সাহেদদের কারা বানায়, কারা পোষে?

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৬:৫৬, জুলাই ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৮, জুলাই ০৯, ২০২০

প্রভাষ আমিনমার্চে যখন বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়লো, তখন অন্যরকম একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মৃত্যুভয়ে কাতর মানুষদের দেখে মনে হচ্ছিল, করোনা বুঝি পৃথিবীকেই বদলে দেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমা চাওয়ার হিড়িক পড়ে। করোনা থেকে বেঁচে গেলে কী কী করবেন, অনেকেই তার ফিরিস্তি দেন। মোটামুটি সবাই বলেছেন, এবার বেঁচে গেলে মিথ্যা বলবেন না, লোক ঠকাবেন না, দুর্নীতি করবেন না, মা-বাবাকে সময় দেবেন, পরিবারকে সময় দেবেন। সবার আকুতি দেখে আমি ভাবছিলাম, আহা, যদি বেঁচে যাই, নিশ্চয়ই অসাধারণ একটা কল্যাণ বিশ্বের দেখা পাবো। যেখানে যুদ্ধ থাকবে না, অন্যায় থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না। অনেক মানবিক একটা বিশ্ব পাবো আমরা। কিন্তু আমার ভাবনায় যে কত বড় ভুল ছিল, তা পদে পদে দেখিয়ে দিয়েছে মানুষ। করোনা এখনও যায়নি, কবে যাবে তাও নিশ্চিত নয়। বরং মার্চের চেয়ে পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ। আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা এখনও আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। কিন্তু মার্চের সেই আতঙ্ক এখন আর নেই। বোঝা গেলো একবিংশ শতাব্দীতে আতঙ্কের আয়ু বড়জোর তিন মাস। প্রতিদিন দুপুর আড়াইটায় মৃত্যু আর সংক্রমণের হিসাব নিয়েও আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমরা আবার ফিরে গেছি সেই চেনা পৃথিবীতে, যেখানে মানুষের চেয়ে অমানুষ বেশি। চুরি, দুর্নীতি, ক্রসফায়ার, রাজনীতি, ল্যাং মারামারি—সবই আছে। আমরা ভেবেছিলাম করোনা পরবর্তী বিশ্ব হবে শান্তির, কোনও যুদ্ধ হবে না। কিন্তু করোনা থাকতেই ভারত-চীন সীমান্তে যুদ্ধের উত্তেজনা।

অন্য দেশের কথা জানি না। সম্ভবত বাংলাদেশই সবার আগে করোনা আতঙ্ক থেকে বেরিয়ে এসেছে। একদম শুরুতে করোনা আতঙ্ক নিয়ে ব্যবসা করেছে কিছু মানুষ। শুরুতে মাস্ক আর স্যানিটাইজারের বাজারে আগুন লাগিয়ে কিছু মানুষ ব্যবসা করেছে। তারপর আমরা দেখেছি ভুয়া এন৯৫ মাস্ক সরবরাহ করে ডাক্তারদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের চেনা ঠিকাদার নামের লুটেরারা। তারপর একে একে এমন সব খবর দেখেছি, বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছি। মাস্ক বা স্যানিটাইজারের দাম বেশি নিয়েছে, তাও না হয় মানলাম, হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সুযোগে কিছু মানুষ না হয় ব্যবসা করে নিয়েছে। কিন্তু যখন শুনি বাজার সয়লাব নকল স্যানিটাইজার আর ভুয়া মাস্কে, তখন ভাবি এরা কি মানুষ? যখন ভুয়া অক্সিজেন সিলিন্ডার আর নকল পালস অক্সিমিটার বিক্রি হচ্ছে; তখন ভাবি এরা কারা।

এর আগে একটি কলাম ‘মাস্কে উন্মোচিত মুখোশ’ শিরোনামে লিখেছিলাম। ‘আমরা সবাই আসলে মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াই। এই অদৃশ্য মুখোশগুলো খুলে দিলে দেখা যেতো আমাদের কদর্য চেহারা। আমরা প্রায়ই বলি, অমুকের মুখোশ উন্মোচন করে দিতে হবে। কিন্তু আমাদের এই অদৃশ্য মুখোশটা এতই শক্ত, এটা উন্মোচন করা কঠিনই বটে। তবে পরিস্থিতি আমাদের বদলে দেয়, দুর্যোগ এলেই উন্মোচিত হয়ে যায় অনেকের মুখোশ। এই যেমন করোনা দুর্যোগে আমরা সবাই মুখে মাস্ক লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। মানে আমাদের এখন দুটো মাস্ক—একটা অদৃশ্য, তার ওপর একটা দৃশ্যমান। তবে এই দৃশ্যমান মাস্ক আমাদের কারও কারও অদৃশ্য মাস্ক খুলে দিয়েছে। উন্মোচিত হয়ে গেছে আমাদের কারও কারও আসল চেহারা।’

