এশিয়ানরা কীসের জন্য অপেক্ষা করছে?

Send
মো.শরীফ হাসান
প্রকাশিত : ১৬:২৩, জুলাই ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৩, জুলাই ২৭, ২০২০

মো. শরীফ হাসানবিশ্বব্যাপী দেশগুলো ক্রমান্বয়ে তাদের অর্থনীতি পুনরায় সচল করতে শুরু করেছে এবং সামাজিক-দূরত্বের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করতে শুরু করেছে, যখন কোভিড-১৯ বিশ্বে দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করছে। যদিও যাতায়াতের ব্যাপারে বিধিনিষেধ  তুলে নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বব্যাপী টিকা সহজলভ্য না হলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যাশা উচ্চাকাঙ্ক্ষায় পরিণত হবে। খারাপ খবর হলো, বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানতে পারে। সম্ভবত সেটি আরও বড় আকারে আঘাত হানতে পারে।
এটি সত্য, সংক্রমণের প্রথম ধাক্কা থেকে রাজনৈতিক নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, বিজ্ঞানী উপরন্তু সাধারণ জনগণও দারুণ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। যদিও সম্ভাব্য সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাক্কা আরও বেশি জোরালো হতে পারে তবুও ধারণা করা হচ্ছে প্রথম ধাক্কার চেয়ে এটি ভিন্নভাবে শেষ হতে পারে।একটি পূর্ণ মাত্রার লকডাউন অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অচলাবস্থা আনতে পারে।এর চেয়ে বরং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, মাস্ক পরিধান করা, টেলিফোনে যোগাযোগ, ভিডিও মাধ্যমে যোগাযোগ ইত্যাদির মতো নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-কানুন গ্রহণ করা যেতে পারে।তা সত্ত্বেও পরবর্তী ধাক্কার প্রবলতার ওপর নির্ভর করে কিছু মারাত্মক পরিস্থিতিতে স্থানীয় অথবা আঞ্চলিক লকডাউন করা জরুরি হতে পারে।

সংক্রমণের প্রথম ধাক্কার মতো পরবর্তী ধাপ একসঙ্গে তিনটি সংকটকে জড়িয়ে ফেলবে।নতুন করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ও তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে এটি নতুন করে চলমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে।একইসঙ্গে এটি আবার ভূ-রাজনৈতিক বিবাদকে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করবে।বৈশ্বিক অর্থনীতি ইতোমধ্যে গভীর মন্দায় আছে আর একে দ্রুত বা সহজে অতিক্রম করা যাবে না।চীন-আমেরিকার ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্বসংক্রমণের সঙ্গে এই ব্যাপারগুলোতে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।বিশেষত নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পূর্বের মাসগুলোতে এটি ঘটতে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য, আর্থ-সামাজিক এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্থানগুলোকে আমরা যতই অপ্রতিষ্ঠা করতে চাই না কেন, আমরা কেউই ট্রাম্পের মতো বিষয়কে অবজ্ঞা করতে পারবো না।যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চার বছর মেয়াদি নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো জয় লাভ করে তাহলে বর্তমানে চলমান বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলাগুলো নাটকীয়ভাবে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে।অপরপক্ষে যদি তার ডেমোক্র্যাটিক প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন নির্বাচনে জয় লাভ করলে বড় ধরনের স্থিতিশীলতা আসবে।

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই বিপদ আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। এটি বলা অতিরঞ্জিত হবে না যে, মানবতা আবার ঐতিহাসিক বিবাদের পথে ধাবিত হচ্ছে। সম্ভাব্য আরেকটি ধাক্কা পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক মন্দা আকারে এই শরৎ ও শীতের আগে দৃশ্যমান হবে না। কারণ বিশ্ব আর কোনও নাটকীয় সংক্রমণে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে না।আমরা সকলে মানসিকভাবে ও বাস্তব অর্থে নিয়মিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।

