আফগানিস্তানও ছুটে যাচ্ছে ভারতের হাত থেকে?

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৩:০৯, সেপ্টেম্বর ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১২, সেপ্টেম্বর ০১, ২০২০

আনিস আলমগীর২০০১ সালে আফগান যুদ্ধকালে তালেবানদের হাতে কান্দাহারের একটি এলাকায় বন্দি হয়েছিলাম। সেই বন্দিত্ব আমাকে বেশি সময় সহ্য করতে হয়নি, তালেবানদের এক কমান্ডার গাড়ি চালিয়ে পাকিস্তান-আফিগানিস্তানের সীমান্ত শহর চামনের এক হোটেলে রেখে গিয়েছিলেন আমাকে, যখন তারা নিশ্চিত হয়েছিলেন আমি সাংবাদিক এবং বাংলাদেশি। বাংলাদেশি মোল্লারা তালেবানদের সমর্থন করে মিছিল করেছে এমন একটি ছবি এক তালেবান যোদ্ধা ওইসময় পাকিস্তানের পত্রিকায় দেখেছে, সেটি তাদের সহানুভূতি লাভে খুব কাজে দিয়েছিল। মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলেও এই ঘটনা আমাকে একটি অভিজ্ঞতা দিয়েছে—জীবন এবং মৃত্যুর মাঝামাঝি পরিস্থিতিতে একজন মানুষের অনুভূতি কেমন হয় সেটি। আমি অনেককে বলেছি—২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়ার সাহসটা আমি আসলে সেখান থেকেই পেয়েছি।
যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান দেখার জন্য ঠিক এক বছর পর আমি যখন আবার কাবুল যাই, সেখানে পড়তে হয় ভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যে। আগেই আমাকে সতর্ক করেছিল পাকিস্তানি সাংবাদিক বন্ধুরা যখন আমি ইসলামাবাদ থেকে আরিয়ানা নামের ছোট্ট একটি উড়োজাহাজে কাবুল যাচ্ছিলাম। যাওয়ার দ্বিতীয় দিনে কাবুলের কেন্দ্রস্থলে একটি জনবহুল রাস্তায় আমাকে আটক করে কিছু লোক। তারা সবাই তালেবানদের প্রতিপক্ষ—নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের লোক। ক্ষমতা বদলের পর ওরাই তখন কাবুলের পাহারাদার।

তারা বলছে আমি পাকিস্তানি, কাবুলে কেন আসলাম। উর্দুতে কথা বলছিল। আমি কথাবার্তা চালানোর মতো হিন্দি-উর্দু মিশ্রিত একটা খিচুড়ি ভাষা জানি, কিন্তু ভুলেও তা বলছি না তখন। কারণ ইসলামাবাদ থেকে সাংবাদিক বন্ধুরা আমাকে যে সতর্ক করেছে, সেটা তখনও মনে আছে, কাবুলে পাকিস্তানি কাউকে পেলে লাঞ্ছিত করে। উর্দু বলা মানেই পাকিস্তানি সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হওয়া। কেউ কেউ প্রশ্ন করছে—হিন্দি, হিন্দি? মানে আমি ভারতীয় কিনা, ভারতীয় হলে ওরা ছেড়ে দেবে। আমি সঙ্গে থাকা পাসপোর্ট দেখালাম, মূর্খরা তা চিনে না, পড়তেও পারে না। অনেক কষ্টে তাদের রাজি করাতে পারলাম যে নিকটস্থ কোনও পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাও আমাকে। তাই করলো এবং পুলিশ আমার পরিচয় পেয়ে সম্মানের সঙ্গে ছেড়ে দিলো।

এই কাহিনি বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে তালেবান পতনের পর আফিগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর দখলদারিত্বে ভারতীয়দের আধিপত্য বুঝানো। আফগান যুদ্ধে পারভেজ মোশাররফ নামকাওয়াস্তে তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে থাকলেও যুদ্ধের পর পাকিস্তান হয়ে যায় আফগানিস্তানের শত্রু রাষ্ট্র। ভারত হয় বন্ধু রাষ্ট্র। কাবুল সরকারের সহায়তা পেয়ে ভারত সেখানে ব্যবসা বাণিজ্যে আধিপত্য গড়ে তোলে এবং পাকিস্তানবিরোধী একটা পরিবেশ তৈরি করে, যা পরবর্তী এক যুগ ছিল বলা যায়। দুই প্রতিবেশী পাকিস্তান-আফগানিস্তান নানা ঝগড়া বিবাধ, নরম-গরম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে কাবুল সরকার ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু এই ঝুঁকে পড়ায় না হয়েছে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক কল্যাণ, না এসেছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