সত্যি করোনা এসে আমাদের অনেকের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়ে আসল চেহারা বের করে দিচ্ছে। করোনার একদম শুরুর দিকে টেস্ট নিয়ে যখন হাহাকার তখন করোনা টেস্টে মানুষের ভোগান্তি কমাতে বিভিন্ন এলাকায় বুথ বসিয়ে এবং বাসায় গিয়ে স্যাম্পল সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় জোবেদা খাতুন সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা বা জেকেজি হেলথ কেয়ার নামের একটি সংগঠন। আরও অনেক মানবিক উদ্যোগের মতো জেকেজিকেও আমার নিঃস্বার্থই মনে হয়েছিল। ক’দিন আগে জানা গেলো পুরোটাই ধাপ্পাবাজি। তারা স্যাম্পল সংগ্রহ করেছে বটে, তবে টেস্ট করেনি; মনগড়া রিপোর্ট দিয়ে টাকা নিয়েছে। জেকেজির সিইও আরিফুল হক চৌধুরী এখন কারাগারে। করোনা যে এমনভাবে তার মুখোশ খুলে দেবে, কে ভেবেছিল। জেকেজি সরকারের অনুমোদন নিয়েই দুই নম্বরি করছিল। আবার মাত্র ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে করোনা সার্টিফিকেট বিক্রি করা চক্রকেও আটক করেছে পুলিশ। বাংলাদেশ সম্ভবত একমাত্র দেশ যেখানে করোনা টেস্টের নামে হয়রানিও হয়, দুই নম্বরিও হয়। ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট নিয়ে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিরা এখন সারাবিশ্বকেই জানিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের এই ‘বিরল অর্জন’-এর কথা। ইতালির পত্রিকায় বাংলাদেশ শিরোনাম হয়েছে ভুয়া করোনা সার্টিফিকেটের কল্যাণে। ইতালি ১২৫ বাংলাদেশিকে নামতে দেয়নি। করোনা সার্টিফিকেট নিয়ে দুই নম্বরি করা এই অমানুষগুলো দেশকে আর কত নিচে নামাবে?

তবে করোনায় সবচেয়ে বড় আবিষ্কার নিশ্চয়ই রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ। রিজেন্ট গ্রুপের একটি হাসপাতাল আছে, যার দুটি শাখা; একটি মিরপুরে, আরেকটি উত্তরায়। নাম শুনলেও এই হাসপাতাল সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না কারও। কিন্তু শুরু থেকেই সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি রিজেন্ট হাসপাতাল কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছে। রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে আমি আগে থেকেই চিনি। বিশেষ কিছু জানি না, তবে নানান আড্ডায়, পার্টিতে, অনুষ্ঠানে দেখা হয়। টক শো’র পরিচিত মুখ। দেখা হলেই অভিযোগ করে, সব টিভিতে গেলাম, আপনাদের টিভিতে কখনও গেলাম না। কিন্তু আমার শুরু থেকেই তাকে সন্দেহজনক মনে হতো। তাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই চলতাম। কিন্তু করোনার শুরু থেকেই সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি রিজেন্ট হাসপাতালের কোভিড-১৯ চিকিৎসায় এগিয়ে আসা দেখে আমার একটু অনুশোচনাও হয়েছে—মানুষটিকে যত খারাপ ভেবেছি, ততটা খারাপ নিশ্চয়ই নয়। আর খারাপ হলেও এই মহামারিকালে মানবতার পাশে দাঁড়িয়ে নিশ্চয়ই নিজেকে শুধরে নিয়েছে। আগে কখনও না করলেও করোনার সময় একবার তাকে আমার অনুষ্ঠানে সংযুক্ত করেছিলাম। তবে সেটা রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে নয়, একমাত্র বেসরকারি কোভিড হাসপাতালের মালিক হিসেবে। ‘মানুষ কোথায় যাবে’ শিরোনামের সে অনুষ্ঠানে করোনা আক্রান্ত হলে মানুষ চিকিৎসার জন্য কোথায় যাবে, সেটা নিয়েই আলোচনা ছিল। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় মো. সাহেদকে সংযুক্ত করা হয়েছিল। সে অনুষ্ঠানে সরকারি কোভিড হাসপাতালের পরিচালক, বেসরকারি নন কোভিড হাসপাতালের মালিক এবং চিকিৎসক নেতারাও ছিলেন।

