যে রাষ্ট্র সাহেদ তৈরির কারখানা

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ২০:১৮, জুলাই ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২১, জুলাই ১১, ২০২০

রুমিন ফারহানাসাহেদের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা তৃতীয় মাত্রা টকশো’তে। পরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন টকশো’তে দেখা হয়েছে, যদিও সবচেয়ে বেশি তাকে দেখেছি তৃতীয় মাত্রায়, টকশো টেবিলে কথা হয়েছে, নিজেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক দাবি করলেও কথা বলতেন নিতান্তই সরকারদলীয় একজন কর্মীর মতো। অবশ্য কর্মী তিনি ছিলেনও। ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে সরাসরি তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে যান। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি একেবারে নতুন প্রজন্মের সেকেন্ড জেনারেশন রাজনীতিতে আসা হাতে গোনা কয়েকজনকে বাদ দিলে দলটির বেশিরভাগ কর্মীরই যে ভাব, ভাষা আর ভঙ্গিতে কথা বলে তাতে টকশো’র অনএয়ারের সময়টুকু ছাড়া আগে পরে কোনও প্রকার কোনও সৌজন্যমূলক আলাপ চালানো অসম্ভব। দীর্ঘ সময় জবাবদিহিতাহীনভাবে টানা ক্ষমতায় থাকার ফলে অধিকাংশেরই অবিশ্বাস্য, অস্বাভাবিক বিত্তবৈভব তৈরি হয়েছে বটে, কিন্তু কালচার, সভ্যতা, শিষ্টাচার বস্তুটিতো আর এক প্রজন্মে তৈরি হওয়ার বিষয় না, সুতরাং নিজের সম্মান রাখতে চুপ থাকাই শ্রেয়। Ignorance and arrogance with full confidence বড় ভয়ানক।


