমি আর ধানক্ষেতগুলোতে এখন হাইওয়ে, বহুতল আবাসিক ভবন আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো দখলে নিয়েছে। নগর জীবনের সংস্কৃতি হামাগুঁড়ি দিয়ে একদা গ্রামীণ এই জনপদকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। এত দ্রুততার সঙ্গে বেড়ে ওঠা নগর জীবনকে মনে হচ্ছে ক্ষ্যাপাটে। রাজধানী ঢাকা থেকে তিরিশ মাইল দূরে বিস্তীর্ণ খালি জায়গাগুলো চোখে পড়ে। কপালে দেওয়া ছোট ছোট টিপগুলোর মতো দূর সীমানায় সবুজের মাঝে বাড়িঘর দেখা যায়। সাইন বোর্ডগুলো দু’পায়ের ওপর ভর করে আহ্বান জানাচ্ছে, ‘শিগগিরই আসছি’, ড্রিমল্যান্ড হাউজিং, ইকো সিটি, ইত্যাদি। মাইলের পর মাইল একদা জলবদ্ধতা নিম্নাঞ্চল কৃষি জমিগুলো বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এভাবে পৃথিবীর ৮তম জনবহুল রাজধানী কেবলই বিস্তৃত হচ্ছে। ইট-সুরকি জমা করা বহুতল ভবন তৈরির সাজ সাজ রব জানান দিচ্ছে— অক্সফোর্ড ইস্ট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস কিংবা সিটি ইউনিভার্সিটি ফিক্সড ক্যাম্পাস। বিদ্যুতের খুঁটিগুলো বিদ্যুৎ সংযোগের জন্যে অপেক্ষা করছে। রাস্তার ধারে কর্মজীবী মানুষ, কাঁচা ঘর-বাড়ি, পশু-পাখি এবং কৃষি জমি, সবই নিস্তব্ধ হয়ে আছে। কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে সব? এই চিত্রই এখন ‘স্বাভাবিক’ বাংলাদেশ।

দৃষ্টি ফেরানো যাক নিজের কর্মস্থল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। সেখানে গিয়েছি ক’দিন এই তিন মাস ছুটির সময়ে। একেবারে গভীর আইসোলেশানে আছে পুরো ক্যাম্পাস। ঢাকা থেকে আসা যাওয়ার পথে দেখি এই করোনা সংকটকালেও পোশাক শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজে যাচ্ছে। নিকট অতীতেও এই ঝুঁকি ভিন্নভাবে তাদের প্রাণ সংহার করেছিল।  ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ১১০০ শ্রমিক এবং ২০১২ সালে ১১২ জন শ্রমিক আগুনে পুড়ে  মারা গিয়েছিল।

ঢাকা থেকে সাভার যাওয়ার পথে কৃষি জমির জায়গায় ইট ভাটা, গার্মেন্টস সহ অনেক ফ্যাক্টরি রয়েছে। সাত সকালে পোশাক শ্রমিকরা কর্মস্থলে যায়, কিন্তু জড়ো হয় গেটে। লে-অফের নোটিশ ঝুলছে, অথবা শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে নিজ নিজ নাম খুঁজে ফিরছে তালিকায় তাদের চাকরি আছে কি নাই। আরও কতদূর গিয়ে দেখি শ্রমিকরা মিছিল করছে, হাতে রয়েছে ব্যানার/প্ল্যাকার্ড:  ‘চাকরি চাই, শ্রমিক ছাঁটাই চলবে না, লে-অফ চলবে না, বকেয়া বেতন দিতে হবে’। সামনেই রয়েছে গার্মেন্টস প্রশাসনের আজ্ঞাবহ পুলিশের বিরাট দল। লাঠি চার্জ চলছে। শ্রমিকরা ফেরত আসে; তাদের দাবি মেনে নেওয়া হয় না।

এই নিবর্তনকে আমরা কীভাবে ব্যাখা করবো? গার্মেন্টস খাতে চাকরি ও মজুরি নিয়ে বিজেএমই/বিকেএমই এবং সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। শ্রমিকদের এই আন্দোলন নতুন নয়। যেটা নতুন তা হলো এই করোনাকালেও জীবিকা আর স্বাস্থ্য দুটোই নিশ্চিত করতে তাদের রাস্তায় নামতে হয়েছে আর পুলিশের নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। পুরো সংগ্রামটাই চলমান রাষ্ট্রকাঠামোর পুঁজি সঞ্চয়নের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে। তেমনি করে সাধারণ মানুষ আর মধ্যবিত্ত যে গ্রামে পাড়ি জমাচ্ছে তার কারণও  ওই পুঁজি আত্মসাৎকরণের ফলেই ঘটছে। আমরা লক্ষ করছি বাংলাদেশে সামাজিক সম্পর্কগুলো এবং বৈশ্বিক পুঁজিবাদ একসঙ্গে গাঁথা। স্বপ্ন এবং দুস্বপ্নের আলো আঁধারি খেলার মাঝে সাধারণ মানুষ ঢাকায় বাস করছে, আবার ঢাকা ছাড়ছে।

ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার এই পটভূমি বুঝতে হবে। গ্রাম-নগর চলাচল একমুখী নয়;  এটি দ্বিমুখী এবং এই প্রবণতার আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। যাওয়া-আসার রাজনীতি  আমাদের দেখতে হবে। করোনাকালে  আমাদের অর্থনীতি নব্য উদারনৈতিক মডেলে চলছে।  রাষ্ট্র স্বাস্থ্যসহ সুরক্ষার সব দায়িত্ব নেয় না। মুক্তবাজার, মুক্ত চলাচল, অর্থনীতি আগে—এসবই উদারনৈতিক অর্থনীতির প্রাণভোমরা। উদারনৈতিক বর্তমান ধারাটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদ আর নিজের অধিকার ত্যাগ করতে বাধ্য করা (ডিস্পজেশান)-র এক নিদারুণ সখ্য নিয়ে গড়ে উঠে। পুঁজির সঞ্চয়নের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে নানান রকম অসমতা তৈরি করা। স্থানচ্যুতি বা বাস্তুচ্যুতি’র মাধ্যমে পুঁজির মালিকেরা তাদের মুনাফার একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করে। শ্রমিকদের মধ্যে দ্বিভাজন তৈরি করা হয়। কেউ দক্ষতার ভিত্তিতে আগে এবং বেশি মজুরি পাবে; এবং অর্ধেক শ্রমিক অচিরেই চাকরি হারাবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। সুতরাং ফ্যাক্টরি থেকে সে অধিকারচ্যুত হয়। আর এভাবেই শ্রমিক বা নাগরিককে তার সম্পদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ওই ধ্বংসকারী পুঁজিবাদ। বলা যেতে পারে, ঢাকা যেমন করোনাভাইরাসের এপিসেন্টার, ঢাকা তেমনি সাধারণ নাগরিক আর মধ্যবিত্ত উৎখাতেরও (ডিসপ্লেসমেন্ট) এপিসেন্টার। প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকা শহরের মেগা প্রকল্পগুলো, শিল্পায়ন, নগরায়ণের যে কর্মযজ্ঞ চলছে তা ব্যাপক সংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ধারণ করতে পারছে না কেন? গত তিন মাসে কর্মহারা, বেতনহারা ব্যাপক সংখ্যক মানুষ মাত্র ক’দিনেই নিঃস্ব হয়ে গেলো? রাষ্ট্র কই? গত সপ্তাহে অগণিত অঙ্কের মেগা বাজেট তার করোনাকালীন বিধ্বস্ত নাগরিকের স্বাস্থ্য-জীবন-জীবিকাকে সুরক্ষার জন্য কত টাকা খরচ করবে? জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে রাষ্ট্র এতটাই অপ্রস্তুত খাদের জন্ম দিয়েছে তা চলমান সংসদে সরকারদলীয় সাংসদরাই তুলে ধরেছেন। ফেসবুকে নিউজ ফিডে দেখি মানুষের আকুতি, রাতের আঁধারে সামান্য ফার্নিচার নিয়ে স্কুল পড়ুয়া বাচ্চা, স্বামী-স্ত্রীর চাকরি আর মা বাবার চিকিৎসা জলাঞ্জলি দিয়ে গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছেন। করোনার ভয় তাদের কাছে নগণ্য।   

পুরো বিষয়টিতে নব্য উদারনীতিবাদের অসম আর কল্পনাতীত প্রভাব রয়েছে। নিজের প্রয়োজনে নব্য উদারনীতিবাদ তার ‘কর্মক্ষম’ শ্রমিকদের ঢাকায় আনবে, আবার কাজ শেষ হয়ে গেলে  ‘অতিরিক্তদের’ কর্মচ্যুত এমনকি স্থানচ্যুতও করবে। এটা সংকটকালে মালিকদের মুনাফা লাভের সাময়িক কৌশল; এভাবেই নাগরদোলায় দোল খায় পোশাক শ্রমিকেরা।     

