বাংলাদেশে ফাইন্যান্সিয়াল ও ব্যাংকিং সিস্টেম কৌশল

Send
ড. জামালউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশিত : ১২:২৬, আগস্ট ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৪, আগস্ট ২২, ২০২০

ড. জামালউদ্দিন আহমেদসরকারি নির্দেশনায় আমি জনতা ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করি ২০১৯ সালের ২০ আগস্ট। তার আগে একইদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য থেকে পদত্যাগ করেছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ছয় বছর কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার সেই অভিজ্ঞতার কিছু অংশ এই লেখায় লিপিবদ্ধ করতে চাই।
আমার মতে, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে সর্বোচ্চ প্রয়াস থাকা দরকার। কোভিড-১৯ মহামারির প্রেক্ষাপটে সরকারি প্রণোদনা বাস্তবায়ন ও সরকারঘোষিত নির্দেশনা অনুসারে মন্দ ঋণ নবায়নে মোট ঋণের ২ শতাংশ জমা দিয়ে পুনঃতফসিলকরণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে বর্তমানে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। আর্থিক সেবার ডিজিটালাইজেশনের বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। আমরা ব্যাংক কর্তৃপক্ষগুলো সেই চেষ্টায় আছি। দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নতুন উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), অণু, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (সিএসএমই), কৃষি ঋণের বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে জনতা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানের সীমাবদ্ধতা এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বিষয়ে সম্ভাব্যতার মনোনিবেশ গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশের সব জেলা, উপজেলা ও পৌরসভায় বিস্তৃত জনতা ব্যাংকের শাখার ব্যবস্থাপকসহ প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে জুম প্রযুক্তির মাধ্যমে কর্মশালা চলছে। কম খরচে আমানত সংগ্রহ,নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণ ইত্যাদি সংযুক্ত করে শর্তাকারে ভবিষ্যতে ‘পারফরম্যান্স বোনাস রুল’ তৈরির প্রয়োজনে বোর্ড সদস্য ও ব্যবস্থাপনার প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণে কমিটি প্রণয়ন করে প্রতিটি রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি নিশ্চিত যে, কর্মদক্ষতা প্রথমে প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাংকের এবং প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত লক্ষ্য মিলেই ব্যাংকের সার্বিক লক্ষ্য নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতে।

১। ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম কাঠামো সুনির্দিষ্টকরণ

(ক) একটি দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও শিল্প-বাণিজ্য প্রসারের জন্য সুনির্দিষ্ট ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম কাঠামো থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ উন্নয়ন ও শিল্প-বাণিজ্যের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে অর্থ জোগানের কৌশল হিসেবে ব্যাংক ব্যবস্থা, পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে মাধ্যম ধরা হয়।

প্রথমত, বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি ঋণ দেওয়া হয়। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি ঋণদাতা ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিলে অবশ্যই ম্যাচুরিটি মিসম্যাচ-এ পড়বে। এর কারণ দেশের বর্তমান ব্যাংকিং সমস্যা। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার তেমন ব্যাংক নেই বললেই চলে। যেমন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) এই সেবা দিতে অপারগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্শাল পরিকল্পনার

আওতায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মাধ্যমে শিল্পায়নের জন্য জাপান, জার্মানি, কোরিয়া, তাইওয়ান, পাকিস্তান, ভারতসহ ইউরোপের অনেক দেশে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানের আর্থিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়। ফলে পাকিস্তানে শিল্প ঋণের জন্য শিল্প ব্যাংক এবং শিল্প ঋণ সংস্থা গঠিত হয়।

ইক্যুইটি মার্কেটে অর্থায়নের জন্য ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ গঠন করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অগ্রাহ্য করে স্বল্পমেয়াদি ঋণ প্রদানকারী বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর করে বর্তমান ব্যাংকিং সমস্যা তৈরি হয়েছে। 

রাষ্ট্রায়ত্ত দুই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা (বিএসআরএস) একীভূত হয়ে বিডিবিএল নাম ধারণ করে। এটি দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ঋণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান শিল্পায়নে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানের প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান তাদের নেই। এ ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। তবে সরকার পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সরকারি বাজেট থেকে ৪ শতাংশ হারে ঋণ দেওয়ার পর সেটি আবার উদ্যোক্তাদের ৯ শতাংশ হারে সুদে ঋণ দিতে পারে। ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) একই কায়দায় ঋণ দিয়ে ইক্যুইটি মার্কেটের নগদ প্রবাহ ছাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডকে (আইডিসিওএল) বিডিবিএল-এর সঙ্গে একীভূত করতে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ঋণের পথ খুলতে হবে।

