শ্রিংলার বাংলাদেশ সফর যে কারণে চরম আশাব্যঞ্জক

Send
মোহাম্মদ এ. আরাফাত
প্রকাশিত : ২১:২১, আগস্ট ৩১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৭, আগস্ট ৩১, ২০২০

মোহাম্মদ এ. আরাফাতবাংলাদেশে সেক্যুলার চিন্তাধারার ও ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে থাকা বিশ্লেষকদের একমত হতে দেখা বিরল। তবু বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আপাত দূরত্ব নিয়ে সেক্যুলারপন্থী শিবির থেকে প্রথমে শোরগোল শুরু হয়। এটি শুরু হয় ভারতের বিদায়ী হাইকমিশনার বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি না পাওয়ার ভিত্তিহীন দাবির ভিত্তিতে।
দেশে যারা চীনের দিকে ঝুঁকে রয়েছেন তারা এতে উচ্ছ্বসিত। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলার ঢাকা সফরকে হতাশার উল্লেখ করার মধ্যেও এই উচ্ছ্বাস প্রতিফলিত হয়। আর আমি ধরে নিতে পারি, যারা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও কাছাকাছি দেখতে চান তারা একইভাবে হতাশার মধ্যে রয়েছেন।
তবে রাজনীতির ময়দানের এই দুই পক্ষই ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের সফরের গুরুত্ব ও গভীরতা অনুধাবনে হয়তো ভুল করেছেন। এমন অপরিণত সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে মূলত ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ডায়নামিকস নিয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকা। 

বাংলাদেশ প্রায় ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত শুধু মিয়ানমারের সঙ্গে ভাগ করা সীমান্তের অংশ বাদে। বিশ্বে যেকোনও দুটি দেশের মধ্যে ভাগ করা বৃহত্তম সীমান্ত আমাদের। তাই অনেকের কাছে ভারতের মতো বড় দেশের উপস্থিতি হুমকি মনে হতে পারা স্বাভাবিক। প্রতিবেশী দেশকে ঘিরে বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটির মতো সম্ভাবনা সহজেই অস্থিরতা ছাড়িয়ে যায়।

বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন আগের সরকার স্পষ্টত এই সমীকরণ ধরতে পারেনি, কারণ দেশের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট চাওয়া তাদের মনে ছিল না। সংকীর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব এবং বাগাড়ম্বরপূর্ণ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারক হওয়ায় তারা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে দেশটির নিরাপত্তার স্বার্থ হুমকির মুখে ফেলে এবং ভারতীয় বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক প্রস্তাব বানচাল করার মধ্য দিয়ে। এমন শত্রুভাবাপন্ন আচরণে বাংলাদেশ বা ভারত, কোনও দেশই লাভবান হয়নি। কিন্তু এতে পাকিস্তানের স্বার্থ হাসিল হয়েছে। যারা এই অঞ্চলে একটি ভারতবিরোধী দেশ পাওয়ার চেয়েও বেশি সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ভারতের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন তখন তার চিন্তা-ভাবনায় অগ্রাধিকার পেয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থ। পররাষ্ট্রনীতিতে আমাদের পিছিয়ে থাকাকে সেই দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে পরিণত করেছেন, যা অনেক সময় দুটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনও দেশের সঙ্গে বিদ্বেষ নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নির্দেশনা রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য বাংলাদেশ নির্ধারণ করেছে তা অর্জন করতে হলে অবকাঠামো সংস্কারে বিশালাকারের বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। এখানেই আবির্ভাব চীনের। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন সেবাভিত্তিক উন্নত অর্থনীতি থেকে বিশ্ব কারখানায় পরিণত হয়েছে। আর স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা দেশটিকে আকর্ষণ করেছে। তখন থেকেই উভয় দেশ উভয়ের স্বার্থানুকূল অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার অনুধাবন করতে পারে ভারত, যদিও চীনের সঙ্গে দেশটির বেশ অস্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে। 

