কেন চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে?

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:২৭, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩০, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০

রেজানুর রহমানচোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। আমাদের দেশে এই কথাটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে কথাটির গুরুত্ব অনেকখানি বেড়েছে। একেকটি অপরাধের ঘটনা ঘটছে, আর তখনই আমাদের বুদ্ধি খুলে যাচ্ছে। চারদিকে ব্যাপক হইচই হচ্ছে, এটা করা দরকার ছিল, ওটা করা দরকার ছিল। একপক্ষ অন্যপক্ষকে দোষারোপ করছে। যেন কত সচেতন আমরা। অথবা যেকোনও মূল্যে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের কূটকৌশল খাটাতে ব্যস্ত হয়ে উঠছেন অনেকে। যুক্তিতর্কের খই ফুটিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা। ‘আমি করি নাই’। সে বা তাহারা করেছে। আবার ‘সে’ বা ‘তাহারা’ কতই না সাধু সাজার চেষ্টা। বিশ্বাস করুন, আমি বা আমরা এই অন্যায় কাজে জড়িত নই। আমাদের ফাঁসানো হয়েছে। দিন যায়, মাস যায়, ঘটনার পেছনে আরেকটি ঘটনা ধাক্কা দেয়। আগের ঘটনাটি যেন ধাক্কা খেয়ে হারিয়ে যায়। নতুন ঘটনার পেছনে ছুটতে গিয়ে পুরনো ঘটনা ভুলে যাই আমরা। তবে প্রতিটি নতুন ঘটনার সময়ই ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’ এই উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই উপলব্ধি কোনও কাজে আসে না। চোর শনাক্ত হলেও কখনও কখনও রাজনৈতিক চাপে ‘চোরের মার বড় গলা’ এই প্রবাদটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন চোর হয়ে ওঠে মহাপুরুষ। ডাকাত যেন তার চেয়েও বড় কিছু।  

ইদানীং আরও একটি মারাত্মক ক্ষতিকর প্রবণতা সমাজে ছড়িয়ে যাচ্ছে। কারও ওপর হামলা হলেই আমাদের বুদ্ধি খুলে যাচ্ছে। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনার পর দেশব্যাপী ইউএনওদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আনসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির পর অনেক অপ্রীতিকর সত্য জনসম্মুখে উঠে আসা। মাঠপর্যায়ে সরকারি কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে একজন ইউএনও হলেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। উপজেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কমিটিরও প্রধান তিনি। অথচ তার বা তাদের নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে ছিল না কোনও সমন্বিত উদ্যোগ। প্রায় ৩ বছর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করা সত্ত্বেও ইউএনও’দের নিরাপত্তায় পুলিশ নাকি আনসার নিয়োগ দেওয়া হবে এই সিদ্ধান্ত নিতেই কেটে গেছে সময়। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ইউএনও’র ওপর নৃশংস হামলার পর ঠিকই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ইউএনওদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তার মানে ঘটনা কী দাঁড়ালো? ঘোড়াঘাটের ইউএনও’র ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা না ঘটলে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি হয়তো আড়ালেই থেকে যেতো। 

একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির পর একাধিক অপ্রীতিকর সত্য আমাদের সামনের উন্মোচিত হলো। 

এক. তিতাস গ্যাসের দুর্নীতি, অনিয়ম। দুই. অবৈধ উপায়ে মসজিদ নির্মাণ। কে না জানে দেশে তিতাস গ্যাস নিয়ে অনিয়ম হয় না। শুধু অনিয়ম বললে কম বলা হবে। তিতাস গ্যাসের সংযোগ দেওয়া, না দেওয়ার ওপর ব্যাপক দুর্নীতি চলে এই দেশে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনা না ঘটলে কেউ কি তিতাসের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করতে পারতো? বোধকরি না। ব্যাপক প্রাণহানির পর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো গেলো। দুর্ভাগ্য, এজন্য জীবন দিতে হলো অনেক অসহায় মানুষকে। 

মসজিদ, মাদ্রাসা অনেক পবিত্র স্থান। অথচ কে না জানে এই দেশে মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেক সময় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয় না। নারায়ণগঞ্জের মসজিদটি নিয়ম-নীতি মেনে নির্মিত হয়নি বলে অভিয়োগ পাওয়া গেছে। স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে এখন থেকে বৈধ জমিতে নিয়ম-নীতি মেনে মসজিদ নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন। 

