একজন সাহেদ, ভুয়া রিপোর্ট ও নেশাগ্রস্তদের জন্য শুদ্ধিখানা

Send
সাইফুল হোসেন
প্রকাশিত : ১৬:১৩, জুলাই ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৫, জুলাই ১২, ২০২০

সাইফুল হোসেনইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘লার্ন মোর, টু আর্ন মোর’। কেউ যদি বেশি আয় করতে চায় তাহলে তাকে জানতে হবে বেশি, শিখতে হবে বেশি। একথা সত্যি, একজন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা সহজ কথা নয়। একজন উদ্যোক্তাকে যে পরিমাণ কষ্ট সহ্য করতে হয়, যে পরিমাণ মানুষিক ও শারীরিক চাপ নিতে হয়, প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে হয়, তা একজন চাকরিজীবীকে করতে হয় না।
চাকরিজীবীদের জীবন অনেকক্ষেত্রে সহজ সরল হলেও ব্যবসায়ীদের জীবন তা নয়, আমরা সবাই জানি। তাই যারা চাকরি করেন তারা হয়তো সুখে থাকেন বেশি, আর যারা ব্যবসা করেন তারা সুখের পেছনে ছোটেন বেশি।
আমাদের দেশে অনেক ব্যবসায়ী আছেন তারাও ওপরের কথাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন এবং পরিপালনও করেন। তারা বেশি আয় করার জন্য বেশি ‘লার্ন’ করেন বা শেখেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অনেকেই যেটা শেখেন সেটা চৌর্য-বৃত্তি, অন্যায়ভাবে টাকা কামানোর কৌশল, টেন্ডারবাজির কৌশল, অন্যের টাকা ধূর্ততার সঙ্গে ছিনিয়ে নেবার, কখনোবা জোর করে ছিনিয়ে নেবার কৌশল এবং দেখা যায় সেই বিশেষ ব্যক্তিরা (!) যখন যে সরকার ক্ষমতাসীন থাকেন তাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে লালিত পালিত হন অতি চাতুরতার সঙ্গে।

ভাগ্য খারাপ থাকলে যারা অনেকদিন ধরে কৌশল রপ্ত করেন তাদের কেউ কেউ হঠাৎ ধরা পড়েন এবং  মিডিয়ার কল্যাণে মানুষের দৃষ্টিতে পড়েন। যিনি ধরা পড়েন রাতারাতি তার চেহারা সবার সামনে উন্মোচিত হয়ে যায়। তখন কেউ তাকে চিনেন না, পারলে তার স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও চিনতে চান না। এসব ভদ্রলোকের (!) কপাল কত খারাপ, আহারে। যাদের জন্য জীবন বাজি রাখলেন, তারাও দুঃসময়ে তার পাশে থাকেন না।  

এক ব্যক্তির কথা শুনেছিলাম যিনি ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করার পর অনেকদিন ধরে জেলে ছিলেন। কিছু তদবিরকারী তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন তাকে জেল থেকে বের করার জন্য। জেলে থাকা ব্যক্তি তদবিরকারীদের বলেছিলেন তার স্ত্রী ও ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে, কারণ তার অন্যায়ভাবে অর্জিত সব টাকা তিনি তার আপন ভাই ও স্ত্রীর কাছে রেখেছিলেন। কথামতো তদবিরকারীরা তার স্ত্রী ও ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা অস্বীকার করেছিলেন। এমনকি তার সঙ্গে দেখা করতেও অস্বীকার করেছিলেন তার আপন আত্মীয়রা। এই কথা শুনে জেলে থাকা ভদ্রলোক হার্টফেল করে মারা যান। এটিই যদি সত্যি হয়, তাহলে যারা অন্যায়ভাবে টাকা আয় করে নিজের পবিবার ও ছেলেমেয়েদের নিরাপদ করতে গিয়ে নিজেকে অনিরাপদ করে ফেলেন, তাদের নিজের দিকে দৃষ্টি ফেরানো উচিত বৈকি।

