‘উন্নয়ন’ মানে কংক্রিট, অক্সিজেন নয়

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৭:০৭, জুলাই ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৮, জুলাই ০৭, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমান২ শত টাকা মানে ৬ কেজি মোটা চাল এই দেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে, যদিও ২ শত তো বটেই, ২ হাজার, ২ লাখ কিংবা ২ কোটি টাকা এই দেশের বহু মানুষের কাছে কোনও টাকাই না। এমন মানুষরাই আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আছেন বলেই আমরা শুনতে পাই।
করোনা পরীক্ষার জন্য ‘নামমাত্র’ মূল্য ধার্য করা হয়েছে। অথচ করোনার আগে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পৌনে ৪ কোটি মানুষের সঙ্গে করোনার অভিঘাতের কারণে আগের সংখ্যার সঙ্গে সমান সংখ্যক মানুষ যুক্ত হয়েছে বলে আমাদের জানিয়েছে ব্র্যাক, সানেম, সিপিডি, বিএইডিএস এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মতো সংস্থাগুলো।
বলা হচ্ছে, এই দেশের মানুষ নাকি ‘অহেতুক’ করোনা টেস্ট করাচ্ছে, তাই সরকার করোনা পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করেছে। করোনা পরীক্ষায় ফি নির্ধারণ নিয়ে সমাজের প্রতিটা ক্ষেত্র থেকে প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু সরকার সেটা থেকে সরে আসেনি। বিনামূল্যে এই পরীক্ষা করতে গিয়ে কিছু টাকা সরকারের খরচ হচ্ছে, এটা সরকারের ভালো লাগছে না। 

গত বেশ কিছুদিন করোনা পরীক্ষার জন্য মানুষের রাতের বেলা লাইন দেওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা, ঘুষ দিয়ে সিরিয়াল পাওয়া ইত্যাদি মরিয়া চেষ্টাগুলো আমরা দেখেছি করোনা পরীক্ষা করার জন্য। কারণ আমরা এর মধ্যে জেনে গেছি শুধু করোনার লক্ষণ না, বহু রোগী করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট ছাড়া অন্য রোগের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না। 

পত্রিকায় অবশ্য এটাও এসেছে, বিভিন্ন জায়গায় কিছু ‘ভিআইপি’ অহেতুক পরীক্ষা করেছেন যাদের কারণে সাধারণ জনগণের পরীক্ষা করতে সমস্যা হয়েছে। মজার ব্যাপার, ২০০/৫০০ টাকা ফি নির্ধারণ করে সেসব ‘ভিআইপি’কে পরীক্ষা থেকে ঠেকিয়ে রাখার কোনও উপায়ে আসলে নেই। মোদ্দাকথা এই পরীক্ষাগুলো থেকেও সরকার কিছু আয় করতে চাইছে। এবং এতে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গরিব মানুষগুলোর করোনা পরীক্ষার পথ বন্ধ করা হলো। 

করোনার সঙ্গে খুব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত আরেকটা বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা খবর এবার দেখে নেওয়া যাক। ২৬ জুন দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকে ‘করোনা চিকিৎসায় অক্সিজেনের ঘাটতি শিগগিরই দূর হচ্ছে না’ শিরোনামের একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, যার প্রথম অনুচ্ছেদটি এরকম— 

‘করোনা চিকিৎসায় অক্সিজেনের ঘাটতি শিগগিরই দূর হচ্ছে না। অক্সিজেনের সংকট কাটিয়ে উঠতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের উদ্যোগ কাজে লাগতে দেড় থেকে দুই মাস বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অক্সিজেন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, ঠিক সময়ে পদক্ষেপ না নেওয়ায় অক্সিজেনের সংকট তৈরি হয়েছে।’

আমরা অনেকেই জানি অনেক রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনেক উচ্চমাত্রার ‘হাই ফ্লো’ অক্সিজেন দেওয়ার জন্য অবশ্যই কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা থাকতে হয়। শুধু তাই না, হাই ফ্লো ছাড়াও কিছু রোগীকে যে মাত্রার অক্সিজেন দিতে হয় তাতেও সিলিন্ডার এত দ্রুত বদলাতে হয় যে রোগীর অক্সিজেন দেওয়া খুব জটিল হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই সিলিন্ডারও পর্যাপ্ত পরিমাণ দূরেই থাকুক মোটামুটি সন্তোষজনক পর্যায়েও নেই। এই পরিস্থিতি বড় বড় শহরেই, তখন জেলা উপজেলা পর্যায়ের কথা বলা স্রেফ বাতুলতা।

এখানে আমরা স্মরণ করবো, আমাদের দেশে সরকারি সাধারণ ছুটি যখন ঘোষণা করা হয় তখন এটাকে লকডাউন বলা হয়নি এবং তখন থেকেই মানুষ অত্যন্ত অসতর্কভাবে সামাজিক দূরত্ব না মেনে জীবন যাপন করেছে। এরপর তো রোজার সময় মসজিদসহ সব উপাসনালয় খুলে দেওয়া, ইফতার বিক্রি করা এবং শপিংমল খুলে দেওয়া হয়েছে। আর ঈদের পর তো ছুটি পুরোপুরি তুলে দেওয়া হলো। এসব কিছু মাথায় রাখলে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন একজন মানুষ বলতে পারে—খুব দ্রুতই করোনা আক্রান্ত মানুষের একটা বড় ঢল হাসপাতালের দিকে যেতে শুরু করবে। ‌তাহলে হাসপাতালে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের প্রস্তুতি কেন রাখা হয়নি? 

