এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখনই

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ২১:২৪, সেপ্টেম্বর ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৭, সেপ্টেম্বর ০২, ২০২০

মো. জাকির হোসেনখালি চোখে অদৃশ্যমান অতিক্ষুদ্র এক ভাইরাসের তাণ্ডবে আদম সন্তানের শ্বাসতন্ত্র ছিন্নভিন্ন হয়ে মৃত্যু ঘটছে। বেঁচে থাকলেও নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে স্থায়ী ক্ষত রেখে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভয়ংকর বৈরিতা সামরিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের এক প্রলয়ংকরী পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। করোনাকালে এসব কিছুর পাশাপাশি যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে, তা হলো সারা বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থাকে তছনছ করে ফেলেছে করোনাভাইরাস। একটি পরিসংখ্যান বলছে, করোনা অতিমারির কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় ২৭ জুলাই পর্যন্ত সারা বিশ্বের ১.৭২৫ বিলিয়ন শিক্ষার্থী নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। UNICEF-এর একটি পর্যবেক্ষণে প্রকাশ, ১০৬টি দেশে সমগ্র রাষ্ট্রব্যাপী ও ৫৫টি রাষ্ট্রে স্থানীয় পর্যায়ে স্কুল বন্ধ রাখায় বিশ্বের ৯৮.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষাজনিত ক্ষতির শিকার হয়েছে। তবে UNICEF-এর ওই পর্যবেক্ষণে প্রকাশ, ৪৮টি রাষ্ট্রে স্কুল চালু রয়েছে। UNESCO-র মতে, এই ৪৮টি দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৪৭ কোটি ৩৯ লাখ ৩৩ হাজার ৩৫৬ জন শিক্ষার্থী ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ৭ কোটি ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ৯০৪ জন করোনাভাইরাস সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে একাধিক গবেষণা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্কুল বন্ধ থাকার ফলে প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার সংক্রমণ কম হয়েছে এবং ৪০ হাজার ৬০০ মৃত্যু এড়ানো গেছে।
কয়েক মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ভয়ংকর পরীক্ষা জট সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বব্যাপী। পরীক্ষা জট মোকাবিলায় বিভিন্ন রাষ্ট্র বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক Center For Global Development-এর COVID education tracker-এর মাধ্যমে ১০০টি রাষ্ট্রের ওপর পরিচালিত গবেষণায় প্রকাশ, জাতীয় পর্যায়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের বিষয়ে সরকারগুলো অন্তত ৬টি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে—
এক. পরীক্ষা বাতিল। এই সিদ্ধান্তের ফলে সব পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে এবং এই শিক্ষাবর্ষে কোনও পরীক্ষার আয়োজন করা হবে না। আমাদের প্রতিবেশী ভারতে মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, হরিয়ানা, রাজস্থান, উড়িষ্যা, কেরালা, দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশসহ রাজ্য ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে স্কুল, কলেজের বোর্ড পরীক্ষা, বার্ষিক সমাপনী পরীক্ষাসহ শত শত পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এমনকি কিছু কিছু রাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাও বাতিল করেছে।
দুই. নতুন ফরম্যাট। এই সিদ্ধান্তের আওতায় অনলাইনে অনেক পরীক্ষা গ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষা চলমান রয়েছে কিংবা পরীক্ষা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
তিন. ২০২০-এর পরিকল্পনা। এক্ষেত্রে পরীক্ষা বিলম্বিত হয়েছে, তবে পরীক্ষার নতুন শিডিউল ঘোষণা করা হয়েছে।
চার. পরীক্ষা স্থগিত। অনেক দেশ করোনা সংক্রমণের বিবেচনায় পরীক্ষা স্থগিত করেছে। পরীক্ষা গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে, তবে এখনও নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
পাঁচ. পরীক্ষাবিহীন ফলাফল ঘোষণা। এক্ষেত্রে কোনও পরীক্ষা গ্রহণ ছাড়াই শিক্ষার্থীর আগের ফলাফল বা শিক্ষকদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ফলাফল ঘোষিত হয়েছে।
গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডাসহ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর ৮০ শতাংশই পরীক্ষাবিহীন বিকল্প গ্রেড প্রদানকে বেছে নিয়েছে।
