আইনশৃঙ্খলা একটি বিশেষ ‘প্রায়োরিটি’

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৬:৩২, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৭, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা‘মাঠ প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সুপার (এসপি) কী করছেন, তা ডিসি জানেন না। র‌্যাব কী নিয়ে কাজ করছে, তাও অজানা ডিসির। বিভিন্ন কমিটিতে রাজনীতিবিদরা থাকলেও তাদের আগ্রহ অন্য জায়গায়। অন্যান্য বিভাগও যে যার মতো কাজ করছে। জেলা পর্যায়ে জবাবদিহিতার একক কোনও কেন্দ্রবিন্দু নেই।’
ঠিক এমন একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল ২০১৪ সালে, একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায়। আজ ছয় বছর পর এসে কি পরিস্থিতি পাল্টেছে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এক নতুন মাত্রা নিয়েছে। প্রায়ই চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এবার স্বয়ং উপজেলা পর্যায়ে সরকারি প্রশাসন প্রধানের ওপর হামলা হয়েছে, তাও তার সরকারি বাসায়। গত ৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট ইউএনও ওয়াহিদা খানমের সরকারি বাসভবনে তার ওপর মারাত্মক সহিংস আক্রমণ হয়। দুর্বৃত্তরা ওয়াহিদা খানমের বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখের ওপরও চালায় বর্বরোচিত হামলা।   

এরপর থেকে নতুন করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার ইস্যুটি আবার আলোচনায়। গানম্যান না আনসার নেবেন–এ নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু কোনও পক্ষ থেকেই একথা উঠে আসছে না যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে একজন ইউএনও তার সরকারি বাসায় এমন সহিংস হামলার শিকার হতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সরকারি বড় কর্তা এমন হামলায় পড়লে, জনগণের নিরাপত্তা কোথায়? 

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চুরির কথা বলা হলেও এটি ধোপে টেকেনি। বুঝতে কারও বাকি নেই, হত্যার উদ্দেশ্যেই এই হামলা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে নানা বিরোধের মধ্য দিয়ে যেতে হয় ইউএনওদের। বিরোধের বড় কারণ হয়ে দেখা দেয় বালুমহাল, জলমহাল, খাসজমি, নদীর পার, বাজার ও খেয়াঘাট ইজারার মতো অনিষ্পন্ন বিষয়গুলো। এসবের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে চায় প্রভাবশালীরা, যারা আবার রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত। এসব জায়গায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নিতে গেলেই ক্ষিপ্ত হন ক্ষমতাবানরা। শুরু হয় দ্বন্দ্ব, বিপাকে পড়তে হয় কর্মকর্তাদের। প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্থানীয় প্রভাবশালীরা সবকিছুর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করতে চান। সরকারি স্বার্থ রক্ষা করতে গেলে টার্গেট হয় প্রশাসন। গত ছয় বছরে অন্তত ৯ জন ইউএনওর ওপর হামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

সমস্যাটি রাজনৈতিকও। এ মুহূর্তে জেলায় জেলায় অন্য কোনও রাজনৈতিক দল নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির। ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাবাদী অংশটি নানা সুবিধার খোঁজে থাকে। আর অবৈধ কাজে বাধা দিলে প্রশাসনকে প্রতিপক্ষ মনে করে। তারা নিজেদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের সমস্যা নতুন নয়। এ বছরই মে মাসে উপজেলা চত্বরে পৌর মেয়র নিজ দলের কর্মীদের হামলায় রক্তাক্ত হয়েছিলেন। একই জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায় নিয়ে বিস্তর খবর আছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। 

ঠিক কী ঘটছে? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন? নাকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা হচ্ছে না? এই প্রশ্ন এলাকার সংসদ সদস্যের কাছে, প্রশাসনের কাছেও। ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন এবং সদস্য আসাদুল ইসলামকে কেন্দ্রীয় যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জাহাঙ্গীর হোসেন বেপরোয়া, মাদক ব্যবসায় জড়িত এবং তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক ডিও লেটারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে যুবলীগ থেকে তাকে বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়। তখন কিন্তু কোনও ব্যবস্থাই গৃহীত হয়নি। তার ছত্রছায়ায় থেকে মাসুদ রানা, আসাদুল অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিল। করোনাকালীন ত্রাণ বিতরণে এই গ্রুপটিই ঘোড়াঘাট পৌর মেয়রের ওপর হামলা চালায়। 

পদাধিকারবলে ইউএনও উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি। তাদের দ্বারা সরাসরি নিষ্পত্তিকৃত কাজের বেশিরভাগই বিরোধ নিষ্পত্তিমূলক। সেখানেই সমস্যা। এসব বিরোধ এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের চাপে, হুমকিতে ইউএনওদের এলাকাও ছাড়তে হয়। 

আমরা একটা গণতান্ত্রিক বন্দোবস্তের মধ্যে আছি। কিন্তু বিভিন্ন জনপদে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করে যে, সেই সব এলাকা যেন একেকটি গৃহযুদ্ধে দীর্ণ-ক্লান্ত ভূখণ্ড। কিছু কিছু জনপদে কেন বারবার পরিস্থিতি আগুন হয়ে ওঠে তার নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার। আজ  ইএনও’র ওপর হামলা হয়েছে। একটু নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। মনে রাখা দরকার রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী প্রতিপক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। তারা আকুল হয়ে পুলিশ আর প্রশাসনের কাছেই ভরসা খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু আদৌ তারা ভরসার যোগ্য কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ে নাগরিকরা। ফলে, পরিস্থিতি কখনও ভালো হয় না। 

আইনশৃঙ্খলা একটি বিশেষ ‘প্রায়োরিটি’। সমস্যা অনেক গভীরে। আমাদের এই সমাজ উৎপীড়ককে, সন্ত্রাসীকে সাদরে গ্রহণ করে। প্রতিপদে লড়াই সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা অতি সাধারণ নাগরিকের কিছু করা থাকে না। সরকারি স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন উদ্যোগ নিলে যারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে তারা নিশ্চয়ই দূর গ্রহের মানুষ নয়। আগের হামলাগুলোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে এমন ঘটনা ঘটতো না। তাই এবারের হামলার দ্রুততম সময়ে বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হোক। 

 

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