প্রিয় পাঠক, ভাবুন তো একবার নারায়ণগঞ্জের মসজিদে এত মানুষের প্রাণহানি না ঘটলে কেউ কি সাহস করে মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ তোলার সাহস পেতো? তার মানেও এখানেও সত্য প্রকাশের জন্য অনেক মানুষকে প্রাণ দিতে হলো। আল্লাহর ঘর পবিত্র মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই তো অনিয়ম, দুর্নীতি হওয়ার কথা নয়। অথচ এই দেশে মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করেই ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয় বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আগামীতে হয়তো মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে আর কেউ অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নেবেন না। শুধু আফসোস, এই উপলব্ধির জন্য অনেক ধর্মপ্রাণ মুসল্লিকে প্রাণ দিতে হলো। আমরা তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। পরপারে মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের যেন বেহেশত নসিব করেন। আমিন, সুম্মা আমিন। 

আমাদের দেশে একটা কথা বেশ প্রচলিত বিচার পেতে গেলে প্রভাবশালী হতেই হবে। সাবেক মেজর সিনহাকে নির্মম, নিষ্ঠুর কায়দায় হত্যার ঘটনা সারাদেশের মানুষকে দারুণভাবে ব্যথিত করেছে। এই নির্মম, নিষ্ঠুর ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গোটা দেশের মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ। পাশাপাশি জনমনে এমন কথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে তা হলো–ব্যক্তিটি যদি সাবেক মেজর না হতেন তাহলে হয়তো এই নির্দয়, নিষ্ঠুর খুনের ঘটনা কোনও এক জাদুর ক্ষমতা বলে হাওয়া হয়ে যেতো। কারণ দেশে এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে, অথবা ক্রসফায়ারে মারা যাচ্ছে। তখন স্রেফ বলা হচ্ছে, বন্দুক যুদ্ধে মারা গেছে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি এক অর্থে সন্ত্রাসীদের উৎসাহিত করছে। 

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও’র ওপর হামলার ঘটনাই ধরা যাক। নারকীয় এই ঘটনার পরই র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এটি একটি চুরির ঘটনা। ফলে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এখন বলা হচ্ছে, এটি নিছক চুরির ঘটনা নয়। ইউএনওকে হামলার পেছনে স্বার্থের দ্বন্দ্ব কাজ করেছে। এই ক্ষেত্রে একটা স্বস্তি কাজ করছে। তা হলো, চোর পালানোর আগেই আমাদের বুদ্ধি বেড়েছে। ঘোড়াঘাটের ইউএনও’র ওপর হামলার ঘটনায় তদন্ত কাজ বোধকরি সঠিক পথেই এগুচ্ছে। 

এই যে সঠিক পথের কথা বলা হলো এর আসলে ব্যাখ্যা কী? কোনটা সঠিক পথ? প্রকাশ্য খুনের ঘটনায় জড়িত হওয়ার পরও দেখা যায় সম্মানিত আইনজীবীদের অনেকেই খুনির পক্ষেই দাঁড়িয়ে যান। তার দৃষ্টিতে তিনি (অপরাধী) সঠিক পথেই হেঁটেছেন। এবং কখনও কখনও দেখা যায় খুনির পক্ষের আইনজীবীই জিতে যান। খুনি বীরদর্পে আবার তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে দেয়। এটিকে কি আমরা সঠিক পথ বলবো? নিশ্চয়ই না। কিন্তু এই আতঙ্কজনক সঠিক পথের দিশারীরাই সমাজের নানা স্তরে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। কোনও না কোনও স্বার্থের টানে অনেকেই তাদের সমর্থনও করছেন। এই প্রবণতা দেশের উন্নয়ন, অগ্রযাত্রায় মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে বলে বিদগ্ধজনেরা মন্তব্য করেছেন। 

তাহলে আমাদের কী করা উচিত? সহজ উত্তর—চোর পালানোর আগেই আমাদের বুদ্ধিকে কাজে লাগানো উচিত। এজন্য সততা ও সচেতন দৃষ্টি ভঙ্গি জরুরি। যা কিছু সত্য ও সুন্দর তার পক্ষে জনসমর্থন বাড়ানো জরুরি। এক্ষেত্রে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য সকল সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী দেশের সকল স্তরের জনপ্রতিনিধিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, অপরাধীদের কেউই প্রশ্রয় দেবেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই কথাটি মানলেই প্রিয় দেশটা অনেক সুন্দর হয়ে উঠবে বলে বিশ্বাস করি। সত্য ও সুন্দরের জয় হোক এটাই হোক আমাদের সমবেত প্রার্থনা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