ফলে কয়েকজন বিশ্লেষক প্রথম যে ভুল করেছেন তা হলো, তারা ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের সফরকে বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কয়েকজন তো এই সফরকে ‘তড়িঘড়ি ব্যবস্থা’ বলে বসেছেন। কিন্তু ঘটনা হলো, যখন মহামারি পরিস্থিতি বিরাজ করছে তখন বন্ধুসুলভ দুটি কূটনৈতিক প্রটোকলের বেড়াজাল এড়িয়ে গেছে। এছাড়া শ্রিংলাই হলেন করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা প্রথম বিদেশি উচ্চপদস্থ ব্যক্তি। এতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রধানমন্ত্রীর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা প্রকাশ পায়।

কয়েকজন কথা বলেছেন বৈঠক উভয় পক্ষের সম্ভাব্য ‘নীরবতা’ নিয়ে। যদিও এই ধারণার বিপরীত চিত্র পাওয়া গেছে যখন বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই শ্রিংলার বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন সংবাদমাধ্যমকে ব্রিফ করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বৈঠকের বিস্তারিত নিয়ে কথা বলেছেন।

লক্ষ্যের নিরিখে শ্রিংলার সফর সফল হয়েছে। এই সফরের উদ্দেশ্যের মধ্যে চীনকে মোকাবিলা বা বাংলাদেশে চীনের প্রকল্প ছিল না। বস্তুত, দ্বিপক্ষীয় এতসব বিষয় ছিল যে অন্য এজেন্ডা বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে স্থান পায়নি। প্রত্যাশিতভাবেই উভয় দেশের প্রথম অগ্রাধিকার তৃতীয় কোনও দেশকে বিতাড়িত করা ছিল না। কিন্তু বিশ্বে চলমান করোনা মহামারির বাস্তব পরিস্থিতি অগ্রাধিকার পেয়েছে। ভারত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির করোনা ভ্যাকসিন বাংলাদেশে উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছে। বিখ্যাত সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার এই প্রস্তাব গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অক্সফোর্ডের করোনা ভ্যাকসিন বাংলাদেশে জরুরি ভিত্তিতে আনার জন্য বেক্সিমকো ফার্মা ও সিরাম ইনস্টিটিউটের মধ্যে দ্রুত একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। চুক্তি অনুসারে, বাংলাদেশে ভ্যাকসিনটির একমাত্র পরিবেশক হবে বেক্সিমকো। যদিও প্রয়োজনে সিরামের কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকারের ভ্যাকসিন নিয়ে আসার পথ খোলা রয়েছে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে তা হলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। এটিও বাংলাদেশ সম্পর্কিত। ভারত যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হতে যাচ্ছে তখন বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের অবস্থান পরিবর্তন অনেক বড় বিষয়। যা ভারতীয় নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশের সুবিধাজনক অবস্থানকেই সামনে নিয়ে আসে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো তরান্বিত করায় ভারত সরকারের আগ্রহের কথা তুলে ধরেছেন শ্রিংলা। আবারও তা বাংলাদেশকেন্দ্রিক ইস্যু। উচ্চমানের অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তার জন্য উপযুক্ত আর্থিক প্রকল্প বাংলাদেশে নিয়ে আসতে ঢাকার প্রস্তাবেও সম্মতি দিয়েছে ভারত।

উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সঙ্গে কানেক্টিভিটি কৌশলগত কারণে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তা বাংলাদেশের জন্যও আর্থিক সুবিধার সুযোগ সৃষ্টি করে। ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যা বলা হচ্ছে বাস্তবতা তার বিপরীত। শ্রিংলার সফরে প্রতীয়মান হয়েছে সম্পর্ক আগের মতোই রয়েছে।

লেখক: অধ্যাপক। চেয়ারম্যান, সুচিন্তা ফাউন্ডেশন

/এএ/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