ছয়. সামনে এগিয়ে যাওয়া। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের শারীরিক উপস্থিতিতে ইতোমধ্যে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিংবা পরীক্ষার শিডিউল সামান্য বিলম্ব করে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। Center For Global Development-এর গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ৪০ শতাংশ রাষ্ট্র পরীক্ষা স্থগিত করেছে। পরীক্ষার নতুন কোনও তারিখ ঘোষণা ছাড়াই মাসের পর মাস পরীক্ষা বিলম্বিত করছে এসব রাষ্ট্র। উল্লেখ্য, এই ৪০ শতাংশ রাষ্ট্রের অর্ধেক হলো নিম্ন আয়ের দেশ।  
করোনাকালের পরীক্ষা জট মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থানেও এই ছয়টি কৌশলের অনেকই প্রতিফলিত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) ও সমমানের পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। স্কুলের বার্ষিক সমাপনী পরীক্ষার বদলে বিকল্প মূল্যায়নের মাধ্যমে কীভাবে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা যায় সে বিষয়ে কৌশল নির্ধারণের কাজ করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল। তবে উচ্চ মাধ্যমিক তথা এইচএসসি পরীক্ষা ৫ মাস ধরে স্থগিত হয়ে আছে। এ সুযোগে কুচক্রীরা প্রতিনিয়ত এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে নানা গুজব রটাচ্ছে। ষড়যন্ত্রকারীরা এমনকি গুজবকে বিশ্বাসযোগ্য করতে ফেসবুকে ‘মিনিস্ট্রি অব এডুকেশন বোর্ড’ নামের ভুয়া পেজ খুলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করছে। সরকার নিয়মিত এসব গুজবের বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। গুজবে বিভ্রান্ত না হতে আহ্বান জানাচ্ছে। এরই মাঝে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে পরপর দু’দিনের সংবাদপত্রে দুটি পরস্পরবিরোধী সংবাদ বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
গত ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং এর অধীন বিভিন্ন দফতর, সংস্থা প্রধানদের অংশগ্রহণে করোনাকালীন ও করোনা-পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অনুষ্ঠিত এক অনলাইন সভার উদ্ধৃতি দিয়ে অনেক জাতীয় দৈনিকে খবর বেরোয়, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এইচএসসি পরীক্ষা এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণের বিষয়ে বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি কী হতে পারে, সে বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর পরদিন ২৮ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশিত হয়, এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের সুযোগ নেই। দেশে ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকার এই পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না।
এই কলাম যখন লিখছি তখন খবর বেরিয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খুললেও পরিস্থিতি সাপেক্ষে নভেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে নভেম্বরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে এমন সুপারিশ করেছে করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি। কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর বরাতে খবরে প্রকাশ, পরীক্ষা যে নভেম্বরে হবেই এমন বলা হচ্ছে না। যদি নভেম্বরে স্বাস্থ্যবিধির যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, সেগুলো নিশ্চিত করা যায়, তাহলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে তারিখটা দেবে সেটা নভেম্বরে হতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা বারবার বলছেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে এলে ২ সপ্তাহের সময়সীমা দিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। এবার আমাদের পরীক্ষার্থী ১৪ লাখ। পরীক্ষার্থী যখন পরীক্ষা দিতে যাবেন, তখন পরিবারের কেউ না কেউ সঙ্গে যাবেন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, বাবা-মা, ভাইবোনের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি পরীক্ষার্থীর সঙ্গে যান। সংখ্যায় তারাও লাখ লাখ। যারা পরীক্ষা পরিচালনা করবেন তারাও লক্ষাধিক। এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা থাকবেন এবং প্রশাসনের লোকসহ নানা রকম লোকের সম্পৃক্ততা রয়েছে সরাসরি। আনুমানিক ২৫ লাখ মানুষের সম্পৃক্ততা থাকবে। এদের বেশিরভাগ চলাচল করবেন গণপরিবহনে। ফলে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির বর্তমান বাস্তবতায় পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ নেই। আর তাই তো ইতোমধ্যে ৫টি পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হলো, করোনা পরিস্থিতি কবে নাগাদ নিয়ন্ত্রণে আসবে?
