চিকিৎসা সেবায় অন্যায়ের ন্যায্য ব্যবসা

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:৪৮, জুলাই ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫০, জুলাই ২৯, ২০২০



সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাআমাদের সময়ে ভালো ছাত্ররা চিকিৎসক হতে চাইতো। নিশ্চয়ই এখনও চায়। কারণ চিকিৎসা পেশা মানেই একটি নিশ্চিত আয় উপার্জনকারী পেশা। তবে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে কপট নাগরিকের মতো একজন আগামীর চিকিৎসক বলবে চিকিৎসা পেশার মধ্য দিয়ে দেশসেবার কাজে যুক্ত থাকার যে সুযোগ পাওয়া যায়, তা অন্য কোথাও এত নিবিড়ভাবে পাওয়া যায় না। একথার সত্যতা আছে, যদিও তাদের অনেকেরই অন্তরে সেই দর্শনের উপস্থিতি নেই।

তাল কেটেছে অনেক আগেই, তবে করোনাকালে সেটা যেন বেশি বোঝা গেলো, গতিপথ বেশ ভালো করেই বদলেছে। দেশ, দশ আর জনসেবার ভাবনা উড়ে গিয়ে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কানাগলিতে সব থেকে সুন্দর মাথাগুলোকে ঢুকে পড়তে দেখছি আমরা লোভ নামের মহাসড়কে।
এই করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকাণ্ডে মানুষ বিরক্ত হয়েছে অনেক। তবে বেশি ভাবনায় পড়েছে আগামীতে যারা ডাক্তার হিসেবে এই সমাজে আবির্ভূত হবেন তাদের নিয়ে। ভুয়া করোনা টেস্ট, লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল, মানুষের কাছ থেকে যাচ্ছেতাইভাবে বিল আদায়ের কাহিনি যখন চর্বিত চর্বণ হয়ে গেলো তখন জানলাম একটি চক্রের ফাঁস করা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অন্তত চার হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হয়েছে।
সমাজে কতই না অবক্ষয় আছে। কিন্তু মানুষ ভাবতো সবার মাঝে থেকেও চিকিৎসা পেশা তার লক্ষ্য হারায়নি। মানুষের কাছে তার আবেদন ম্লান হয়নি। কারণ তারা বিপদের কালে মানুষের মাঝে দাঁড়ান, যেমন তারা কাজ করছেন এই করোনাকালে। কিন্তু ফাঁস করা প্রশ্নপত্রে যারা চিকিৎসক হচ্ছেন তারা ভালো ছাত্রও নন, তারা কোনোদিন ভালো চিকিৎসকও হবেন না, তবে নিশ্চিতভাবেই তারা দখল করে রাখবেন পুরো চিকিৎসা খাত।
রিজেন্ট, জেকেজি, সাহাবউদ্দিন বা আরও কিছু হাসপাতালের নাম আছে ভুয়া করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়ার জন্য। কিন্তু যুগ যুগ ধরে কত হাজার হাজার চিকিৎসক টাকার বিনিময়ে ভুয়া প্যাথলজি রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছেন, সেটা কেউ কি জানবে বা এখনও জানতে পারছে?
তথাকথিত ভুয়া চিকিৎসার অভিযোগে যেমন হাসপাতাল ভাংচুরকে আমরা জায়েজ করেছি, তেমনি ভালো ছাত্রকে চিকিৎসা পেশায় উদ্বুদ্ধ করে তাকেই আবার আমলাতন্ত্রের ‘সরল সিস্টেমে’ তার জন্য পরিস্থিতি গরল করেছি। রোগ নির্ণয়, রোগের চিকিৎসার সবচেয়ে ভালো পথ হলো ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক। কিন্তু এই সম্পর্ক কোথায় যেন বহু আগেই হারিয়ে গেছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর বোঝাপড়ার যে অদৃশ্য বাঁধনে ডাক্তার-রোগীর সম্পর্ক তৈরি, তা আজ এক চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা, যুক্তিহীনতা, অভব্যতার পাথরে চাপা পড়েছে।
বিসিএস দিয়ে যিনি সরকারি ডাক্তার হন, তিনিই আবার বড় অঙ্কের টাকার প্রলোভনে প্রাইভেট হাসপাতালে যুক্ত থাকেন। স্বার্থের এই দ্বন্দ্ব তাকে রোগীর পক্ষে কোনও অবস্থানই নিতে দেয় না, যার জন্য তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
