এ কেমন ঈদ!

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৮:০৯, জুলাই ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৩৮, জুলাই ৩১, ২০২০

 

রুমিন ফারহানাআর মাত্র এক দিন পর ঈদ। চারপাশে থাকার কথা ছিল আনন্দ আর খুশির ছোঁয়া, নতুন গরু কেনার আনন্দ, হাটে উপচেপড়া মানুষের ভিড়, গরুর দরদাম, মানুষের উচ্ছ্বাস। কিন্তু এই বছরই প্রথম দেখলাম ঈদ সবসময় আনন্দের হয় না। মাত্র দুই মাস আগের ঈদুল ফিতর আমাদের এই শিক্ষা দিয়ে গেছে। সেবার ছিল কেবল করোনার ধাক্কা। এই ঈদে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বন্যা, অর্থনৈতিক সংকট, সামনের দিনগুলোর অনিশ্চয়তা। নানামুখী সংকটে দিশেহারা মানুষ। মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় দুই উৎসব ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহা আমাদের জীবনে দুই ধরনের শিক্ষা নিয়ে আসে। ঈদুল ফিতর আমাদের বলে সংযমী হতে আর আজহা তার আনন্দের রেশ সরাসরি ছড়িয়ে দেয় সমাজের একেবারে উঁচু তলা থেকে প্রান্তিক মানুষগুলোর কাছে।
ধর্মীয় আর সব অনুষ্ঠানের মতো কোরবানির ঈদেরও খুব বড় অর্থনৈতিক প্রভাব আছে। এই ঈদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হচ্ছে এতে অনেক বড় মাত্রায় ইনকাম ডিস্ট্রিবিউশন হয়। এতে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের কাছ থেকে সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ পৌঁছে। তাই কোরবানি এই সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত মানুষগুলোর কাছে এক বড় আশীর্বাদ। কিন্তু এই বছর সেই পরিস্থিতিটা থাকছে না আগের মতো।

কোরবানিকে লক্ষ্য করে অনেক মানুষ গরু-ছাগলসহ অন্যান্য প্রাণী পালন করে। এরমধ্যে বড় বড় খামার যেমন আছে, তেমনি আছে হাজার হাজার প্রান্তিক মানুষ, যারা দুই একটা ছোট গরু কিনে সেটাকে কয়েক মাস লালন পালন করে কিছু লাভে কোরবানির হাটে বিক্রি করেন। নিজের শ্রমের মূল্য না ধরে যে খরচ তার হয় তার তুলনায় কিছু লাভ করতে পারে তারা। এই লালন পালনের সঙ্গে প্রাণীগুলোর খাবার, ওষুধ এমন আরও অনেক আনুষঙ্গিক বিষয়ের চাহিদা তৈরি হয়। সেটায়ও অনেক মানুষের জীবিকা তৈরি হয়। কোরবানির প্রাণী বিক্রির পর এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক আরও অনেক জিনিস (যেমন: গোখাদ্য, চাটাই, গাছের গুঁড়ি, দা-বঁটি-ছুরি)-এরও বড় বাজার আছে। অনেক টাকা বিনিময় হয় সেখানে।

ঈদের দিন কোরবানিকৃত প্রাণীগুলোর মাংস প্রক্রিয়াজাত করার জন্য বহু মানুষ আয়ের পথ পায়। দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকাসহ বড় শহরে যায়, এবং আয়ের পথ দেখে। এখানে একটা দলে একজন মানুষ হয়তো এই কাজে দক্ষ থাকে, বাকিরা অদক্ষ, একেবারে প্রান্তিক মানুষ। সারা দেশে যে অঙ্কের টাকার কোরবানি হয় তার সঙ্গে ওই অঙ্কের অতিরিক্ত প্রায় ১০ শতাংশ টাকা এই মানুষগুলোর কাছে যায়।

কোরবানির মাংসের এক তৃতীয়াংশ দরিদ্র মানুষদের কাছে যায়। বর্তমানের মহামূল্যের গরুর মাংসের সময়ে গরিব মানুষদের অনেকেই তাকিয়ে থাকতেন বছরের এই সময়ের দিকে–পেট আর মন ভরে গরুর মাংস খেতে পাবেন তারা। অনেকেই যে পরিমাণ গরুর মাংস পান সেটা সংরক্ষণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলেই অনেকেই সেই মাংস বিক্রি করে দেন। কোরবানির মাংসের প্রতিকেজির যে দাম হয়, সেটার তুলনায় হয়তো এক তৃতীয়াংশ দামেই বিক্রি করেন তারা, কিন্তু সেটাও তাদের হাতে কিছু নগদ টাকা নিয়ে আসে যেটা দিয়ে তারা তাদের কিছু প্রয়োজন মেটাতে পারতেন। সর্বোপরি কোরবানির প্রাণীর চামড়ার মূল্যটার পুরোটা গরিব মানুষদের কাছে যায়।

