লাভ বোম্বিং: আবেগ শিকারির গোপন ক্ষেপণাস্ত্র

Send
সাদিয়া নাসরিন
প্রকাশিত : ১৩:৫৪, জুলাই ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৬, জুলাই ১১, ২০২০

সাদিয়া নাসরিনকিছু কেস স্টাডি, কিছু ঘটনা আচমকা সামনে এসে আমাদের হতবিহ্বল করে দেয় না? ভীষণ সাহসী, ঋজু, স্বাধীন সচেতন, মেয়েরা কোনও আবেগ শিকারির  হাতে এক্সপ্লয়টেশনের শিকার হয়ে কোনও এক সুন্দর সকালে প্রেস ক্লাবের সামনে পোস্টার হয়ে যায়, কিংবা সঙ্গীর নৃশংসতায় দৃষ্টি হারিয়ে খবরের শিরোনাম হয়ে যায়, যার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
আমরা নিরন্তর গবেষণা করেও কূল করতে পারি না যে ঠিক কোন কারণে লড়াকু সব মেয়ে, যারা নিজের যোগ্যতায় নিজের পরিচয়  তৈরি করে, অন্য মেয়েদের অধিকার সংগ্রামের পথে ইট বিছিয়ে যায়, যাদের মেরুদণ্ড যথেষ্ট শক্ত, শিরদাঁড়া টানটান, এমন মেয়েরা কোন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সুরে নিজের সব ভুলে গিয়ে স্রেফ আবেগের বলি হয়ে পার্টনারকে এতটাই সাবমিশন দেয় যে, বিয়ের মতো একটি সিদ্ধান্তও গোপন করতে বাধ্য হয় বা নিঃশর্তে তুলে দিতে বাধ্য হয় নিজেদের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত বা সঙ্গীর অপমান মেনে নিতে থাকে যে অবধি না চূড়ান্ত নৃশংসতার শিকার হয়!

কী এমন জাদুবলে এসব পুরুষ নারীর মনস্তত্ত্বের ওপর এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, স্বাধীন, সচেতন ও দৃঢ় মেয়েদেরও দিনের পর দিন মানসিকভাবে প্রতারিত করতে পারে, সামাজিকভাবে হীন করতে পারে, ‘পার্সোনালিটি ড্যামেইজ’ করে দিতে পারে, আর্থিকভাবে নিঃস্ব করতে পারে, সেক্সুয়ালি এক্সপ্লয়েট করতে পারে, শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে পারে!

কীভাবে পারে? কেন পারে? এটি কি শুধুই প্রেমের রসায়নের অবুঝ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কাছে নারীর নিজেকে ছেড়ে দেওয়া নাকি আরও গভীর কোনও মনস্তাত্ত্বিক চক্রান্ত এর পেছনে কাজ করে?

এই যে নারীর ওপর পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কৌশল, মনোবিজ্ঞানীরা তার নাম দিয়েছেন ‘লাভ বোম্বিং’ বা ‘প্রেমের বিস্ফোরণ’। লাভ বোম্বিং ধারণাটি মনোবিজ্ঞানে নতুন নয়। উনিশের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিফিশন চার্চের নেতা সান মায়ুং মুন প্রথম এটি ব্যবহার করেছিলেন। ‘মুনিজ’ সম্প্রদায়ের এই নেতা লাভ বোম্বিং ধারণাটি প্রথম ব্যবহার করেন, অনুসারীদের আনুগত্য, শীর্ষস্থানীয় সুখ এবং আগ্রহ বা উদ্বেগের সত্যিকারের অভিব্যক্তি বোঝাতে।

মনোবিজ্ঞান বিষয়ক ব্লগ সাইকোলজি টুডের  রেফারেন্স অনুযায়ী, মূলত যেকোনও গ্যাং নেতারা অনুসারীদের আনুগত্যকে উৎসাহিত করার জন্য লাভ বোম্বিং ধারণাটির ব্যবহার শুরু করলেও পরবর্তীতে নার্সাসিস্ট বা সাইকোপ্যাথ বা প্রতারকরা তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে এই কৌশলটি চর্চা শুরু করে।

এটি এমন এক মনোমুগ্ধকর মনোবিজ্ঞান এবং বিপজ্জনক মায়া যার মাধ্যমে আপনার সঙ্গী আপনার ভালোবাসা এবং বিশ্বাস অর্জনের জন্য আপনাকে তার কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মূল্যবান ভাবায় এবং আপনি যে ধরনের সম্পর্কের গভীরতা চান, আপনার সঙ্গী আপনাকে খুব অল্প সময়ে তারচেয়েও অনেক গভীরতম অনুভূতি আপনাকে দেয়, যেখানে আপনার কোনোরকমের সন্দেহ বা অস্বস্তির সুযোগই থাকে না। সুতরাং খুব অল্প সময়েই আপনার আবেগের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে আপনার সঙ্গী।