হ্যাঁ, চিকিৎসকদের নিজেদেরও কথা আছে। একদিকে তাকে মাথা পেতে নিতে হয় আমলাতন্ত্রের যন্ত্রণা, আরেকদিকে তাকে সইতে হয় মানুষের গালমন্দ। প্রশাসনিক শৃঙ্খলার নামে যেমন তার টিকে থাকার সংগ্রাম আছে, তেমনি গণ-উন্মাদনায় তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধও বাড়ছে।
এই বাস্তবতাকে মূল্যায়ন করতে হবে চিকিৎসকদেরই। কেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের একটা বিচ্ছিন্নতার বাতাবরণ তৈরি হলো সেটা তারা ভেবে দেখুন। একথা সত্য, সামাজিক অসহিষ্ণুতার ঢেউ যে পেশাগুলোকে সব থেকে আগে আঘাত করছে, তার মধ্যে চিকিৎসা অগ্রগণ্য।
চিকিৎসকদের প্রশ্নহীন ভাবমূর্তি অনেক আগেই গেছে। কিন্তু এই করোনাকালে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল রোগীর সঙ্গে যে আচরণ করেছে, যে ধরনের অর্থনৈতিক অত্যাচার করেছে, সেটা ব্যবসায়ী হাসপাতাল করলেও শেষ পর্যন্ত সেই দায় গিয়ে পড়েছে ডাক্তারদের ওপরই। আর্ত মানুষের অসহায় অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জনের লাগামহীন উপাসনায় ব্রতী হয়ে উঠেছেন আমাদের চিকিৎসকরা, এমন একটি ভাবমূর্তিই আজ উজ্জ্বল এই সমাজে।
ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধ কোম্পানি থেকে কমিশন, টাকার বিনিময়ে বা অন্য কোনও সুবিধার বিনিময়ে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে রোগী পাঠিয়ে সুবিধা পাওয়াকে আমাদের চিকিৎসক সমাজের একাংশ অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছেন। এই অনৈতিক, ক্ষতিকারক স্বভাব থেকে তারা আর বের হতে পারছেন না। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে একথা ঠিক, কিন্তু চিকিৎসকরা কি ভেবে দেখেছেন তাদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কতখানি কমছে?
সমস্যার মূল এখানেই যে চিকিৎসাকে আর পাঁচটা পণ্যের সঙ্গে একাকার করে ফেলেছেন অনেক অনেক চিকিৎসক। কিন্তু কষ্টটা এখানেই, এই ভালো ছাত্ররা প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ওষুধ কোম্পানি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালি করাকে নাম দিয়েছেন কমিশন আর সেটা তারা করছেন প্যাথলজি পরীক্ষার নাম করে, রেফারাল চার্জ বা অন্য কোনও নামে।
এ দেশের চিকিৎসকদের অনেকের ভাবনায় আর নেই, চিকিৎসা কেনাবেচার বিষয় নয়। এর মধ্যে থাকে একটা মানুষের শরীর, মন, জীবনমরণ। সবাই না করলেও চিকিৎসকদের একাংশের কাছে এগুলো আর অন্যায় নয়, বরং প্রায় অধিকারে পরিণত হয়েছে এবং এই অংশটার দাপটেও বেশি তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে। আছেন অনেকেই যারা নিজেদের বিকিয়ে দেননি, নিজের প্রতি, নিজের পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু তারা সাধারণত চুপচাপ থাকেন। ফলে দুর্জনের গলার জোর বাড়ে, দুষ্কর্মের পরিধিও প্রসারিত হয়। পেশার পরিবেশে এই ধরনের অন্যায় আচরণ যখন তীব্রতা পায়, তখন তা ন্যায়-অন্যায়ের বেড়াজাল ভেঙে দেয়। সেটাই সাবরিনার মতো পেশাজীবীদের একটা অংশকে পিচ্ছিল পথে টেনে নেয়।
চিকিৎসা পেশায় যুক্ত কিছু মানুষ এই অন্যায়কে ন্যায্য ব্যবসা বলছেন। তবে তার চেয়েও আশঙ্কার কথা, তারা সেটাকেই সমস্ত পেশার স্বাভাবিক ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট। তারা ইতোমধ্যে একটা বৃহত্তর পরিমণ্ডলকে দখলে নিয়েছেন। যে চিকিৎসকরা সে পথে যেতেন না তাদের কথা বলার প্রয়োজন এখনই, বুক চিতিয়ে।
লেখক: সাংবাদিক

 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