একমাত্র বেসরকারি হাসপাতাল বলে অনেকের ভরসার জায়গাও ছিল রিজেন্ট হাসপাতাল। দেখেছি সাংবাদিকদের অনেকেই সেখানে ভর্তি হয়েছেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রথম সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকনের মৃত্যুও হয়েছে রিজেন্ট হাসপাতালে। পরে তার পরিবারের সদস্যরাও সেখানেই ভর্তি ছিল। এখন ভাবি খোকনের মৃত্যু কি রিজেন্টে বিনা চিকিৎসায় হলো? মে মাসে করোনা আক্রান্ত এক আত্মীয়কে হাসপাতালে ভর্তি করা দরকার ছিল। আমি অন্তত ১০টি বেসরকারি হাসপাতালে ফোন করেও কোনও সিট পাইনি। পরে মধ্যরাতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে অক্সিজেন দিতে পেরেছিলাম। সেই রাতে হাসপাতালের খোঁজে ব্যাকুল আমি এক সাংবাদিক বন্ধুর কাছ  থেকে নম্বর নিয়ে মো. সাহেদকেও ফোন করি। যদিও সেদিন তার হাসপাতালে সিট পাইনি, তবুও তাকে ধন্যবাদ জানাই, মানবতার জন্য কাজ করছে বলে। এখন ভাবছি, ভাগ্যিস সেদিন সেখানে সিট ছিল না। থাকলে আমার আত্মীয়কে বাঁচানোই মুশকিল হতো।

র‌্যাবের এক অভিযানেই রিজেন্ট হাসপাতাল, রিজেন্ট গ্রুপ এবং মো. সাহেদের সব গোমর ফাঁস হয়ে গেছে। আমরা যেটাকে মানবতার সেবা ভেবেছি, এখন শুনছি সেটা আসলে মুখোশ। অনেক বড় বড় হাসপাতাল চেয়েও কোভিড চিকিৎসার অনুমতি পায়নি। আর মো. সাহেদ প্রভাব খাটিয়ে রিজেন্টের মতো একটি বিপজ্জনক হাসপাতালের নামে সে অনুমতি আদায় করে নিয়েছিল। এখন র‌্যাবের অভিযানে জানা যাচ্ছে, কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা দেওয়া তো দূরের কথা, রিজেন্ট আসলে কোনও হাসপাতালই না। আইসিইউর নামে সেখানে যা ছিল, সেটা আসলে অন্য হাসপাতালের ওয়ার্ডের চেয়েও খারাপ। বিছানা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আইসিইউর ফ্রিজে র‌্যাব আইড় মাছ পেয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতাল কোভিড-১৯ চিকিৎসার ক্ষেত্রে তিনটি অপরাধ করেছে।

এক. ২০১৪ সালের পর তাদের হাসপাতালের অনুমতি নবায়ন করেনি। তার মানে এটি একটি অবৈধ হাসপাতাল।

দুই. শুধু ভর্তি রোগীর স্যাম্পল নিয়ে করোনা টেস্ট করার কথা থাকলেও তারা বাইরে থেকেও স্যাম্পল সংগ্রহ করেছে এবং বিনা পয়সায় টেস্ট করার কথা থাকলেও তারা টাকা নিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো, টেস্ট না করেই মনগড়া রিপোর্ট দিয়েছে। এভাবে কত পজিটিভ রোগী নিজেদের নেগেটিভ ভেবে ঘুরে বেড়িয়ে করোনা ছড়িয়েছেন কে জানে। আর রিজেন্ট হাসপাতালের রিপোর্ট নিয়ে বিদেশ গিয়ে না জানি কত মানুষ কত বিপদে পড়ছে। র‌্যাবের ধারণা করোনা টেস্টের নামে জালিয়াতি করে রিজেন্ট অন্তত ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

তিন. বিনা পয়সায় কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা রোগীর কাছ এক থেকে তিন লাখ টাকা আদায় করেছে। আবার সরকারের কাছেও এক মাসে এক কোটি ৯৬ লাখ টাকার বিল জমা দিয়েছে। তার মানে সাহেদ গাছেরটাও খেয়েছে, তলারটাও কুড়িয়েছে।