সাহেদ নামের এক ‘টকশো স্টার’ ও রিজেন্ট হাসপাতালের মালিককে নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে কয়েকদিন। এসএসসি বা এইসএসসি পাস করা এই ভদ্রলোকের (!) সঙ্গে বর্তমান ও পূর্বতন সরকারের অনেক কর্তাব্যক্তির অজস্র ছবি আছে। ছবি দেখলে বোঝা যায় সাহেদ তাদের কম কাছের ছিলেন না। পার্টির নাম ভাঙিয়ে সরকার থেকে সুবিধা নিয়েছেন। তার কপাল খারাপ—অপরাধের কিয়দংশ ধরা পড়েছে। কিন্তু দেশবাসী অবাক হবেন না যদি দেখেন যারা তার এই অন্যায় কাজে জড়িত ও সহায়তাকারী তারা আইনের ঊর্ধ্বে আছেন।

লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও যারা রিজেন্ট হাসপাতালকে কোভিড ১৯ রোগ নির্ণয়ের অনুমতি দিয়েছেন তাদের অনেক বড় সাজা হওয়া উচিত, কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে হয়তো সঙ্গত কারণে এর উচিত বিচার হবে না। যদি তাই হয় তাহলে বিচারহীনতা স্বাস্থ্যখাতের ক্রমিক অপরাধকে আরও উসকে দেবে।

পত্রিকায় দেখলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার বলেছেন, ‘উনি যতবড় ক্ষমতাশালী হোক না কেন ওনাকে ধরা হবে।’ কিন্তু উনি এখনও ধরা পড়েননি। ওনাকে ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে যারা সাহায্য করেছেন তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে তাহলে হয়তো অন্য অন্যায়কারীরা ভয় পাবে, নাহলে এখন যারা একই ধরনের অন্যায়ে প্রবৃত্ত আছেন, তারা অন্যপথ গ্রহণ করবেন, অন্য কৌশল নেবেন, কিন্তু অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকবেন না।

রিজেন্ট হাসপাতাল অন্যায় করেছে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে। যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, তারা যদি ঋণাত্মক রিপোর্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে ইতোমধ্যে যত্রতত্র ঘুরে বেড়িয়ে তারা অনেককে সংক্রমিত করে ফেলেছেন। আবার যারা করোনা নেগেটিভ, তারা পজিটিভ রিপোর্ট নিয়ে ভয়ে আতঙ্কে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেছেন, হয়তো কেউ মারাও গেছেন। শাহেদ টাকা কামিয়েছেন, কিন্তু তিনি সমাজের জন্য এক ভয়াবহ ক্ষতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করেছেন, যা ক্ষমার অযোগ্য।

সম্প্রতি ইতালিতে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্লেন থেকে যাত্রীদের দেশে ঢুকতে দেওয়া হয়নি ভুয়া করোনা সার্টিফিকেটের দোহাই দিয়ে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রিজেন্ট হাসপাতালের কথা, জেকেজি’র প্রতারণার কথা ছড়িয়ে গেছে বাতাসের চেয়ে দ্রুতগতিতে, যার কুফল ভোগ করছেন এবং করবেন দেশের বাইরে যেকোনও দেশে যেকোনও কাজে পরবর্তীতে যারা যাবেন তাদের সবাই। সাহেদের মতো অসৎ ব্যবসায়ী এবং তার সহযোগীদের এই অপরাধের শাস্তি কী হওয়া উচিত?