অন্যদিকে, সরকারি নীতি যাই হোক, তালেবানদের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর যোগাযোগ বরাবরই ছিল। তালেবানদের অবাধ যাতায়াত ছিল পাকিস্তানে। মোল্লাহ ওমরের তালেবান সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতা হারিয়েও বছরের পর বছর দখলে রেখেছে দেশের একটা বিস্তৃত এলাকা, আর ১৯ বছর ধরে চলে আসছে সেই যুদ্ধ। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী এবং সরকারি বাহিনী—দুটির সঙ্গে লড়ে গিয়েছে তালেবানরা। সর্বশেষ ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবানদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে আমেরিকা, কারণ যে হারে তারা তালেবানদের কাছে সৈন্য হারাচ্ছিল, তাতে মানসম্মান দিয়ে আফগানিস্তান ত্যাগ করা ছাড়া তাদের উপায় নেই। কিন্তু সেই চুক্তি কার্যকর আর হয়নি কারণ তালেবানদের শর্তানুয়ায়ী কাবুল সরকার ৫০০০ বন্দির সবাইকে মুক্তি দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। তালেবানরাও হামলা বন্ধ করেনি কথা মতো।

অবশেষে এগিয়ে আসে চীন। তারা কাবুল সরকার, তালেবান আর পাকিস্তানকে এক মঞ্চে আনতে নেপথ্য ভূমিকা রাখে। গত ২৬ আগস্ট ২০২০ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি আফগানিস্তানে নিয়োজিত চীনের বিশেষ দূত লিউ জিয়ানকে আফগানিস্তানের ১৯বছরের যুদ্ধ শেষ করতে সাহায্য করার জন্য ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেখানে তালেবানদের রাজনৈতিক শাখার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের বৈঠক হয়েছে কীভাবে তালেবান এবং আফগান সরকার একটা সমঝোতায় পৌঁছতে পারে তার রূপরেখা নিয়ে। আর চীন-পাকিস্তানের এই উপস্থিতি ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের উচ্চাভিলাষকে আরও এক ঝাঁকুনির মুখে ফেলে দিয়েছে। শুধু নেপাল বা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে চীন নিজের দিকে টানতে চাইছে না, আফগানিস্তানের জন্য তাদের উন্নয়ন প্যাকেজ রয়েছে। আর সেটা দেখিয়ে তারা পাকিস্তান-আফগানিস্তান আর তালেবানদের এক মঞ্চে আনার কাজটা করে দিয়েছে।

সময়ের ব্যবধানে তালেবানরা বিশ্বকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে আফগানিস্তানের উন্নয়ন, গঠন এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় তালেবানদের বাদ দেওয়া সম্ভব না। প্রতিবেশী ইরান, চীন, রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়া, পাকিস্তান সবাই একমত যে জাতি গঠনে তালেবানদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা রয়েছে। এটাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। সেখানে ভারতের কূটনীতি এবং ভূমিকা চরম ব্যর্থ হয়েছে।

সবচেয়ে লক্ষণীয় এতে আমেরিকার কোনও বাধা নেই। ২৬ আগস্ট তালেবানদের সঙ্গে বৈঠকের পর ইসলমাবাদ বলছে, আফগানিস্তানের যুদ্ধরত দলগুলোর মধ্যে দেশটির দীর্ঘ বিরোধের অবসান ঘটাতে ‘মার্কিন সমর্থনপ্রাপ্ত’ শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা সম্পর্কে তারা ‘আশাবাদী’। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কুরেশির সঙ্গে তালেবান নেতা মোল্লা আবদুল গণি বড়দারের নেতৃত্বে একটি তালেবান প্রতিনিধি দল আলোচনা করেছে। সেখানে আইএসআই প্রধানও ছিলেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাম না নিয়ে ভারতের উদ্দেশে বলেন, তারা আফগান শান্তি আলোচনার অগ্রগতি চায় না। তালেবানি নেতা মোল্লা আবদুল গণি ৮ বছরের বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের নিরাপত্তা হেফাজতে ছিলেন বলা হয়। ২০১৮ সালে তাকে ছাড়া হয় সম্ভবত তালেবানদের সঙ্গে চীনের বৈঠকের মঞ্চ তৈরির জন্য।

