‘তবু চোর ধরতে হবে’

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৯:০৫, জুলাই ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৭, জুলাই ১৪, ২০২০

সালেক উদ্দিনজাতীয় সংসদ বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘চোর ধরে আমরাই চোর হয়ে যাচ্ছি’। তিনি আবারও দৃঢ়কন্ঠে বললেন,  দুর্নীতিবাজ যেই হোক, ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। কে কোন দলের তা বিবেচনায় না এনে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের যাকে যেখানে যে অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে তাকেই ধরে যাচ্ছে তার সরকার। তিনি আক্ষেপ করে এও বলেছেন যে আমরা ধরি আবার আমাদের দোষারোপ করা হয়। আমরা ধরছি বলেই চোর ধরে যেন চোর হয়ে যাচ্ছি।
দেশের প্রধানমন্ত্রী এই কথাটি ছোট হলেও এর মর্মার্থ অনেক বড়। দুর্নীতি-সন্ত্রাস-চুরি-ডাকাতি করার সাহস কারা পায়? যারা সরকারের চারপাশে অবাধে বিচরণ করার ক্ষমতা রাখে তারাই। বর্তমান সময়ে যে দুর্নীতি ও চুরির কথা বলা হচ্ছে এবং যাদের ধরা হচ্ছে তাদের সিংহভাগই এ ধরনের মানুষ। কারণ হিসেবে যে কথাটি বলতে পারি তা হলো, এদের কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নেই। এরা সব সময়ই সরকারি দলের ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকার চেষ্টা করবে। সরকার বদলালে এদের রাজনৈতিক দলের পরিচয়ও বদলায়। এটাই তাদের সংস্কৃতি। অতএব, যারা চুরি করার সাহস রাখে তারা তো সরকারের কাছের কেউ হবেই। এ আর নতুন কী?
বহুল আলোচিত রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের কথা বলুন, ক্যাসিনো ‘রাজা’ সম্রাটের কথা, খালেদের কথা বলুন, টেন্ডারের বাদশা জিকে শামীমের কথা বলুন, পাপিয়ার কথা বলুন, আর একটু পেছনের দিকে গেলে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত খুনি নূর হোসেনের কথাই বলুন। এরা সবাই এই একই সূত্রে গাঁথা।
নারায়ণগঞ্জের নূর হোসেনের কথা আসতেই প্রাসঙ্গিক কারণেই মনে পড়ছে সে সময়ে ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে ‘নূর হোসেনরা সরকারি দলের লোক’ শিরোনামে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত আমার একটি লেখার কথা। তথ্য-উপাত্ত সাপেক্ষে তাতে লিখেছিলাম, নূর হোসেন যখন আইন রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দুর্নীতিবাজ গ্রুপের দ্বারা এই সাত খুন সংঘটিত করে তখন সে ছিল সরকারি দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর। আরও আগে জাতীয় পার্টি যখন ক্ষমতায় তখন জাতীয় পার্টির ব্যানারে  সে তার সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়েছে। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এলে সে যোগ দেয় বিএনপিতে। ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে হয়ে যায়  বিএনপি নেতা। ১৯৯৬  সালের ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে ভুল করেনি নূর হোসেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হয়ে বসে সে। সাত খুনের ঘটনায় আটকে যাওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানায় হত্যা মামলাসহ বহু মামলা ছিল। তারপরেও কিছু হয়নি তার। যোগ্যতা একটাই, সরকারি দলের নেতা সে।
সেই কলামে লিখেছিলাম, নূর হোসেনরা খুন সন্ত্রাস দুর্নীতি ততদিন করে যাবে যতদিন তারা সরকারি দলের ছত্রছায়ায় থাকতে পারবে। লিখেছিলাম, রাজনীতির সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন না এলে যে মাটিতে নূর হোসেনের ফাঁসির দণ্ডাদেশ কার্যকর হবে সেই মাটিতে আরও আরও নূর হোসেনের জন্ম হবে। নূর হোসেনরা বাড়তে থাকবে জ্যামিতিক হারে।
এবার প্রধানমন্ত্রীর আক্ষেপ ‘চোর ধরে আমরাই চোর হয়ে যাচ্ছি’  প্রসঙ্গে আবার আসা যাক। চলতি করোনাকালের শুরুতে লকডাউনের সময় হতদরিদ্র মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে যে চাল দিয়েছিলেন সেই চাল যারা চুরি করেছিল সেসব চোর ধরে দেখা গেলো অনেকেই সরকারি দলের নেতা বা কর্মী অথবা সরকার দলের ছায়াতলে আছে এমন কেউ। ভুয়া এন৯৫ মাস্ক সরবরাহ করে ডাক্তারদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতরের চেনা ঠিকাদার নামের লুটেরারা, যারা সরকারি দলের পরিচয়েই বুক ফুলিয়ে হাঁটে। বিএনপির ক্ষমতাকালে হাওয়া ভবনে অবাধে বিচরণকারী এবং এ সময়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সাব-কমিটির সদস্য প্রতারক মো. সাহেদসহ এরা সবাই ওই একই গোত্রের মানুষ। এরকম বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে।
যে কথাটি বলার জন্য উপরের ক’টি  উদাহরণ টানলাম তা হলো, বিএনপি,  জাতীয় পার্টি, আওয়ামী  লীগ সব সরকারের সময়েই সন্ত্রাস হয়েছে, দুর্নীতি হয়েছে, লুটপাট হয়েছে এবং তা সংঘটিত হয়েছে সরকারি দলের নেতাকর্মী, সরকারি আশীর্বাদপুষ্ট আমলা কর্মচারীদের দ্বারা।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আক্ষেপ সম্ভবত এ কারণেই যে  নিজের দলের দুর্নীতিবাজদেরও ছাড় না দেওয়ার যে কাজটি ইতোপূর্বে কোনও সরকার করেনি সেই রকম একটি মহৎ উদ্যোগ নিয়েও তিনি বিরোধীদের কাছে প্রশংসিত হতে পারছেন না। বরং তারা সরকারকেই দোষারোপ করছেন।
আগেই বলেছি, সব সরকারের সময়ই সরকারি দলে পুরনো ও নব্য দুর্নীতিবাজ ও চোর ছিল। নব্যরা সরকার পরিবর্তন হলেই দ্রুত দল বদলে নতুন সরকার দলের লেবাস লাগিয়েছিল।
অন্য সময়ের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য হলো- অতীতের সরকারগুলো নিজ দলের এবং দলে যোগ দেওয়া সুবিধাবাদী দুর্নীতিবাজদের ধরেনি। বর্তমান সরকার ধরছে। ফলে দেখা যাচ্ছে দুর্নীতিবাজ এবং চোরদের অধিকাংশই সরকারি দলের কর্মী বা ছায়াতলে অবস্থিত মানুষ। তাই শুধু বিরোধিতার জন্যই বিরোধীরা সরকারকে দোষ দিচ্ছে বলেই আক্ষেপ করে  প্রধানমন্ত্রী এমন কথা বলেছেন বলেই মনে হয়। তবে তারা শুরু করেছেন বাইরে থেকে দলে আসা দুর্নীতিবাজ ও চোর ধরা দিয়ে এবং আশ্বস্ত করছেন দলের ভেতরেও যারা রয়েছে তাদের ধরা হচ্ছে বা হবে।
বলতেই হবে প্রধানমন্ত্রী অনেক বড় একটি কাজ শুরু করেছেন এবং তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ‘অপরাধী যে দলেরই হোক তাদের ধরা হবে’  যদি সত্যি সত্যি সঠিকভাবে পালিত হয় তবে সে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে। এ দেশের মানুষের সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