করোনার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে গত ২৮-৩০ আগস্ট তারিখে প্রকাশিত কয়েকটি পত্রিকার সংবাদের অবতারণা করছি। গার্ডিয়ানের সংবাদে প্রকাশ, করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড পুরো বিশ্ব। দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন করে করোনা সংক্রমণের ১৬তম দিন পূর্ণ হয়েছে শনিবার। দেশটির হাসপাতালগুলোতে দেখা দিয়েছে শয্যা সংকট। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সিউলে জটিল রোগীদের বেলায় এখন হাসপাতালে মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড খালি আছে। অথচ গত সপ্তাহে এই হার ছিল ২২ শতাংশ। মন্ত্রণালয়ের গণস্বাস্থ্য নীতি বিভাগের মহাপরিচালক ইয়ুন তায়ে-হো বলেন, ‘বৃহত্তর সিউলে জটিল রোগীদের জন্য মাত্র ১৫টি বেড খালি আছে। অথচ গুরুতর অবস্থায় থাকা বিপুল সংখ্যক রোগী রয়েছে, যাদের হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন।’ গার্ডিয়ানের খবরে আরও বলা হয়, দেশটির গির্জা, অফিস, নার্সিং হোম ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঘটিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, ইউরোপ-হংকংয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে ছড়াচ্ছে করোনা। এদিকে, জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে ফের বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বিভিন্ন দেশে সতর্কতা ও বিধিনিষেধ জারি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই জানিয়েছিল, যেকোনও সময়ে করোনা ফের ঘুরে আসতে পারে। তেমনই দেখা যাচ্ছে। জার্মানিতে ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষ ফের করোনা আক্রান্ত। এই পরিসংখ্যান গত তিন মাসের মধ্যে সর্বাধিক। ফ্রান্সে হঠাৎ বেড়েছে সংক্রমণের হার। ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, সংক্রমণ আবার আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। ২৪ ঘণ্টায় সাত হাজারের বেশি মানুষ করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। ফের লকডাউনের চিন্তা করছে ফ্রান্সের সরকার। নেভাদা স্টেট পাবলিক হেলথ ল্যাবের ডিরেক্টর মার্ক প্যান্ডোরি জানিয়েছেন, করোনার চরিত্র এবার বদলেছে। প্যান্ডোরি জানিয়েছেন, একবার করোনা হয়ে গেলে তাতে মানুষের এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যাবে, তা বলা যাবে না। কোনও ব্যক্তি একবার করোনা আক্রান্ত হয়ে সেরে উঠলেও আবার আক্রান্ত হতে পারেন এবং দ্বিতীয়বার করোনার আক্রমণ অনেক বেশি শক্তিশালী হচ্ছে, যা আশঙ্কার। যুক্তরাজ্যের দ্য সান পত্রিকা যুক্তরাজ্য সরকারের SAGE কমিটির গোপন নথির বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছে, আসন্ন শীত মৌসুমে যুক্তরাজ্যে ৮৫ হাজার মানুষের করোনা সংক্রমণে মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে প্রকাশ, করোনার তাণ্ডবে বিপর্যস্ত ভারত। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের দৈনিক সর্বোচ্চ সংক্রমণে নিজেদের একদিন আগের রেকর্ড ভেঙে ফের বিশ্বরেকর্ড গড়েছে ভারত। শুধু তাই নয়, এক সপ্তাহের টানা সর্বোচ্চ সংক্রমণেও বিশ্বরেকর্ড গড়েছে দেশটি। টাইমস অব ইন্ডিয়া আরও জানায়, শনিবার (২৯ আগস্ট) ভারতে আরও ৭৮ হাজার ৯০৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে, যা নতুন বিশ্বরেকর্ড। দৈনিক ৭০ হাজার ৮৬৭ শনাক্ত নিয়ে ভারতে গত এক সপ্তাহে মোট ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৭০ জন করোনা সংক্রমিত হয়েছেন, যা বিশ্বরেকর্ড। করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত ব্রাজিল। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এরইমধ্যে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৩৮ লাখ ৪৬ হাজার ৯৬৫ জন। মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৪৯৮ জনের।