আইসিইউ-ভেন্টিলেটর না পেয়ে কেউ মারা গেছে, অনুমান করি একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এই দেশের সাধারণ মানুষরা এখন এটা নিয়ে তাদের খুব বড় আক্ষেপ থাকবে না, কিন্তু শুধুমাত্র অক্সিজেনের অভাবে কেউ মারা যাচ্ছে, এটা মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া কি সম্ভব কোনোভাবে? সেটাও এমন একটা দেশে যেটা নাকি ‘উন্নয়নের রোলমডেল’। 

যেদিন অক্সিজেন নিয়ে এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ঠিক তার পরদিন দেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পত্রিকায় একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ‘মেগা প্রকল্পের কাজে গতি আনতে চায় সরকার’ শিরোনামে। সেটার একটা অনুচ্ছেদ এরকম—

‘তিন মাস ধরে স্থবির মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ। ১০টি স্প্যানসহ পদ্মা সেতুর প্রায় এক-চতুর্থাংশ কাজ বাকি। কাজের গতি কমেছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পেও। নভেল করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব পড়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ দেশে সব মেগা প্রকল্পে। ফলে সঠিক সময়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে দেশে চলমান মেগা প্রকল্পগুলোয় গতি আনতে চায় সরকার। এজন্য প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি পরামর্শক ও বিশেষজ্ঞদের দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।’

আমরা যারা কিছুটা খোঁজখবর রাখি তারা কিন্তু জানি, করোনার এই চরম অভিঘাতের সময়‌ও এই সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি খাত স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি ২০২০-২১ সালের বাজেটে পুরোপুরি অবহেলিত থেকে গেছে। যদিও সমাজের বিভিন্ন জায়গা থেকে বলা হয়েছিল এই বছর ভৌত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে সেটা উল্লিখিত খাতগুলোতে ব্যবহার করলে মানুষের জীবন এবং জীবিকা ঠিক রাখা যেতো। কিন্তু সরকার মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় বরাদ্দ ঠিকই রেখেছে এবং সেগুলো যাতে দ্রুত শেষ করা যায় সেই ব্যাপারে সরকারের চরম মনোযোগ দেখা যাচ্ছে। এতটাই কংক্রিটপ্রেম সরকারের!

জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং সেটার ভিত্তিতে হিসাব করা মাথাপিছু আয় উন্নয়নের নির্দেশক হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে গত কয়েক দশক থেকেই। কিন্তু এই বিষয়টা নিয়ে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কাজ হয়েছে ২০০৮ সালে। সেই সময়ের বিশ্বমন্দার মধ্যেই ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি দু’জন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ এবং অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বিখ্যাত ফরাসি অর্থনীতিবীদ জাঁ পল ফিটুসিকে দায়িত্ব দেন জিডিপিভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিমাপের সমস্যা এবং এর বিকল্প নিয়ে প্রস্তাবনা দিতে। ২০১০ সালে বের হয় এই তিন লেখকের গবেষণার ফল—‘মিসমেজারিং আওয়ার লাইভস: হোয়াই জিডিপি ডাজনট অ্যাড আপ’ শিরোনামের বইতে। বইটির শিরোনামই আমাদের বলে দেয় জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে করা অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপ করার সনাতন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের বেশিরভাগ মানুষের সত্যিকারে ভালো থাকা পরিমাপ না; তাই বিকল্প পরিমাপ পদ্ধতি জরুরি। তার ফলশ্রুতিতেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখানোর প্রবণতা বর্তমান পৃথিবীতে বিলুপ্তই হয়ে গেছে প্রায়। কিন্তু আমাদের মতো দেশে এই ঘটনাটা এখনও এই ‘সেকেলে’ চর্চাটা চলছেই অবিশ্বাস্যভাবে। 

আমাদের দেশের এমন চর্চার মধ্যে আমরা অনেকেই খেয়াল করছি না, বাজেটের এমন দর্শন এখন পৃথিবীতেই পাল্টে গেছে। করোনা মোকাবিলায় অত্যন্ত আলোচিত নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন গত বছর থেকে তার দেশে ‘ওয়েলবিয়িং বাজেট’ করতে শুরু করেছেন। বাজেটের কেন্দ্রে রাষ্ট্রের প্রায় সব মানুষকে কীভাবে রাখা যায়, কীভাবে তাদের ভালো রাখা যায়, সেই চেষ্টা তিনি ক্রমাগত করে যাচ্ছেন। এখানে পরিসর কম, তাই বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না, তবে সেই বাজেটের দুই একটা বরাদ্দের কথা জানলেই বোঝা যাবে একটা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি এখন কোথায় যাচ্ছে। জেসিন্ডার ‘ওয়েলবিয়িং বাজেট’-এ নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ তো আছেই, আমাদের অনেকের অবাক লাগবে শুনলে—ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণের জন্য তার বাজেটে আলাদা অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। 

এই সরকারের উন্নয়ন দর্শন হচ্ছে কতগুলো মেগা প্রকল্প বানিয়ে বড় অঙ্কের দুর্নীতি করার আর সেই প্রকল্পগুলো মানুষকে দেখিয়ে উন্নয়ন দাবি করা। এই চর্চা আমরা দেখছি প্রায় এক যুগ হলো। এই সরকারের উন্নয়ন দর্শনে সমাজের সিংহভাগ মানুষকে ভালো রাখার চেষ্টা আমরা কখনও দেখিনি।

আমি বিশ্বাস করি জনগণ তার এই চরম বিপদের সময়ে সরকারের এই আচরণ দেখছে, মনে রাখছে, এবং তার নিজের কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হচ্ছে।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