যাই হোক বলছিলাম শাহেদের কথা। তিনি কখনও মেজর, কখনও কর্নেল, কখনও প্রধানমন্ত্রীর এপিএস, এডিসি, কখনও এমএলএম ব্যবসায়ী, হাসপাতালের মালিক, এমনকি পত্রিকার সম্পাদক পর্যন্ত। এক অঙ্গে শত রূপ। বলা হয় তার সকল অপকর্মের মূল পুঁজি তিনটি। প্রথমত তিনি টকশো’র পরিচিত মুখ, দ্বিতীয়ত তার হাসপাতাল ব্যবসা আর তৃতীয়ত বঙ্গভবন, গণভবন থেকে শুরু করে সকল মন্ত্রী-এমপি’র সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর ছবি। রাজনীতিতে যুক্ত মানুষের সঙ্গে ছবি কোনও নতুন বিষয় নয়। সাবেক, বর্তমান মন্ত্রী, এমপি কিংবা রাজনৈতিক বড় নেতার সঙ্গে ছবি থাকতেই পারে এবং থাকেও। কিন্তু সেই সব ছবিতে ব্যক্তিগত পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতার কোনও ছাপ থাকে না। কিন্তু সাহেদের সঙ্গে তোলা বড় নেতাদের ছবিই বলে দেয় এ কেবলই প্রিয় নেতার সঙ্গে হঠাৎ কোথাও দেখা হয়ে গিয়ে তোলা ছবি না। ছবির মানুষদের অভিব্যক্তিই প্রমাণ করে তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা কতটুকু।
সাহেদের সঙ্গে ছবি কিংবা যোগাযোগ আছে এমন ব্যক্তিদের তার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে প্রায় সকলেই এক বাক্যে বলেন টকশো’তে তার সরব উপস্থিতির কথা। বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্ট বলছে নিজেকে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জাহির করে অর্থের বিনিময়ে টকশো’তে নিয়মিত অংশ নিতেন তিনি। নিজেকে কথিত বুদ্ধিজীবী বা রাজনৈতিক বিশ্লেষক পরিচয় দিয়েই গণমাধ্যমে আসতেন। এজন্য গাঁটের টাকা খরচ করতেও দ্বিধা করেননি। অর্থ বা তদবির যার বিনিময়েই হোক এই মানুষটিকে যারা মিডিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তারাও কি আজ দায় এড়াতে পারেন? বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট চ্যানেলে তার মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি বিষয়টিকে আরও বেশি স্পষ্ট করে। কোনও প্রকার কোনও খোঁজ না নিয়ে এসএসসি পর্যন্ত পড়া এই রাজনৈতিক বিশ্লেষককে দিনের পর দিন কিসের বিনিময়ে তারা আলোচক করে এনেছিলেন? দায় নেই কার?
যে হাসপাতাল এই সাহেদের উত্থানে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে সেই হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয় ২০১৪ সালে। এরপর আর এর মেয়াদ বৃদ্ধি ঘটেনি। এই তথ্য যে আমাদের স্বাস্থ্য অধিদফতরের জানা ছিল না তেমনটি নয়। লাইসেন্স না থাকায় তিনবার অভিযান চালানো হয়েছিল রিজেন্ট হাসপাতালে। করা হয়েছিল জরিমানা। অথচ এসব তথ্য থাকার পরও কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দিতে বেসরকারি এই হাসপাতালটির সঙ্গে চুক্তি করেছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। ২১ মার্চ সেই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তৎকালীন সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। টেস্ট না করে রিপোর্ট দেওয়া, সেই বাবদ রোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া, বিনা পয়সায় চিকিৎসা দেওয়ার কথা থাকলেও রোগীদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া আবার একই কাজের জন্য সরকারের কাছে টাকা দাবি করা, লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল চালানো এসব অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির হাসপাতালের সঙ্গে স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চুক্তি স্বাক্ষর কী বার্তা দেয় মানুষকে? গত জুন মাসের ৭ তারিখে এই প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম, দুর্নীতির তথ্য দিয়ে টেস্ট বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে চিঠি পাঠায় জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নিপসম। সেখানে বলা হয় প্রতি টেস্টের জন্য রিজেন্ট সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে চার্জ করছে। অথচ নিপসম বিনা মূল্যেই তাদের পরীক্ষা করে দিচ্ছে। সেই বিবেচনায় রিজেন্টের কোনও স্যাম্পল পরীক্ষা করা নিপসনের পক্ষে যুক্তিযুক্ত নয়। ২ দিন পর সেই চিঠির জবাবও দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে প্রতিদিন ৫০টি নমুনা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। যার অর্থ দাঁড়ায় সব জানার পরও রিজেন্ট হাসপাতালকে প্রতিদিন ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আয়ের পথ করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। তাহলে কার ইঙ্গিতে চলে এই অধিদফতর? কারা সরকারের অধিদফতরে বসে অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনের পথ করে দেয় সাহেদদের?
সাহেদ কাণ্ডের পর কেটে গেছে বেশ কিছু দিন। এখনও গ্রেফতার করা হয়নি তাকে। ৭ জুলাই উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে র‍্যাবের অভিযানের সময় সাহেদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন দিয়েছিল বলে নিশ্চিত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে ঘটনা ফেস করার কিংবা আদালতে যাবার পরামর্শ দেন।
যেই দেশে সরকারের ন্যূনতম সমালোচনাকারীকে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিনিয়ত গ্রেফতার করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে এত নাটকের জন্মদাতা, এত অভিযোগে অভিযুক্ত একজন অতি পরিচিত মুখ সাহেদকে ধরা এতটা কঠিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য—এটি বিশ্বাস করা একটু কঠিন বৈকি। মজার তথ্য হলো, স্বাস্থ্য অধিদফতর তার বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবছে। এত কিছু উদ্ঘাটনের পরও মামলার বিষয়টি এখনও ‘ভাবনার’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে, সেটি ভাবতে ভালোই লাগে।
এই দেশে অদৃশ্য মহলের কলকাঠি ছাড়া মামলা হয় না, তদন্ত আগায় না, গ্রেফতার হয় না, শাস্তি হয় না। এর অনেক উদাহরণের একটি হলো অতি সম্প্রতি একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে আর একটি প্রতিষ্ঠান জেকেজি হেলথ কেয়ার। টেস্ট না করেই করোনা রিপোর্ট নিয়ে তাদের প্রতারণা প্রকাশ্যে আসার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ড. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে অসংখ্য রিপোর্ট হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ইতিমধ্যেই কোনোরকম কোনও পরীক্ষা ছাড়াই ১৫ হাজার ৪৬০টি টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব টেস্টে জনপ্রতি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ৫ হাজার টাকা। আর বিদেশিদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১০০ ডলার। এ হিসাবে ভুয়া টেস্ট বাণিজ্য করে জেকেজি হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা। তারও উচ্চমহলের সঙ্গে যোগাযোগের সকল প্রমাণ ঘুরছে গণমাধ্যমে।
সাহেদ কাণ্ডের আগে অতি নিকট অতীতে আমাদের সামনে এসেছে জি কে শামীম, সম্রাট, পাপিয়া, রন, দিপু, পাপুলসহ অসংখ্য মানুষের নানান অপরাধের কথা। তাদের কারও বিরুদ্ধে লোক দেখানো কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে বেশিরভাগই থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিছু দিন তাদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গরম হয়েছে, আবার সবাই ভুলে গেছে সবকিছু। ঘটনার পর ঘটনা, একটির নিচে চাপা পড়ে অন্যটি। স্বজনতোষী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে এমনটাই ঘ্টার কথা। তবে সাহেদ বা সম্রাট তো অনেক নিচের টায়ারের সুবিধাভোগী মাত্র। যারা নিজেদের স্বার্থে তাদের তৈরি করে, ব্যবহার করে, লালন করে, পালন করে, তারা সব সময়ই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাষ্ট্র যারা চালায় তাদেরই প্রত্যক্ষ মদতে সৃষ্টি হয় এদের একেকজন। তাই রাষ্ট্র যতদিন সাহেদ তৈরির কারখানা হয়ে থাকবে, ততদিন এই ধরনের কাণ্ড ঘটতেই থাকবে বারবার, অল্প কিছু হয়তো সামনে আসবে, বেশির ভাগই থেকে যাবে অন্তরালে।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