করোনার কারণে এবার মানুষের আর্থিক সামর্থ্য কমে গেছে। তাই এবার কোরবানি করতে পারবেন না অনেকেই। আবার করোনার ভীতির কারণে অনেক সামর্থ্যবান মানুষ এবার কোরবানি দিচ্ছেন না, বা কম দিচ্ছেন। যিনি আগে এক বা একাধিক প্রাণী কোরবানি করতেন, তিনি হয়তো আর কারও সঙ্গে অংশীদার হয়ে কোরবানি দিচ্ছেন। ফলে এবার আগের বছরের তুলনায় কোরবানির প্রবৃদ্ধি হওয়া দূরেই থাকুক, কমে যাবে গত বছরের তুলনায়।

এর মধ্যেই আমরা পত্রিকায় দেখছি গরু বিক্রেতারা লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, এমনকি হাটের খরচটাও উঠছে না অনেকের। হাটে গরু বিক্রি অনেক কমে যাওয়ায় ইজারাদাররাও আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। কারণ গরু বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের একাংশ থেকে তাদের আয় আসে। আর্থিক সংকট সঙ্গে স্বাস্থ্য ঝুঁকি সব বিবেচনায় নিয়ে অনেকেই কোরবানি থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন।

কোরবানির অর্থনীতির যে চমৎকার সুফল দরিদ্র মানুষের পায় ফি বছর, সেটা এই বছর আর হচ্ছে না। অথচ করোনার কারণে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া মানুষসহ দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের কাছে এবার কোরবানির গুরুত্ব ছিল আগের যেকোনও বছরের চাইতে অনেক বেশি।

এই চরম সংকটের সময় বিশেষ করে যে মানুষগুলো কোরবানির প্রাণী পালন করে একেবারে পথে বসে যাবার উপক্রম হয়েছে তাদের ন্যূনতম প্রণোদনা দেবার কোনও ঘোষণা সরকারের দিক থেকে আসেনি।

চামড়ার নিয়ে কী করছে সরকার, এবার আসা যাক সেই প্রসঙ্গে। গত বছর প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার মূল্য সরকার নির্ধারণ করেছিল ৪৫-৫০ টাকা। একটা মাঝারি গরুতে (গত বছর যার বাজার মূল্য এক লাখ টাকা বা কিছু বেশি ছিল) কমপক্ষে ২৫ বর্গফুট চামড়া হয়। অর্থাৎ গত বছর এক লাখ টাকার গরুর চামড়ার আড়তে হবার কথা ছিল মানভেদে ১১২৫ থেকে ১২৫০ টাকা। তাহলে কোরবানি দাতা পর্যায়ে সেটার দাম ৮০০ টাকার বেশি হবার কথা ছিল। কিন্তু কী হয়েছে গত বছর? ১ লাখ টাকা দামের একটি গরুর চামড়া ২৫০/৩০০ টাকায় বিক্রি করতে পেরেছেন সৌভাগ্যবানরা। আর অনেকে এই ন্যূনতম টাকা না পেয়ে অপেক্ষা করতে করতে চামড়া পচিয়ে ফেলেছিলেন, তাই পুঁতে ফেলা হয়েছিল লাখ লাখ চামড়া। এবার গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ১০ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫-৪০ টাকা। গতবারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে লাখ টাকার গরুর চামড়ার মূল্য এবার সর্বোচ্চ কত হতে পারে?

ট্যানারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বছরের সংরক্ষণ করা ৩৫০০ কোটি টাকার চামড়া এখনও রয়ে গেছে। তারা এটাও জানান, গত কয়েক বছরে তাদের রফতানিতে ধস নেমেছে। আর এবার করোনার কারণে তো আরও বড় মন্দা থাকবে। ঈদের মাত্র ২ দিন আগে সরকার কাঁচা ও ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানি করার অনুমতি দিয়েছে,তাও আবার কেস টু কেস ভিত্তিতে। সবকিছু বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত কি আরও আগেই নেওয়া যেতো না? এত দেরিতে নেওয়া সীমিত এই সিদ্ধান্ত কি চামড়ার মূল্যের ভয়ঙ্কর পতনকে রোধ করতে পারবে?

