কী করবেন নতুন ডিজি?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৫:৫১, জুলাই ৩১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৬, জুলাই ৩১, ২০২০

আমীন আল রশীদদেশের ইতিহাসে এটি একটি নতুন ঘটনা যে, বিতর্কের মুখে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক পদত্যাগ করেছেন এবং তার জায়গায় নতুন একজন দায়িত্ব নিয়েছেন। আর এসবই টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজ হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দায়িত্ব নেওয়ার পরে নতুন মহাপরিচালক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। বস্তুত অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ এবং অধ্যাপক আবুল বাসার খুরশীদ আলমের আগে অতীতে আর কোনও স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের নামও দেশের সাধারণ মানুষ জানতো না বা তাদের জানার প্রয়োজনও পড়েনি।
বিতর্কের মুখে অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের পদত্যাগের পরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন অধ্যাপক আবুল বাসার খুরশীদ আলম। প্রশ্ন হলো, বছরের পর বছর ধরে স্বাস্থ্য খাতে যে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, নতুন মহাপরিচালক কি সেই সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে পারবেন? একজন মহাপরিচালকের ক্ষমতা, এখতিয়ার বা কার্যপরিধিই বা কতটুকু? রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা প্রশ্রয় ছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতি হওয়া কি সম্ভব? যদি সম্ভব না হয়, তাহলে একজন মহাপরিচালক কী করবেন বা করতে পারবেন? আবার বছরের পর বছর ধরে এই খাতে যে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ আকারে প্রকারে বিশাল হয়েছে, সেখানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে গিয়ে মহাপরিচালক কি নিজেই স্রোতে ভেসে যাবেন বা সিস্টেমের অংশ হয়ে যাবেন, নাকি নানাবিধ চাপ ও বাধার মুখে নতিস্বীকার করে পালিয়ে আসবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া কঠিন। তবে আমরা ভালো কিছুর প্রত্যাশা করি বা করতে চাই। সমস্যা হলো, করোনার কারণে বিশ্বের সব ক্ষমতাধর রাষ্ট্র নাকানিচুবানি খেলেও; মানুষের অসহায়ত্বের চূড়ান্ত রূপ দৃশ্যমান হলেও বাংলাদেশের কোনও খাতে ন্যূনতম কোনও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। বরং কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলেই শঙ্কা হয়। সুতরাং এরকম একটি বিরুদ্ধ স্রোতে একজন মহাপরিচালক কতক্ষণ সাঁতার কাটতে পারবেন, সেটিই মূল প্রশ্ন।

খুরশীদ আলম দায়িত্ব নেওয়ার পরে অনেকেই বলেছেন, তিনি একজন ভালো চিকিৎসক, ভালো শিক্ষক এবং ভালো মানুষও বটে। কথা হচ্ছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরে যে পরিমাণ দুর্নীতিবাজ লোকের আনাগোনা বা প্রভাব বলে শোনা যায়, তাতে একজন সর্বোচ্চ ভালো মানুষ, সবচেয়ে ভালো শিক্ষক বা খুব সফল চিকিৎসকের পক্ষেও কি সেই দুর্নীতির দেয়াল ভাঙা সম্ভব হবে, যদি না তিনি দক্ষ প্রশাসক হন? অর্থাৎ একজন ভালো চিকিৎসক দ্রুত রোগীর অসুখ ধরতে পারেন এবং সঠিক চিকিৎসা দিতে পারেন। একজন ভালো শিক্ষক ক্লাসে ভালো পড়ান, ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করেন। একজন ভালো মানুষ নির্লোভ থাকতে পারেন এবং তাতে তাকে দিয়ে অন্যায় কাজ করানো কঠিন। কিন্তু একটি বড় প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে তাকে প্রথমে ভালো প্রশাসক হতে হয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক হিসেবে যিনি দায়িত্ব নিলেন, তিনি কতটা ভালো শিক্ষক, ভালো মানুষ বা ভালো চিকিৎসক—তার চেয়ে বড় কথা তিনি কতটা দক্ষ প্রশাসক?