ইতিহাস আর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলা যায়, রাষ্ট্র তার কল্যাণমূলক কাজ থেকে ইস্তফা দিয়েছে মনে হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এর উদাহরণ। পাবলিক বনাম প্রাইভেট; ফরমাল বনাম ইনফরমাল খাতের মধ্যে দুস্তর পার্থক্য লক্ষণীয়। নাগরিক তো প্রাইভেটের কাছে মুনাফার যন্ত্র, একেকজন কাস্টমার—যেকোনও সময় উৎখাত করাই যায়।

মানুষ গ্রামে চলে যাচ্ছে; অনেকটা স্রোতের মতো যেমন করে এসেছিল ঢাকা শহরে। কয়েকজনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়, ক্ষুব্ধ, এবং শোকাহত। যে ঢাকা তার অন্ন জোগাতো, সেটি তাকে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছে। একজন শ্রমজীবী মানুষ আমাকে বলেছেন, ‘আমার  হৃদয়ে আগুন  জ্বলছে’, যখন ভাবতে থাকে এই ঢাকায় আবার কবে ফিরবো’? আর একজন বলছেন, ‘এই গার্মেন্টসে আমার বউ, ছেলে, ছেলের বউ চাকরি করতো, কিন্তু আজ আমাদের আর দরকার নেই মালিকের। তাদের বিদেশি অর্ডার এখন তৈরি হয়ে গেছে। আমরা তো এখন বোঝা। আমাদের রক্ত আর ঘামের উপর এরা প্রতিষ্ঠিত। আমাদের আর কোনও অধিকার নেই এই গার্মেন্টসে; গ্রামের বাড়ি নাকি আমাদের ঠিকানা? আমাদের নাকি সেখানেই বাঁচতে হবে। অথচ এরাই আমাদের কত আশা দিয়েছিল।’   

সমসাময়িক পুঁজিবাদ সাধারণের জন্য আশার বাণী শোনায়, স্বপ্ন দেখায়। এই মেগাসিটি  আসলেই স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই স্বপ্নগুলো হচ্ছে— আধুনিকতার আকাঙ্ক্ষা, নিশ্চিত চাকরি, ভালো আয়, এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ। কিন্তু করোনাকালীন স্থবিরতা সবই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র বা তাদের কাজের মালিক এই সংকটে পাশে থাকেনি।  

দুটো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো, ঢাকায় করোনাকালে মানুষের জীবন জীবিকার ধাক্কাগুলো ধ্বংসাত্মক এবং এই অসহায় মানুষের জন্য কোনও সেফটি নেট নেই। বরং চাকরিদাতাদের চরিত্র হচ্ছে ‘খ্যাপাটে’। এর সঙ্গেই সম্পর্কিত হচ্ছে দ্বিতীয় বিষয়টি। তা হচ্ছে, রাষ্ট্র এখানে ওই  খ্যাপাটেদের বাহক হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে যা ঘটছে তা হলো, ওই ঢাকাবাসীরা তাদের বাসস্থান আর নিজ কর্মস্থলে বসবাস করার অধিকার থেকে উৎখাত হচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষ বাক্স পেটরাসহ গ্রামের বাড়িতেই আশ্রয় নিচ্ছে।    

এই সময়ে বাস্তুচ্যুত এবং স্থানচ্যুত হওয়ার প্রধান কারণই হচ্ছে পুঁজির এককেন্দ্রীকরণ—মুষ্টিমেয়দের হাতে তা কেন্দ্রীভূত আর বেশিরভাগ তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত। গার্মেন্টস এক্ষেত্রে ক্লাসিক উদাহরণ। আবার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একই অভিজ্ঞতা বহন করছে। তিন মাসের বাড়ি ভাড়া দিতে না পারা, চাকরি/জীবিকা হারানো, করোনার সম্ভাব্য সংক্রমণ-এসবই একজন মানুষ ও তার পরিবারকে গ্রামের বাড়িতে টানতে থাকে। এটি ডিসপোজেশন। আক্রান্ত হলে, মৃত্যু হলে দেশের বাড়ি তার নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল। এই ভাবনা যতটুকু না চিকিৎসা সংক্রান্ত, তার চেয়েও অধিক আধ্যাত্মিকমূলক। মূল সমস্যা হচ্ছে কাঠামোগত অসমতা—যার অনিবার্য ফলাফল বর্তমানের উল্টো রথ—শহর থেকে গ্রামে জোরপূর্বক অভিবাসন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট দেখা দেবে। নিকট ভবিষ্যৎ তার ইঙ্গিত  দিচ্ছে। রাষ্ট্রকে এর দায়-দায়িত্ব নিতেই হবে।    

লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা। এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।  

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