পশ্চিমা এবং এশিয়ার ধনী দেশগুলো কি দীর্ঘ, বিস্তৃত ও দীর্ঘায়িত মন্দার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে? এমনকি কর্মে উদ্দীপনার জন্য ট্রিলিয়ন ডলার ভেঙে পড়া অর্থনীতির জন্য যথেষ্ট বলে প্রমাণিত হবে কিনা তা পরবর্তীতে দৃশ্যমান হবে।

যদি ট্রাম্প পুনরায় নির্বাচিত হয়, সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, অর্থনীতি যদি বারবার ভেঙে পড়তে থাকে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শীতল যুদ্ধ উত্তপ্ত রূপ ধারণ করে তাহলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।যদিওবা এটি অসম্ভব কোনও কিছু না।কিন্তু যদি এর মধ্যে কোনও একটি সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় উপনীত না হয় তবে ট্রিপল সংকট নতুন যুগে প্রবেশ করবে।জাতীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় গঠন করতে হবে।এমনকি সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও পূর্বের স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে যাওয়া যাবেনা। অতীত আমাদের অতিক্রম করে চলে গেছে, শুধুমাত্র বর্তমানে আমাদের ভবিষ্যৎকে গণ্য করতে হবে। আমরা আগামীতে কী হবে তা নিয়ে কোনও ধরনের মোহের আশ্রয় গ্রহণ করবো না।আলোড়ন সৃষ্টিকারী সংক্রমণ থেকে সৃষ্টি হওয়া দুর্যোগের প্রভাব এতটাই গভীর ও সুদুরপ্রসারী যে এটি অবধারিতভাবে বিশ্বে ক্ষমতা ও সম্পদ নির্ধারণে আমূল-পরিবর্তন করবে।যে সমাজগুলো প্রয়োজনীয় শক্তি, ব্যবহারিক জ্ঞান ও বিনিয়োগের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রস্তুত করতে পারবে তারাই শুধুমাত্র জয় লাভ করবে।আর যা এইটা অনুমান করতে ব্যর্থ হবে তারা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে।

সর্বোপরি, সংক্রমণ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই পৃথিবী ডিজিটাল যুগে রূপান্তরের মধ্যেই ছিল।এটি প্রাচীন প্রযুক্তি, শিল্প এবং বিশ্বে ক্ষমতা ও সম্পদের বণ্টনে সুদূরপ্রসারী বাস্তবায়ন কার্যকর করেছিল। আবার, এর চেয়েও বড় সংকট বিশ্বব্যাপী ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চলমান ফলাফল এর চেয়ে আরও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করবে যা আমরা অতীতে কখনও দেখিনি।আর এই সমস্যা সমাধানে কোনওটিকাও কার্যকর হবে না।

কোভিড-১৯ সংক্রমণ সত্যিকারের যুগপৎ পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমরা আত্মবাদী জাতি-রাষ্ট্র, জীবাশ্ম জ্বালানি দ্বারা চালিত পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত শিল্প-কলকারখানা এবং সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের গঠিত রাজনৈতিক অর্থনীতি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এসেছি।কিন্তু অতি দ্রুত এই ব্যবস্থা তার চরম সীমায় পৌঁছে গেছে এবং মৌলিক পরিবর্তনগুলোকে অপরিহার্য করে তুলেছে।

এখন আমাদের প্রধান কাজ হলো, ট্রিপল সংকটের প্রথম ধাক্কা থেকে যত বেশি সম্ভব শিক্ষা গ্রহণ করা।অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এশিয়ার জন্য এই মুহূর্তে সুস্পষ্ট ভুলত্রুটিগুলো শুধরে নেওয়ার অপ্রত্যাশিত সুযোগ এসেছে।এশিয়ার নিজস্ব রাজনৈতিক মূল্যবোধ (গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সামাজিক সমতা), প্রযুক্তিগত ব্যবহারিক জ্ঞান এবং বিনিয়োগ ক্ষমতা আছে যা সুনিশ্চিতভাবে নিজেদের নীতি ও লক্ষ্য নির্ধারণে সাহায্য করবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এশিয়ানরা কীসের জন্য অপেক্ষা করছে?

লেখক: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