বিষয়টিকে শুরু থেকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। হঠাৎ এমন কারও সঙ্গে আপনার ইমোশনাল কানেকশন তৈরি হলো যে কিনা আপনার আবেগের এমন অংশগুলোকে নাড়া দিয়েছে যা আপনি প্রত্যাশাই করেননি। আপনি যে ধরনের সূক্ষ্মতা, সৃজনশীলতা এবং সংবেদনশীলতা আপনার সঙ্গীর কাছে প্রত্যাশা করেছেন এতদিন সে তার পুরোটার সঙ্গেই নিজেকে কানেক্ট করতে পেরেছে।  হতে পারে সেটি একটিমাত্র বাক্য বা একটি মুহূর্ত। এবং এই সময় আপনার আবেগের উচ্ছ্বাস এতটাই তীব্র হয়ে উঠলো যে,  আপনার মনে হতে লাগলো যে আপনি নিজের আত্মার সন্ধান পেয়েছেন। এই মুহূর্তগুলো আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এমন জায়গায় যেখানে আপনি আপনার ভাগ্যকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। আপনি বিশ্বাস করে ফেলেছেন যে আপনি আপনার সোলমেট খুঁজে পেয়েছেন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই মুহূর্ত থেকেই শিকারির ছুড়ে দেওয়া বোমাটি আপনার ওপর বিস্ফোরণ হয়ে গেছে অজান্তেই। এবং আপনার সঙ্গী এর ক্ষয়ক্ষতি থেকে ইতিমধ্যেই নিজেকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে। এই অবস্থাকে বলা হয় রেড ফ্ল্যাগ ইন লাভ বোম্বিং। এই অবস্থায় আপনি ভীষণ রকমের কনফিউজড। এখন আপনি কেবল একটি প্রশ্নের আবর্তেই ঘুরতে থাকবেন যে, ‘সে প্রথম দিকে এত দুর্বার ছিল, সেসব কি সত্যি ছিল না? আমি কেন সেই ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনতে পারি না? আমি জানি সে আমাকে ওভাবেই ভালোবাসে, যা সে আমাকে দেখিয়েছিল। এখন যে আচরণ করছে নিশ্চয়ই তার পেছনে কোনও ব্যাখ্যা আছে। তাকে বরং কিছুটা সময় দেওয়া যাক।’—এভাবে আপনি তাকে বারবার সুযোগ দিতে থাকবেন।

যে মানুষটি তীব্র মায়ায় আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সেই মানুষটিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে থাকবেন। এটি মেনে নিতেই আপনি অনেকটা সময় পার করে ফেলবেন যে, বাস্তবে এই মানুষটির অস্তিত্ব কখনও ছিল না, এটি কেবলই একটি মুখোশ ছিল। যখন মেনে নিতে বাধ্য হবেন, আপনি ক্লান্ত হবেন, নিজেকে প্রতারিত বোধ করবেন, একজন পরাজিত সৈনিকের অনুভূতি আপনাকে গ্রাস করে ফেলবে প্রতিদিন।

জার্মান মনোচিকিৎসক পিয়েরকোভস্কি বলছেন, ‘যুদ্ধের মতো, প্রেমের বোমা হামলাও ঘটে ঝড়ের মতোই,  যা আপনার সেই দেয়ালকে ভেঙে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যেটির রক্ষাকবচ আপনি নিজের হাতেই রেখেছিলেন। কিন্তু যখনই এই লাভ বোম্বিং হয়, হামলার শিকার সেই সময় এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে সহজেই অযৌক্তিক মনোযোগ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের রক্ষাকবচ তুলে দেন শিকারির হাতে।’

এবার চলুন দেখি, ঠিক কোন কারণে পুরুষরা নারীদের ওপর এই লাভ বোম্বিং করে, বা সেই পুরুষদের ধরন কীরকম?

পিয়েরকোভস্কি এর দুটো কারণ দেখিয়েছেন। তিনি প্রধানত দুই ধরনের পুরুষকে লাভ বোম্বার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ‘প্রথমত, যারা আসলেই একটি সম্পর্কের জন্য খুব মরিয়া। তারা সত্যিকার অর্থেই একা, হতাশাগ্রস্ত এবং শূন্যতা পূরণ করার জন্য কাউকে চান। এই ধরনের পুরুষরা শুরুর দিকে ক্ষতিকর উদ্দেশ্য নিয়ে লাভ বোম্বিং না করলেও তারা শেষ পর্যন্ত সঙ্গীর আবেগের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে এবং যখনই তাদের সঙ্গীরা সম্পর্কের সীমানা ঠিক করতে চায় তখনই তারা রেগে যায় এবং সঙ্গী পুরোপুরি সাবমিসিভ না হওয়া পর্যন্ত তারা নিয়ন্ত্রণকারী এবং আগ্রাসী হয়ে উঠতে থাকে।

