‘টিকটক অপু’র চুল এবং এক ‘সংকীর্ণ বারান্দা’র কথা

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৭:৫৫, আগস্ট ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫৭, আগস্ট ১২, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমান‘টিকটক অপু’ গ্রেফতার হওয়ার পর আমাদের প্রতিক্রিয়া আলোচনা অপুর গ্রেফতার ছাপিয়ে আরও অনেক কিছুতে চলে গেলো। ফেসবুকে দেখলাম কেউ কেউ এতে বিরক্ত বোধ করেছেন—প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও একেবারে প্রান্তিক অবস্থান স্যালুনের কর্মচারী থেকে একজন ‘স্টার’ হয়ে ওঠা আমাদের অনেকের অহমকে আহত করেছে নিশ্চয়ই।
অপুকে নিয়ে এই আলোচনায় আমি অবশ্য খুশি হয়েছি। অপুর গ্রেফতার নিয়ে আমাদের নানামুখী বিশ্লেষণ এবং প্রতিক্রিয়া খুব আগ্রহ ভরে দেখছিলাম। এসব প্রতিটা ঘটনাকে ঠিক একটা ঘটনা হিসেবে না দেখে আমাদের সমাজের মানুষের ভাবনা বিশ্লেষণের একটা চমৎকার টুল হিসেবে‌ দেখি আমি। আমাদের সমাজের ডিনামিক্স নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ গবেষণায় অভাবের খামতি কিছুটা হলেও তো পূরণ হয় এমন সব ঘটনার প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে।

নানাদিক থেকে দেখা হয়েছে ঘটনাটিকে। অনেকেই দাঁড়িয়েছেন তার পক্ষে, আবার অনেকেই বিপক্ষে। অনেকেই অপুকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী ভেবে লজ্জিত হয়েছেন, অনেকেই তার ‘কাণ্ডকীর্তি’কে সমাজের উঠতি বয়সের কিশোর-তরুণদের বিপথে যাবার অনুঘটক বলে মনে করেছেন। অনেকেই আবার তার পক্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের মধ্যবিত্ত উন্নাসিকতাকে কটাক্ষ করেছেন,কেউবা তার ওপরে আক্রমণকে ব্যাখ্যা করতে পোস্ট-কলোনিয়ালিজম এর সাবঅল্টার্ন তত্ত্ব হাজির করেছেন।

মজার ব্যাপার আমি যতটুকু দেখেছি তাতে যারা মনে করেন অপু বিপথে গেছে, তাদের কাছে এটার পক্ষে খুব ‘বড় প্রমাণ’ হচ্ছে অপুর লম্বা এবং রঙ করা চুল। ফেসবুকে অনেককেই লিখতে দেখেছি তার চুলের বিরুদ্ধে। কেউ বলছেন সেটা নিয়ে, আবার কেউবা জানাচ্ছেন তার হাত নিশপিশ করছে নিজ হাতে ধরে ওর চুলগুলো কেটে দিতে।

এই পর্যন্ত হলেও হয়তো মেনে নেওয়া যেতো, কিন্তু আমরা জানতে পারি অপু থানায়, এমনকি অবিশ্বাস্যভাবে আদালতেও তার চুল নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। আদালত অপুর কাছে জানতে চায়, ‘তোমার চুলের এই অবস্থা কেন?’ অপু তখন পুরো নীরব ছিলেন। কোনও উত্তর দেননি। তবে তার উকিলকে জবাব দিতে হয়েছে। আদালতকে তিনি জানান–‘অভিনয় করা জন্য এমন কালার করতে হয়।’  

প্রতিটি সমাজে বিশেষ করে আমাদের মতো পশ্চাৎপদ সমাজে কতগুলো স্টেরিওটাইপ থাকে। শুধু থাকে না, ভীষণ প্রভাবশালী সেগুলো। সেগুলোর ভিত্তিতেই আমরা একরকম চট করে মূল্যায়ন করে ফেলি মানুষের। সমাজ গ্রহণ করে এমন বেশ ভূষণ,আচরণ কেউ না করলেই সেটাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়। সমাজে চলতে থাকা এসব স্টেরিওটাইপ কোনোমতেই ভালো না। প্রত্যেকটা মানুষের উচিত এগুলোকে প্রশ্ন করা, চ্যালেঞ্জ করা। এবং যেসব স্টেরিওটাইপ ক্ষতিকর, পরিত্যাগ করা উচিত সেগুলো। এটাই আধুনিকতা। এই ব্যাপারগুলো বোঝার গুরুত্ব আসলে ‘আধুনিক হবার’ চাইতেও অনেক বেশি; এটা রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই আলোচনায় পরে আবার ফিরে আসছি।

যেদিন থেকে মানুষ রাষ্ট্র গঠন করেছে সেদিন থেকেই খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা আলোচনা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রের প্রকৃতি কেমন হবে। একটা রাষ্ট্র শক্তিশালী হওয়া ভালো, না দুর্বল হওয়া ভালো– রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং নাগরিকদের মধ্যে দীর্ঘকাল এই নিয়ে আলোচনা চলেছে।  

আমরা যদি অ্যানার্কিস্ট না হই, আমরা যদি রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাস করি, তাহলে আমাদের সম্ভবত মেনে নিতে হবে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থাই জনগণের জন্য ভালো। কারণ একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র না থাকলে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান না থাকলে আইনের ন্যায্য এবং সঠিক প্রয়োগ হয় না। ‌আর সেটা না হলে সবচেয়ে ভুক্তভোগী হয় রাষ্ট্রের দুর্বল নাগরিকরা, কারণ তখন সবল, সক্ষম নাগরিকদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য কেউ থাকে না। এখানে একটা আদর্শ রাষ্ট্রের কথাই বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে অবশ্য রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা নিয়েই সবলরা দুর্বলদের নিপীড়ন করে। সে অন্য আলোচনা।

ড্যারন এসেমাগলু এবং জেমস রবিনসন তাদের সর্বশেষ বই ‘দ্য ন্যারো করিডোর: স্টেইটস,সোসাইটিজ অ্যান্ড দ্য ফেইট অব লিবার্টি’-এ একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বলেছেন। বলেছেন রাষ্ট্রকে হতে হবে বাইবেলে বর্ণিত সামুদ্রিক দানব লেভায়াথান-এর মতো শক্তিশালী, তাহলেই সেটা সমাজের প্রান্তিক মানুষটিরও স্বার্থ রক্ষা করার সক্ষমতা অর্জন করবে। কিন্তু একটা বিপদ আছে, দানব লেভায়াথান তার ভীষণ শক্তির দাপটে এমন সব ক্ষেত্রে চলে যেতে চাইবে যেগুলো আখেরে আবার নাগরিকের স্বাধীনতায় চরম ব্যত্যয় ঘটাবে–এটাকে তারা বলছেন ‘ডেসপোটিক লেভায়াথান’ পরিস্থিতি। আগেই বলা হয়েছে দুর্বল রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর, তাই ‘অ্যাবসেন্ট লেভায়াথান’ পরিস্থিতিও কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সবদিক বিবেচনায় তারা বলেন, রাষ্ট্র নামের এই লেভায়াথান থাকবে, তবে এটা পুরোপুরি মুক্ত স্বাধীন হতে পারবে না। এটিকে হতে হবে শৃঙ্খলিত, লেখকদ্বয়ের ভাষায় ‘শ্যাকলড লেভায়াথান’।

লেভায়াথানকে শৃঙ্খলিত করার জন্য একমাত্র ভূমিকা পালন করতে পারে সামাজিক শক্তি। সমাজকে তার চিন্তায় চেতনায় এতটাই শক্তিশালী হতে হবে যে সে তার নিজস্ব একটা সত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। প্রবল শক্তিশালী রাষ্ট্রকে সে একটা চৌহদ্দি ঠিক করে দিতে পারবে যার বেশি রাষ্ট্র যেতে পারবে না। এভাবে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে যদি একটা শক্তিশালী সামাজিক শক্তি থাকে তাহলে পরস্পর বিরোধী এই দুই বলের প্রভাবে একটা জায়গা তৈরি হয় যেখানে নাগরিকরা তাদের স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারেন। এটাকেই লেখকদ্বয় বলেছেন ন্যারো করিডোর; এটাই আমার শিরোনামে লেখা ‘সংকীর্ণ বারান্দা’।

আলোচিত বইটিতে এমন রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক এবং যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে। তেমন রাষ্ট্রেই যদি এই ধরনের ঝুঁকি থাকে, আমাদের মতো একটা কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের সময়ে এই প্রবণতা এর চাইতে অনেক বেশি হবে এটা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়। সেটার আলামত আমরা প্রায়শই দেখি।

রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের দু’টি প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা এই রাষ্ট্রের একজন নাগরিকের এমন একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে যেটা কোনোভাবেই তাদের ক্ষমতার চৌহদ্দির মধ্যে পড়ে না। তাই এটার প্রতিবাদ আমাদের সমাজ থেকে খুব শক্তভাবে হওয়া উচিত ছিল। ‌ কিন্তু সেটা হয়নি সেভাবে। বরং আমরা নিজেরাও এই অপ্রয়োজনীয় অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলো করে একেবারে উল্টো পথে হাঁটলাম।

দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা সংকটে আমরা এতই জর্জরিত থাকি, একটা উদার, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা সম্ভবত আমরা বাদই দিয়ে দিয়েছি। অথচ এই রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছিল সেই স্বপ্ন দেখে। ‌কয়েক গুণ বেশি খরচ করে কিছু কংক্রিটের কাঠামো তৈরি করার জন্য এই রাষ্ট্র স্বাধীন হয়নি, এই রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখে। আমি জানি এই রকম পরিস্থিতিতে এই স্বপ্ন এখন অলীক বলে মনে হতেই পারে, কিন্তু সব প্রতিকূলতার মধ্যেও এই স্বপ্নটা দেখে যেতে হবে। এই স্বপ্নটা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা খুব সামান্য করে হলেও হতে হবে।

উল্লিখিত বইটিতে এসেমাগলু এবং রবিনসন এটাও খুব জোর দিয়ে বলেছেন রাষ্ট্র এবং সমাজের এই পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত একবার করলেই সেটা আজীবন থাকবে না। এই স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ক্রমাগত সংগ্রামের ব্যাপার এবং এর কোনও বিকল্প নেই। এখানে তারা এনেছেন আলোচিত রেড কুইন এফেক্ট বা হাইপোথিসিস, যেখানে আরেকজনের সাপেক্ষে নিজের জায়গা নিশ্চিত রাখার জন্য আপনাকেও তার সমান গতিতে চলতে হবে।

রাষ্ট্র তার ক্ষমতার চৌহদ্দি পেরিয়ে জনগণের ব্যক্তিগত জীবনে সামান্যতম ঢোকার চেষ্টা করলে তার প্রতিবাদ করতে হবে। তেমন কোনও চেষ্টায় অন্তত সামাজিক মাধ্যমে এক টুকরো প্রতিবাদও আমরা করি তবে সেটা একটা উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামের‌ই অংশ হয়ে থাকে। এভাবেই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াস একদিন হয়তো আমাদের স্বপ্নের রাষ্ট্র গঠনের পথে আমাদের অগ্রযাত্রাকে বেগবান করবে।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