সম্প্রতি অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষক ছিলেন। নিওরোসায়েন্সের গবেষণার একটা চমকপ্রদ নতুন ফলাফল নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। বলেছেন, দেখা গেছে মানুষের ভাবাবেগ, যা মস্তিষ্কের সামনের অংশের স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে, তা অনেক সময়েই পেছনের অংশের যুক্তিনির্ভর অংশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর ফলে অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে মানুষের অর্থনৈতিক আচরণকে যুক্তিভিত্তিক বলে যে অনুমান করা হয় বাস্তবে আবেগতাড়িত হয়ে মানুষ অনেক সময়েই তেমন আচরণ করে না। যেমন অতিরিক্ত আর্থিক লোভ কী করে অযৌক্তিক ঝুঁকি নিতে মানুষকে প্রলোভিত করে। অপ্রত্যাশিত নতুন নতুন অর্থ প্রাপ্তি স্নায়ুতন্ত্রের যে বিশেষ অংশকে উত্তেজিত করে, মাদক আসক্তিও সেই অংশের সঙ্গে সম্পৃক্ত।  ধারণা করা হচ্ছে এ ধরনের অর্থ প্রাপ্তির লোভ এমনকি কোকেইন বা এ ধরনের মাদক সেবনের নেশার মতো মারাত্মক হয়ে যেতে পারে। নেশাগ্রস্ত মানুষকে আইন-কানুন দিয়ে বা উপদেশ-পরামর্শ দিয়ে সংশোধন করা যায় না, প্রয়োজন তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। তাছাড়া নেশাগ্রস্ত  মানুষ অন্যদেরও প্ররোচিত করতে পারে। (সূত্র: "Your Money and Your Brain: How the New Science of Neuro-economics Can Help Make You Rich," author Jason Zweig)।

যারা অনেক টাকা আয় করেন, তাদের আরও আয় করার একটা নেশা পেয়ে বসে। এই নেশা তার যৌক্তিক চিন্তাকে বিদায় করে। প্রয়োজন তখন তাকে তাড়িত করে না, বরং নেশাগ্রস্ত হয়ে তিনি তখন অন্যের সঙ্গে এমনকি পূর্বতন নিজের সঙ্গে অযাচিত প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত হয়ে পড়েন, তিনি ভুলে যান তার আপন সত্তা, ভুলে যান নৈতিকতা, ভুলে যান তিনি কে, তিনি কী চান। মোহগ্রস্ত হয়ে তিনি এমন সব কাজ করেন যা তার নিজের জন্য, পরিবারের জন্য বা দেশের জন্য ভালো কিনা তা বোঝার মতো শক্তি তার রহিত হয়ে যায়। তারা সৎ উদ্যোক্তা হয়ে বেশি আর্ন করার জন্য ভালো কিছু লার্ন করেন না, তারা লার্ন করেন অনৈতিকতা, শঠতা, চুরি-ডাকাতি। তারা হয়ে যান আর্থিকভাবে অটিস্টিক ব্যক্তি, একটাই নেশা তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়—টাকা, টাকা আর টাকা। এদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনর্বাসন আসলেই জরুরি।

‘দুষ্টের দমন’ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে না করতে পারলে, ওদের থামাতে না পারলে, ওরা সবকিছু তছনছ করে দেবে, ওরা দেশের টাকা বিদেশে আরও পাচার করবে, ওরা ব্যাংকিং খাতকে মাটিতে ধসিয়ে দেবে। একপর্যায়ে ওরা রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিকল করে দেবে।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা ওদের কাছে ম্লান। ওরা নেশাগ্রস্ত উন্মাদ, পাগল। ওদের জন্য দরকার একটা আরামদায়ক (!) শুদ্ধিখানা, যেখানে দেশের হাজার হাজার সম্পদের নেশায় নেশাগ্রস্ত মানুষকে রেখে চিকিৎসা করাতে হবে। দেশমাতৃকার অস্ফুট কান্না থামানোর জন্য এর বিকল্প নেই। করোনা আমাদের মিতব্যয়ী হতে শিখিয়েছে, নীতিবান করতে পারেনি এখনও।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে অবৈধ আয়ের নেশায় নেশাগ্রস্ত সমাজের অধিকাংশ সম্পদশালী মানুষের আত্মশুদ্ধি যেমন দরকার তেমনি দরকার তাদের এবং তাদের সহযোগীদের আইনের আওতায় এনে শুদ্ধিখানায় নিয়ে চিকিৎসা করানো, তাদের পরিশুদ্ধ করা গেলে হয়তো দেশমাতার কান্না থেমে যাবে, তার সন্তানেরা ভালো থাকবে, সুখে থাকবে।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, ফিনপাওয়ার লিডারশিপ ইন্টারন্যাশনাল

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