শুধু মহাপরিচালক নয়, দুর্নীতি ও অনিয়মসহ নানা অভিযোগের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক ডা. আমিনুল হাসানকেও ওএসডি বা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করে তার জায়গায় নতুন পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ডা. ফরিদ হোসেন মিয়াকে। তার ক্ষেত্রেও এই একই প্রশ্ন খাটে যে ডা. আমিনুল হাসানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, যেসব অন্যায় ও অপরাধের সঙ্গে তিনি জড়িত বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে, ডা. ফরিদ হোসেন কি তা থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন? স্বাস্থ্য খাতে যে বিশাল সিন্ডিকেটের কথা শোনা যায়, সেই সিন্ডিকেট ভাঙা কি একজন মহাপরিচালক বা পরিচালকের পক্ষে সম্ভব যদি এখানে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না থাকে? প্রশ্নটা এ কারণে যে, রাজনৈতিক বা সরকারের কোনও একটি প্রভাবশালী অংশের সহায়তা ছাড়া সরকারি অর্থ লুটপাট করা অসম্ভব। আবার যে সিন্ডিকেটের কথা বলা হচ্ছে, সেই সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী অংশে সাধারণত রাজনৈতিক নেতারাই বসে থাকেন। অনেক সময় তারা দৃশ্যমান, অনেক সময় আড়ালে। কিন্তু ঝড়ঝাপ্টা যা যাওয়ায় তা ফ্রন্টলাইনে থাকা বা দৃশ্যমানদের ওপর দিয়েই যায়। সিন্ডিকেটের চূড়ান্ত ব্যক্তিটি অধিকাংশ সময় অদৃশ্যই থেকে যান।

অস্বীকার করার উপায় নেই, স্বাস্থ্য খাতে বেনিফিশিয়ারি বা সুবিধাভোগীর তালিকা অনেক লম্বা। এই তালিকার কিছু লোক পরিবর্তন হলেও বা কিছু লোককে আইনের আওতায় আনা গেলেও একটা বড় অংশকেই ধরা সম্ভব হয় না। আবার এই বেনিফিশিয়ারির সবাই সরকারের ভেতরের লোক নয়। বাইরের চাপও রয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও বলেছেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে বাইরের হস্তক্ষেপ অনেক বেশি।’ স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন এরকম একটি কথা বলেন, তখন এটা বুঝতে তো বাকি থাকে না যে এই খাতে কী পরিমাণ ক্ষমতাবান লোকের পদচারণা। প্রকাশ্যে যখন একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ ধরনের কথা বলেন, তখন বুঝতে হয় যে তারাও আসলে কোথাও না কোথাও অসহায়। অর্থাৎ যাদের কারণে তারা অসহায়, সেই লোকগুলোকে হয়তো কোনোদিনই ধরা যাবে না। যদি ধরা না যায়, তাহলে একজন মহাপরিচালক বা পরিচালক এমনকি একজন মন্ত্রীকে বদল করেও আখেরে কী ফল হবে?

মনে রাখার দরকার, করোনার নমুনা পরীক্ষায় প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে যে রিজেন্ট ও জেকেজির বিরুদ্ধে, এই কাজে তাদের দায়িত্ব দেওয়াটা সরকারেরই সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চুক্তি সই হয়েছে। তার মানে এটি সরকারের নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত। সুতরাং যখন রিজেন্ট ও জেকেজির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠলো, তখন তার দায় পুরো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপরে গিয়েই বর্তায়। কারণ, এরকম একটি মহামারিকালে জনস্বাস্থ্যের একটি বড় দায়িত্ব কাকে দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে শুরু করে আরও নানাভাবে যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজন ছিল। সেগুলো করা হয়েছে কিনা এবং করলে সেখানে কী ত্রুটি ছিল সেগুলোরও গভীর অসুন্ধান জরুরি। এসব অনিয়মে সহায়তায় অভিযোগ ওঠায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ পদত্যাগ করেছেন, এটি অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি এই অনিয়মের দায় এড়াতে পারেন? তিনি তো বহাল তবিয়তে আছেন। শুধু তা-ই নয়, করোনা ইস্যুতে তিনি শুরু থেকেই যেসব কথাবার্তা বলেছেন, তা নিয়ে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে; তার কিছু কথাবার্তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় হাস্যরসও সৃষ্টি হয়েছে। এরকম একটি দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিকে নিয়ে যখন সাধারণ মানুষ রসিকতা করে, তখন তার আর এই পদে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না।