‘করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে’ এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে, এটি অতি অস্পষ্ট ও আপেক্ষিক ধারণা। ‘করোনা নিয়ন্ত্রণে এলে’ বলতে মৃত্যুহার শূন্য, নাকি সংক্রমণের হার শূন্য মানদণ্ড হিসেবে ধরা হবে? আবার সংক্রমণ বা মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামার কতদিন পর পরীক্ষা শুরু হবে? কারণ, অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় আসার কয়েকদিন পর আবার সংক্রমণ শুরু হয়েছে। আর তাই করোনাভাইরাস সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় নামার পরও যুক্তিসঙ্গত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় নিশ্চিত হতে। করোনার আঁতুড়ঘর চীনের উহানে গত ১৮ মে’র পর কেউ সংক্রমিত হননি। তারপরও চীনের উহানে স্কুল খুলেছে সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে। তার মানে শূন্য সংক্রমণের ৩ মাস ১২ দিন পর চীন উহানে স্কুল চালু করলো। অন্যদিকে, ইউরোপের কিছু দেশ নতুন করে করোনা সংক্রমণের মধ্যেই স্কুল খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উহানের উদাহরণ অনুসরণ করা হলে এ বছর কখন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে? এদিকে পরীক্ষা অনুষ্ঠানে দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কোমলমতি টিন এজাররা। করোনাকালে এমনিতেই সামাজিক, আত্মীয়তা ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে, তদুপরি এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ওপর এ কড়াকড়ি আরও বেশি করে আরোপ করা হচ্ছে। বাইরে বেরোতে চাইলেই স্বজনরা বাধা দিচ্ছেন, মনে করিয়ে দিচ্ছেন সামনে পরীক্ষা, সংক্রমণ হলে কী হবে তখন? একপ্রকার গৃহবন্দি তারা।
একদিকে সারাক্ষণ পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা, ‘টু বি, অর নট টু বি?’ অন্যদিকে, ঘরের বাইরে বেরোতে মানা ও করোনার ট্রমা। সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর মানসিক চাপ। এই জটিল মানসিক সংকটের শিকার এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অধিকাংশই ৩-৪ মাস ধরে পড়ার টেবিলে বসছে না বলে অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন। সাধারণত শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগের পুরোটা সময় ক্লাসরুম, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, মডেল টেস্ট ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এমনকি পরীক্ষার আগের দিন পর্যন্ত। সেসব চর্চাও বন্ধ ৫ মাস যাবৎ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা মূলত মুখস্থনির্ভর। ফলে পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার পর ২ সপ্তাহ সময় পেলে প্রায় চর্চাহীন, পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়া পরীক্ষার্থীরা ১৩টি বিষয়ের ওপর রিভিশন দিয়ে প্রস্তুতি নিতে পারবে কী? ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, চর্চার মধ্যে না থাকলে মুখস্থ করা জিনিস মস্তিষ্ক থেকে হারিয়ে যেতে ১-২ মাসের বেশি লাগে না। এমন হলে পরীক্ষায় তারা ভালো ফলাফল করতে পারবে কী? ফল বিপর্যয় হলে অপরিপক্ব বয়সী ও অতি আবেগী আমাদের সন্তানরা তা কতটুকু মেনে নিতে পারবে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একজন মেধাবী এইচএসসি পরীক্ষার্থীর নিবন্ধে এসব সংকট ও আকুতি দারুণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘Does studying even make sense if I don't know how long my memory has to retain everything? All of this paved the way for my daily dose of cumulative stress. The fear of losing friends and family was added to it as well since every now and then I would hear news of acquaintances getting affected by or dying due to Covid-19. Fast forward to August, I've lost the mentality to appear for HSC. Rumours of institutions reopening amidst the pandemic are circulating nowadays; they terrify me. While I want to see the end of this viral horror so that normal life can resume, I don't want a hurried resumption of normal life either as this would inevitably lead to HSC. I heavily doubt if I can still achieve the result which I expected from myself before March. If HSC takes place at any cost, numerous students like me would fail to obtain their desired grades and marks, which would further worsen our mental health. ……Perhaps predictive grades will be considered to lessen our burden, or the wait for exam dates will extend indefinitely as everyone's anxiety worsens daily.’
