কার কাছে বিচার চাইবো?

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৮:৪৭, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৯, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২০

প্রভাষ আমিনওয়াহিদা খানম যে এখনও বেঁচে আছেন সেটা তার ভাগ্য, সৃষ্টিকর্তার অসীম দয়া আর লাখো মানুষের ভালোবাসা আর দোয়ার কল্যাণেই হয়তো। দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যার জন্যই মধ্যরাতে তার সরকারি বাসায় হামলা চালিয়েছিল। দারোয়ানকে বেঁধে রেখে, মই দিয়ে উঠে ভেনটিলেটর ভেঙে বাসায় ঢুকে ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলা চালিয়েছিল। হামলায় তার মাথার খুলি ভেঙে মগজে ঢুকে গেছে। মাথায় রক্তক্ষরণও হয়েছে। মেয়েকে বাঁচাতে এসে মুক্তিযোদ্ধা পিতাও দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছেন। দুর্বৃত্তরা হুট করে আসেনি বা চুরি-ডাকাতি করতে আসেনি। সুস্পষ্টভাবেই তারা ওয়াহিদা খানমকে হত্যা করতে এসেছিল। ঠান্ডামাথায় পরিকল্পনা করে এসেছিল। ওয়াহিদা খানম মারা গেছেন ভেবে তারা মিশন সফল ধরে নিয়েই নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। সারা রাত বাবা-মেয়ে আহত অবস্থায় পড়েছিলেন। সকালে খবর পেয়ে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ওয়াহিদাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় আনা হয়েছে। তিনি এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। বিদেশে নেওয়ার মতো অবস্থা নেই। বৃহস্পতিবার রাতে অপারেশন করা হয়েছে। মাথায় ৯টি আঘাত ছিল। মাথার খুলি ভেঙে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল, শরীরের একপাশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে। সবাই এখন একটা মিরাকলের অপেক্ষায় আছে।

কে এই ওয়াহিদা খানম? তিনি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও মানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। ইউএনও হলেন একটি উপজেলার প্রধান নির্বাহী। সহজ করে বললে, তৃণমূলের মানুষদের কাছে ইউএনও-ই হলেন সরকার, সরকারের একেবারে প্রাথমিক ইউনিট। এ হামলা ব্যক্তি ওয়াহিদা খানমের ওপর নয়, এটা আসলে সরকারের ওপরই হামলা, প্রশাসনের ওপর আঘাত। ওয়াহিদা খানম একজন নারী। তবে আমি সেটার জন্য আলাদা কিছু দাবি করছি না। ওয়াহিদা খানম না হয়ে ওয়াহিদুল ইসলাম হলেও একই ঘটনা ঘটতে পারতো। কেন হামলা হয়েছে, সেটা এখনই বলা কঠিন। পুলিশের সব তদন্ত দল মাঠে নেমেছে। একদিনের মধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে দুজনকে। দুজনই স্থানীয় যুবলীগ নেতা। ইতোমধ্যে গ্রেফতার হওয়া উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম ও সদস্য আসাদুল ইসলামকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আসাদুল ইসলামই মূল হামলাকারী। সরকারি দলের নেতারাই সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলা চালাচ্ছে! এখন জানা যাচ্ছে, এই যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই অনেক অভিযোগ। স্থানীয় সংসদ সদস্য আগেই তাদের বহিষ্কারের সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তাদের তখন বহিষ্কার করা হয়নি কেন? হলে আজ সরকারের ওপর এত বড় আঘাত এবং দলের ওপর এত বড় কলঙ্ক লেপনের সুযোগ তারা পেতো না।

আমার শঙ্কা অন্যখানে। একজন ইউএনওর ওপর এমন নৃশংস হামলা জনগণের নিরাপত্তাবোধের ওপরই বড় আঘাত। উপজেলা পর্যায়ে সাধারণ মানুষ বিপদে-আপদে ইউএনওর কাছে ছুটে যায়, বিচার চায়। কিন্তু ইউএনও নিজেই যখন আক্রান্ত হন, তখন আমরা কার কাছে বিচার চাইবো? ইউএনওর নিরাপত্তাই যখন অনিশ্চিত, তখন সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? তাই সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে, নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করতে ওয়াহিদার ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি জানি ওয়াহিদার সর্বোচ্চ চিকিৎসা ও তদন্ত আমরা দাবি না জানালেও দ্রুতই হবে। তবে কোথাও যেন কোনও বিলম্ব না হয়।

ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার পর দেশের ইউএনওদের নিরাপত্তার জন্য গানম্যান দেওয়ার দাবি উঠেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবির সঙ্গে একমত হলেও গানম্যান দেওয়ার দাবির সঙ্গে একমত নই। কাল উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বা কৃষি কর্মকর্তা বা অন্য কারও ওপর হামলা হলে তারাও গানম্যান চাইতে পারে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ইউএনওদের বাসায় আনসার দেওয়ার কথা বলেছেন। আসলে গানম্যান দিয়ে কখনও কারও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। দেশজুড়ে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করাটা জরুরি। নইলে ১৭ কোটি মানুষের জন্য ১৭ কোটি গানম্যান লাগবে।

আগেই বলেছি ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার কারণ এখনও জানি না। হতে পারে ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা শত্রুতা। একজন ইউএনও তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকের বিরাগভাজন হতে পারেন। সে কারণেও হামলা হতে পারে। ইউএনওর ওপর হামলা দুর্বল করবে প্রশাসনকেও। তাই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত ও দৃশ্যমান করতে এই ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি। হামলাকারী সরকারি দলের বলে কোনও অনুকম্পা যেন তারা না পান। এটা খুব জরুরি। কারণ, ইউএনওরা নিজেরাই ভয়ে থাকলে সাধারণ মানুষের মন থেকে ভয় দূর করবেন কীভাবে?

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X