আবাসন খাতে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (এইচবিএফসি) একমাত্র সরকারি সংস্থা ও ব্যাংক নয়। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণদাতা ব্যাংকে রূপান্তর করে সরকারি বাজেট থেকে প্রতি বছর ১০-১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন শহর-গ্রামের ব্যবধান দূরীকরণ সম্ভব। এ বিষয়ে এইচবিএফসি, ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং করপোরেশন, আইডিএলসি ফাইন্যান্সসহ যেসব নন-ব্যাংক বা ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) গৃহনির্মাণ ঋণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তাদের কাছ থেকে নিয়ে সহনীয় সুদের ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিলে সরকারপ্রধানের মহতি উদ্যোগ বাস্তবায়ন হবেই।এইচবিএফসি খুবই অল্প টাকায় গৃহনির্মাণ ঋণ নিয়ে কাজ করে। দেশের চাহিদা অনুযায়ী তারা ঋণ দিতে না পারায় আবাসন খাতের প্রসার হচ্ছে না। বিনিয়োগকারী ব্যাংক হিসেবে আইসিবি সীমিত আকারে কাজ করছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

দ্বিতীয়ত, কার্যকর পুঁজিবাজারের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশে আমরা এটা সঠিকভাবে করতে পারিনি। অথচ বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে এখনও যারাই পরিচালক তারাই মালিক। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে মালিকপক্ষের কর্তৃত্ব এড়ানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে শেয়ারবাজারকে বেসরকারি ইক্যুইটি মার্কেট ও ফাইনান্সিয়াল ডেরিভেটিভ (বন্ড, ডিবেঞ্চার ইত্যাদি ছাড়ার ব্যবস্থা করে) বানিয়ে ক্যাপিটাল মার্কেট নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বয়ে শেয়ার বাজারে বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে।

তৃতীয়ত, কার্যকর বন্ড মার্কেট গড়ে তুলে করপোরেট বন্ড, সরকারি বন্ড ও অবকাঠামো বন্ড সৃষ্টির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি করলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সহায়ক ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ও অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগীদের তালিকা করলে দেখা যায়, একই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রতিটির সুবিধাভোগী! জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নের মধ্যম আয়ের দেশ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে ব্যাংক ঋণের বিস্তৃতি লাখ লাখ উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে সম্ভব। ব্যাংকের দরজা ঋণখেলাপিদের জন্য বন্ধ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য খুলতে হবে। অঞ্চল ও লিঙ্গ বৈষম্য ভুলে উদ্যোক্তা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
(খ) কোন দেশের বেসরকারি খাতে অর্থায়নের ধরন কেমন তা জানতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০১১ সালে ১৭টি দেশের ওপর গবেষণা চালায়। এতে উঠে আসে ব্যাংক নির্ভরতা ও পুঁজিবাজার নির্ভর অর্থায়নের তথ্য। গবেষণায় জানা যায়, ১৭টি দেশের মধ্যে সাতটি দেশ পুঁজিবাজার নির্ভর। এগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স।

(গ) অন্যদিকে জাপান, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেনকে ব্যাংক নির্ভর অর্থ জোগানকারী দেশ হিসেবে ধরা হয়। গবেষণায় চারটি দেশকে শক্তিশালী বাজার হিসেবে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া শক্তিশালী ব্যাংকভিত্তিক দেশের কাতারে পড়ে।

(ঘ) একই গবেষণায় এটাও বলা হয়েছে,আর্থিক জোগানের পদ্ধতি যাই হোক না কেন, সেটি যদি সঠিক ও স্বচ্ছভাবে পরিবেশন করা হয় তাহলে অবশ্যই ভালো ফল আসবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে গঠনমূলক স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবে।

২। মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) বৃদ্ধির ফলে সুদের হার বৃদ্ধি, ঋণের প্রবাহ কমতি, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির ওপর ঋণাত্মক প্রভাব বিষয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা

প্রতিটি গবেষণা শেষে সবাই একমত, বর্তমান সিএআর একধাপ উঠলে সুদের হার বাড়বে, ঋণের প্রবাহ কমবে এবং জিডিপিতে ঋণাত্মক ফল দেখা দেবে। ফলে বিষয়টি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের নীতিনির্ধারকদের ব্যাপক বিচার-বিশ্লেষণের পর দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিএআর একধাপ বাড়লে আরোপিত সুদের হার বৃদ্ধি পায় ও ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের ক্ষমতা কমে যায় এবং জিডিপিতে ঋণাত্মক ফল দেখা যায়। এটি স্বনামধন্য অসংখ্য গবেষক তাদের গবেষণায় তুলে ধরেছেন। ২০১৩-২০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এসব গবেষণাকর্ম সম্পাদিত হয়েছে। এর সংখ্যা ন্যূনতম ১৪টি। তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ৮টি, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ২টি, জার্মানিভিত্তিক ১টি ও অন্যান্য দেশে ৩টি গবেষণা হয়।

গত মার্চে আইএমএফ কর্তৃক প্রকাশিত আন্তর্জাতিক জার্নাল অব সেন্ট্রাল ব্যাংকিংয়ে গবেষণাধর্মী একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বাড়লে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পায় অর্থাৎ ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়। ফলে ব্যাংক ঋণের প্রবাহ কমে যায় এবং দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়ে। আইএমএফের এই প্রকাশনায় ১৯ জন স্বনামধন্য গবেষকের গবেষণালব্ধ ফল লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এগুলোর সামগ্রিক ফল এই লেখার ২ প্যারার শুরুতে উল্লিখিত আছে। বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও সময় ব্যবধানের তথ্য নিয়ে গবেষণা সম্পাদন করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ৫টি, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ৫টি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) ভিত্তিক ৩টি, জার্মানিভিত্তিক ১টি, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ১টি ও অন্যান্য দেশের ৪টি গবেষণা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন ২০১৮ সালে সিএআর শতাংশের ওপর একটি গবেষণা করে। ১৯৩৪-২০১৭ সালের তথ্য ও ১৮৩৪-১৯৩৩ আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে এটি করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ১৮৩৪ সালে সিএআর ছিল ৫০ শতাংশের কাছে। ১৮৪২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৬০ শতাংশে পৌঁছায়। ক্রমান্বয়ে এই সিএআর শতাংশ কমতে থাকে, যা ১৮৪২ সাল পর্যন্ত ৩০ শতাংশ এবং ১৮৪৬-১৮৬৬ সালে ৪০-৫০ শতাংশে পৌঁছায়। আবার ১৮৫৪-১৮৭০ সালে ৩০-৪০ শতাংশের মধ্যে থাকে, ১৮৭০-১৮৯৪ সালে ২০-৩০ শতাংশ, ১৮৯৪-১৯৩৪ সালে ১০-২০ শতাংশ এবং ১৯৩৮-২০১৪ সালে ০-১০ শতাংশ পর্যন্ত হয়। উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের তথ্য ঘাটলে একই চিত্র দেখা যাবে। তাদের মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিং মূলধনের পর্যাপ্ততা পর্যালোচনার পর হয়তো তা অন্য অনেক দেশের মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনায় পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। বর্তমান কঠোর সিএআর শতাংশ উন্নত বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য হলেও তা গবেষণার বিষয় হিসেবে ঠিক আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সিএআর শতাংশের বর্তমান সংখ্যা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এ অবস্থা চলতে থাকলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে না, বরং সুদের হার বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এছাড়া কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সরকারি প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হবে, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়বে এবং সরকারের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে যাবে। সর্বোপরি শিল্পায়ন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন, শর্তপূরণ ও মধ্যম আয়ের দেশ আর উন্নত বাংলাদেশ গঠন বাধাগ্রস্ত হবে।

৩। ব্যাংকের বর্তমান মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত রক্ষার হার ১০ শতাংশের নিচে প্রাথমিকভাবে কমিয়ে ৬-৭ শতাংশের মধ্যে রাখা আবশ্যক

আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাতের ধাপ ওপরে উঠলে দেশে ঋণ প্রবাহ কমে যায় ৬-৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় তা কমে যায় ০ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ১০ শতাংশ, যা পাশ্ববর্তী দেশেরটি ৬-৭ শতাংশের মধ্যে।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোকে ঋণ সহায়তা দেওয়ার বেলায় আগে ৫ শতাংশ সুদ নিতো। বর্তমানে তা নিচ্ছে ৪ শতাংশ। এর হার ১-২ শতাংশ হওয়া দরকার। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে সৃষ্টি হবে নতুন উদ্যোক্তা, যাদের মধ্যে থাকবে বেকার তরুণ-তরুণীরা। এছাড়া নীতিগতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সব নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেমন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ও বিএসইসি’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লাভের উদ্দেশে গড়ে তোলা হয়নি। বরং অর্থনীতির চাকা সঠিকভাবে ও নিয়মাচার মেনে চলছে কিনা তা তদারকি করাই এসব সংস্থার কাজ। এগুলোর পরিচালনার ব্যয় কোনও কোনও ক্ষেত্রে সরকারি বাজেট থেকে নেওয়া হয়। আবার কিছু সংস্থা নিজস্ব বাজেট থেকে তা ব্যয় করে।

৪। আমানতের ওপর ৬ শতাংশ সুদ এবং ঋণের ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ সুদ চার্জ করার সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ছাড়া অন্য কোনও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকারি এই নির্দেশনা মানছে না। এ কারণে বাজারে সুদের হার স্থিতিশীল হচ্ছে না। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারি নির্দেশনা মেনে ৬ শতাংশ হারে আমানত সংগ্রহ করা কঠিন। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংক ৬ শতাংশ হারে সুদ দিয়ে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের কাছ থেকে আমানত নিয়ে যাচ্ছে বেশি (৬ শতাংশের অতিরিক্ত সুদে প্রয়োজন অনুযায়ী)। আবার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে সরকারি প্রতিষ্ঠানের এলসি চার্জ কমিশন ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রচলিত বাজার মূল্যের চেয়ে কম দামে সেবা দিতে হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, সেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তাদের আমানত রাখার সময় বেসরকারি ব্যাংকে ৬ শতাংশের ওপর সুদে টাকা জমা রাখতে অতীব উৎসাহী। এখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অসহায়। প্রচলিত নিয়মের কাছে তাদের হাত বাঁধা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়, যা দুই বছর ধরে কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন আছে।

৫। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আদলের ট্রেজারি রুলস সংস্কার প্রয়োজন

১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া অর্থাৎ ভারতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আসে। ১৯৩৭ সালে এর কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জন্মের পর রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার আদলে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালু হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয় এবং পরের বছর এর কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু চলতে থাকে আগের নিয়মে। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয় পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যে। তখন কম সুদে সরকারি ট্রেজারির টাকা জমা হতো পাকিস্তানি মালিকানাধীন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও একই কাজ চলছিল। তাতে অসুবিধা ছিল না, কারণ সোনালী ব্যাংক সরকারি ব্যাংক। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে সরকারের রাজস্ব আয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায়, বাস্তবে সোনালী ব্যাংক একই সেবা দিতে পারছে না। তাই ট্রেজারি রুলস পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সেটি করার পর পর্যায়ক্রমে জনতা ব্যাংকসহ আরও দুটি ব্যাংককে এই দায়িত্ব দিলে কম দামি আমানতের সুযোগ বাজারে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি করবে। একইসঙ্গে বিনিয়োগ ও চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রদানের দুই বছর কেটে গেলো বর্তমান সরকারের। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিকেন্দ্রীকরণে সায় আছে বলে জানা যায়। তবে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত এটি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