করোনার সর্বশেষ আপডেট হলো, দেশে করোনার সংক্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় স্থিতিশীল রয়েছে। এক মাস সংক্রমণের হার একই রকম আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। যেকোনও সময় সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট বাংলাদেশে শীতকালে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা বলেছেন, ‘সার্বিকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। যদিও গত সপ্তাহে রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, চুয়াডাঙ্গাসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ বাড়তে দেখা গেছে। পরিস্থিতির এমন উন্নতিকে স্থায়ী ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ কোরিয়াকে সফল দেশ হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেখানে নতুন সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। আরও একাধিক দেশে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ বাড়তে দেখা গেছে। সুতরাং আমাদেরও সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।’ করোনার এ অপডেট বিবেচনায় নিয়ে এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরীক্ষার্থীদের মানসিক সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করা হবে, নাকি অন্যান্য অনেক দেশের মতো পরীক্ষা বাতিল করে বিকল্প পদ্ধতিতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হবে।
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধ্যয়ন করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্যের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আইন শাস্ত্রেও তিনি ডিগ্রিধারী। এটি বিরল যোগ্যতা। নিশ্চয়ই তিন সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে পরীক্ষার্থীদের মানসিক সংকট বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে আর বিলম্ব করা সমীচীন নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচ্য।
এক. পরীক্ষা শুরুর মাত্র কয়েকদিন আগে পরীক্ষা স্থগিত হয়েছিল। তার মানে পরীক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। এ অবস্থায় পরীক্ষাবিহীন গ্রেড প্রদান করা হলে তা অধ্যয়ন ও শিক্ষাবিহীন হবে না কোনোভাবেই।
দুই. বিকল্প গ্রেড প্রদানের সিদ্ধান্ত হলে, সেক্ষেত্রে যে কারণে নিজ নিজ কলেজে-স্কুলে পরীক্ষা হয় না, ঠিক একই কারণে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক গ্রেড প্রদানও প্রভাবিত হতে পারে।
তিন. এইচএসসির ফল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও বৃত্তি অর্জনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ক্রিকেটের ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতির মতো পরীক্ষার্থীর অতীতের সর্বোচ্চ অর্জনকে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। কিংবা জেএসসি ও এসএসসি কিংবা সমমানের পরীক্ষায় প্রাপ্ত গ্রেডের গড়কে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
চার. বিকল্প গ্রেড প্রদানের ক্ষেত্রে অন্য কোনও অ্যালগরিদম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্বখ্যাত International Baccalaureate ফাউন্ডেশন করোনাকালে পরীক্ষা বাতিল করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের শিক্ষার্থীদের IB প্রোগ্রামের বিকল্প গ্রেড প্রদানের ক্ষেত্রে অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। তাতে ফল বিপর্যয় ঘটে। বিশ্বের ১৫৩টি দেশের ১ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। “IBSCANDA”L নামে অনলাইন হ্যাশট্যাগ চালু করে এর প্রতিবাদ চলছে। যুক্তরাজ্যে A-level ও GCSE পরীক্ষা বাতিল করে বিকল্প গ্রেড প্রদানের ক্ষেত্রে পরীক্ষা রেগুলেটরি বডি OFQUAL যে অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ফল তৈরি করেছে, তা নিয়েও আপত্তি উঠেছিল।
করোনাকালের এইচএইসসি পরীক্ষা নিয়ে আমাদের কোমলমতি সন্তানেরা এক ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। এ অবস্থা থেকে তাদের মুক্তি দিতে এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বয়ে যায়। দ্রুত তাদের এ সংকটময় অবস্থার অবসান হোক, এ প্রার্থনা করি।

লেখক:  অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