করোনার কারণে এবার কোরবানি কম হলেও মোটামুটি ন্যায্য দাম পেলে কোরবানি দাতারা চামড়া বিক্রি করে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা পেতে পারতেন। আর এই টাকা পুরোটাই যেতো সমাজের সবচেয়ে গরিব মানুষের কাছে। এই সময়ে কোরবানির চামড়ার টাকা এই মানুষগুলোর জীবনে কিছুটা স্বস্তির সুবাতাস নিয়ে আসতে পারতো।

করোনার সঙ্গে লড়াই করার সময়ই শুরু হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা যা দ্বারা এই পর্যন্ত প্রায় অর্ধকোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। এটি সরকারি হিসাব। বেসরকারি হিসাব ধরলে এই অঙ্ক কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা মুশকিল। বলা হচ্ছে ৮৮ সালের পর এত ভয়াবহ বন্যা আর কখনও হয়নি। ইতিমধ্যেই ৩১টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে বন্যা। উত্তরের কিছু এলাকায় মানুষ বাধ্য হচ্ছে নৌকায় বাস করতে। তলিয়ে গেছে বসতভিটা। আমন ধানের বীজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক পথে বসেছেন, এবার আর কোনও আবাদও করতে পারবেন না তারা। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো নদীর ভাঙনে অসহায় সেখানকার মানুষ।

গত ২৮ জুলাই সরকারি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বন্যাকবলিত জেলাগুলোয় চাল বিতরণ করা হয়েছে ৭ হাজার ১৪৭ টন। নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে ২ কোটি দুই লাখ ১২ হাজার ৭০০ টাকা। শিশু খাদ্য ক্রয় বাবদ বিতরণের পরিমাণ ৩৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, গো খাদ্য ক্রয় বাবদ বিতরণের পরিমাণ ৫৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকা, শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে ৮২ হাজার ১২ প্যাকেট। এছাড়া ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে ১০০ বান্ডিল এবং গৃহ মঞ্জুরি বাবদ বিতরণ করা হয়েছে তিন লাখ টাকা।

অর্থনীতি বিষয়ক থিংকট্যাংকগুলো আমাদের জানিয়েছে করোনার অভিঘাতে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। তাহলে সরকারি হিসাবেই বন্যাদুর্গত ৫০ লাখ মানুষের অন্তত অর্ধেকের ত্রাণ প্রয়োজন হয়েছে। যদিও বন্যাদুর্গত বেশির ভাগ মানুষই দরিদ্র বা হতদরিদ্র তারপরও তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি অর্ধেক মানুষের ত্রাণ প্রয়োজন। তাহলে তারা কতটা ত্রাণ পাচ্ছে? মাথাপিছু ২.৮৫ কেজি চাল আর মাথাপিছু ৮ টাকা। এই সরকারের সময়ে ত্রাণের লুটপাট আমরা দেখেছি, কিন্তু সেটা বাদ দিলেও মাথাপিছু দেওয়া ত্রাণকে প্রহসনও বলা যায় না। প্রহসন করতে হলেও পরিমাণ আরও অনেকটা বেশি হওয়া উচিত।

দারিদ্র্যসীমার নিচে ৭২ শতাংশ মানুষ নিয়ে করোনার আগেই দেশের সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যপীড়িত জেলা ছিল কুড়িগ্রাম। বন্যাপীড়িত ৩১টি জেলার মধ্যে প্রাবল্যে এবং স্থায়িত্ব সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই জেলাটিই। অনেকদিন পর আমরা যখন ঈদ করতে যাচ্ছি তখনই জেলার অসংখ্য মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানা আর সামাজিক দূরত্ব রক্ষার বিলাসিতা করতে পারছে না, কারণ তাদের খুঁজতে হচ্ছে কিছু আশ্রয়, কিছু খাবার। একটি পত্রিকার রিপোর্টারকে এমন একজন বানভাসি মানুষ যা বলেন, সেটা হয়ে ওঠে এই মুহূর্তে এই দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের ভেতরের হাহাকার। এই হাহাকার স্পর্শ করে কি আমাদের? ‘পেটোত নাই ভাত, থাইকপার নাই জাগা। হামরাতো বাঁচি থাকতে মরি গেচি। করোনাক ভয় করি বা লাভ কী! হামার ফির ঈদ কিসের বাহে?’

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