ফেব্রুয়ারির ওই চুক্তি অনুসারে মার্কিন সৈন্যরা ১৪ মাসের ভেতর সম্পূর্ণভাবে আফগানিস্তান ছাড়তে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেছেন তারা সরে গেলে কাবুলের পশ্চিমা সমর্থিত সরকারকে হটিয়ে তালেবানরা রাজধানী কাবুলের দখল নেবে। কাবুল সরকারের জন্য এখন আশা হচ্ছে আসন্ন আন্তঃআফগান বৈঠক সফল করা, যা সম্ভবত সমস্ত ক্ষেত্রেই তালেবানরা যেসব শর্ত নিয়েছে তা মেনে নেওয়া হবে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির টেমপ্লেটের চেয়ে খুব আলাদা নয়।

প্রতি মাসেই আফগানিস্তানের সরকারি বাহিনীর ২০/২২ জন নিজ পক্ষ ছেড়ে তালেবান বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। মার্কিনিদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এটা আরও বেড়ে গেছে এবং বড় পদবির কর্মকর্তারাও যোগ দিচ্ছেন। গত ১৯ বছরের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৩০০ সৈন্য নিহত হয়েছে, আহতদের সংখ্যা ২১ হাজার আর আফগান সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর ৫৮ হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছে। মার্কিনিদের আর্থিক ব্যয় দুই ট্রিলিয়ন ডলার।
তালেবানদের সঙ্গে চুক্তির সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর আকার প্রায় ১৩ হাজার থেকে ৮,৬০০ তে নেমে এসেছিল। ট্রাম্প এই আগস্টের শুরুর দিকে বলেছিলেন যে নভেম্বরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আফগানিস্তান থেকে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার সেনা চলে যাবে। তালেবানদের সঙ্গে সহিংসতা অবসান করতে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২১ সালের মাঝামাঝি নাগাদ সমস্ত মার্কিন সেনাকে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

এই চুক্তিতে তালেবানদেরকে বন্দি করে রাখা এক হাজার আফগান সুরক্ষা বাহিনীর সদস্যকে মুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। বিনিময়ে আফগান সরকারের পাঁচ হাজার বিদ্রোহী বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। যদিও এপ্রিল মাসে পাল্টাপাল্টি মুক্তিদান শুরু হওয়ার পর থেকে তালেবানরা ইতোমধ্যে সব বন্দিকে পর্যায়ক্রমে মুক্তি দিয়েছে, কাবুল সরকার প্রায় চার শত তালেবান বন্দি ছাড়া বাকি সবাইকে মুক্তি দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট গানি গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে এসব তালেবান সদস্যকে মুক্তি দিতে অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু রবিবার আফগান ট্রেডিশনাল পার্লামেন্ট লয়া জিরগা রাষ্ট্রপতিকে বিদ্রোহীদের মুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে যাতে আন্তঃআফগান আলোচনা অবিলম্বে শুরু হতে পারে।

ভারত বিজয়ের পর ব্রিটিশরা আফগানিস্তানের দখল নিতে বহু চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল চূড়ান্তভাবে। গত শতাব্দীর আশির দশকে সোভিয়েত রাশিয়াও পারেনি আফগানিস্তান দখলে রাখতে। এমন একটি দৃষ্টান্ত চোখের সামনে থাকার পরও আমেরিকা ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদার সন্ত্রাসী হামলার পর আফগানিস্তান আক্রমণ করে বসে। কারণ তখন কাবুলে ক্ষমতায় ছিল তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের সরকার। তারাই ওসামা বিন লাদেন ও তার সংগঠন আল-কায়েদাকে সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করে যাচ্ছিল।

মোল্লা ওমরের সহযোগিতা ছাড়া আল-কায়েদার বাড়বাড়ন্ত অবস্থানে গিয়ে পৌঁছা সম্ভব ছিল না। ওসামা বিন লাদেন তখন আফগানিস্তানেই থাকতেন। বিশ্বের বহু দেশে আল-কায়েদা ছড়িয়ে পড়েছিল। তার হামলার মুখ্য টার্গেট ছিল আমেরিকান স্থাপনা ও দূতাবাস। তখন বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙেযাওয়ার পর রাশিয়া তখন স্বস্তিকর অবস্থায় নেই। সোভিয়েতের অবর্তমানে আমেরিকার জন্য আল-কায়দাই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল সারা বিশ্বে এবং তারা দেশে দেশে মার্কিন দূতাবাস আক্রমণ শুরু করেছিল।

কাবুল সরকার এবং তালেবানরা যদি আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায় তবে সমন্বিত একটা সংবিধান রচনা করতে হবে সবার আগে। তারা যদি আন্তরিকতার সঙ্গে শান্তি কামনা করে তাহলে সমঝোতা হওয়া খুব কঠিন হবে না। কামনা করি চুক্তি সফল হোক, আফগানিস্তানে শান্তি আসুক।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 

 
/এমএমজে/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