মুশকিল হলো, যখনই রাষ্ট্রের কোনও খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, সংশ্লিষ্টরা প্রথমেই নিজেদের দায় অস্বীকার করেন। এরপর চেষ্টা করা হয় সেই অন্যায়ের দায়টি বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর চাপানোর এবং কোনও না কোনোভাবে প্রমাণের চেষ্টা চলে যে, এই কাজে যুক্ত ব্যক্তি অতীতে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি নিজে রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও তার পরিবারের কেউ বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন কিনা, সেটিও প্রমাণের চেষ্টা চলে। আর এই কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্ম।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার পর আবুল বাসার খুরশীদ আলমও সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির দায় সরকারের একার নয়। দুর্নীতির দায় আমাদের সবার। আমরা যদি শুধু সরকারের দিকে আঙুল তুলি সেটা হবে সবচেয়ে বড় বোকামি। আমরা সবাই এই দুর্নীতির অংশ। ব্যক্তিগতভাবে মানুষ সৎ না হলে কোনোভাবেই দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়।’ কথাগুলো শুনতে ভালো। কিন্তু মানুষ জানতে চাইবে এবং দেখতে চাইবে নতুন মহাপরিচালক এই দুর্নীতি রোধে কী পদক্ষেপ নেন। তিনি নিজে কতটা লোভ ও ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে পারছেন। তার এই মন্তব্য নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই তার এই বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। ২৭ জুলাই তিনি যে অনলাইন সংবাদ সম্মেলন করেছেন সেখানে সাংবাদিকরাও তার কাছে এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন। জবাবে তিনি বলেন, তিনি আসলে বোঝাতে চেয়েছেন যে ব্যক্তিগতভাবে সবাই সৎ না হলে সামগ্রিকভাবে দুর্নীতি রোধ করা কঠিন।

এই কথাটিও খুব অ্যাকাডেমিক এবং আপাত নিরীহ। কারণ, বিশ্বের কোনও দেশে, কোনও সমাজের সব মানুষ সৎ নয়। এটা সম্ভবও নয়। বরং একটি সমাজের কিছু লোক অন্যায় করে এবং সেই অন্যায় প্রতিরোধের মূল দায়িত্বটা রাষ্ট্রের। অর্থাৎ স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি বন্ধের প্রথম উদ্যোগটা নিতে হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই। স্বাস্থ্য খাতে জনগণের অর্থ লুটপাট হলে এ কথা বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই যে সব মানুষ সৎ হলে দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে। সব মানুষ একসাথে কোনোদিন সৎ হবে না। তাহলে কি দুর্নীতি ও লুটপাটও কোনোদিন বন্ধ হবে না? আবার দুর্নীতি হলেই যে তার দায় সব মানুষকে নিতে হবে তারও কোনও মানে নেই। বরং সমাজ ও রাষ্ট্রে দুর্নীতি হবে এবং সেটি দমনও করতে হবে—যার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ব্যক্তি পর্যায় থেকে মানুষকে সৎ হতে বলাটাও জরুরি। কিন্তু এই কথার মধ্য দিয়ে যেন এটি মনে না হয় যে সংশ্লিষ্টরা আগেই নিজেদের দায়মুক্তির পথ খুঁজছেন বা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য অন্যকে দোষারোপ করছেন। কারণ যারা চোর তারা সব সময়ই চুরি করার জন্য ফাঁক খুঁজবে। কিন্তু সেই চুরির দায় সমাজ ও রাষ্ট্রের সবার ঘাড়ে চাপানোর সুযোগ নেই। কোনও কোম্পানি নকল ওষুধ তৈরি করলে এবং ফার্মেসিতে সেই নকল ওষুধ বিক্রি করা হলে একজন মানুষ কেন সেই নকল ওষুধ কিনলেন, সেজন্য তাকে অভিযুক্ত করার সুযোগ নেই। এই অপরাধের জন্য এটি বলার সুযোগ নেই যে দেশের মানুষ খারাপ তাই নকল ওষুধ তৈরি করা হয়েছে। বরং যারা চুরি করবে, অন্যায় করবে, দায়টা তাদের এবং এজন্য তাদেরই জবাবদিহি করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