অন্য ধরনের লাভ বোম্বাররা হলো মূলত শিকারি এবং এরা ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক। এরা বেশিরভাগই হয় নার্সাসিস্ট, সাইকোপ্যাথ এবং প্রতারক। এ ধরনের পুরুষরা নিজেদের সারাক্ষণ চাঙা রাখতে পছন্দ করে। এজন্য সঙ্গী হিসেবে যেকোনও সাধারণ নারীদের চাইতে শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী নারীই তাদের পছন্দ। যখনই এই পুরুষরা কোনও শক্তিশালী নারীর ভেতরে ইমোশনাল ডিপেন্ডেন্সি তৈরি করে দিয়ে তার পার্সোনালিটি ড্যামেজ করে দিতে পারে তখন তারা এক ধরনের শ্লাঘা বোধ করে, সঙ্গীকে অনুগ্রহ করার অনুভূতি পায়, যা তাদের চাঙ্গা রাখে।

এখন দেখা যাক লাভ বোম্বাররা যখন আপনাকে টার্গেট করে, তখন আপনার আবেগ শিকারের জন্য শুরু থেকেই কী ধরনের আচরণ বা ক্রিয়া করে। প্রথমেই মাথায় রাখুন বেশিরভাগ সাইকোপ্যাথই প্রচণ্ড মেধাবী এবং তারা আপনার চিন্তাকে পড়তে পারে। সুতরাং আপনি কিসে খুশি হবেন তা রপ্ত করে ঠিক সেভাবেই তারা আপনার বিশ্বাস অর্জন করবে।

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আপনার প্রতি অবিরাম ভালোবাসা ঘোষণা করে, প্রেমময়, যত্নশীল এবং স্নেহময় আচরণ করে, যেকোনও অজুহাতে আপনার পছন্দের জিনিস উপহার দেয়, আপনার ভেতরের সবচে কোমল ও সংবেদনশীল আচরণটিকে বারবার প্রেইজ করে এবং নিজেকেও ঠিক সেভাবেই উপস্থাপন করে। যেমন আপনি কবিতা ভালোবাসলে সে আপনাকে কবিতা শোনাবে রাতের পর রাত, গান ভালোবাসলে গান!

তারা আপনার ভেতরের মায়াময় অংশটুকু খুঁড়ে বের করে নিয়ে আসে, নিজের যত ধরনের ভালনারেবিলিটি আছে তার সবটাই আপনার কাছে বহুগুণ বাড়িয়ে উপস্থাপন করে এবং আপনাকে বিশ্বাস করাবে যে আপনি তার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

তারা প্রথমে আপনার প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করে পুরোটাই, অল্প সময়েই আপনাকে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং আপনার মধ্যে এই নির্ভরশীলতা তৈরি করায় যে একমাত্র তারই আপনার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার যোগ্যতা আছে। এই ধাপে আপনার কাছ থেকে বিভিন্ন রকমের কমিটমেন্ট আদায় করে।

তারা সবচেয়ে বেশি যে কথাটি বলে তা হলো, ‘আমি তোমার মতো কাউকে কখনও পাইনি।’ বা ‘তুমিই একমাত্র ব্যক্তি যার সঙ্গে আমি দীর্ঘসময় কাটাতে চাই।’ যখন কেউ আপনাকে বলেন যে আপনি কতটা বিশেষ, এটি আপনাকে মাতাল করতেই পারে।

যখন আমরা লাভ বোম্বিং-এর কথা বলবো, আমাদের মনে রাখা দরকার যে শিকারির শেষ লক্ষ্যটিই জয়। যখন একজন নার্সিসিস্ট বা একজন সাইকোপ্যাথ বা একজন প্রতারক এই কৌশলটি ব্যবহার করে, তখন সে তার শিকার এই বিষয়টি বুঝে ফেলার আগেই শিকারকে ধরার জন্য যা করা দরকার তার সবটাই করে। লাভ বোম্বিং মূলত ইমোশনাল অ্যাবিউজের প্রাথমিক ধাপ। এর পরের অংশটুকু নিরন্তর প্রতারণা আর শোষণের গল্প। 

আমরা সকলেই ভালোবাসতে পছন্দ করি, এবং নিশ্চিতভাবেই ভালোবাসা চমৎকার সঞ্জীবনী সুধার নাম যতক্ষণ না এটি নিজেকে প্রতারিত হওয়ার বা ছিবড়ে হওয়ার মতো অনুভূতি দিতে শুরু করে। সুতরাং কোনটা ভালোবাসা এবং কোনটা মেনুপুলেশন সেটি আবেগের বদলে মগজ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে পারলে আপনার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা আবেগ শিকারি নার্সিসিস্ট বা সাইকোপ্যাথদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারবেন আপনি।

তার জন্য আপনাকে শুরু থেকেই কিছুটা অবিশ্বাসের চর্চা করতে হবে, কিছুটা সংশয়, কিছুটা সন্দেহ লালন করতে হবে, যেকোনও সম্পর্কের জন্যই একটু সময় নিতে হবে এবং আনচ্যালেঞ্জড ক্ষমা করে দেওয়ার বদলে নেগোসিয়েশন করতে শিখতে হবে।

এটুকু না পারলে ‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়/তার লাগি পথ চেয়ে আছি পথে যে জন ভাসায়’, গাইতে গাইতে কোনও একদিন খবরের শিরোনাম হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না।

লেখক: নারীবাদী লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