সাহেদ কাহিনিতে পরে আসছি, আগে একটু বলে নেই, রিজেন্ট নামের একটি নামকাওয়াস্তে হাসপাতাল শুরু থেকেই কোভিড-১৯ চিকিৎসা দেওয়ার অনুমতি পেলো কীভাবে? এখন দেখছি স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন সবার উপস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি করছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতর কি জানতো না রিজেন্ট হাসপাতালের অনুমতি নেই? তারা কি জানতো না, রিজেন্টের কোভিড-১৯ চিকিৎসার সক্ষমতা নেই? তাহলে কি এই অনুমতির ক্ষেত্রেও লেনদেন হয়েছে? সাহেদ তো সরকারের অনুমতি নিয়েই প্রতারণা করছিল। সাধারণ মানুষ তো হাসপাতালে লাইসেন্স চেক করে, আইসিইউ ঠিক আছে কিনা দেখে ভর্তি হবে না। সরকারের অনুমতি আছে দেখে যারা রিজেন্টে গিয়ে প্রতারিত হয়েছে, অপচিকিৎসা পেয়েছে, মারা গেছে; এর দায় সাহেদের তো বটেই, স্বাস্থ্য অধিদফতরকেও নিতে হবে। যারা সাহেদকে সাহেদ বানালো, ধরতে হবে তাদেরও।

মানুষের জীবন নিয়ে এই ব্যবসার অভ্যাস অবশ্য আমাদের পুরনো। আজ ধরা পড়েছে বলে রিজেন্ট বা মো. সাহেদ নিয়ে এত আলোচনা। কিন্তু আমি নিশ্চিত, বাংলাদেশের রিজেন্ট মানের আরও অনেক হাসপাতাল আছে। মো. সাহেদের মতো আরও অনেক প্রতারক মুখোশ পরে ঘুরে বেরাচ্ছে। ‘মাস্কে উন্মোচিত মুখোশ’ থেকে আরেকটু উদ্ধৃত করি, ‘করোনা তো একদিন যাবেই। এই যে আমাদের মুখোশগুলো একে একে খুলে দিয়ে যাচ্ছে, সুযোগ হলো এদের চিনে রাখার। পরে আবার যেন তারা মুখোশটা পরে নিতে না পারে। আমাদের সবার অদৃশ্য মুখোশ উড়িয়ে নিয়ে যাক করোনা। আমরা যেন মনে আর মুখে এক ও অভিন্ন মানুষ হতে পারি, আরও ভালো মানুষ হতে পারি, আরও মানবিক হতে পারি।’

এবার আসি মো. সাহেদ প্রসঙ্গে। হঠাৎ করেই টক শো’তে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বনে যাওয়া সাহেদকে একটু রহস্যজনক মনে হলেও আমার তার ব্যাপারে কোনও কৌতূহল ছিল না। আমি জানি এমন আরও অনেক হাইব্রিড আওয়ামী লীগার আমাদের চারপাশে ঘুরঘুর করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আর আওয়ামী লীগের নাম বেচে ধান্ধাবাজি করছে। সাহেদের মতো ছাই দিয়ে ধরতে না পারলে এদের আটকানো মুশকিল। এখন জানা যাচ্ছে, হঠাৎ আওয়ামী লীগ বনে যাওয়া এই মো. সাহেদ নাকি হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ঠ ছিল, তখন তার নাম ছিল সাহেদ করিম। এমএলএম কোম্পানি করে ৫০০ কোটি টাকা মেরে দিয়ে প্রতারণার মামলায় কিছুদিন জেল খেটে বেরিয়ে মো. সাহেদ নাম ধারণ করে রিজেন্ট গ্রুপ গড়ে তোলে। তারপর প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে চলে ধান্ধাবাজি। সাহেদ নাকি নিজেকে কখনও অবসরপ্রাপ্ত মেজর বা কর্নেল বা লেফটেন্যান্ট কর্নেল পরিচয় দিতো। প্রতারণার সর্বশেষ এপিসোডে তার প্রধান অস্ত্র ছিল প্রভাবশালীদের সঙ্গে ছবি তুলে তা সবাইকে দেখানো। ফেসবুকে তো এ ধরনের ছবির ছড়াছড়ি, তার হাসপাতালের সামনেও বড় করে বাঁধাই করা আছে সেসব ছবি। সাহেদের সঙ্গে ছবি নাই, এমন কোনও লোক বোধহয় বাকি নেই। তবে যাদের সঙ্গে ছবি, আমি তাদের অত দায় দিতে চাই না। কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে কেউ ছবি বা সেলফি তুলতে চাইলে না করাটা অসামাজিকতা। রাজনীতিবিদদের তো না করার সুযোগই নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই জেলখাটা টাউট, ৩২ মামলার আসামি এসব ছবি তোলার জন্য বঙ্গভবন, গণভবন, সেনাকুঞ্জ, ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাবের মতো জায়গায় যাওয়ার সুযোগ পেতো কীভাবে? সাধারণ মানুষ তো চাইলেই এসব জায়গায় যেতে পারবে না। সাহেদকে কারা আমন্ত্রণ জানাতো?

মানছি সাহেদের উত্থানের পেছনে সাংবাদিকদের কারও কারও অবদান আছে। জেনে হোক বা না জেনে, স্বেচ্ছায় হোক  চাপিয়ে দিয়ে হোক, স্বার্থে হোক বা নিঃস্বার্থে, আমাদের কেউ কেউ সাহেদকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক’ বানিয়েছে। আবার সাহেদের এই অপকর্ম ফাঁসও করেছে সাংবাদিকরাই। কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য রিজেন্ট হাসপাতাল সরকার থেকে ডাক্তার ও নার্স পেয়েছে। সরকারি দুই ডাক্তারই রিজেন্ট হাসপাতাল সম্পর্কে অবিশ্বাস্য সব অভিযোগ এনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। সেই চিঠির সূত্র ধরেই চ্যানেল ২৪এর রিপোর্টার আব্দুল্লাহ আল ইমরানের অনুসন্ধানে কেঁচো খুড়তে বেরিয়ে আসে অ্যানাকোন্ডা। আচ্ছা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার কাছে ছিল সেই চিঠি? তিনি কেন ব্যবস্থা নেননি?

সাহেদ করিম থেকে মো. সাহেদ বনতে জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি করেছে এই প্রতারক। তার প্রতারণার জাল ছড়িয়েছিল সর্বত্র। ছাত্রলীগ করা ত্যাগী নেতাকর্মীরা বছরের পর বছর ঘুরেও আওয়ামী লীগ বা এর কোনও অঙ্গসংগঠনে ঠাঁই পান না। সেখানে হাওয়া ভবনের সাহেদ করিম কীভাবে মো. সাহেদ হয়ে ঢুকে পড়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে? সাহেদের সঙ্গে ছবি থাকা নেতাদের আমি দোষ দেই না, কিন্তু তার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সাব কমিটির সদস্য হয়ে যাওয়ার দায় অবশ্যই দলকে নিতে হবে। ধরা পড়ার পর এখন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সাহেদ দলের কেউ নয়। তাহলে এতদিন সেটা বলেনি কেন? ফেসবুকে তো প্রথম পরিচয় সে আওয়ামী লীগের সাব কমিটির সদস্য। এই লেখা পর্যন্ত তার সে পরিচয় জ্বলজ্বল করছে। পলাতক হলেও তার ফেসবুক সচল। আর এই পরিচয়েই সে ধান্ধাবাজি করেছে, টক শো করেছে। আওয়ামী লীগের কোনও নেতার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সেখানে হাজির। আর সাহেদ সবার সামনে দলের নাম ভাঙাচ্ছে বছরের পর বছর, কেউ দেখলো না কেন?

কথায় বলে চোরের দশ দিন, গৃহস্থের একদিন। দুদিন আগেও যে সাহেদ রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান, রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক, টক শো করা সুশীল, গাড়িতে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড লাগিয়ে চার সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে চলা সেই দাপুটে ধান্ধাবাজ আজ পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এর আগেও আমরা দেখেছি সম্রাট, জিকে শামীম, পাপিয়া, সাহেদরা আমাদের চারপাশেই মুখোশ পরে ঘুরে বেরায়। আমরা চিনতে পারি না। যখন মুখোশটা খুলে যায়, তখন আমরা চমকে যাই। আমি নিশ্চিত, এখনও আমাদের চারপাশে আরও অনেক সাহেদ, সম্রাট, জিকে বা পাপিয়া আছে, সুন্দর মুখোশ পরে বসে আছে। তাই আমাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। আর সাহেদদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়; যাতে অন্য সাহেদরা সতর্ক হয় আর নতুন কোনও সাহেদ তৈরি হতে না পারে। আর সাহেদ করিমকে কারা মো. সাহেদ বানালো, খুঁজে বের করতে হবে তাদেরও।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