৬। গ্রামপর্যায়ে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তৃতি

বাংলাদেশের সব জেলা-থানা-উপজেলা ও পৌরসভায় জনতা ব্যাংকের শাখা রয়েছে, যার মাধ্যমে জনগণের কাছে অনলাইন ব্যাংকিং করার মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ, রেমিট্যান্সসহ অন্যান্য ব্যাংকিং সেবার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো–  গ্রামীণ আমানত সংগ্রহ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় ঋণ না দিয়ে হেড অফিস ঋণ নামে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ইত্যাদি বড় বড় শহরের শিল্পপতিদের দেওয়া হয়। এ কারণে এসএমই, সিএসএমই, নারী উদ্যোক্তা ও কৃষিতে ঋণ বিতরণ হচ্ছে না। এ কারণে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ব্যাংক ব্যবস্থাপকরা বড় ঋণগ্রহীতা ও বিদ্যমান ঋণগ্রহীতাকে ঋণ দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, এটি তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে ব্যাংক পর্ষদের উচিত নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পদক্ষেপ নেওয়া। এ ব্যবস্থা কার্যকরণের লক্ষ্যে জনতা ব্যাংকের জিআই পারফরম্যান্স বোনাসের যোগ্যতার মানদণ্ডগুলো হলো কম খরচে আমানত বৃদ্ধি, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির ঋণ প্রদান, এসএমই, সিএসএমই ও কৃষি ঋণ, ঋণ আমানতের হার ইত্যাদি। এসব যুক্ত করে পারফরম্যান্স বোনাস রুল তৈরির কমিটি গঠন হয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন অন্যান্য ব্যাংকে একই পদ্ধতি ভাবার সুযোগ আছে। অচিরেই জনতা ব্যাংকের এই উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারি চাকরিবিধির সঙ্গে মিল রেখে তিন বছর পরপর বদলির নিয়ম চালু এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ জেলায় না রেখে অন্য জেলায় পাঠানোর নিয়ম কার্যকরের পদক্ষেপ নিয়েছে জনতা ব্যাংক। এছাড়া শাখাগুলোর ভৌগলিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় রিপোর্টিং পয়েন্ট পুনর্গঠিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

৭। আয় ও সম্পদের বৈষম্য দূরীকরণে দেশের বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থা সহায়ক নয়

বাংলাদেশের বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবসা শ্রেণি, আঞ্চলিক ও লিঙ্গ বৈষম্য সৃষ্টির ধারক বাহক হিসেবে চলে আসছে। গ্রামীণ মানুষের সঞ্চয় ব্যাংকে আমানত হিসেবে আসে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী ওই আমানতের ৮০ শতাংশ একই অঞ্চলের মানুষকে ঋণ না দিয়ে শহরের বড় বড় শিল্পপতিদের দেওয়া হয়, যারা ঋণখেলাপি হচ্ছেন অথবা টাকা বিদেশে পাচার করছেন। নতুন উদ্যোক্তারা ব্যাংকের দরজায় ঢুকতে পারেন না। ব্যাংকে ঢুকতে পারেন না নারী উদ্যোক্তা ও যুবসমাজ। মুষ্টিমেয় কিছু লোককে ঋণ দিতে আগ্রহী ব্যাংকগুলো। এ বিষয়টি প্রত্যেক কর্মকর্তার মজ্জাগত হয়ে আছে। এ অবস্থার পরিবর্তন আবশ্যক। একটি ব্যাংকের শাখা আমানতের ৮০ শতাংশ ঋণ দিলে ওই এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি ঘটে। একইভাবে ব্যাংকও লাভবান হয়। দেশের ও আঞ্চলিক বৈষম্য দূর হয়। দেশ উন্নতি লাভ করে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৮০ শতাংশ শাখা তাদের নিজের আশেপাশে ব্যবসায়ীদের ঋণ না দিয়ে বড় শহরের শিল্পপতিদের বড় অঙ্কের ঋণ দিতে ইচ্ছুক। অথচ তারা ঋণখেলাপি হলে বড় পরিমাণ খেলাপি হয়ে যায়। দেশের বৃহত্তর ক্ষতি সাধিত হয়। এ ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। শহর এলাকার করপোরেট শাখাগুলো আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ দিয়ে থাকে। রফতানিতে বিদেশি বিল ক্রয় হিসেবে যত কেলেঙ্কারির ঘটনা রয়েছে, সেগুলো শহরের হাতেগোনা শাখায় হয়েছে। এসব শাখায় আমানতের চেয়ে ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে বর্তমানে এসব অনিয়মিত ঋণ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থাপকরা যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত তারা সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। ব্যাংকিং নিয়মাচার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে এই ব্যবস্থার অবসান অবশ্যই সম্ভব।

৮। জনতা ব্যাংকের সার্বিক সূচকের উন্নয়ন পরিকল্পনা

জনতা ব্যাংকের সার্বিক সূচকের উন্নতির জন্য ২০১৯ সালের ২০ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করি। এ ব্যাপারে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের সহযোগিতার মাধ্যমে ৪৩ শতাংশ মন্দ ঋণের হ্রাস টেনে ২০২০ সালের ৩০ জুন ২৬ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ব্যাংকের মন্দ ঋণ কমানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ২০২০-এর ডিসেম্বরের মধ্যে এটি ২০ শতাংশের নিচে আনার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকের আমানত ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে গত ২৭ জুলাই ৭১ হাজার কোটিতে উন্নীত হয়েছে। ২০১৯ সালের আগস্টে স্বয়ংক্রিয় শাখার পরিমাণ ৩৫০ থেকে ২০২০ সালের ৭ জুন ৯১২টিতে দাঁড়িয়েছে, যা একটি সরকারি ব্যাংকের জন্য বিরাট অর্জন। গত ৩১ মে’র আমানত পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে আগামী ৩১ ডিসেম্বর আমানতের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে ৯০ হাজার কোটি টাকা। এটি অর্জিত হলে অবশ্যই ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে।

৯। পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের কাজের রেফারেন্সের শর্তাবলী স্পষ্টীকরণ

দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথ অথবা এককভাবে কাজটি করতে পারে।

(ক) ব্যাংক ও বোর্ডের স্বার্থে প্রতি বছর কমপক্ষে অন্তত দু’বার মূল্যায়ন করতে পারে এবং পরিচালকদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা যায়।

(খ) বিবেচ্য বিষয়ের মধ্যে থাকতে পারে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার উন্নতি, নেতৃত্ব, ভূমিকা স্পষ্টীকরণ, টিমওয়ার্ক, দায়বদ্ধতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা, পারস্পরিক যোগাযোগ, পর্ষদ কার্যক্রম পরিচালনা ইত্যাদি।

(গ) পরিচালক নিয়োগের সময় যোগ্যতা ও দক্ষতায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি অবিলম্বে নির্ধারিত হওয়া জরুরি।

(ঘ) ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সম্ভাব্য আকার গঠনের নীতিমালা হতে পারে এরকম–  একজন করে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, প্রযুক্তিবিদ, পেশাদার হিসাবরক্ষক, আইনবিদ, চাকরিরত সরকারি কর্মকর্তা ও ন্যূনতম একজন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা। প্রত্যেকের স্ব স্ব কাজের দক্ষতা থাকতে হবে।

(ঙ) ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পেপারটি প্রস্তাব আকারে উপস্থাপনকালে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি দল নীতিমালা পরিচালনা করে শাখা থেকে আঞ্চলিক, বিভাগীয় ও প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটি চূড়ান্ত স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে আছে গেটকিপিং পয়েন্ট, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), জিএম-এইচও ক্রেডিট, ডিজিএম-এইচও ক্রেডিট প্রভৃতি। এ পদ্ধতির ব্যাপারে অসম্মতি থাকলে অথবা সঠিক তথ্য উল্লেখ করা না হলে পর্ষদের গ্রহণযোগ্যতা নাকচের প্রশ্ন ওঠে।

১০। ব্যাংকিং, অর্থ ব্যবস্থা ও মুদ্রানীতির ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণাকার্য সার্বিকভাবে পরিচালনা করা দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ কার্যক্রম চলমান থাকলে সমগ্র জাতি বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার ফল পাবে। একইসঙ্গে তা দেশের দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

১১। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের কমিটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের অভিজ্ঞতা সংবলিত দক্ষ পেশাদারদের নিয়ে গভর্নরের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করলে ভালো ফল আসবে। অপেক্ষাকৃত নবীনদের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্তমান চুক্তিমূলক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের ভেতরের লোকদের নিরুৎসাহিত করা দরকার। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার থেকে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পদোন্নতির প্রয়োজনে গঠিত কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সংযুক্তি থাকা খুব দরকার।

১২। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালকদের ব্যাংকের গাড়ি ব্যবহারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা চলমান রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে এসব ব্যাংকের ৫০-৬০টি গাড়ি পরিচালকরা চালক ও তেলসহ বছরের পর বছর ব্যবহার করছেন। এটি বন্ধের পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: এফসিএ। সাবেক চেয়ারম্যান, জনতা ব্যাংক লিমিটেড। সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। সভাপতি, দ্য ইনস্টিটিউট অব চাটার্ড অ্যাকাউনটেন্ট অব বাংলাদেশ (২০১০)

/এসএএস/জেএইচ/টিএন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